Home / খবর / চরম দুর্ভোগ কথায় কথায় সড়ক বন্ধ

চরম দুর্ভোগ কথায় কথায় সড়ক বন্ধ

গতকাল সকালে রিকশাযোগে সেগুনবাগিচায় বারডেম হাসপাতালে এসেছিলেন। হাসপাতালে যেতে বাসা থেকে বেরিয়েই বিপাকে পড়েন পঞ্চাশোর্ধ সিরাজুল ইসলাম। এরপর দুপুর ১২টার দিকে কাঁটাবন যাবেন বলে রিকশা খুঁজতে বের হয়ে পড়ে যান মহাবিপাকে।

সপ্তাহখানেক আগে পায়ে অস্ত্রোপচার করা এই মানুষটি জানতেন না ওই মুহূর্তে শাহবাগ মোড়ে অবস্থান করে আন্দোলন করছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। এতে চারিদিকে তৈরি হয় তীব্র যানজট। পরে নানা ঝক্কিঝামেলা কাটিয়ে এক তরুণের সহায়তায় কাটাবন পৌঁছেন দুই ঘণ্টা পর। কিন্তু এতে তার কষ্ট হয়েছে অবর্ণনীয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গত মঙ্গলবার যানজটের কারণে এমন দুর্ভোগে পড়েছেন অসংখ্য মানুষ। তবে এটি ইদানীং এক সাধারণ চিত্র হয়ে গেছে। নানা দাবি নিয়ে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কে অবস্থান নিয়ে যান চলাচল বন্ধ করে দেওয়া এক সাধারণ চিত্র হয়ে গেছে। সম্প্রতি শারীরিক প্রতিবন্ধীরাও কোটার দাবিতে এই কাজ করেছেন।

নিত্য যানজটের এই নগরে গাড়ি চলাচলের গতি এখন হাঁটার গতির চেয়ে কমে গেছে। এর মধ্যে আবার ভিআইডি রোডে চলছে মেট্রোরেলের নির্মাণকাজ। এই সড়কের গাড়ির একাংশ চলছে বিকল্প সড়ক দিয়ে। এমন পরিস্থিতিতে প্রধান কোনো একটি সড়ক যদি আটকে থাকে, তার প্রভাব গিয়ে পড়ে আশপাশের অন্য সড়কে। চলাচলের জন্য দিনভর দুর্ভোগ পোহাতে হয় নগরবাসীকে।

সাধারণ মানুষ বলছেন, দাবি আদায়ের জন্য মূল সড়ক বন্ধ করে দাবি আদায়ের এই কৌশল বন্ধ করা উচিত। এই ধরনের কর্মসূচির আয়োজকদের পাশাপাশি সরকারকেও বিকল্প চিন্তা করার পরামর্শ তাদের।

আইনশৃঙ্খলার পাশাপাশি রাজধানীর যান চলাচলের নিয়ন্ত্রক পুলিশও বলছে, রাস্তা বন্ধ করার কর্মসূচি এই নগর আর নিতে পারছে না। এ নিয়ে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বিক্ষোভ কর্মসূচির জন্য স্থান নির্ধারণ করে দেওয়ার পক্ষে তারা।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) যুগ্ম কমিশনার শেখ নাজমুল আলম ঢাকা টাইমসকে বলেন,  ‘আগে মুক্তাঙ্গন ছিল মানুষের বিভিন্ন দাবি-দাওয়া আদায়ের জন্য সেখানে অবস্থান করত। এখন সেই মুক্তাঙ্গন আর মুক্তাঙ্গন নেই। সেটা এখন দখলাঙ্গন হয়ে গেছে। মানুষের সভা-সমাবেশ করার জন্য একটি উন্মুক্ত স্থান থাকলে তো আর রাস্তায় আসে না। যখন মানুষ রাস্তায় আসে তখন এর প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের ওপরে আর আমাদের পুলিশের ওপরে।’

নগর পরিকল্পনাবিদ নজরুল ইসলাম ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘রাস্তায় বসে আন্দোলন এটা পুরোনো সমস্যা। কখনো বাড়ে কখনো কম থাকে। যারা এগুলো করে তারা মনে করে এটাই তাদের শেষ অস্ত্র। যদিও এসব দাবি দাওয়ায় অনেক সময়ই যুক্তি আছে। যে কারণে কষ্ট হলেও মানুষ অনেক সময় এটা মেনে নেয়।’

‘কিন্তু এর ফলে যে দুর্ভোগ, তার ফলে শুধু অফিসগামী মানুষই সমস্যায় পড়ে না, হাসপাতালগামী লোকও তো চলে। তাদের কী অবস্থা হয়?

এর সমাধান কী- জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত এই অধ্যাপক বলেন, ‘অনাকাক্সিক্ষত এই সমস্যা এড়ানোর জন্য সরকারের বা কর্তৃপক্ষের উচিত শুরুতেই দাবি দাওয়ার বিষয়টি আমলে নেয়া। সমাধানে কী করণীয় সেটা ঠিক করা। জিইয়ে রাখলেই সমস্যা বাড়বে।’

‘আর আন্দোলনকারীদের উচিত হবে নিয়মের মধ্যে থেকে দুর্ভোগ কম হয় তেমন পদ্ধতি অবলম্বন করা। অন্যথায় সহমর্মিতা পাওয়ার বদলে বিরক্তি ও ক্ষোভ বেশি জন্মাবে তাদের ওপর। মোট কথা এই সমস্যার সমাধানে দুই পক্ষকে যতœবান হতে হবে।’

গতকাল রাজধানীতে শাহবাগের ঢাবি ছাত্ররা ছাড়াও আরও কয়েকটি কর্মসূচি পালিত হয়। যাতে সড়কে যান চলাচল নিয়ন্ত্রিত ছিল অনেকটা। গত কয়েকদিন ধরে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে ফুটপাতসহ অর্ধেক সড়কে বসে বকেয়া বেতনসহ বিভিন্ন দাবিতে আন্দোলন করছে সারা দেশের পৌরসভার কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তারও আগে থেকে চলছে জাতীয়করণ বঞ্চিত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের আন্দোলন।

শিক্ষকরা ফুটপাতে থাকলেও পৌরসভার কর্মীদের আন্দোলন সড়কেও চলে আসায় পল্টন থেকে শাহবাগের রাস্তায় অনেকটা যানজট লেগে থাকে। অন্যদিকে মেট্রোরেলের কাজ চলায় সড়ক এমনিতেই সংকীর্ণ হয়ে আছে।

কখনো বাস শ্রমিক, কখনো হকাররা রাস্তায় অবস্থান করে দুর্ভোগ সৃষ্টি করেন। তবে বেশিরভাগ সময় ছাত্রদের নানা দাবি দাওয়া নিয়ে সড়কে আন্দোলন করতে দেখা যায়। আর বকেয়া বেতনসহ নানা দাবিতে ঢাকা ও এর আশপাশের শিল্প এলাকায় সড়কে অবস্থান নিয়ে পোশাক শ্রমিকরা নিয়মিতই কর্মসূচি পালন করে থাকে। সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়স বাড়ানো নিয়েও মাঝে মাঝে আন্দোলন হয় সড়কে।

গতকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) থেকে সরকারি সাত কলেজের অধিভুক্তি বাতিলের দাবিতে আন্দোলনে নামে শিক্ষার্থীরা। প্রায় দুই ঘণ্টার মতো শাহবাগ মোড় অবরোধ করে পুরো শহরকে স্থবির করে দেয় তারা। দুপুর ২টার দিকে নতুন কর্মসূচি দিয়ে তারা সরে গেলেও রাত অবধি থেকে যায় এর রেশ।

ছাত্ররা যখন সড়কে অবস্থান করছিল, তখন স্বভাবতই শাহবাগ এলাকা দিয়ে সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ থাকে। মৎস্যভবন থেকে শাহবাগের রাস্তা বন্ধ করে দিয়ে কাকরাইল মসজিদের দিক দিয়ে গাড়ি যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেয় পুলিশ। এর প্রভাব পড়ে আশপাশের সড়কগুলোতে। সবগুলো সড়কে গাড়ির চাপ বেড়ে চলার গতি হয়ে পড়ে একেবারেই ধীর।

শাহবাগ এলাকার একজন পুলিশ সার্জেন্ট ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘রাস্তা বন্ধ করলে মানুষের দুর্ভোগের পাশাপাশি আমাদের বিপদ বাড়ে। কারণ এক ঘণ্টা বন্ধ থাকলে সেই জ্যাম শেষ হয় রাতে। এটার সমাধান আমরাও চাই।’

সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক শরিফুল ইসলাম ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ১২টায় রওনা দিয়ে ৩টা বাজে রোগী নিয়া শাহবাগ আসলাম। শুনি রাস্তা বন্ধের জন্য এত সময় লাগছে। এমন নানা সময় হয়। এর কী সমাধান নাই?’

শাহবাগে কথা হয় দেওয়ান পরিবহনের বাস চালক জাকির হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘সবাই কিছু অইলেই রাস্তায় বয়া পড়ে। আমরাও বই। কিন্তু সরকার চাইলে এর সমাধান সম্ভব।’

-‘কীভাবে সম্ভব’

‘যারা আন্দোলন করে তাগো (তাদের) সঙ্গে কথা কইলেই (বললে) তো অয়। বইলা দিব রাস্তায় বওয়ন যাইব না। নইলে একটা জায়া দিয়া দিলেই তো অয়।’

৯০ এর দশকে সময় ঢাকায় মানিক মিয়া এভিনিউতে সভা-সমাবেশে করা হতো। পরে বড় ধরনের কর্মসূচি পালন করা হতো পল্টন মাঠে। আর সচিবালয়ের পাশের মুক্তাঙ্গন ছিল সবার জন্য উন্মুক্ত। যে কেউ সেখানে সভা-সমাবেশ করতে পারত।

তবে পল্টন ময়দান এখন হয়েছে বক্সিং ফেডারেশনের খেলার মাঠ ও কার্যালয়। আর মুক্তাঙ্গনে এখন হয়েছে ‘রেন্ট এ কার’ এর ব্যবসাস্থল।

পুলিশ কর্মকর্তা শেখ নাজমুল আলম বলেন, ‘যারা রাস্তায় বসে তাদের ব্যাপারে মনস্তাত্ত্বিক কারণেই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া যায় না। রাস্তায় কারা বসে কী কারণে বসে সেটা আগে দেখার দরকার। একজন স্কুল ছাত্র বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, শিক্ষক কিংবা পোশাক কারখানার শ্রমিক। এরা যখন তিন মাস বেতন না পেয়ে রাস্তায় আসে তখন মানবিক কারণেই কিছু বলা যায় না।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Skip to toolbar