Home / অন্যান্য / সড়ক দুর্ঘটনা / আর কোনো সংকটে পড়তে দেয়া যাবে না জাহাঙ্গীরনগরকে

আর কোনো সংকটে পড়তে দেয়া যাবে না জাহাঙ্গীরনগরকে

বেপরোয়া দ্রুতগামী বাসের ধাক্কায় অকালে লাশ হয়ে পরকালে পাড়ি জমালেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই অসামান্য মেধাবী ছাত্র-মার্কেটিং বিভাগের নাজমুল হোসেন রানা এবং মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের মেহেদী হাসান আরাফাত। এখনো সেই ঘাতক বাস, হেলপার ও ড্রাইভারের হদিস পাওয়া যায়নি। রিকশার চালকের কথাও কেউ বলছে না। কোথাও লেখা হয়নি তার নাম কিংবা অবস্থা। অতি প্রাসঙ্গিক কিছু বিষয় ইতোমধ্যেই চাপা পড়ে গেছে। মনে হচ্ছে, লাশ হয়ে যাওয়া ছাত্রদ্বয়ের স্মৃতি, পরিবারের কষ্ট, নিকটজনের বেদনা-হাহাকার, ঘাতক ড্রাইভারের নির্মমতা সব ছাপিয়ে বিশেষ এক শ্রেণির মানুষের কাছে লাশকেন্দ্রিক ‘ভিসি ফেলে দেয়া’মুখী রাজনীতিই মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। আকস্মিকভাবে গত তিন বছরের মোটামুটি শান্ত ক্যাম্পাস যেন মৃত্যুপুরীর রূপ নিয়েছে।

যদিও গত কয়েক দিনের ঘটনাপ্রবাহের প্রত্যক্ষ সাক্ষী আমি নই। কারণ গত এক বছর ধরে আমি ঢাকা-ক্যাম্পাস যাওয়া-আসা করি। তাছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যাওয়াতে আকস্মিক এই অস্থিতিশীল পর্বে উপস্থিত থাকার সুযোগ আমার ছিল না। যে ঘটনা/ঘটনা প্রবাহে আমি নিজে উপস্থিত ছিলাম না তা নিয়ে লেখা সহজ কাজ নয়। তবে গত পাঁচ বছরে জাহাঙ্গীরনগরের বিশাল পরিবারের অনেকের সাথে আমার ঘনিষ্ঠতা। ছাত্র-ছাত্রী, সহকর্মীরা আছেনই, কর্মকর্তা, কর্মচারী, দোকানি, হেন কোনো শ্রেণি নেই যেখানে আমার নিজস্ব সোর্স নেই।

যাই হোক, আমার কথায় বা পর্যবেক্ষণে ভুল বা তথ্য বিকৃতি থাকলে প্রমাণসহ পাল্টা কোনো লেখায় যে কেউ এর প্রতিবাদ জানাবেন বলে আশা করি। আমি কাউকে আমার ব্যক্তিগত শত্রু মনে করি না, আমাকেও কেউ ব্যক্তিগত শত্রু বা বন্ধু ভাববেন না। আমি বৃহত্তর স্বার্থে লেখার বেদনা অনুভব করলাম।

২০১১ সালের ডিসেম্বর থেকে জাহাঙ্গীরনগরের সব বড় বড় ঘটনা-দুর্ঘটনা প্রত্যক্ষ করার সৌভাগ্য কিংবা দুর্ভাগ্য আমার হয়েছে। দেখেছি দুইজন ভিসি আন্দোলনের মুখে কীভাবে সরে যেতে বাধ্য হয়েছেন। প্রথমজন অধ্যাপক ড. শরীফ এনামুল কবীর, দ্বিতীয়জন অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসেন। যদিও দুইজনের বিরুদ্ধে পরিচালিত আন্দোলনের প্রেক্ষাপট ছিল ভিন্ন ভিন্ন। অতীতে যাওয়ার আগে বর্তমানেই একটু থাকি। প্রতিটি ক্ষেত্রে জাহাঙ্গীরনগরের বর্তমান এত ঘোলাটে দেখেছি যে, বর্তমান ক্লিয়ার না করে অতীতে কিংবা ভবিষ্যতে যেতে মন সায় দেয় না।

গত শুক্রবার ভোরে মার্কাজ মসজিদ থেকে ফজরের নামাজ পড়ে রিকশায় ক্যাম্পাসে ফিরছিলেন রানা এবং আরাফাত। আল-বেরুনি হলের আবাসিক ছাত্রদ্বয় এভাবে রাস্তায় বাসের ধাক্কায় লাশ বনে যাবে, কেউ কল্পনাও করেনি। যদিও গতিরোধকহীন এই রাস্তায় নিকট অতীতেই আরও লাশ পড়েছে। নতুন করে এই হৃদয়বিদারক ডাবল মৃত্যুর ঘটনায় যে কারো ক্ষুব্ধ, ব্যথিত হওয়ার কথা। আমরা দেখলাম শুক্রবার জুম্মার নামাজের পর একদল শিক্ষার্থী ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে, ডেইরি গেইটের সামনে প্রতিবাদ জানাতে উপস্থিত হয়। এতে স্বাভাবিকভাবে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। অচেনা ঘাতক বাসের ধাক্কায় দুই দুইটি তাজা প্রাণ ঝড়ে গেলে রাস্তায় এমন অবরোধ হতেই পারে। জুমার পরপর এই অবরোধে তেমনসংখ্যক শিক্ষার্থী অংশ নেয়নি। মিনিট ১৫ রাস্তা অবরোধ করার পর ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা এসে অবরোধকারী শিক্ষার্থীদের রাস্তা থেকে সরে আসতে বললে শিক্ষার্থীরা রাস্তা ছেড়ে দেয় বলে শুনেছি।

দুপুর আড়াইটায় আল-বেরুনি হলের দুই শতাধিক শিক্ষার্থী জয়বাংলা গেইটে জড়ো হয়ে ফের রাস্তা অবরোধ করে। সুস্পষ্ট পাঁচ দফা দাবিতে ছাত্ররা স্লোগান দিচ্ছিল। দাবিগুলো হলো- ১. অনতিবিলম্বে ঘাতক চালককে গ্রেপ্তার করে তার যেন ফাঁসি হয় সেই ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ২. নিহত রানা ও আরাফাতের পরিবারকে কমপক্ষে ১০ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। ৩. পিএটিসি থেকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস পর্যন্ত মহাসড়কের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় স্পিডব্রেকার নির্মাণ। ৪. জয়বাংলা গেইট, বিশমাইল এবং মীর মশারররফ হোসেন হল গেইট সংলগ্ন রাস্তায় জরুরি ভিত্তিতে ফুট ওভার ব্রিজ নির্মাণ। ৫. জাহাঙ্গীরনগর সংলগ্ন মহাসড়কে যানবাহনের গতিসীমা ৩০-৪০ কিলোমিটার এর মধ্যে রাখা। শুক্রবার এই পাঁচ দফা দাবিতে ২০-৩০ মিনিট রাস্তা অবরোধ করে রাখলে যানজট সৃষ্টি হলে উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবুল হোসেন এর নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সর্বোচ্চ পর্যায়ের একটি প্রতিনিধি দল আসে। সাত দিনের মধ্যে সমস্ত দাবি দাওয়া পূরণ করা হবে মর্মে অধ্যাপক আবুল হোসেন ও তার প্রতিনিধি দল প্রতিশ্রুতি দিয়ে চলে যান। জানাজা পড়তে না পেরে, নিহতদের বাড়িতে যেতে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বড় বাস না পেয়ে ছাত্র-ছাত্রীরা তখনো প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ থাকলেও রাস্তায় যান চলাচল শুরু করতে দেয়। সাত দিন মানে সাত দিন, এর এদিক-সেদিক হলে, ফের দুর্বার আন্দোলনে নামবে ছাত্র-সমাজ এসব কথা বলে অবরোধকারীরা ঘরে ফেরে। সেদিনকার মত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।

প্রসঙ্গত, দুজন তাবলিগ করা নিরীহ, অরাজনৈতিক ছেলের নির্মমভাবে নিহত হওয়ার প্রতিবাদে যারা প্রথম দিন দুই দফা রাস্তায় এসেছিল তারাও সবাই অরাজনৈতিক এবং নিরীহ সাধারণ ছাত্র। প্রগতির বাড়াবাড়ি যে সমাজে, সেখানে তাবলিগ করা দুটি ছেলের মৃত্যু আর কজন প্রগতিশীলকে নাড়া দেবে?

যাই হোক, শুক্রবার সকাল থেকে আমার বন্ধু তালিকায় থাকা বর্তমান-সাবেক জাবিয়ানদের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট, সংশ্লিষ্ট সব পাতায় নজর রাখছিলাম। জানাজা নিয়ে ‘মিথ্যাচার’, ‘চালাকি’ ইত্যাদির অভিযোগে সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের ভেতরে দুজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে চরম ক্ষোভ লক্ষ্য করেছি। একজন প্রক্টর তপন কুমার সাহা আরেকজন মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের একজন শিক্ষক।  জানাজা কেন ক্যাম্পাসে পড়া যায়নি প্রশ্নে সবাই নিজের মনের ভাব, মতামত, তর্ক-বিতর্ক প্রকাশ করতে গিয়ে ফেসবুককে বেছে নিয়েছে। ফলে অনেক পরিচিতজনের কাছ থেকে শুরু থেকেই ঘটনাক্রম জানার এবং বোঝার সুযোগ হয়েছে। কেউ মিথ্যা বলছে কি না, বোঝার জন্য আস্থাভাজনদের কাছে জিজ্ঞেস করে ক্রসচেক করেছি। শুক্রবার বিকেল থেকে একটা বিষয় লক্ষ্য করলাম, সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীরা ক্যাম্পাসের সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদে বিশ্বাসী ছাত্রসংগঠনগুলোকে বাসের ধাক্কায় ছাত্র নিহতের বিরুদ্ধে আন্দোলনে শামিল না হওয়ায় তীব্র সমালোচনা করে পোস্ট দিচ্ছিল। কয়েকজন এমনও বলেছে যে, ‘ঢাকার সুপ্রিম কোর্টের সামনের ভাস্কর্য/মূর্তির দামই তোমাদের কাছে বেশি, রক্ত মাংসের গড়া মানুষ হত্যা তোমাদের কাছে গুরুত্ব পেল না’।

আমার ধারণা সোশ্যালিস্ট ও কম্যুনিস্ট ছাত্র সংগঠনগুলো সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের সমালোচনা থেকে বাঁচতেই হয়ত নতুন করে সকালে আবার রাস্তা অবরোধ করার পরিকল্পনা করে। আর নির্দলীয় ছাত্র-ছাত্রীদের ভেতরে জানাজা, রাস্তার স্পিডব্রেকার, ফুট ওভারব্রিজ সংক্রান্ত ক্ষোভ ছিলই। সব মিলে শত শত, কম করে হলেও পাঁচশ ছেলে-মেয়ে, রাস্তা অবরোধ করে ফেলে শনিবার সকালে।

পরিস্থিতি ক্রমশ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। শুক্রবারের অবরোধ ২০/২৫ মিনিট হলেও শনিবারের অবরোধ বেশ লম্বা সময় ধরে হয়। ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক কয়েক ঘণ্টা বন্ধ থাকলে নানা দিক থেকে কী পরিমাণ চাপ সৃষ্টি হতে পারে, তা অনেকে হয়ত বুঝবেই না। একদিকে ছাত্র-ছাত্রীদের আন্দোলন, ইচ্ছে করলেই ছাত্র-ছাত্রীদের জোর করে উঠিয়ে দেয়া যায় না। আবার রাস্তায় আটকে থাকা হাজার হাজার মানুষের কষ্ট। প্রচণ্ড গরমে ছাত্র-ছাত্রীদেরও কষ্ট হচ্ছিল। তবে আন্দোলনে একবার নেমে পড়লে শারীরিক, মানসিক শক্তির অভাব হয় না। তাই ছাত্র-ছাত্রীদের কোনোভাবেই বোঝানো যাচ্ছিল না। আর যিনি বোঝাবেন সবার আগে, অর্থাৎ প্রক্টর সাহেব তিনি আত্মগোপনে থাকলেন। বর্তমান উপাচার্য মহোদয় দায়িত্ব গ্রহণের পরে এটাই ছিল সবচেয়ে বড় সংকট। অথচ প্রক্টর সাহেব প্রকাশ্য হলেন না। বড়ই রহস্যময়। এমন সংকটময় মুহূর্তে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর যখন গরহাজির থাকেন, তখন পুরো চাপটা গিয়ে পড়ে ভিসির ওপর। এবং প্রচণ্ড গরমে, শত শত বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীর মাঝে গিয়ে ভিসিকেই শেষ পর্যন্ত সব দায়িত্ব নিতে হয়। ভিসি শেষ পর্যন্ত সেখানে গেলেন এবং লিখিত প্রতিশ্রুতি দিয়ে এলেন। এর আগে অবশ্য ছাত্রলীগের একটি অংশ অবরোধকারীদের ওপর হামলা করেছে বলে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। তবে ছাত্রলীগ নিশ্চয় সেধে সেখানে যায়নি। তাদেরকে নিশ্চয় কেউ না কেউ অনুরোধ করে সেখানে নিয়ে গেছে।

যাই হোক, ভিসির লিখিত প্রতিশ্রুতি প্রদানের পর রাস্তা থেকে নির্দলীয় ছাত্র-ছাত্রীরা চলে আসতে শুরু করে। কিন্তু নানা রাজনৈতিক সংগঠনের ছেলে-মেয়েরা অবরোধ তুলে নিতে অস্বীকৃতি জানায়। এক পর্যায়ে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্তে পুলিশ এসে অবরোধকারীদের হটিয়ে দেয়। পুলিশ টিয়ার শেল, রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে অবরোধকারী, সাংবাদিকসহ অনেককে আহত করে। সড়ক যোগাযোগ শুরু হলেও সংকট অন্য মোড় নেয়। অবরোধকারীদের রাজনীতি-সংশ্লিষ্ট অংশটি ভিসির বাড়িতে আক্রমণ করে বসে। আক্রমণ বললাম এ কারণে যে, তালা ভেঙে, গেইট ভেঙে ভিসির বাড়ির ভেতরে ঢুকেছে একদল। সিসিটিভি ক্যামেরাও ভেঙেছে তারা। সাংবাদিকরা আমাকে ওই সময় সব আপডেট দিয়েছে। শিক্ষকদের সাথে হাতাহাতি হয়েছে। হতভম্ব হয়ে যাওয়ার মতো সব ঘটনা। এর আগে অধ্যাপক আনোয়ার হোসেনের সময় তার বাসায় একদল ছাত্র হামলা করেছিল। রান্নাঘর পর্যন্ত ঢুকতে পেরেছিল তারা। তখনো প্রক্টরিয়াল টিম এমন ছিল, ছন্নছাড়া। সে সময় ক্লাব থেকে দৌড়ে গিয়ে ভিসির বাড়িতে হামলাকারীদের হটিয়ে দিতে ভূমিকা রাখা কয়েকজন শিক্ষকের মধ্যে আমিও ছিলাম। যাইহোক সে আরেক দুঃখজনক অধ্যায়।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কর্তৃক মামলা দায়ের করা নিয়ে অনেক কথা হচ্ছে। কথা ছিল, সাত দিনের মধ্যে প্রশাসন দাবি পূরণে ব্যবস্থা নেবে। কিন্তু কী কারণে সাত দিন দূরে থাক, একদিন পরেই আবার রাস্তা অবরোধ করা হলো? ধরে নিলাম, ছাত্ররা আবেগ, ক্ষোভ ধরে রাখতে পারেনি, তাই আবার রাস্তায় চলে গেছে। ঠিক আছে। ভিসি লিখিত প্রতিশ্রুতি দেয়ার পরেও তাৎক্ষণিকভাবে সব দাবি বাস্তবায়ন করার মতো অবাস্তব দাবি উঠল কেন? পুলিশ হামলা করল কেন, এমন প্রশ্নেও উপাচার্যকেই দোষী করা হচ্ছে। কিছু শিক্ষক ঢাকায় বসে, লন্ডন-নিউইয়র্কে থেকে উপাচার্যকে ধুয়ে ফেলছেন। উপাচার্য শত চেষ্টা করলেও সেদিন পুলিশের আগমন এবং আক্রমণ ঠেকিয়ে রাখতে পারতেন না। উনি শুধু একটা প্রতিষ্ঠানের প্রধান, তাও এমন প্রতিষ্ঠানের যেখানে সবাই একেকজন রাজা। পাশেই আছে সাভার ক্যান্টনমেন্ট। পিএটিসি আছে। এই রাস্তা বন্ধ থাকা মানে ঢাকার সাথে খুলনা, রাজশাহী, রংপুর, বরিশাল বিভাগের সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়া। ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্র এই এলাকা। ফলে উপাচার্য চান বা না চান, তাতে সরকার বেশিক্ষণ অপেক্ষা করত না। এই রাস্তা উপাচার্যের এখতিয়ারে না। পুলিশি হামলা অবধারিতই ছিল।

পুলিশ, পুলিশের মতোই কাজ করেছে। নির্দয়ভাবে পিটিয়ে আন্দোলনকারীদের আহত করেছে। খুব কাছ থেকে রাবার বুলেট মেরে আমার ছাত্র, সাংবাদিক হাফিজের পিঠ থেতলে দিয়েছে। এই রাবার বুলেট যদি পিঠে না লেগে, মাথায় লাগত তাহলে কী হতো ভাবলে আতঙ্কিত হতে হয়।

উপাচার্য পুলিশ ডেকে এনে অবরোধকারীদের ওপর আক্রমণ করিয়েছেন বলে ফেসবুকে যে প্রচারণা চলছে তাতে আমার সায় নেই। এই প্রচার পরিষ্কার উদ্দেশ্যমূলক। একজন উপাচার্য শুধু নিজের এবং ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা বিধানের জন্য পুলিশি সহযোগিতা চাইতে পারেন। পুলিশ না এলে তার কিছু করার নেই। আর রাস্তার মালিক সরাসরি সরকার। হানিফ পরিবহনের কয়েকটি বাস একবার এমএইচ হলের এক ছাত্রলীগ নেতার নেতৃত্বে আটকে রাখা হলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে পর্যন্ত ফোন দিতে দেখেছিলাম। ফলে সবকিছুর জন্য এখন ভিসিকে দায়ী করা উদ্দেশ্যমূলক মনে হচ্ছে। আরও বলা হচ্ছে, নিজের ছাত্র-ছাত্রীদের বিরুদ্ধে মামলা দিলেন কী করে! প্রথমে শুনতে আসলে লজ্জাজনকই মনে হয়। কিন্তু উপাচার্য একজন মানুষ। তার পরিবার আছে। তার থাকার ঘর আছে। সে ঘরে অশীতিপর বৃদ্ধ-বৃদ্ধা থাকতে পারে, ছোট শিশু থাকতে পারে। ফলে সেখানে কেউ যদি আক্রমণ করে, তালা ভেঙে প্রবেশ করে, তাহলে মামলা দেয়া কী অপরাধ? আপনি আন্দোলন করবেন, বাড়ির বাইরে করেন। আর কিছু হলে ভিসির বাড়িতে চলে আসা কেন? বাড়ি তো ভিসির একার নয়। তার পরিবারের। তার আত্মীয়-স্বজনের। আন্দোলনের নামে যারা উপাচার্যের বাড়ির গেইট ভেঙে ঢুকল তাদের নামে মামলা করার অধিকার উপাচার্য এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের আছে।

তবে যতটুকু খবর পাচ্ছি, তাতে আসামি তালিকায় ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত ‘ভুল’ আছে বলে প্রতীয়মান। এখানে কেউ হয়ত অন্য কোনো বিষয় নিয়ে ব্যক্তিগত শত্রুতার ঝাল মেটাতে মামলার আসামির মধ্যে এমন কয়েকজনের নাম ঢুকিয়ে দিয়েছে যারা ঘটনাস্থলে ছিলই না। এ বিষয়েও উপাচার্য মহোদয় সব জানেন বলে আমার মনে হয় না। অন্য কেউ বা কয়েকজন মিলে কৌশলে এটা করেছে। আসামির তালিকায় অযথা কাউকে ঢুকানো হলে পরে কোর্টে গিয়ে প্রকৃত অপরাধীরাও পার পেয়ে যেতে পারে। তাই চার্জশিট দাখিলের আগে, পুলিশকে অবশ্যই এদের নাম বাদ দিতে হবে।

পুলিশ যে মাঝে মাঝে বাড়াবাড়ি করে, তাতে জবাবদিহি করতে হয় অন্যদের। যারা এই মামলার প্রকৃত আসামি, তারাও কিন্তু এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী। এদের একজনকে হাসপাতালের বেডে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে রাখার মতো দুঃসাহস, বর্বরতা পুলিশের দেখানো ঠিক হয়নি। সঙ্গত কারণেই হাইকোর্ট পুলিশকে তলব করেছে। তাই বলি, পুলিশ কিংবা ক্যাম্পাস প্রশাসনের বা কোনো প্রভাবশালী ছাত্র সংগঠনের কারো অতি উৎসাহ বা বাড়াবাড়ি অপরাধীদের শাস্তি না পাওয়ার কারণ হতে পারে। মামলা প্রত্যাহারের জন্য আমাদের সন্মানিত কয়েকজন শিক্ষক উপাচার্যকে চাপ দিয়েছেন। ছাত্রজীবনে ফৌজদারি মামলা থাকলে পরবর্তী জীবনে নানা অসুবিধা হয়। কিন্তু একজনের বাড়িতে এভাবে হামলা করলে মামলা খেতে হতে পারে, এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। এভাবে উপাচার্যের বাড়ি আক্রান্ত হলে, এর বিচার কী হবে সেটা কি একটু আমাদের শিক্ষকরা বলে দেবেন? বা উপাচার্যের, বাড়ির অন্যান্য সদস্যদের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত হবে তার একটা সমাধানও দিতে হবে।

যে ভাষায় ফেসবুকে উপাচার্য মহোদয়কে আক্রমণ করা হচ্ছে, তাতে বিস্মিত হতে হয়। এমন সব ছেলেমেয়ে ফেসবুকে লিখছে, যারা খুবই নিরিবিলি চলাফেরা করে, পড়ালেখা আর নিজস্ব জগতে থাকে। ৪৫ ব্যাচের ছেলে-মেয়েরা পর্যন্ত এ দলে আছে। উপাচার্যের বাড়ির ভেতরে রাতে ছিল ৪০/৫০ জন। অথচ দুপুরেই রাস্তায় ছিল কয়েকশ ছেলে-মেয়ে। হল খালি করার নির্দেশ পেয়ে সাধারণ ছেলে-মেয়েরা ক্ষেপে যায় পুনরায়। আমি হলে থাকলে, আর হল এভাবে ছাড়ার নির্দেশ দিলে আমিও উপাচার্যকেই দোষারোপ করতাম।

কিন্তু একটা কথা সবাই ভুলে যায়, হল খালি করার নির্দেশ কিন্তু উপাচার্য দেননি, দিয়েছে সিন্ডিকেট। সবকিছুতে উপাচার্যকে দোষারোপ করাতে সচেতন মহলে সন্দেহ সৃষ্টি হচ্ছে। ইস্যু ছিল একটা, হয়ে গেছে আরেকটা। মনে হচ্ছে এখানে বড়দের রাজনীতি জড়িয়ে গেছে। কিন্তু ক্ষতি যে হবে শুধু সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের। ঈদের পরে যেকোনো মূল্যে ক্যাম্পাস অবশ্যই খুলতে হবে। সেশনজট যেন দীর্ঘতর না হয়, সেজন্য সবার সমান মনোযোগ ও দায়িত্বশীলতা লাগবে। এক্ষেত্রে সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের খুব বড় ভূমিকা আছে। ঈদের পর ক্যাম্পাস খুললে, কোনো ধরনের ভুল পদক্ষেপ নেয়া যাবে না। না প্রশাসন, না সাধারণ ছাত্র-ছাত্রী, না কোনো রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠন, কেউই কোনো ভুল পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন না আমাদের আশা। অনেকে বড় বড় কথা বলবে, সাধারণ ছাত্রদের মনে হবে, আহারে কত মহান একজন মানুষ! কে যে কোনদিক দিয়ে নাশকতা করে দিবে, তা বলা মুশকিল। তাই একটি সাবলীল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থে কোনো ব্যক্তির বা গোষ্ঠীর খেলার শিকারে পরিণত হওয়া যাবে না, অন্যদিকে প্রশাসনকেও সাধারণ ছাত্রদের দাবিপূরণে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখাতে হবে।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Skip to toolbar