Home / খবর / অদক্ষ চালক ফিটনেসবিহীন গাড়ি

অদক্ষ চালক ফিটনেসবিহীন গাড়ি

বয়স ১৫ বছর জাহেদুল ইসলাম । গতকাল বিকেলে সিএমপির ট্রাফিক (উত্তর) বিভাগ কার্যালয়ে এসেছে তার হিউম্যান হলার (ম্যাক্সিমা) গাড়িটা ছাড়িয়ে নিতে। অপ্রাপ্তবয়স্ক চালক হয়ে গাড়ি চালানোর দায়ে আটক হয় তার গাড়িটি।  সে জানায়, আগে গাড়ির গ্যারেজে মিস্ত্রির কাজ করতো। সেখানেই কয়েকজন চালকের সাথে সখ্যতা। একদিন অনুরোধ করায় নিউমার্কেট টু নতুন ব্রিজ রুটের লাইনম্যান তাকে নিয়োগ দেয়, তবে বদলি চালক হিসেবে। এরপর থেকে গত দুই মাস ধরে সে গাড়ি চালাচ্ছে। কখনো ধরা পড়েনি। গতকাল থেকে বিশেষ অভিযান শুরু হওয়ায় প্রথম ধরা পড়লো। গাড়ির ৯ম পৃষ্ঠার ১ম কলাম

মালিকের নাম জানতে চাইলে কিছুক্ষণ ভাবতে থাকে, পরে বলে মনে করতে পারছে না। গাড়ির নম্বর জানতে চাইলেও একই কথা বলে, জানা নেই তার। সব খরচ বাদ দিয়ে দৈনিক তার আয় ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা। গাড়ি চালানোর পদ্ধতি সম্পর্কে জানতে চাইলে অকপটে উত্তর দেয়, ‘ফজর অইলে আইয়া পড়ি। হেরপর লাইনম্যান কইয়া দেয় কোনডা চালামু। আছরের আজান পর্যন্ত চালাই। হেরপর ছুটি।’ – শুধু জাহেদুলই নয়, এমন অপ্রাপ্তবয়স্ক ও বদলি ড্রাইভারদের হাতে নিজের জীবনটাকে সঁপে দিয়ে প্রতিনিয়ত যাত্রা করছে লক্ষ লক্ষ মানুষ। হরহামেশাই ঘটছে দুর্ঘটনা। মরছে যাত্রী সাধারণ এবং চালক হেলপারদের অনেকেই। সড়ক দুর্ঘটনার খবর শিরোনাম হয় মিডিয়ায়। একসময় একে নিয়তি ভেবে মানুষ পরদিন আবারো সেই গাড়ির যাত্রী হয় বাধ্য হয়ে।

দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রামে পরিবহন সেক্টরে অরাজকতা বিরাজ করছে। গাড়ির রেজিস্ট্রেশন, ফিটনেস, রুট পারমিট ও রাস্তায় চলাচলের ক্ষেত্রে সর্বত্র বিশৃঙ্খল অবস্থা বিরাজ করছে। নগরীতে চলাচলকারী যানবাহনের বেশিরভাগেরই বৈধ ফিটনেস সার্টিফিকেট নাই। সেই কবে যে একবার ফিটনেস সার্টিফিকেট নেওয়া হয়েছিল, সেটা দেখিয়ে বছরের পর বছর গাড়ি চলছে। দেখবার–বলবার যেন কেউ নেই। অথচ নির্দিষ্ট মেয়াদান্তে যথারীতি পরীক্ষা–নিরীক্ষাপূর্বক যানবাহনের ফিটনেস সার্টিফিকেট নবায়নের বিধান রয়েছে। নিয়ম–নীতির তোয়াক্কা না করে প্রায় অবাধে যাত্রী ও মালামাল পরিবহন করে চলেছে হাজার হাজার গাড়ি।

পুলিশ সূত্র জানায়, প্রচলিত আইনে ফিটনেসবিহীন গাড়ির বিরুদ্ধে উচ্চহারে জরিমানার কোনো বিধান নেই। এ কারণে বারবার মামলা ও জরিমানা হলেও ফিটনেসবিহীন গাড়ির চলাচল বন্ধ হচ্ছে না। সিএমপির ট্রাফিক বন্দর জোনের ইন্সপেক্টর আবুল কাসেম  জানান, ট্রাফিক পুলিশ প্রতিদিন যানবাহনের বিরুদ্ধে ২০০ থেকে ৩০০টি মামলা করছে। এর বেশির ভাগই ফিটনেস না থাকার অভিযোগে হচ্ছে। একবার মামলা হলে তাদের সর্বোচ্চ ৭০০ টাকা জরিমানা হয়।

বিআরটিএর সূত্র মতে চট্টগ্রামে ফিটনেসবিহীন প্রায় ২৫ হাজার যানবাহন চলাচল করছে। এসব গাড়ি ১০ থেকে ১২ বছর যাবৎ বিআরটিএ থেকে ফিটনেস নবায়ন না করে চলাচল করছে। এর ফলে সরকার বছরে প্রায় ২০ কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে। পরিবহন খাতে এই অনিয়ম নিয়ে বিআরটিএ, ট্রাফিক পুলিশ ও পরিবহন মালিক একে অপরের উপর দোষ চাপাচ্ছে। গাড়ির গ্লাস, লাইট, জানালা ভাঙা। তারপরও রাস্তায় ত্রুটিপূর্ণ এসব যানবাহন ট্রাফিক পুলিশের সামনে বাধাহীনভাবে চলাচল করছে। ত্রুটিপূর্ণ এসব গাড়ি কিভাবে চলছে তার কোনো উত্তর মিলছে না। তবে কোনো ‘প্রাইভেট গাড়ি’ ত্রুটি নিয়ে চলাচল করলে রাস্তায় দফায় দফায় পুলিশের রোষানলে পড়তে হচ্ছে।

বিআরটিএ সূত্র জানায়, মহানগরীতে ১০/১২ বছর যাবত ফিটনেস নবায়ন করছে না এ ধরনের বিভিন্ন যানবাহনের সংখ্যা প্রায় ১২ হাজার। আর জেলায় রয়েছে এ ধরনের যানবাহন প্রায় ১৩ হাজার। এসব যানবাহনের মধ্যে রয়েছে ট্রাক, বাস, মিনিবাস, টেম্পো, সিএনজি অটোরিকশা, মাইক্রোবাস ইত্যাদি। তবে অটোরিকশা সবচেয়ে বেশি। অনেক অটোরিকশা ১৬/১৭ বছর অতিক্রম করেছে, তারপরও জোড়াতালি দিয়ে চলছে। ফিটনেসবিহীন যানবাহনের দ্বিতীয় পর্যায়ে রয়েছে ট্রাক, মিনি ট্রাক, বাস, হিউম্যান হলার ও টেম্পু। ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন চলছে লাইসেন্সবিহীন চালক দিয়ে।

গত ২৫ জুলাই সিএমপি কমিশনার মো. মাহাবুবুর রহমানের সভাপতিত্বে ‘চট্টগ্রাম মহানগরীর যানজট নিরসনসহ সুষ্ঠু ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কিত সভায় ট্রাফিকের সিনিয়র কর্মকর্তাদের আলোচনায় উঠে আসে যে ট্রাফিক পুলিশে যে জনবল আছে, তা দিয়ে একবার মামলা হলে দ্বিতীয়বার ওই একই গাড়ির বিরুদ্ধে মামলা করতে গেলে অন্তত ৫০ দিন সময় লাগবে। এটা ফিটনেসবিহীন গাড়ির মালিকদের কাছে সহনীয় হয়ে গেছে। এ কারণে তাঁরা সরকারি রাজস্ব পরিশোধ করে ফিটনেস নেওয়ার চেয়ে বরং ফিটনেস ছাড়াই গাড়ি চালাতে বেশি উৎসাহী হচ্ছে।

চট্টগ্রামে পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের সংগঠন এক ডজনের বেশি। বাস মালিকদের মধ্যে বৈধ ও অবৈধ মিলিয়ে প্রায় ৮টি সংগঠন রয়েছে। এত ফিটনেসবিহীন যানবাহন সড়কে বছরের পর বছর কীভাবে চলাচল করছে– জানতে চাইলে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন, চট্টগ্রাম আঞ্চলিক শাখার সভাপতি মো. মুছা  বলেন, ‘অবৈধ যানবাহনের বিরুদ্ধে অভিযানে আমাদের আপত্তি নেই। আমরা তখনই আপত্তি জানাই, যখন নাম সর্বস্ব কিছু পরিবহন সংগঠন নিজের মতো করে নিয়ম শৃঙ্খলা না মেনে গাড়ি চালিয়ে দেয় রাস্তায়। বিআরটিএ–এর কোনো মোবাইল কোর্ট নেই। রাস্তায় মাঝেমধ্যে পুলিশ কিছু মামলা দিয়ে দায়িত্ব শেষ করছে।’

বিআরটিএ’র তথ্যানুযায়ী চট্টগ্রামে ২০ বছরের পুরোনো জীর্ণ গাড়ির সংখ্যা মোট গাড়ির অর্ধেক, প্রায় ২৫ হাজার। অন্যদিকে, গাড়ির চালকদের বেশিরভাগেরই বৈধ লাইসেন্স নাই। বিশৃংখলার এখানেই শেষ নয়। বাস টেম্পু ট্রাক চালকদের এক উল্লেখযোগ্য অংশ অপ্রাপ্তবয়স্ক। তের–চৌদ্দ বছর বয়সের কিশোররা সমানে এ শহরে যানবাহন চালাচ্ছে। এদের ড্রাইভিং লাইসেন্স আছে কী নাই, সে প্রশ্ন অবান্তর। অপ্রাপ্তবয়স্ক কোনো কিশোরের কোনো অবস্থাতেই ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়ার কথা নয়। নিয়ম অনুযায়ী পেশাদার চালকদের ন্যূনতম বয়স হতে হয় ২০ বছর। অপেশাদার ড্রাইভারের ক্ষেত্রে বয়সের ন্যূনতম সীমা আঠার বছর। নগরীর বিভিন্ন সড়কে ১৪/১৫ বছর বয়সী কিশোর গণপরিবহনের গাড়ি চালাচ্ছে। দেখা যাচ্ছে নগরীর হিউম্যান হলার ও টেম্পুর মধ্যে কম বয়সী চালকের সংখ্যা বেশি।

প্রশাসন এবং আইন–শৃঙ্খলা বাহিনীর নাকের ডগা দিয়ে প্রকাশ্যে সড়কে গাড়ি চালাচ্ছে শত শত লাইসেন্সবিহীন কিশোর চালক। পিকআপ চালানোর কাজে নিয়োজিত এসব কিশোর চালকের গাড়ি চালানোর ন্যূনতম কোনো জ্ঞান তো নেই, নেই শিক্ষাগত যোগ্যতাও। পিকআপের হেলপারি করার পর কোনো ধরনের অভিজ্ঞতা ছাড়াই এসব শিশু–কিশোর বসে যাচ্ছে চালকের আসনে। ফলে যা ঘটার তা–ই ঘটছে। দক্ষিণ চট্টগ্রামের মহাসড়কের আওতায় থাকা পটিয়া, চন্দনাইশ, সাতকানিয়া ও লোহাগাড়া উপজেলার ৭৫ কিলোমিটারের মহাসড়কে প্রায় সাড়ে চার শতাধিক পিকআপ চলাচল করে। এসব পিকআপের মালিকরা টাকা বাঁচানোর জন্য অপ্রাপ্ত বয়স্ক, প্রশিক্ষণবিহীন এবং লাইসেন্স ছাড়া চালকদের নিয়োগ দিচ্ছে। একজন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও লাইসেন্স থাকা চালকের বেতন যেখানে দৈনিক ৬০০ টাকা থেকে ৭০০ টাকা দিতে হয় সেখানে ৩০০ টাকা থেকে সাড়ে ৩০০ টাকা দিয়ে এসব অদক্ষ কিশোর চালককে পাওয়া যায়। আর অদক্ষ চালকরা স্টিয়ারিং হাতে পেয়ে হয়ে ওঠে বেপরোয়া। ঘটছে একের পর এক দুর্ঘটনা। একদিকে অপ্রাপ্ত বয়স্ক–অপরিপক্ক চালক, অন্যদিকে লাইসেন্সবিহীন বাহনে চলে ‘আগে পৌঁছানোর’ প্রতিযোগিতা। যে সিএনজি আগে গন্তব্যে পৌঁছাবে, সে আবার যাত্রী বোঝাই করে আগে ফিরে এসে সিরিয়াল রাখতে পারবে। আর এ জন্যই চলে তাদের বেপরোয়া গতির ‘রেস’। ফলে বেপরোয়া গতির কারণেই যাচ্ছে প্রাণ।

ঢাকায় দুই শিক্ষার্থী নিহতের ঘটনায় আটক তিন চালকের কারোই বাস চালানোর লাইসেন্স নেই। তারা হাল্কা যানবাহনের (কার, মাইক্রোবাস) লাইসেন্স দিয়েই বাস চালাচ্ছিলেন। বাস চালক হিসেবে লাইসেন্স পেতেও কোনো শিক্ষাগত যোগ্যতা লাগে না। ব্র্যাক–এর এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ৫৯ শতাংশ চালক ট্রাফিক আইন মেনে গাড়ি চালান না। অধিকাংশ চালকের সড়ক নিরাপত্তা বাতি এবং সাইন সম্পর্কে সম্যক ধারণা নেই। লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালালে বর্তমান আইনে শাস্তি মাত্র ৫ হাজার টাকা জরিমানা। ফলে অদক্ষ, অপ্রাপ্ত বয়স্ক এবং লাইসেন্স ছাড়া চালকের সংখ্যা বাড়ছে। যাদের লাইসেন্স আছে তাদের বড় একটি অংশের প্রশিক্ষণ নাই। চালকরা ট্রিপ ভিত্তিতে গাড়ি চালাতে বাধ্য হয়। যত ট্রিপ বেশি হবে তত তার আয় বেশি হবে। তাই তারা বেপরোয়া গাড়ি চালায়।

সিএমপি ট্রাফিক উত্তর বিভাগের প্রসিকিউশন ইনচার্জ সার্জেন্ট আনোয়ারুল হক এ প্রসঙ্গে  বলেন, অপ্রাপ্তবয়স্ক চালকদের বেশিরভাগই আসলে হেলপার। এদের ড্রাইভিং লাইসেন্স নাই। থাকবার কথা নয়। আসল ড্রাইভার কাজে ফাঁকি দিয়ে এদের ড্রাইভারের আসনে বসিয়ে দেয়। পরিবহনের মালিক এবং প্রকৃত চালকদের এক্ষেত্রে সচেতন হওয়া উচিত, তাদের অবশ্যই দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে। পক্ষান্তরে বছরের পর বছর ফিটনেসবিহীন যানবাহন কিভাবে রাস্তায় চলতে পারে, সে প্রশ্নটি থেকে যাচ্ছে। পরিবহন সেক্টরে নৈরাজ্য সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। বিশৃংখলাপূর্ণ এই অবস্থার অবসান প্রয়োজন। এই ক্ষেত্রে মূল সমস্যাটি কোথায়, তা খুঁজে বের করা দরকার। সার্জেন্ট আনোয়ার আরো বলেন, পরিবহনের নিরীহ মালিকরা কতিপয় শ্রমিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দের কাছে জিম্মি। কিছু সুবিধাভোগী নেতার আশ্রয় প্রশ্রয়ে চালকরা বেপরোয়া হয়ে উঠছে। অনেকে ট্রাফিক পুলিশের দোষ দেয়। কিন্তু পুলিশ যখন ত্রুটিপূর্ণ গাড়িটি আটক করে নিয়ে আসে, তখন সেই তথাকথিত নেতারা প্রভাব খাটিয়ে গাড়ি ছাড়িয়ে নিয়ে যায়। অন্যথায় পরিবহন ধর্মঘট দিয়ে সবকিছু অচল করে দেওয়ার ভয় দেখায়। নিয়ম হলো যার গাড়ি সেই ছাড়িয়ে নিয়ে যাবে। কিন্তু গাড়ি ছাড়াতে আসে সংগঠনের নেতারা। তারা গাড়ির মালিকের থেকে সর্বোচ্চ জরিমানা নিয়ে এখানে এসে সর্বনিম্ন জরিমানাটাও দিতে চান না। এতে প্রকৃত মালিকরা বিপদে পড়ে।

এদিকে দেশে সড়ক দুর্ঘটনা রোধে বিভিন্ন সড়কে চলাচলকারী গণপরিবহনের অভ্যন্তরীণ ও বাইরের ফিটনেস জরিপের জন্য বিশেষজ্ঞদের নিয়ে কমপক্ষে ১৫ সদস্যের একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ জাতীয় অনুসন্ধান কমিটি গঠন করতে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। একইসঙ্গে তিন মাসের মধ্যে ওই কমিটির কাছে ফিটনেসহীন পরিবহনের তালিকা চেয়েছেন আদালত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Skip to toolbar