Home / খবর / ‘ প্রধানমন্ত্রীর ভিডিও কনফারেন্সে ’

‘ প্রধানমন্ত্রীর ভিডিও কনফারেন্সে ’

সারাদেশের উন্নয়ন মেলা উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী ভিডিও কনফারেন্সে কথা বললেন ‍তৃণমূলের মানুষের কাছে। সরকারের বিভিন্ন সামাজিক উন্নয়ন প্রকল্পের সুবিধাভোগীরা এ সময় নানা দাবি তুলে ধরার পাশাপাশি তাদের জীবনের কাহিনিও তুলে ধরেন।

বৃহস্পতিবার সকালে গণভবনে বসে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে প্রত্যেক জেলা শহরে তিন দিনের উন্নয়ন মেলার উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় বেশ কয়েকটি জেলায় এই আয়োজনের অংশগ্রহণকারীরা সরাসরি যুক্ত হন ভিডিও কনারেন্সের মাধ্যমে। আর জেলা প্রশাসকরা তাদের নিজ নিজ জেলার উন্নয়ন প্রকল্পের বর্ণনা দেন। এরপর প্রত্যেক জেলা থেকে দুই জন এবং একটি জেলা থেকে তিন জন সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় তারা সরকার প্রধানের নানা প্রশ্নের জবাব দেন।

শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী যান বরগুনায়। সেখানে একটি আশ্রয়ন প্রকল্পের বাসিন্দা বরগুনার মোহাম্মদ দুলাল প্রধানমন্ত্রীকে বলেন, ‘আপনের উছিলায়, আমরা ভালো আছি, শিশু বাচ্চা নিয়া আল্লাহপাক খুব ভালো রাখছে। ছেলেপুলে লেখাপড়া করতে আছে। সবাই সুন্দর, শান্তিতে বসবাস করতে আছে।’

‘আপনাকে যেন এই বাংলাদেশে আল্লায় আরও অনেক থাকতে দেয় বা অনেক সেবা করতে দেয় বা চিরদিন যেন আল্লায় আপনাকে হায়াত দরস্ত দেয়। আমাগো আপনাকে নিয়া অনেক আশা। আমরা অনেক শান্তিতে আছি।’

প্রধানমন্ত্রী দুলালের এই বক্তব্যের জবাবে বলেন, ‘আমি খুব খুশি হলাম যে আপনি খুব ভালো আছেন, শান্তিতে আছেন।’

দুলাল এরপর বলেন, ‘আল্লাহপাক যেন আপনারে আরও রাখে বা আপনি আরও থাকেন। এইটা আমরা দোয়া করি। আমরা এইটাই চাই।’

এরপর প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেন, তালতলী উপজেলার রাখাইন সম্প্রদায়ের সদস্য নারী উদ্যোক্তা নাইচিং। তিনি তালতলীতে উৎপন্ন তাঁতের কাপড় বিক্রির জন্য একটি মার্কেট করে দেয়ার দাবি জানান।

জবাবে জেলা প্রশাসককে এ বিষয়ে উদ্যোগ নেয়ার নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। বলেন, এসব তাঁতপণ্য অনলাইনেও বিক্রির ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

এরপর প্রধানমন্ত্রী ঝিনাইদহে একজন পুনর্বাসিত একজন নারী ভিক্ষুকের সঙ্গে কথা বলেন। প্রবীণ ওই নারী বলেন, ‘আমি ভিক্ষুক ছিলাম। এখন নেই। আমি এখন খুব খুব সুখে আছি। প্রধানমন্ত্রী আপনাকে খুব ধন্যবাদ।’

‘আপনি কী করছেন?’-জানতে চান শেখ হাসিনা।

‘আমি এখন দোকানি করছি’- জবাব দেন ওই নারী।

-‘কী করে চলছেন?’

-‘এই দোকান দিয়েছে, সেই দোকান কোনো রকম টুকটাক চলছে, কোনো রকম চলছে আরকি। আর ভিক্ষেটিক্ষে করছি নে।’

-‘খুব খুশি হলাম, ভিক্ষা না করাই ভালো। ভিক্ষা করবেন কেন। আপনাদের যেন ভিক্ষা করতে না হয়, সে ব্যবস্থাই আমরা করছি।

আপনার জন্য দোয়া করছি’-বলেন প্রধানমন্ত্রী

ওই নারী জানান, তার দুটি ছেলে এবং দুটি মেয়ে ছিল। এর মধ্যে তিন জনকে মুক্তিযুদ্ধের সময় হত্যা করা হয়েছে। তিনি প্রধানমন্ত্রীকে বলেন, ‘আমার জন্য দোয়া করবেন, আপনার জন্য আমি দোয়া করি।’

ওই নারীর কাহিনি জেনে দুঃখ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তিনি যেন আরেকটু ভালো থাকতে পারেন, সে ব্যবস্থা করা হবে।

এরপর ঝিনাইদহের ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদনকারী নারী উদ্যোক্তা মর্জিনা বেগম যোগ দেন ভিডিও কনফারেন্সে। তিনি বলেন, ‘এক সময় আমি শুধু ঘরে বসে কান্নাকাটি করেছি। এখন শুধু ভার্মি কম্পোস্ট বেচে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা উপার্জন করি। আমার এখানে যে ছেলে মেয়েরা কাজ করছে তারা ১০ হাজার টাকা, ২০ হাজার টাকা ইনকাম করছে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আপনার মতো সবাই উদ্যোক্তা হোক এবং নিজের পায়ে দাঁড়াক, এটাই চাই আমরা তাই চাই।’

এরপর হবিগঞ্জ থেকে ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ প্রকল্পে পাটলী গ্রাম উন্নয়ন সমিতির সভাপতি যোগ দেন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘গ্রাম উন্নয়ন সমিতির পক্ষ থেকে আমরা লোক নিয়ে স্বাবলম্বী হচ্ছি, অনেকেই স্বাবলম্বী হয়েছে। আমরা আগামী দিনে বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখছি, অনেকেই বড় হয়েছে।’

এই জেলা থেকে যোগ দেন শ্রমিকদের নেতা গোপাল। তিনি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের আবেদন করেন। বলেন, ‘‘চা শ্রমিক প্রতিনিধিদের সাথে আপনার একটা সাক্ষাতের ব্যবস্থা করে দিলে আমরা কৃতজ্ঞ থাকব।’

প্রধানমন্ত্রী জবাবে বলেন, ‘অবশ্যই আমি দেখা করব। আগেও দেখা করেছি। আপনারা আসবেন গণভবনে।’

এরপর প্রধানমন্ত্রী যান গাইবান্ধায়। সেখানকার একটি মসজিদের ইমাম বলেন, ‘আমরা গাইবান্ধা জেলার ওলামায়ে একরাম বিভিন্ন মসজিদে ওয়াজ মাহফিলে জঙ্গিবাদ, মাদক, বাল্যবিবাহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করছি। আমরা সবাই সোচ্চার। যাতে ধর্মের নামে যেন মানুষকে কেউ খুন করতে না পারে, গাড়ি ভাঙচুর করতে না পারে এবং সর্বশ্রেণির মানুষ যেন এক কাতারে সামিল হয়ে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে।’

বয়স্ক ভাতাভোগী একজন বলেন, ‘বয়স্ক ভাতা পায়া আমাদের অনেক উপকার হয়েছে। এখন আর কষ্ট করি চলা লাগে না, হাত পাতা লাগে না। এখন আপনি যদি আরেকটু যদি দয়া করেন, তাহলে মনে হয় ভালো হয়।’

এরপর প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘একটু বাড়িয়ে দিলে আর কেউ কাজ করবে না। সবাই কাজ করবে কিছু কিছু, ভাতা দিয়ে কিছু একটা করবে, এটাই আমরা চাই। কেউ না খেয়ে যেন না থাকে, সে জন্য ভাতাটা দিচ্ছি। ভাতাটা ব্যাংকে একটা অ্যাকাউন্টে থাকবে, তাহলে পরিবারেও তার একটা মূল্য বাড়ে। এ জন্যই এটা করে দেয়া।’

একজন মুক্তিযোদ্ধা বলেন, ‘মু্ক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমরা অবহেলিত ছিলাম। এখন আমাদের ভাতা হওয়ার পর আমরা ভালো আছি, ছেলে মেয়েদের লেখাপড়া করতে পারছি।’

সবশেষ প্রধানমন্ত্রী কথা বলেন চাঁদপুরের বাসিন্দাদের সঙ্গে। জেলা প্রশাসক উন্নয়ন প্রকল্পের বর্ণনা দেয়ার পর প্রথমে যুক্ত হন হাইমচর এলাকার মৎস্যজীবী মানিক দেওয়ান। তিনি কারেন্ট জাল উৎপাদনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানান।

মানিক বলেন, ‘কারেন্ট জাল এর জন্য জেলেরাই মাইর খায়। জেলেদের পুলিশে বা কোস্টগার্ডে ধইরা জেলে দেয়। কিন্তু যারা তৈয়ার করে তাদের জেলে দেয় না, যারা বিক্রি করে তাদেরকে ধরে না। এখানে আমাদের জেলেদেরকে একটু নির্যাতিত করে। দয়া করে কারেন্ট জাল বন্ধ হোক। আমরা এর বিপক্ষে না। কিন্তু যারা তৈয়ার করে আর বিক্রি করে, তাদেরকে ভালোভাবে ধরেন। জেলেরা না পাইলে তো আর কিনতে পারে না।’

নদী শাসন ও খননের দাবি জানিয়ে এই মৎস্যজীবী বলেন, ‘মাছ বাঁচলে দেশ বাঁচব। যদি নদী শাসন কইরা আপনি মাছ বাঁচাইতে পারেন, তাহলে সোনার বাংলা হতে ৪১ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে না।’

আমাদের মৎস্যজীবীদের ছেলেমেয়েদে জন্য স্কুল-কলেজে কোটার ব্যবস্থা করার দাবিও জানান মানিক। বলেন, ‘তাইলে আমাদের ছেলেপুলেরা আর মৎস্যজীবী হবে না। তাইলে কোনো একটা ভালো চাকরি বা কোনো একটা কাজ করতে পারব।’

‘আপনি মৎস্যজীবীদের অনেক উপকার করছেন। আপরা কাছে আমরা অনেক ঋণি। এই ঋণ শোধ করব ভোটের মাধ্যমে।’

জবাব প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যারা কারেন্ট জাল তৈরি করে এবং বিক্রি করে, তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে। আমরা অবশ্যই এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেব। কারেন্ট জালটা অন্য কোন কাজে লাগে সেটা দেখব। তবে মাছ ধরতে যেন না লাগে, সেটা আমরা দেখব।’

‘আপনাদের ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া শিখে উন্নত পদ্ধতিতেও মাছ ধরতে পারবে। সেই ট্রেইনিংটাও দেয়া যেতে পারবে। আপনারা যদি বলেন কেউ মাছ ধরবেন না তাহলে মানুষ মাছ খাবে কোত্থেকে?’।

সবশেষ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে যুক্ত হন একজন কৃষক। তিনি বলেন, ‘আমরা ন্যায্যমূল্য চাই কৃষকরা। আজকে যে প্রয়োজন তা মিটিয়ে বাহিরেও রপ্তানি হইতাছে।’ চাঁদপুরে একটি এই ভেজিটেবল কোল্ডস্টোরেজ তৈরির দাবি জানান তিনি।

আলু উৎপাদনে কৃষকের লোকসান হয়েছে জানিয়ে এই কৃষক বলেন, ‘আজকে আমাদের দেশে যে আলু উৎপাদন হয়েছে, সারাদেশের চাহিদা মিটায়া অর্ধেক আলু আজকে ফালায়া দিতে হইছে। আলুর দাম কৃষক পায়নি।’

‘বাহিরে রপ্তানি করার জন্য সুযোগ করে দিবেন, কৃষকরা যেন ন্যায্যমূল্য পায়।’

‘আমরা বেশি ‍মুনাফা চাই না। উৎপাদন করতে যে খরচ, তার চেয়ে সামান্য কিছু বেশি আমরা আপনার কাছে চাই।’

মত বিনিময়ে প্রধানমন্ত্রী বরগুনায় জনবসতির বদল চরাঞ্চলে জাহাজ ভাঙা শিল্প গড়া, ভিক্ষুকমুক্ত জেলা গড়তে প্রশাসনকে তহবিল গড়া, গৃহহীনদের তারিকা করে তাদের বাড়ি তৈরি করে দেয়ার ব্যবস্থার নির্দেশ দেন জেলা প্রশাসকদেরকে।

আবার জামালপুরের বাহাদুরাঘাট থেকে গাইবান্ধার বালাসি ঘাট পর্যন্ত ফেরি চালুর ঘোষণা দিয়ে জানান, এই রুটে নদীর নিচে এটি টানেল করার বিষয়ে সমীক্ষা করার চিন্তা আছে সরকারের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Skip to toolbar