Home / অন্যান্য / সড়ক দুর্ঘটনা / কতটা নিরাপদ সড়ক এখন ?

কতটা নিরাপদ সড়ক এখন ?

গতবছর সরকারি স্বীকৃতি পায় ‘জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস’ দীর্ঘ দুই দশকের আন্দোলনের পর । আজ দ্বিতীয়বারের মতো পালিত হবে দিবসটি। মাঝখানে নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনে নামে সাধারণ শিক্ষার্থীরা। এরপর সড়ক আইনে প্রয়োজনীয় সংস্কার কাজে হাত দেয় সরকার। পাশাপাশি সড়ক সংশ্লিষ্ট আইন তদারককারী, প্রয়োগকারী ও বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকেও ব্যাপক উদ্যোগ নেয়া হয়। নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে বিআরটিএ। এ সময়ের মধ্যে সড়কে আইন ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে গড়ে দৈনিক ৫৩টি করে মামলা প্রদান করা হয়েছে, বেসরকারি যানবাহনের পাশাপাশি সরকারি যানবাহনেরও নিয়মিত ফিটনেস পরীক্ষা করা হচ্ছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, এ সবের পরও এখন সড়ক কতটা নিরাপদ? এমন প্রশ্নের জবাবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখনো দুর্ঘটনা নিয়মিত ঘটছে। মানুষের মাঝে আগের তুলনায় সচেতনতা কিছুটা বাড়লেও সড়কে শৃঙ্খলা এখনো ফেরেনি।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী গতকাল আজাদীকে বলেন, ছাত্র আন্দোলনসহ বিভিন্ন আন্দোলন আমাদের চোখ খুলে দিয়েছিল, এর দ্বারা জনসাধারণের মানসিকতায় পরিবর্তন হয়েছে। একটা সচেনতনতার জায়গা তৈরি হয়েছে। কিন্তু আমাদের মূল সমস্যাগুলো আগের মতো রয়ে গেছে। তিনি বলেন, বর্তমানে আমাদের যেসব চালক তৈরি হচ্ছে, তাদের অনেকে মূলত হেলপার থেকেই পরবর্তীতে চালক হচ্ছে। চালক তৈরিতে আমাদের জাতীয় পর্যায়ের কোন ইনস্টিটিউট নেই। সুনির্দিষ্ট কোন নীতিমালাও নেই। অনেক অযোগ্য চালক এখনো গাড়ি চালাচ্ছেন। মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, প্রথমে নিরাপদ চালক তৈরি করতে হবে, এরপরেই হচ্ছে নিরাপদ যানবাহন।
তিনি বলেন, পাবলিক পরিবহনে ৯০ শতাংশ যানবাহন ফিটনেস অযোগ্য। যাত্রীরা ওইসব পরিবহনে চড়তে বাধ্য হচ্ছেন। ফুটপাত নিয়ে নানা সমস্যা থাকায় পথচারীরা রাস্তার ওপর দিয়ে চলাফেরা করছেন। চালকেরা জেব্রা ক্রসিং মানছেন না।
যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব বলেন, যতদিন চালক প্রশিক্ষিত হবে না, সড়ক ত্রুটিমুক্ত হবে না, ফিটনেসবিহীন যানবাহন বন্ধ হবে না এবং এ সবের পাশাপাশি আইনের শাসন সুনিশ্চিত হবে না ততদিন নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত হবে না।
এদিকে গতকাল গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি নিরপদ সড়কের জন্য দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে অঙ্গীকার চেয়েছেন। সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সকল রাজনৈতিক দল ও জোট নিবার্চিত হলে সড়ক নিরাপত্তা ও সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় কি কি পদক্ষেপ নেবেন- তার সুষ্পষ্ট ঘোষণা তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে দিতে হবে।
বিবৃতিতে সংগঠনটির মহাসচিব বলেন, প্রতিদিন সড়কে মৃত্যুর মিছিল চলছে। এই মিছিল থামানো জরুরি। যাত্রী সচেতনতা বাড়িয়ে, ট্রাফিক আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করে সড়কে মৃত্যুর মিছিল থামানো না গেলে নিরাপদ সড়ক দিবস পালন অর্থবহ হবে না। তাই সড়ক দুর্ঘটনা হ্রাসে ও সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় পরিবহন মালিক, শ্রমিক, সরকার ও যাত্রী সাধারণের সম্মিলিত ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা আজ অত্যন্ত জরুরি।
তিনি আরও বলেন, সদ্য অনুমোদিত সড়ক আইনে যাত্রী সাধারণের প্রতিনিধিত্ব না রাখায় মালিক শ্রমিকদের নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ সড়ককে আরো অনিরাপদ করে তুলবে। সড়কে বিশৃঙ্খলা বন্ধ না হলে উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণ বাধাগ্রস্ত হবে বলেও দাবি করেন তিনি।
নিরাপদ সড়কের দাবিতে দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে আন্দোলন করে আসছে নিসচা (নিরাপদ সড়ক চাই)। এই আন্দোলনের প্রেক্ষিতে গত বছর ৫ জুন মন্ত্রী সভার বৈঠকে ২২ অক্টোবরকে জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও অনুমোদন করা হয়। সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চনের স্ত্রী’র মৃত্যুবার্ষিকীর দিনটিকেই সরকার নিরাপদ সড়ক দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
সংগঠনটির চট্টগ্রামের সাধারণ সম্পাদক শফিক আহমেদ সজীব আজাদীকে বলেন, সড়কে শৃঙ্খলার ক্ষেত্রে মানুষের মাঝে এখন সচেতনতা তৈরি হয়েছে। কিন্তু রাস্তা ও পরিবহনে শৃঙ্খলা এখনো ফিরে আসেনি। ট্রাফিক পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করছেন না বলেও তিনি অভিযোগ করেন। তবে তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি বিআরটিএ’র নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রমে আমাদের মাঝে আশার সঞ্চার তৈরি করেছে। এর ধারাবহিকতা থাকলে আমরা আশা করছি, ধীরে ধীরে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে।’
সড়ক পর্যবেক্ষণে ও সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে মোটরসাইকেল আরোহীরা নিয়মিত হেলমেট ব্যবহার করার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সাথে রাখছেন। গণপরিবহনের চালকেরাও প্রয়োজনীয় কাগজ সাথে নিয়ে রাস্তায় নামছেন। অন্যান্য পরিবহনগুলোর চালকদের মধ্যেও সচেতনতা বোধ তৈরি হয়েছে। তবে শুরুর দিকে এসব আইন কিছু মানলেও বর্তমানে আবারো পুরনো চেহারায় ফিরে যাচ্ছে। জেব্রাক্রসিং দেখলেও অনেকে আইন মানছেন না। ফিটনেসবিহীন ও রুটপারমিটবিহীন যানবাহনও চলছে।
চট্টগ্রাম বিআরটিএ’তে প্রথমবারের মতো ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগের পর গত ৩০ আগস্ট থেকে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা শুরু হয়। পর্যায়ক্রমে বিআরটিএ’তে তিনটি আদালতের কার্যক্রম চলে। গত ১৭ অক্টোবর পর্যন পূর্ববর্তী ৩৭ কার্যদিবসে বিআরটিএ’র তিনটি ভ্রাম্যমাণ আদালত গড়ে দৈনিক বিভিন্ন যানবাহন ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে ৫৩টি করে মামলা প্রদান করেছে। এ সময় মোট মামলা দেওয়া হয়েছে ১ হাজার ৯৭০টি। একই সময় ৩১ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হয়। এছাড়া ৩৮ লাখ ১৫ হাজার ২৯০ টাকা জরিমানার পাশাপাশি ২০৬টি যানবাহনকে ডাম্পিং এ পাঠানো এবং ৩৩৩টি যানবাহনের কাগগপত্র জব্দ করা হয়।
গতকালও অভিযানের ধারাবাহিকতায় ১৪টি মামলা, ৬১ হাজার টাকা জরিমানা, ৫টি যানবাহনের কাহজপত্র জব্দ এবং ৪টি যানবাহনকে ডাম্পিং এ পাঠিয়ে দেয়া হয়। নগরীর বহদ্দারহাট ও কাস্টমস মোড়ে বিআরটিএ’র আদালত ১১ ও আদালত ১৩’র সংশ্লিষ্ট নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এ অভিযান পরিচালনা করেন।
বিআরটিএ’র এক কর্মকর্তা আজাদীকে বলেন, ছাত্রদের আন্দোলনের পর থেকে ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য এ পর্যন্ত সাড়ে ২৫ হাজারের মতো আবেদন জমা পড়েছে। এছাড়া গাড়ির ফিটনেস, রুট পারমিটসহ অন্যান্য কাগজপত্র ঠিক করার জন্য সংশ্লিষ্ট যানবাহনের মালিকেরা প্রতিদিন বিআরটিএ কার্যালয়ে ভিড় করছেন।

দিবসটি উপলক্ষ্যে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে দিনব্যাপী নানা কর্মসূচি-
এদিকে জাতীয়ভাবে দিবসটি উদযাপনে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন, বিআরটিএ, পুলিশসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে র‌্যালি ও আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। এবার দিবসটির প্রাতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে, ‘আইন মেনে চলবো, নিরাপদ সড়ক গড়বো’।
আজ সকাল ৯টায় ষোলশহর দুই নম্বর গেইট সংলগ্ন চট্টগ্রাম শপিং কমপ্লেঙ থেকে এলজিইডি পর্যন্ত একটি র‌্যালির আয়োজন করা হয়েছে। এ র‌্যালিতে জেলা প্রশাসন, বিআরটিএ, পুলিশ, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরসহ অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী ও স্কাউট, নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা), বিভিন্ন পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠন অংশগ্রহণ করার কথা রয়েছে।
এ কর্মসূচির পর সংশ্লিষ্টদের নিয়ে এলজিইডি মিলনায়তনে একটি আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে প্রধান অতিথি থাকবেন চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসেন। এছাড়া অতিথি হিসেবে অন্যান্যদের মধ্যে জেলা পুলিশ সুপার নূরে আলম মিনা, বিআরটিএ উপ পরিচালক মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ, সওজ নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আলী আহম্মেদ খান, সিএমপি উপ কমিশনার (ট্রাফিক-উত্তর) ওয়াহিদুল হক চৌধুরীসহ অন্যান্যরা উপস্থিত থাকবেন। এছাড়া দুপুর ১২টায় চট্টগ্রাম ওয়াসা মোড়ে জনসচেতনতামূলক সমাবেশ এবং বাদ আছর মোমিন রোড কদম মোবারক মসজিদে মিলাদ ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Skip to toolbar