Home / খবর / জামায়াতের ‘প্রতারণা’ মুক্তিযুদ্ধের ছবি নিয়ে

জামায়াতের ‘প্রতারণা’ মুক্তিযুদ্ধের ছবি নিয়ে

অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে ঢুকলে অবাক হতে হবে মুক্তিযু্দ্ধের সময় পাকিস্তানের পক্ষে অস্ত্র ধরা দল জামায়াতে ইসলামীর । ১৯৭১ সালে ২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গণহত্যা ও মুক্তিযোদ্ধাদের বেশ কয়েকটি ছবি দিয়ে প্রোফাইল ছবি করা হয়েছে ওয়েবসাইটটিতে।

এই বিষয়টি জানতে পেরে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক একে জামায়াতের প্রতারণা বলেছেন। একই কথা বলেছেন যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে সোচ্চার সাংবাদিক, লেখক শাহরিয়ার কবির।

জামায়াতের ওয়েবসাইটে প্রোফাইল ছবিতে ‘অগ্নিঝড়া মার্চ’ এর কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, ‘রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা রক্ষা করা আমাদের পবিত্র দায়িত্ব।’

মোট পাঁচটি ছবি মিলিয়ে এই প্রোফাইল ছবিটি বানানো হয়েছে। তার একটি ২৫ মার্চ রাতে ঢাকায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গণহত্যা শুরুর দিন এক রিকশাচালনের মৃত্যুর বহুল প্রচারিত ছবিটি।

অন্য যে চারটি ছবি ব্যবহার করা হয়েছে তার একটি ভারতে শরণার্থীর স্রোতের, একটি ছবি অভিযান থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের সারি বেঁধে ফেরার, একটি ছবি ফসলের মাঠে মুক্তিযোদ্ধাদের দল বেঁধে তোলা।

আর মাঝে রয়েছে দুই জন কিশোর মুক্তিযোদ্ধার ছবি, যাদের হাতে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন বাংলাদেশের মানচিত্র সম্বলিত জাতীয় পতাকা।

অথচ ৪৭ বছর আগে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যখন ‘মানুষ নয়, জমি চাই’ নীতি নিয়ে স্বাধীনতাকামী জনতার ওপর ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, বাঙালি যখন ‘যার যা আছে, তাই নিয়ে শত্রুর’ মোকাবেলা করা শুরু করেছিল, তখন জামায়াতে ইসলামী নেয় দেশবিরোধী অবস্থান।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে রাজাকার, আলবদরসহ নানা বাহিনী গড়ে, পূর্ব পাকিস্তান সরকারে যোগ দিয়ে নানাভাবে সেনাবাহিনীকে সহায়তা করেছে জামায়াতে ইসলামী। যুদ্ধের শেষ দিকে বুদ্ধিজীবী হত্যায়ও জড়িত ছিল জামায়াতের সে সময়ের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র সংঘ। এই সংগঠনটি এতটাই কুখ্যাত হয়ে উঠে যে, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর বাংলাদেশে রাজনীতি করার সুযোগ পেয়ে এই নামে সংগঠন না খুলে ইসলামী ছাত্র শিবির নামে ছাত্র শাখা খুলে জামায়াত।

টিক্কা খানের সঙ্গে গোলার আযমের বৈঠক

টিক্কা খানের সঙ্গে গোলার আযমের বৈঠক

মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের পক্ষে অস্ত্র ধরার দায়ে স্বাধীন বাংলাদেশে নিষিদ্ধ হয় জামায়াত। আর জিয়াউর রহমানের সেনা শাসনের সময় তারা আবার রাজনীতিতে ফেরে।

স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াত কোন চিন্তা করে মুক্তিযোদ্ধা ও যে গণহত্যায় তারাও সহযোগী ছিল, সেই ছবি ব্যবহার করেছে, তা অবশ্য জানা যায়নি। গণমাধ্যমে বক্তব্য দিতে পারেন, দলটির এমন প্রায় সব নেতাই আত্মগোপনে। যে দুই একজন প্রকাশ্যে আছেন, তাদের মধ্যে তিন জনকে ফোন করা হলেও তারা তা ধরেননি।

স্বাধীনতাবিরোধী দলটির মুক্তিযুদ্ধের এসব ছবি দলের ওয়েবসাইটে নির্মাণের বিষয়টি জানতে পেরে অট্ট হাসিতে ফেটে পড়েছেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক।

মন্ত্রী বলেন, ‘জামায়াত-শিবির এখন হয়তো নতুন কৌশল নিয়েছে। তারা এখন নতুন প্রজন্মের চোখে ধূলা দিতে চাইছে। তাদেরকে আগে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতার জন্য জাতির কাছে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে হবে।’

একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শাহরিয়ার কবির বলেন, ‘এটা জামায়াতের প্রতারণার রাজনীতি।  ১৯৪১ সাল থেকে তারা এটা করে আসছে। মওদুদী বলেছেন ভোটের রাজনীতি হারাম। কিন্তু তারা এখন ভোটের রাজনীতির জন্য কি না করছে?’

‘তরুণ প্রজন্মকে বিভ্রান্ত করার জন্য তারা নতুন কৌশল অবলম্বন করতে পারে। তবে আমার কাছে মনে হচ্ছে তারা বিভ্রান্ত করতে পারবে না।’

মুক্তিযুদ্ধবিরোধিতার কলঙ্ক ঢাকতে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে মুক্তিযোদ্ধা সংগঠনও খুলেছিল জামায়াত। জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা পরিষদ নামে ওই সংগঠনের কমিটিতে মুক্তিযোদ্ধা দাবি করে জামায়াতের বিভিন্ন নেতা ও সমর্থকদেরকে রাখা হয়।

কিন্তু সে সময় গণমাধ্যমে এই প্রতারণা ফাঁস হয়ে যায়। আবার সংগঠনের এক অনুষ্ঠানে প্রতিবাদ জানাতে যাওয়া এক প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাকে মারধরের পর এই সংগঠনটি আর প্রকাশ্যে আসেনি।

মুক্তিযুদ্ধ গবেষণা কেন্দ্র করেও সে সময় জামায়াতের নেতা-কর্মীরা বানোয়াট ইতিহাস প্রচারের চেষ্টায় ছিল। তবে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন আসার পর বিশেষ উদ্দেশ্যে শুরু হওয়া সে কাজও বন্ধ হয়ে যায়।

আর বর্তমান সরকারের আমলে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে জামায়াতের পাঁচ শীর্ষ নেতার ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। এরা হলেন একাত্তরের আলবদর বাহিনীর নেতৃত্বে থাকা মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ, মুহম্মদ কামারুজ্জামান, আবদুল কাদের মোল্লা এবং মীর কাসেম আলী।

আর আমৃত্যু কারাদণ্ড পাওয়া গোলাম আযম মারা গেছেন বন্দী অবস্থায়। বিচার চলাকালে মারা গেছেন রাজাকার বাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা আবুল কালাম মো. ইউসুফ। জামায়াতের আরেক নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে সারা জীবন কাটাতে হবে কারাগারে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ফাঁসির আদেশ হয়েছে যুদ্ধ চলাকালে পাবনায় শান্তি কমিটির প্রধান আবদুস সুবহান এবং রংপুর আলবদর বাহিনীর প্রধান এ টি এম আজহারুল ইসলামের। তাদের আপিল আবেদন নিষ্পত্তির অপেক্ষায়।

অবশ্য জামায়াতের ওয়েবসাইটে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ফাঁসি হওয়া নেতাদেরকে ‘শহীদ’ দাবি করে তাদের ছবি দিয়েও আলাদা প্রোফাইল ছবি করা হয়েছে।

৭১ এ যে ভূমিকা তুলে ধরেছেন জামায়াত নেতারাই

পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আক্রমণ শুরুর ১১ দিনের মাথায় গোলাম আযম বেশ কিছু ধর্মভিত্তিক দলের নেতাদেরকে নিয়ে সামরিক আইন প্রশাসক টিক্কা খানের সঙ্গে দেখা করেন।

গোলাম আযম তাঁর আত্মজীবনী ‘জীবনে যা দেখলাম’ তৃতীয় খণ্ডে লেখেন, জামায়াত মুক্তিযুদ্ধের সময় তৎকালীন সামরিক আইন প্রশাসক জেনারেল টিক্কা খানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সামরিক বাহিনীকে সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন (পৃ-১৪৪)।

টিক্কা খানের নির্দেশ অনুযায়ী গোলাম আযম পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষার আহ্বান জানিয়ে রেডিওতে ভাষণও দেন। ওই ভাষণ প্রচারের পর সারা দেশে জামায়াতের নেতা-কর্মীরা আওয়ামী লীগের হুমকির মুখে পড়ে সেটা লিখেছেন গোলার আযমই।

মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সঙ্গে জামায়াতের আঁতাতের সাফাই গেয়ে গোলাম আযম লেখেন, ‘…জনগণের সামান্য খিদমত করতে হলে সামরিক সরকারের সাথে যোগাযোগের মাধ্যমেই তা সম্ভব’ (তৃতীয় খণ্ড, পৃ-১৪৩)।

যুদ্ধ চলাকালে মে মাসে সে সময়ের খুলনায় খানজাহান আলী রোডে একটি আনসার ক্যাম্পে ৯৬ জন জামায়াত কর্মী নিয়ে রাজাকার বাহিনীর প্রথম ইউনিট গঠন করেন সে সময় পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতের ডেপুটি আমির আবুল কালাম মোহাম্মদ ইউসুফ। যুদ্ধ চলাকালে গভর্নর মালেকের অধীনে মন্ত্রিসভায়ও যোগ দেন তিনি।

জামায়াত নেতা এ কে এম ইউসুফের নেতৃত্বে রাজাকার বাহিনী প্রতিষ্ঠার ছবি

জামায়াত নেতা এ কে এম ইউসুফের নেতৃত্বে রাজাকার বাহিনী প্রতিষ্ঠার ছবি

মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনীর নানা অপকর্মের সহযোগী রাজাকার বাহিনীকে দেশপ্রেমিক এবং মুক্তিযুদ্ধকে নাশকতামূলক তৎপরতা উল্লেখ করে গোলাম আযম তার বইয়ে লেখেন, ‘যে রেযাকাররা (রাজাকার) দেশকে নাশকতামূলক তৎপরতা থেকে রক্ষার জন্য জীবন দিচ্ছে তারা কি দেশকে ভালবাসে না? তারা কি জন্মভূমির দুশমন হতে পারে?’

যুদ্ধের শেষে দিকে পরাজয় অবশ্যম্ভাবী বুঝতে পেরে গোলাম আযম পাকিস্তান পালিয়ে যান এবং সেখানে বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে পাকিস্তানকে বাঁচাতে রাজাকারদেরকে ভারী অস্ত্র দেয়ার দাবি জানান।

মুক্তিযুদ্ধের সময় গঠন করা খুনি বাহিনী আলবদর ছিল জামায়াতের তৎকালীন ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের নেতা-কর্মীদের নিয়ে গঠিত। মুক্তিযুদ্ধের সময় এ দেশের মানুষের ওপর সবচেয়ে বেশি নৃশংসতা চালানোর অভিযোগ আছে এই বাহিনীর বিরুদ্ধে।

বুদ্ধিজীবী হত্যার দায়েই আলবদর বাহিনীর কমান্ডার মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, সংগঠক মোহাম্মদ কামারুজ্জামানের ফাঁসি কার্যকর হয়েছে।

১৯৭১ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক গোপন প্রতিবেদনে দেখা যায়, মতিউর রহমান নিজামী মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে সব রকমের সাহায্য করতে দলের নেতা-কর্মীদের প্রতি আহ্বান জানান। আলী আহসান মুজাহিদ মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিহত করতে আলবদর বাহিনী গড়ে তুলতে দলের নেতা-কর্মীদের নির্দেশ দেন।

নিজামী একাত্তর সালের ১৪ জুন জামালপুরে ইসলামী ছাত্রসংঘের এক সভায় বলেন, ‘পাকিস্তান সেনাবাহিনী সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সেনাবাহিনী যেভাবে কাজ করছে তাতে আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করা সম্ভব। ইসলাম রক্ষায় পাকিস্তান সেনাবাহিনী-কে সার্বিকভাবে সহযোগিতা করতে হবে।’

১৭ অক্টোবর রংপুরে পাকিস্তান ইসলামী ছাত্রসংঘের এক সভায় মুজাহিদ আলবদর বাহিনী গড়ে তুলতে নেতা-কর্মীদের নির্দেশ দেন। সভায় সভাপতিত্ব করেন মানবতাবিরোধী অভিযোগে ফাঁসির দণ্ড পাওয়া এ টি এম আজহারুল ইসলাম। তিনি যুদ্ধ চলাকালে আলবদর বাহিনীর রাজশাহী জেলা শাখার প্রধান ছিলেন।

একাত্তর সালের ৭ নভেম্বর জামায়াতে ইসলামী আলবদর দিবস পালন করে। ৬ সেপ্টেম্বর ইসলামী ছাত্রসংঘ ঢাকা মাদ্রাসায়ে আলিয়ায় ‘পাকিস্তান রক্ষা দিবস’ পালন করে।

ফাঁসিতে ঝুলা মোহাম্মদ কামারুজ্জামানের তত্ত্বাবধানে মুক্তিযুদ্ধকালে বৃহত্তর ময়মনসিংহে আলবদর বাহিনী গঠিত হয়। ১৯৭১ সালের ১৬ আগস্ট দৈনিক সংগ্রাম-এর একটি প্রতিবেদনে কামারুজ্জামানকে ময়মনসিংহে আলবদর বাহিনীর প্রধান সংগঠক হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

জামায়াতের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতা আব্দুস সুবহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাবনার শান্তি কমিটির প্রধান ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে ব্যক্তির অবস্থান বই-এর ৪৩১ পৃষ্ঠায় জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী অন্যতম সংগঠক বলে উল্লেখ করা আছে।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Skip to toolbar