Home / অন্যান্য / অপরাধ / দুই জঙ্গি আস্তানা দুই কিলোমিটারে

দুই জঙ্গি আস্তানা দুই কিলোমিটারে

‘ নিহত দুইজনের একজন নারী ও অন্যজন পুরুষ। তাদের লাশ উদ্ধারের পাশাপাশি একটি আগ্নেয়াস্ত্র জব্দ করা হয়েছে অপারেশন গর্ডিয়ান নট’ বা ‘জটিল গেরো’ নামে ছয়ঘণ্টার শ্বাসরুদ্ধকর অভিযানে নরসিংদীতে।

তবে তারা পুলিশের গুলিতে না নিজেদের বিষ্ফোরণে নিহত হয়েছেন- অভিযান শেষে তা নিশ্চিত করতে পারেননি  অভিযানের দলনেতা কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের (সিটিইউ) প্রধান মনিরুল ইসলাম।

নরসিংদীর দুইটি ‘জঙ্গি আস্তানা’র মধ্যে সদর উপজেলার মেহেরপাড়া ইউনিয়নের ভগীরথপুর এলাকার বিল্লাল হোসেনের পাঁচতলা বাড়ির ভেতর থেকে ওই দুইজনের লাশ উদ্ধার করে মনিরুল ইসলাম জানান, ধারণা করা হচ্ছে, তারা নব্য জেএমবি’র সদস্য।

পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ইউনিটের (সিটিটিসি) সন্ধান পাওয়া অন্য ‘জঙ্গি আস্তানা’ মাধবদী পৌর এলাকার ছোট গদাইরচর (গাংপার) মহল্লায় আফজাল হোসেনের মালিকানাধীন নিলুফা ভিলা নামের সাততলা বাড়িতে দিনের আলো ফোটার পর (বুধবার সকালে)অভিযান চালানো হবে বলেও জানান তিনি।

মঙ্গলবার বেলা ১১টায় বিল্লাল মিয়ার বাড়ির জঙ্গি আস্তানায় বিভিন্ন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতায় সিটিটিসি ও সোয়াত টিম অভিযান শুরু করে। ছয়ঘণ্টার শ্বাসরুদ্ধকর অভিযানটি শেষ হয় বিকাল চারটায়।

ভগীরথপুরে ‘গর্ডিয়ান নটের’ প্রথম অভিযান সমাপ্ত ঘোষণা করে মনিরুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘অভিযানে নিহতদের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তাদের কাছ থেকে একটি আগ্নেয়াস্ত্র জব্দ করা হয়েছে। আর ছোট গদাইরচরের অপর জঙ্গি আস্তানায় আপাতত আমরা জঙ্গিদের আত্মসমর্পণের আহ্বান জানাচ্ছি। আমরা সমঝোতার চেষ্টা করছি। যদি তারা রাজি না হয়, তাহলে আমরা দিনের আলোয় অপারেশন শুরু করব।’

আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ভাষ্য, গোয়েন্দা তৎপরতায় পুলিশের সিটিটিসি ইউনিট নিশ্চিত হয় যে, নরসিংদীর ওই দুই এলাকায় পৃথক দুইটি বাড়িতে আলাদা দুইটি নব্য জঙ্গি আস্তানা করা হয়েছে। এরপর সোমবার সন্ধ্যার পর পুলিশের সিটিটিসি ইউনিট নরসিংদী জেলা ও মাধবদী থানা পুলিশের সহায়তায় বাড়ি দুইটি ঘেরাও করে ফেলে। সারারাত বাড়িগুলো ঘেরাও রেখে পুরো এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেওয়া হয়। এরই মধ্যে পুলিশের সোয়াট টিম, এলআইসি টিম, বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দল, এন্টি টেরোরিজম ইউনিট, র‌্যাব, সিআইডিসহ জেলা ও বিভিন্ন থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে। তারা প্রথমে বাড়ি দুইটির অন্য সকল ইউনিটের বাসিন্দাদের সরিয়ে নেয়।

পরে মঙ্গলবার সকাল ছয়টার দিকে ঘটনাস্থলের ৫০০ গজের মধ্যে ১৪৪ ধারা জারি করে স্থানীয় প্রশাসন। পাশাপাশি মাইকিং করে কাউকে বের না হওয়ার পরামর্শ দেয়া হয়। সকাল সাড়ে আটটার দিকে দুই বাড়ির গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে ফায়ার ব্রিগেডের গাড়ি ও দুইটি অ্যাম্বুলেন্স এনে রাখা হয়।

সকাল ১০টার পরে দুইটি আস্তানা পরিদর্শন শেষে সিটিটিসির প্রধান মনিরুল ইসলামের নেতৃত্বে শুরু হয় চূড়ান্ত অভিযান। ভগীরথপুরের বিল্লাল হোসেনের বাড়িতে থাকা জঙ্গিদের প্রথমে আত্মসমর্পণের আহ্বান জানানো হয়। কিন্তু ভিতর থেকে থেমে থেমে গুলিবর্ষণ করা হলে সিটিটিসি ও সোয়াট টিমও প্রথমে টিয়ারশেল ও পরে গুলিবর্ষণ করে।

আড়াইঘণ্টা অভিযান চলার পর পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) জাবেদ পাটোয়ারী পরিদর্শনে আসেন। তিনি আসার কয়েক মিনিটের মধ্যেও বেশ কয়েকটি গুলির শব্দ হয়। ঘটনাস্থলে আরও ছিলেন পুলিশের ঢাকা রেঞ্জের সহকারী মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন, নরসিংদী জেলা প্রশাসক সৈয়দা ফারহানা কাউনাইন, পুলিশ সুপার সাইফুল্লাহ আল মামুন সিভিল সার্জন হেলাল উদ্দিন প্রমুখ।

আইজিপি ঘটনাস্থল ত্যাগ করার পর বেলা আড়াইটার দিকে বেশ কয়েক রাউন্ড টানা গুলিবর্ষণের শব্দ শোনা যায়।

বিকাল চারটার দিকে সিটিটিসি’র প্রধান মনিরুল ইসলাম ভগীরথপুরের অভিযানের সমাপ্তি ঘোষণা ও অভিযানের পরবর্তী ধাপ ছোট গদাইরচরে জঙ্গি আস্তানায় অভিযানের প্রস্তুতির কথা জানিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন। ভগীরথপুরের জঙ্গি আস্তানাটি এখনো পুলিশের হেফাজতে রয়েছে। সেখানে কাউকে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না।

প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয়রা জানান, ভগীরথপুরের জঙ্গি আস্তানার বাড়িটি ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক থেকে তিনশ মিটারের মধ্যে। সেখান থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরত্বে অন্য জঙ্গি আস্তানা মাধবদীর ছোট গদাইরচরের (গাংপাড়)বাড়িটি। দুইটি বাড়িই ৫ থেকে ৭ অক্টোবরের মধ্যে ভাড়া নেওয়া হয়েছে বলে বাড়ির মালিকদের পক্ষ থেকে পুলিশকে জানানো হয়েছে। ভগিরথপুরের পাঁচতলা বাড়িটির মালিক বিল্লাল হোসেন কাপড় ব্যবসায়ী। তিনি ওই ভবনের পঞ্চমতলার একটি ফ্ল্যাট জঙ্গি সন্দেহভাজন ওই নারী ও পুরুষের কাছে ভাড়া দিয়েছিলেন। পঞ্চম তলার অন্য ফ্ল্যাটের ভাড়াটিয়া সাইফুল ইসলাম সাহেদ বলেন, ‘আমার পাশের ফ্ল্যাটেই ওই দুইজন থাকতেন। তাদের পরিচয় আমি জানি না। তবে তাদের বয়স ২৫ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে। বাসা ভাড়া নেওয়ার পর তাদের সঙ্গে আমার একদিন দেখা হয়েছে। সম্ভবত তারা ৫/৭ অক্টোবর ভাড়া নেন। বাড়িওয়ালা বিল্লাল তাদের কাছে একাধিকবার জাতীয় পরিচয়পত্র চাইলেও তারা শুধু কালক্ষেপণ করছিলেন। তাদের ঘরে দুই-একটি কাপড়ের ব্যাগ আর দুইটি খাবারের প্লেট ছাড়া আর কিছুই ছিল না। তারা ঘর থেকেও তেমন বের হতেন না। কেউ কথা বলতে চাইলেও এড়িয়ে যেতেন। আমার কিছুটা সন্দেহ হয়েছিল। পরে আমি ৯৯৯-এ কল করব ভাবছিলাম। এরই মধ্যে সোমবার সন্ধ্যার পর পুলিশ বাড়ি ঘেরাও করে রাত আনুমানিক ৩টার দিকে আমাদেরকে সরিয়ে দেয়।’

বিল্লাল হোসেনের বাড়ির দোতলার একটি ফ্ল্যাটের ভাড়াটিয়া অপু দেবনাথ বলেন, ‘রাত আটটার দিকেই বাড়ির সামনে পুলিশ চলে আসে। আমরা কোনো কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। এলাকাটি হঠাৎ করে নিস্তব্ধ হয়ে যায় এবং সবার মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছিল। এরই মধ্যে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সবাইকে যার যার ঘরে ঢুকে যাওয়ার নির্দেশ দেন। পরে রাত ৩টার দিকে আমাদেরকেসহ বাড়ির অন্য বাসিন্দাদেরকে সরিয়ে নিয়ে জানান, এই ফ্ল্যাটে জঙ্গিরা অবস্থান করছেন। তাদের গ্রেফতারে অভিযান চালানো হবে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Skip to toolbar