Home / খবর / কুলাউড়ার ট্রেন দুর্ঘটনা প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনায়

কুলাউড়ার ট্রেন দুর্ঘটনা প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনায়

যথা নিয়মেই শোনা যাচ্ছিল ট্রেন চলার শব্দ। রাত তখন প্রায় পৌনে ১২ টা। স্থানীয় ইসলামাবাদ,নন্দনগর,মহলালসহ আশপাশের গ্রামবাসী অনেকেই তখন ঘুমে। আবার কেউ কেউ নিচ্ছিলেন ঘুমের প্রস্তুতি। বরমচাল রেলস্টশন সংলগ্ন কালামিয়া (ফুলেরতল) বাজারের অধিকাংশ ব্যবসায়ী দোকানপাট বন্ধ করে ফিরছিলেন নিজ বাড়িতে। ওই ব্যবসায়ীদের অনেকেই প্রত্যক্ষ করছিলেন তাদের চিরচেনা ওই ট্রেনটির অচেনা দ্রুতগতি আর সাইরেন। হঠাৎ এমন দ্রুতগতি আর বিদঘুটে শব্দ শোনে তখন অনেকেরই সন্দেহ জাগে। কিছু দূর যেতে না যেতেই হঠাৎ ট্রেনের বিকট শব্দ।
এই মর্মান্তিক দৃশ্যে যে যার মত করে সবাই উদ্বার কাজে সহায়তা করেন। উপবন ট্রেনের ক্যানটিন ম্যানেজার  মো: মানিক খান জানান অন্য দিনের চাইতে আজকে একটু বাড়তি চাপ ছিল যাত্রীদের। তাই নিয়মিত ১৫ টি বগি থাকলেও আজকের জন্য আরো ২টি বাড়িয়ে ১৭ টি বগি করা হয়েছিল। নন্দনগর গ্রামের ফারুক মিয়াসহ ওই গ্রামের একাধিক বাসিন্দা জানান বড়ছড়া ব্রিজের উপর ও ব্রিজের মুখের রেল স্লিপার ও পাতের নাট বল্টু দীর্ঘদিন থেকে নেই বললেই চলে। আর যে দু’একটি আছে তা জং ধরে থ্রেট ক্ষয় হওয়াতে কাজ করে কম। তাই ট্রেন ওই ব্রীজে উঠলেই লক্কর ঝক্কর ওই ব্রীজের রেললাইন নড়াচড়া করত। এই বিষয়টি তারা স্থানীয় রেল স্টেশনের সংশ্লিষ্টদের জানালেও তারা তা আমলে নেননি। তাদের ধারনা একারনেই হয়ত দ্রুত চলা এই ট্রেনটি দূর্ঘটনায় পড়ে। ঘটনাস্থলে আসা আরব আলী, মাছুম আহমদ চৌধুরী, সুলতান আহমদ চৌধুরীসহ ভাটেরা বাজার ও বরমচালের কালামিয়া (ফুলেরতল) বাজারের কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান অন্য দিনের চাইতে উপবন ট্রেনটি বেশ দ্রুতগামী ছিল। এমন দৃশ্য দেখে আমাদের ভয় হয়েছিল। সে ভয়ই বাস্তব হল। রাত প্রায় আড়াইটার দিকেও ঘটনাস্থলের কয়েক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে উদ্ধারকারী,যাত্রীদের স্বজন,আইনশৃঙ্খলাবাহীনির সদস্যসহ স্থানীয় বাসিন্দাদের উপস্থিতি ছিল লক্ষ্যনীয়। ভোর পর্যন্ত ঘটনাস্থলের আশপাশ এলাকায় পুলিশ, ফারসার্ভিসকর্মীদের নিরাপত্তা বেষ্টনী ছিল জোরদার। কুলাউড়া সদর হাসপাতাল,মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালসহ স্থানীয় সরকারী বেসরকারী হাসপাতালেও আহত ও নিহদের খোজঁখবর নিতে ও তাদের এক নজর দেখতে ভীড়ে হিমশিম খেতে হয় কর্তৃপক্ষের। কুলাউড়া হাসপাতালের বারান্দার মেঝেতে সারিবদ্ধভাবে রাখা হয় দূর্ঘটনায় নিহত ৪ জনের লাশ। আর স্থান সংকুলান না হওয়াতে মেঝেতে চলে আহতদের চিকিৎসা সেবা। গুরুতর আহতদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে প্রেরণ করা হয় মৌলভীবাজার সদর কিংবা সিলেট ওসমানী হাসপাতালে। হাসপাতাল গুলোতে আহতদের কান্নায় ভারী হচ্ছে পরিবেশ। ফায়ারসার্ভিসের সিলেট বিভাগের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ আলী জানান হতাহতের পরিসংখ্যান এই মুহুর্তে সঠিক করে বলা না গেলেও ৪জন নিহত ও শতাধিক আহত হয়েছেন। আমাদের ১১টি ইউনিটের সদস্যরা এখানে কাজ করছেন। দূর্ঘটনা কবলিত সব বগিই আমরা সার্চ করে দেখেছি। কোনো বগিতেই আহত নিহত কোনো যাত্রীকে পাইনি। তারপরও আমরা ঘটনাস্থলে আরো সার্চ করছি। ভয়াবহ এই ট্রেন দূর্ঘটনায় ৬ জন নিহত ও ৩ শতাধিক যাত্রী আহত হয়েছেন। আর আহতদের মধ্যে অনেকের অবস্থা গুরুতর। আহত ও নিহতের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলে উদ্ধারকারী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের ধারণা। ওই দূর্ঘটনায় ট্রেনের ৬টি বগি লাইনচ্যুত হয়। আহতদের উদ্ধার করে কুলাউড়া,মৌলভীবাজার,ফেঞ্চুগঞ্জ ও সিলেটের সরকারী ও বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। দুর্ঘটনার কারণে সিলেটের সঙ্গে সারাদেশের ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে। প্রতিটি স্টেশনে অপেক্ষমান যাত্রীদেরও চরম দূর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত (সোমবার সকাল ৭ টা) ইঞ্জিনের সাথে সংযুক্ত থাকা ১১টি বগি উদ্ধার করে কুলাউড়া স্টেশনে আনা হয়েছে। আর ব্রীজের নীচে ও সড়কের পাশে দুমড়েমুচড়ে পড়া ৪টি বগি ও লাইচ্যুত হওয়া দু’টি বগিসহ ৬টি বগি উদ্ধারে তৎপর রয়েছেন রেল বিভাগের লোকজন। পরে সাতটি বগি নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেয় উপবন ট্রেন।
উল্লেখ্য ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সরাইলের শাহবাজপুরে ব্রিজ ভেঙ্গে গেলে ঢাকা-সিলেট সরাসরি সড়ক যোগাযোগ বন্ধ থাকায় ট্রেনে যাত্রী সংখ্যা ছিল দ্বিগুন। কুলাউড়া রেলওয়ে স্টেশনের লোকাল ইনচার্জ দুলাল চন্দ্র দাস জানান ট্রেনে মোট ১৭ বগির মধ্যে ৬টি বগি লাইনচ্যুত হয়। ওই ৬টি বগি উদ্ধারের কাজ চলছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Skip to toolbar