Home / চট্টগ্রাম / ইয়াবার রাজ্য চট্টগ্রামে

ইয়াবার রাজ্য চট্টগ্রামে

ব্যবসায়ীদের কাছেও মিলছে ইয়াবা পুলিশ, সাংবাদিক, রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের হাতে ইয়াবা, স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র-ছাত্রী ও শিক্ষকদের হাতেও ইয়াবা, । বাস-কাভার্ড ভ্যান-প্রাইভেটকার, সিএনজি অটোরিকশা ও রিকশা চালকের হাতেও ইয়াবা, ওষুধের দোকানে ইয়াবা, ভাসমান চা বিক্রির দোকানে ইয়াবা। চট্টগ্রামের সর্বত্র ধনী থেকে ফকির পর্যন্ত সবার কাছে এখন পাওয়া যাচ্ছে ইয়াবা। এ যেন ইয়াবাময় রাজ্য চট্টগ্রাম। দীর্ঘশ্বাস ফেলে এমনভাবে কথাগুলো বললেন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার ইকবাল বাহার। গত বৃহস্পতিবার বিকেলে চট্টগ্রামে কর্মরত কয়েকজন সাংবাদিকের সঙ্গে ইয়াবা পাচার নিয়ে কথা বলার সময় তিনি এসব কথা বলেন।

পুলিশ কমিশনার ইকবাল বাহার বলেন, চট্টগ্রামের কোথাও ইয়াবা তৈরি হয় এমন প্রমাণ এখনো মেলেনি। অথচ দেশের সিংহভাগ ইয়াবা ধরা পড়ছে শুধু চট্টগ্রামেই। তিনি বলেন, কক্সবাজারের সীমান্ত পেরিয়ে আসা এসব ইয়াবা দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে। আর ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে চট্টগ্রামের মধ্যবর্তি সড়ক ও জলপথগুলো। শুধু ট্রানজিট হিসেবে চট্টগ্রামের মধ্যদিয়ে ইয়াবা পাচার হচ্ছে তা নয়, সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রামের সর্বত্র বিক্রয় ও সেবন বেড়েছে ইয়াবার। আর এই কাজে জড়িত হয়ে পড়ছে স্বয়ং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর লোকজনও। গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় চট্টগ্রামের নৌ পুলিশের এক এএসআই এক হাজার ইয়াবাসহ নগর গোয়েন্দা পুলিশের হাতে ধরা পড়ে। এর আগেও ইয়াবাসহ আরো একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা ধরা পড়ে। সংশ্লিষ্ট এসব পুলিশ কর্মকর্তাদের চাকুরি থেকে বরখাস্তসহ আইনি ব্যবস্থা নেয়া হলেও যেন ব্যর্থ হচ্ছি আমরা-বললেন পুলিশ কমিশনার ইকবাল বাহার। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ইয়াবা পাচারে এখন সভ্য শ্রেণির মানুষ হিসেবে বিবেচিত পুলিশ, সাংবাদিক, রাজনৈতিক নেতাকর্মী, স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র-ছাত্রী ও শিক্ষক, ব্যবসায়ী সবাই জড়িত হয়ে পড়েছে। এমনকি বাস-কাভার্ড ভ্যান-প্রাইভেট কার, সিএনজি অটোরিকশা ও রিকশা চালকরাও পাচার করছে ইয়াবা। ওষুধের আড়ালেও দোকানে বিক্রয় হচ্ছে ইয়াবা, ভাসমান চা বিক্রির দোকানেও বিক্রয় হচ্ছে ইয়াবা। শুধু পাচার বা বিক্রয় নয়, সেবনও করছে তারা। চট্টগ্রামের সর্বত্র ধনী থেকে ফকির পর্যন্ত সবশ্রেণির মানুষ ইয়াবা পাচার, বিক্রয় ও সেবনে জড়িত। চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের সংরক্ষণ শাখার এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, চট্টগ্রামে গড়ে প্রতিদিন ৮-১০টি ইয়াবার চালান ধরা পড়ছে। এতে ১০-১৫ হাজার বা তারও বেশি ইয়াবা উদ্ধার হচ্ছে। এমনকি কোনো কোনো চালানে ৫০ হাজার বা এক লাখ ইয়াবা পর্যন্ত ধরা পড়ে। গত বৃহস্পতিবার বিকেলে কক্সবাজার থেকে আসা ঢাকাগামী গ্রীণলাইনের একটি বাসে ৬৮ হাজার ইয়াবা ধরা পড়ে। এর আগে সকালে পণ্যবাহী একটি ট্রাকে ধরা পড়ে ৩৬৪৪০টি ইয়াবা। এভাবে প্রতিমাসে গড়ে ইয়াবা উদ্ধারের সংখ্যা ৪ থেকে ৫ লাখ পর্যন্ত ছাড়িয়ে যাচ্ছে। যার বাজার মূল্য ২০ কোটি টাকারও বেশি। আর এসব ইয়াবা পাচারে বাস-কাভার্ড ভ্যান, প্রাইভেট কার, সিএনজি অটোরিকশা চালক সবচেয়ে বেশি জড়িত বলে উল্লেখ রয়েছে। এছাড়া নগরীর সর্বত্র ইয়াবা বিক্রেতা নারী-পুরুষ এমনকি কয়েকজন শিশু ও কিশোরের নামও উল্লেখ রয়েছে। রয়েছে রাজনৈতিক নেতাকর্মী, পুলিশ ও সাংবাদিক পরিচয়ে ইয়াবা পাচারের সংক্ষিপ্ত বিবরণও। তার সঙ্গে ইয়াবা পাচারের বিবরণীতে নতুন করে যুক্ত হয়েছে রোহিঙ্গা নারী ও পুরুষরাও। চট্টগ্রাম মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপ কমিশনার মো. কামরুজ্জামান বলেন, ইয়াবা পাচার রোধে আমরা চট্টগ্রাম-কক্সবাজার সড়কের শাহ আমানত সেতুর টোল প্লাজা, কালুরঘাট সেতুর এলাকায় পুলিশের বিশেষ তল্লাশী টিম সক্রিয় রয়েছে। সাগর ও কর্ণফুলী নদীপথে কোস্টাগার্ড রয়েছে। এছাড়া চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের কর্ণফুলী উপজেলা, পটিয়া, সাতকানিয়া, চকরিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় পুলিশের তল্লাশি চৌকি রয়েছে। নগরীর সর্বত্র ঢাকা-কক্সবাজার-সিলেট-রাজশাহী-খুলনাগামী সব বাস স্টেশনগুলোতে পুলিশ তৎপর রয়েছে। এছাড়া র‌্যাব ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারাও ইয়াবা বিরোধী অভিযানে তৎপর রয়েছে। যাদের হাতে প্রতিদিন কোন না কোন ইয়াবার চালান ও পাচারকারী ধরা পড়ছে। আটক হচ্ছে বিলাসবহুল দুরপাল্লার বাস-কাভার্ড ভ্যান, প্রাইভেট কার, সিএনজি অটোরিকশাসহ চালক ও সহকারীরা। তিনি জানান, চট্টগ্রাম থেকে ইয়াবা পাচারে আটক শ্যামলী পরিবহণের চারটি, সাউদিয়া পরিবহণের তিনটিসহ গ্রীণ লাইন পরিবহণের ৩টি, ঈগল পরিবহণের ২টিসহ ২১টি দুরপাল্লার বিলাসবহুল গাড়ি, ৪টি কাভার্ড ভ্যান, ১০-১১টি প্রাইভেট কার, এবং ৩০-৩২টি বাস-মিনিবাস নগরীর বিভিন্ন স্থানে সড়কে দীর্ঘদিন ধরে পড়ে আছে। আটক হয়ে জেলে রয়েছে এসব গাড়ির মালিক, চালক ও সহকারীরা। তবুও যেন কমছে না ইয়াবা পাচার। বরং মনে হচ্ছে ইয়াবা পাচার, বিক্রয় ও সেবনকারীরা সংখ্যা দিনদিন বাড়ছে। যা থেকে সহজেই অনুমেয় যে, পুলিশ, র‌্যাব ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্ততরসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে যে পরিমাণ ইয়াবা ধরা পড়ছে তার চেয়ে শতগুণ বেশি ইয়াবা পাচার হয়ে যাচ্ছে। বিক্রি বাড়ছে যত্রতত্র। সেবন করছে যে কেউ। আর এ নিয়ে উদ্বিগ্ন পুলিশ প্রশাসন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে চট্টগ্রাম মেট্টোপলিটন পুলিশের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, চট্টগ্রামে সবমিলিয়ে প্রায় ৭ হাজারের মতো পুলিশ সক্রিয় রয়েছে। এরমধ্যে অধিকাংশই এখন ইয়াবা পাচার ও উদ্ধার কাজে সক্রিয়। ফলে চট্টগ্রাম মহানগরীর অন্য সামাজিক অপরাধ রোধে তেমন ভূমিকাই রাখতেই পারছে না পুলিশ। ফলে চট্টগ্রাম শহরে চুরি-ছিনতাই, চাঁদাবাজিসহ নানা অপরাধ কর্মকাণ্ডও বেড়ে চলেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Skip to toolbar