Home / খবর / দুর্নীতি কমেনি বেতন বাড়লেও সরকারি কর্মকর্তাদের : টিআইবি

দুর্নীতি কমেনি বেতন বাড়লেও সরকারি কর্মকর্তাদের : টিআইবি

সদিচ্ছার অভাব ও নেতিবাচক দিক রোধে গুরুত্বারোপ না করায় জনপ্রশাসনে শুদ্ধাচার চর্চা বাস্তবায়ন হচ্ছে না রাজনৈতিক প্রভাব। সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা  বৃদ্ধি হলেও  তাদের দুর্নীতি কমেনি। প্রনোদনা দেয়া হচ্ছে ঠিকই। কিন্তু এর বিপরীতে সঠিক জবাবদিহিতা নেই জনপ্রশাসনে। ট্রন্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) ‘জনপ্রশাসনে শুদ্ধাচার: নীতি এবং চর্চা’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

২৩শে জুন আন্তর্জাতিক জনপ্রশাসন দিবসে জাতীয় শুদ্ধাচার জনপ্রশাসন সম্পর্কিত ১১টি কৌশলের উপর গবেষণা ও তার তথ্য তুলে ধরা হয়েছে এ প্রতিবেদনে। এর মধ্যে ৫টি কৌশলের সন্তোষজনক চর্চা শুরু হয়েছে আর তিনটির চর্চা শুরুই হয়নি। যার মধ্যে জনপ্রশাসনের নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাব, পদোন্নতিতে মেধা ও যোগ্যতার পুরুষ্কার না দিয়ে গোয়েন্দা প্রতিবেদন, ওএসডিকে (বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) এখন ভিন্নার্থে দেখা এবং চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ যথেষ্ট হারে বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন বিষয়ের তথ্য তুলে ধরা হয়।

গতকাল টিআইবি কার্যালয়ে আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে এ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।

প্রতিবেদন প্রণয়নকারী ও টিআইবির কর্মসূচি ব্যবস্থাপক মহুয়া রউফ প্রতিবেদন উপস্থাপন করে বলেন, রাজনৈতিক ও অন্যান্য প্রভাবের কারণে জাতীয় শুদ্ধাচারের অনেক কৌশলের চর্চা ফলপ্রসূ হচ্ছে না। যা প্রশাসনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সামপ্রতিক বছরগুলোতে জনপ্রশাসনে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের প্রবণতা বেড়েছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে যোগ্যতা নয়, ক্ষমতাসীনদের পছন্দ প্রাধান্য পাচ্ছে।

তিনি বলেন, ২০১০ সাল থেকে নিয়োগপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তারা চাকরিতে যোগদানের সময় নিজেদের এবং পরিবারের সদস্যদের স্থাবর এবং অস্থাবর সম্পদের হিসাব প্রদান করে আসছেন। তবে প্রতি পাঁচ বছর অন্তর অন্তর ডিসেম্বর মাসে সম্পত্তির হ্রাস বৃদ্ধির হিসেবের দৃষ্টান্ত নেই। এর আগে ২০০৮ সালে এ বিষয়ে উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছিল এবং অধিকাংশ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা সেসময় জনপ্রশাসন সচিব বরাবর সম্পদের বিবরণী প্রদান করেছিলেন। এছাড়া সম্প্রতি ভূমি মন্ত্রণালয় ১৭ হাজারেরও বেশি ৩য় ও ৪র্থ শ্রেণির কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব নিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। কিন্তু ১ম ও ২য় শ্রেণীর কর্মকর্তাদের কোনো হিসেব নেয়া হয়নি।
তিনি বলেন, ২০০৯ থেকে ২০১৭ পর্যন্ত বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে ঘুষ, দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা ও অবৈধ কার্যলাপের ২৩১৩ টি অভিযোগ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে জমা পড়ে। যার মধ্যে ২৩০৯ টি অভিযোগ নিস্পত্তি করা হয়। তবে অভিযোগ নিস্পত্তিতে ধীরগতি রয়েছে।

প্রতিবছর শূন্যপদে সিনিয়র সহকারি সচিব ও সমপর্যায় পদে  এবং  সহকারি সচিব ও সমপর্যায় পদে যথাক্রমে ২৭ শতাংশ এবং ২৯ শতাংশ পদ শূন্য রয়েছে। অন্যদিকে জনপ্রশাসনে ঊর্ধ্বতন পদসমূহে (উপসচিব হতে অতিরিক্ত সচিব) অপরিকল্পিতভাবে বেশি নিয়োগ দেয়া হয়েছে। ফলে উপসচিব, যুগ্ম-সচিব ও অতিরিক্ত সচিব পদে ১০০ শতাংশের বেশি কর্মকর্তা কর্মরত রয়েছেন।

এছাড়া সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে শুধু যোগ্যতাই নয় ক্ষমতাসীনদের ‘নিজের লোক’ হওয়া অলিখিত প্রধান যোগ্যতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০১৮ সালের সরকারি চাকরি আইনে রাষ্ট্রপতির এ চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের নিয়ম প্রবর্তন করা হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, আইনে না থাকা সত্ত্বেও সরকারি কর্মকর্তা নির্বাচনে একাধিক আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক (পুলিশি তদন্ত, গোয়েন্দা তদন্ত, ডিজিএফআই) তদন্ত হচ্ছে। প্রার্থীর পরিবারের সদস্যদের রাজনৈতিক আনুগত্যসহ বিভিন্ন বিষয়ে তল্লাশি হচ্ছে। প্রশাসনের কর্মকর্তারা বিভাগীয় প্রধান হয়ে টেকনিক্যাল ক্যাডারে নিয়োগ পাওয়ার কারণে টেকনিক্যল কর্মকর্তারা তাদের কর্মক্ষমতা কাজে লাগাতে পারছেন না, ফলে দ্বন্দ্ব ও হতাশার সৃষ্টি হচ্ছে। নিয়মিত যোগ্য কর্মকর্তা থাকার পরও চুক্তিতে নিয়োগ সরকারের আর্থিক খরচ বাড়ায়। সচিব পদে চুক্তিতে নিয়োগে দক্ষ ও যোগ্য অতিরিক্ত সচিবদের পদোন্নতির সুযোগ সংকুচিত হয়। ক্ষোভ, অসন্তোষ, হতাশা ও কর্মদক্ষতার ঘাটতির সৃষ্টি হচ্ছে। প্রশাসনিক কাজের ধাপগুলি ক্রমশ বাড়ানোর (আট স্তর) ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে কালক্ষেপণ বেড়েছে।

জ্যেষ্ঠতা, কৃতি, জ্ঞান ও দক্ষতার কৌশলের বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতিযোগিতামূলক পদোন্নতি অনেক ক্ষেত্রে উপেক্ষিত হয়। সরকারি কর্মকর্তাদের চাকরি স্থায়ীকরণ ও সিনিয়র স্কেল পদে পদোন্নতির জন্য পরীক্ষায় অবতীর্ণ হওয়ার নিয়ম থাকলেও উপসচিব থেকে সচিব পর্যন্ত পদোন্নতিতে পরীক্ষা নেই। পদোন্নতি বিধিমালায় উল্লেখ না থাকা সত্ত্বেও বর্তমানে প্রশাসনে পদোন্নতিতে ‘গোয়েন্দা রিপোর্ট’ যুক্ত করা হয়েছে। পদোন্নতি বিধিমালার নির্ধারিত নম্বর ছাড়াও যুগ্ম সচিব থেকে তদূর্ধ্ব পর্যায়ে ‘সার্বিক বিবেচনায় উপযুক্ত’ বিবেচিত হতে হবে সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ডের কাছে। এ বিধানটির অনেকক্ষেত্রে অপব্যবহার হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। রাজনৈতিক বিবেচনায় পদোন্নতির ক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠতার লঙ্ঘন হয়েছে একাধিকবার।

এছাড়া নিয়মবর্হিভূত পদোন্নতি ক্রমশ জনপ্রশাসনে পিরামিড আকৃতির ব্যত্যয় ঘটাচ্ছে। একই পদে একাধিক কর্মকর্তা থাকায় কাজের ভাগাভাগি নিয়ে সমস্যা হচ্ছে। প্রতিটি মন্ত্রণালয়ে ৩/৪ জন অতিরিক্ত সচিবের পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। কর্মকর্তারা পদোন্নতি পেতে রাজনৈতিক আনুগত্য প্রদর্শনের দিকে ঝুঁকে পড়েন বলেও প্রতিবেদনে তথ্য উঠে এসেছে।

ক্ষমতাসীন দলের ভাবাদর্শে বিশ্বাসী না হলেই কর্মকর্তাদের ওএসডি করার প্রবণতা বিদ্যমান রয়েছে। ওএসডি কর্মকর্তা নিয়মিত বেতনভাতা, আবাসন, পেনশন দেয়া হলেও তারা রাষ্ট্রের কোনো সেবা দিতে পারেন না। একারণে অনুৎপাদনশীল খাতে সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি পায়। এছাড়া ওই কর্মকর্তাদের কর্মদক্ষতাকে কাজে লাগানো যাচ্ছে না, অভিজ্ঞতার সুফল রাষ্ট্র পাচ্ছে না, এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মধ্যে হতাশা ও অসন্তোষ সৃষ্টি হচ্ছে। এর বাইরে ওএসডিকে একসময় বিশেষ সুবিধাভোগি কর্মকর্তা হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও এটা এখন সম্পূর্ণ অসম্মানজনক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, জনপ্রশাসনে শুদ্ধাচারের অবস্থাটি সামগ্রিকভাবে মিশ্র। কিছু ক্ষেত্রে লক্ষণীয় অগ্রগতি আছে। কিছু কিছু উদ্যোগ শুরুই হয়নি। তিনি সরকারি চাকরি আইনের সংশোধনের দাবি তুলে বলেন, এটা হওয়ার কথা ছিল প্রজাতন্ত্র আইন। এই আইনে গ্রেপ্তার সম্পর্কিত ধারার সমালোচনা করে বলেন, এই ধারাটি দুর্নীতি প্রতিরোধে বাধা প্রদান করবে। সরকারি চাকরিজীবীরা দুর্নীতি করলে কেনো তাদের হাতে নাতে গ্রেপ্তার করা যাবে না, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি লাগবে। এটা সংবিধানে সকলের জন্য আইন সমান এর পরিপন্থি। এই ধারাটি বাতিল করতে হবে।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন টিআইবির ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য ও সেন্ট্রাল উইমেন্স ইউনিভার্সিটির উপাচার্য পারভিন হাসান, টিআইবির উপদেষ্টা প্রফেসর সুমাইয়া খায়ের, টিআইবির পরিচালক মোহাম্মদ রফিকুল হাসান।

টিআইবির ট্রাস্টি বোর্ডে নতুন ৩ সদস্য, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম ন্যায়পাল: ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর ট্রাস্টি বোর্ডে যুক্ত হলেন নতুন তিন সদস্য। গত ১৯শে জুন বোর্ডের ১০০তম সভায় যোগদান করার মাধ্যমে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে টিআইবির সঙ্গে যুক্ত হন। তিন সদস্য হলেন সেন্ট্রাল উইমেন্স ইউনিভার্সিটির ভিসি প্রফেসর ড. পারভীন হাসান, লেখক ও সাংবাদিক আবুল মোমেন এবং ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির প্রো-ভিসি প্রফেসর ড. ফখরুল আলম। একই সঙ্গে ড. পারভীন হাসান টিআইবির ট্রাস্টি বোর্ডের মহাসচিব নির্বাচিত হয়েছেন। এ তিন সদস্য সেলিনা হোসেন, ড. এ টি এম শামসুল হুদা ও প্রফেসর সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন। তাদের মেয়াদ পূর্ণ হওয়ায় তারা দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নিয়েছেন। অন্যদিকে অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম টিআইবির ন্যায়পালের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। এর আগে এ দায়িত্বে ছিলেন ড. এ টি এম শামসুল হুদা।
ট্রাস্টি বোর্ড টিআইবির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম। বোর্ডের সদস্যরা হলেন চেয়ারপারসন: অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল, কোষাধ্যক্ষ: মাহফুজ আনাম, সদস্য অ্যাডভোকেট তৌফিক নেওয়াজ, সৈয়দা রুহী গজনবী, এম হাফিজউদ্দিন খান, ড. আকবর আলি খান, আলী ইমাম মজুমদার ও পারভীন মাহমুদ এফসিএ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Skip to toolbar