Home / খবর / ট্রাফিক বিভাগ সাইনবোর্ড টাক্সিয়েছে বিশৃঙ্খলার দায় কার?

ট্রাফিক বিভাগ সাইনবোর্ড টাক্সিয়েছে বিশৃঙ্খলার দায় কার?

ট্রাফিক বিভাগ সাইনবোর্ড টাক্সিয়েছে। নিয়ম না মানাটাই যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে। কোনোটায় লেখা আছে ‘এখানে বাস থামিবে না’। কোনোটায় লেখা, ‘নো পার্কিং’। কর্তব্যরত ট্রাফিক কনস্টেবলও আছেন। অথচ সেই স্থানে বাস, সিএনজি টেঙি, রিকশা দাঁড়িয়ে আছে। আর গন্তব্যে যাওয়ার অপেক্ষায় আছে অসংখ্য মানুষ।
গতকাল মঙ্গলবার বিকেল ৫টার দিকে নগরীর জিইসির মোড়ে এমন চিত্র দেখা যায়। যেখানে দাঁড়ানোর নির্দেশনা সেখানে যাত্রী বা বাস কোনোটাই নেই। যেখানে না দাঁড়ানোর নির্দেশ, সেখানেই গাদাগাদি। এ চিত্র হঠাৎ দেখা নয়, কিংবা ওই স্থানে শুধু দেখা যায়, এমন নয়। মুরাদপুর, আগ্রাবাদ, নিউ মার্কেট মোড়, ষোলশহর ২ নং গেটসহ নগরীর সর্বত্র একই চিত্র।
দীর্ঘদিন ধরে নগরীর পরিবহন ব্যবস্থাপনায় বিশৃঙ্খলা। এখন প্রশ্ন, পরিবহন ব্যবস্থাপনার শৃঙ্খলা রক্ষার দায় কার?
সিএমপির উপ-কমিশনার (ট্রাফিক বন্দর) তারেক আহমেদ বলেন, লক্ষ লক্ষ যাত্রীকে সচেতন করা সম্ভব নয়। তবে চালককে সচেতন করার কর্মসূচি আছে। নির্দিষ্ট স্থানে বাস না দাঁড়ালে আমরা মামলা করি। অনেক সময় গাড়িও জব্দ করা হয়। কিন্তু দেখা যায়, জরিমানা দিয়ে গাড়ি ছাড়িয়ে নিয়ে একই কাজ আবার করে। এটা চলমান প্রক্রিয়া হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, চালকদের সচেতন করার কর্মসূচি চলছে, আইনগত পদক্ষেপও চলছে। তারপরও তারা সচেতন হচ্ছে না।
ফিটনেসহীন গাড়ি, লক্কড়ঝক্কড় বাস যেখানে সেখানে দাঁড়াচ্ছে, রাস্তার মাঝখানে যাত্রী ওঠায় আর নামায়। যাত্রীরা নিরুপায়। সড়কজুড়েই যেন স্টপেজ। যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা, পাল্লা দেওয়া সবই চলছে। অভিযোগ আছে, ট্রাফিক পুলিশ সেসব দেখেও দেখে না। নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে স্টপেজের শুরু ও শেষে লাগানো হয়েছে বড় বড় সাইনবোর্ড। কিন্তু বাস্তবে শুধু সাইনবোর্ডই আছে, ঘোষণাটি আর কার্যকর হয়নি। নগর জুড়ে যে কয়টি নির্দিষ্ট বাস স্টপেজ রয়েছে সেখানেও থামছে না যানবাহন। মূল সড়কের ওপর থেকেই যাত্রী ওঠানামা করছে। তবে অন্যান্য পরিবহন কোথায় দাঁড়াবে তার কোনো সুনির্দিষ্ট নির্দেশনাও দেখা যাচ্ছে না।
গতকাল সরেজমিনে নগরীর বিভিন্ন সড়ক ঘুরে দেখা যায় এসব বিশৃঙ্খলার চিত্র। দেখা গেছে, যে যেখানে পারছে সেখানেই বাস দাঁড় করিয়ে যাত্রী তুলছে। অনেক যানবাহন আবার সড়কের মাঝখানে দাঁড়িয়ে যাত্রী ওঠানামা করাচ্ছে। বাস-মিনিবাসের বেপরোয়া চলাচল, পাল্টাপাল্টি ছুটে চলা, যত্রতত্র থামা, ওঠানামা করানো, ট্রাফিক নিয়ম লঙ্ঘন কোনোটাই বন্ধ হয়নি। নিয়ম না মেনে চলার কারণে নগরীর ব্যস্ত এলাকাগুলোতে ভয়াবহ যানজট সৃষ্টির কারণও এই যাত্রীবাহী বাসগুলো।
নগরীর বাস স্টপেজ ঘুরে দেখা গেছে, কোনো স্টপেজেই বাস থামে না। এছাড়া স্টপেজে বাস থামানোর জন্য পুলিশের কোনো কার্যক্রমও নেই। স্টপেজে বাস না থামার পেছনে বাসচালকেরা যাত্রীর ওপর, যাত্রীরা চালকের ওপর আর পুলিশ অনভ্যস্ততার ওপর দায় চাপিয়েছেন। চালকেরা বলছেন, যাত্রীরা নির্ধারিত জায়গায় দাঁড়ান না। তারা নিজেদের সুবিধামতো জায়গায় উঠতে-নামতে চান। আর যাত্রীদের ভাষ্য, চালকেরাই নির্ধারিত স্টপেজে থামতে চান না। জিইসির মোড়ে ‘বাস থামিবে না’ লেখা স্থানে দাঁড়ানো একটি বাসের চালকের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, দাঁড়ানোর জায়গা কই। আর যাত্রীরাই তো দাঁড়ায় না। বাস থামিয়ে লাভ কী?
স্টপেজ থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা বাসের যাত্রী আবদুর রহমান বলেন, বাস যদি স্টপেজ ছাড়া না দাঁড়ায়, তখন যাত্রীদের আর উপায় থাকবে না। তাই সবার আগে স্টপেজে বাস দাঁড়ানো নিশ্চিত করতে হবে।
এদিকে, ২ নং গেট, জিইসির মোড় ও আগ্রাবাদ-তিন স্টপেজেই নির্ধারিত স্থানে বাস দাঁড়ানো নিশ্চিত করতে পুলিশের কোনো কার্যক্রম চোখে পড়েনি। এই সড়কে দায়িত্বরত এক ট্রাফিক পুলিশের সঙ্গে কথা হয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, মূলত যাত্রী ও চালকদের অনভ্যস্ততার কারণে এমন হচ্ছে। অভ্যস্ত করতে সময় লাগবে।
বিভিন্ন রুটে ঘুরে দেখা যায়, নির্দিষ্ট স্টপেজে বাস থামার কড়া নির্দেশনা থাকলেও তা কর্ণপাত না করে আগের মতোই চলছে পরিবহন। বাস থামার জন্য নির্দিষ্ট জায়গা চিহ্নিত করা থাকলেও সেখানে বাস থামানো হয় না। নির্দিষ্ট জায়গা শুরু হওয়ার অনেক আগেই বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠানামা হচ্ছে। ফলে যাত্রীরাও বাসের জন্য নির্ধারিত স্টপেজে দাঁড়াচ্ছে না। অন্যদিকে চালকদের লাইসেন্স প্রদর্শনের নির্দেশনা আমলেই নেয়নি গণপরিবহন শ্রমিকরা। বাদুরঝোলা হয়ে যাত্রী পরিবহনও বন্ধ হয়নি।
নিউ মার্কেট মোড়ে দেখা যায়, বাস স্টপেজ দখল করে রয়েছে রিকশা, মোটরসাইকেল। কোনো কোনো স্থানে প্রাইভেট গাড়ি পার্কিং অবস্থায় দেখা গেছে। যাত্রীরাও আগের মতোই বাস স্টপেজে না দাঁড়িয়ে মোড়ে বাস ঘুরানোর সময় ঝুঁকি নিয়ে যানবাহনে উঠছেন।
একাধিক বাস চালক বলেন, আগে থেকে যেভাবে বাস চলাচল করে আসছে সে অনুযায়ী বাসে ওঠার জায়গাগুলো যাত্রীদের কাছে পরিচিত হয়ে গেছে। ফলে যাত্রীরা নির্ধারিত জায়গায় গিয়ে বাসের জন্য অপেক্ষা করে না। অনেক যাত্রীই নির্ধারিত স্ট্যান্ডের পরিবর্তে নিজের সুবিধামতো জায়গা থেকে গাড়িতে উঠতে-নামতে চায়। এটা নগরীর সড়কে বাস চলাচলের দৈনন্দিন অভ্যাস। ফলে অভ্যাসের পরিবর্তন আসতে সময় লাগবে।
যেখানে-সেখানে যাত্রী তোলার বিষয়ে জানতে চাইলে চালক হেলাল উদ্দিন বলেন, মোড় থেকে বাস স্টপেজগুলো একটু দূরে তৈরি করা হয়েছে। বাস স্টপেজে যাত্রী পাওয়া যায় না। ফলে বাধ্য হয়েই রাস্তা থেকে যাত্রী তুলতে হয়।
নির্ধারিত স্থান ছাড়া কেন গাড়িতে উঠছেন জানতে চাইলে যাত্রীরা বলেন, বাস স্টপেজগুলোতে বাস থামে না। মোড়ে না দাঁড়ালে গাড়িতে ওঠা যায় না। তাই বাধ্য হয়েই ঝুঁকি নিয়ে গাড়িতে উঠতে হয়।
আবার নিরাপদ সড়কের জন্য শুধু গণপরিবহনের ক্ষেত্রে নির্দেশনার কথা বলা হচ্ছে। অন্য যেসব ছোট-বড় পরিবহন এবং ইঞ্জিন ছাড়া যেসব বাহন রয়েছে, তাদের জন্য নেই কোনো নির্দেশনা।
নগর পরিকল্পনাবিদরা মনে করেন, সাধারণ মানুষ সচেতন না হলে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো কঠিন। তারই ফাঁক গলে চালক ও হেলপাররা হয়ে উঠছেন বেপরোয়া। একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটছে। তাদের মতে, সবার আগে আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটাতে হবে, নিয়ম মানতে শিখতে হবে। এছাড়া ট্রাফিক ব্যবস্থাকে উন্নত করতে হবে। প্রশাসনকে কঠোর হতে হবে। চালকদের ভালো করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ড্রাইভিং লাইসেন্স দিতে হবে। হেলপার দিয়ে গাড়ি চালানো বন্ধ করতে হবে। লাইসেন্স ও রুট পারমিট ছাড়া গাড়ি চলাচল বন্ধ করতে হবে। তাহলে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরবে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন চট্টগ্রাম আঞ্চলিক কমিটির সভাপতি মো. মুছা বলেন, গণপরিবহনে দুর্ঘটনার পর উপসর্গের চিকিৎসা হয়, কিন্তু রোগের চিকিৎসা হয় না। অধিকাংশ দুর্ঘটনায় চালকের সমান দায় রয়েছে পরিবহন ব্যবস্থাপনারও। অথচ এই ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা বজায় রাখার দায়িত্ব যাদের তাদের কখনো শাস্তির মুখোমুখি হতে হয় না।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজপথে অধিকাংশ বাস চলছে চুক্তিতে। বেতনভুক্ত চালক ও সহকারীর বদলে মালিকরা বাস চুক্তিতে ভাড়া দিচ্ছেন। চালকরা সেই চুক্তির টাকা তোলার পর নিজের পারিশ্রমিক আয় করেন। তাই দ্রুত সময়ে একাধিক ট্রিপ দিতে ও বেশি যাত্রী পেতে মরিয়া থাকেন তারা। অন্য বাসের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে বেশি উপার্জনের জন্য বেপরোয়া গতিতে বাস চালানোর প্রবণতা রয়েছে অধিকাংশ চালকের।
পরিবহন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নির্ধারিত স্থানে বাস দাঁড়াতে বাধ্য করার জন্য আগে বাস স্টপেজ ঠিক করে দিতে হবে। যেখানে সুবিধা আছে বে-বাস নির্মাণ, যেখানে সুবিধা নেই সেখানে রোড সাইন দিয়ে বাস দাঁড়ানোর স্থান চিহ্নিত করে দিতে হবে। স্থান চিহ্নিত করার পর ওই স্থানের আগে-পরে যাতে কোনো বাস দাঁড়াতে না পারে সেজন্য ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Skip to toolbar