Home / অন্যান্য / সড়ক দুর্ঘটনা / বাসচাপায় আহতরা কেমন আছেন

বাসচাপায় আহতরা কেমন আছেন

মেহেদী হাসান সাগর বড় হয়ে সেনা কর্মকর্তা হওয়ার স্বপ্নটি শৈশব থেকে লালন করতো । স্বপ্ন পূরণের খুব কাছাকাছি চলে এসেছিল মেহেদী। এসএসসিতে জিপিএ-৫ পাওয়ার পর ভর্তি হয়েছিল ঢাকা সেনানিবাস এলাকার অবস্থিত শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজে। কিন্তু একটি দুর্ঘটনায় চুরমার হয়ে গেছে তার সব স্বপ্ন। বিমানবন্দর রোডে দুর্ঘটনায় হারাতে বসেছে বাম চোখ। তার স্বজনরা জানিয়েছে, হাসপাতালের বেডে শুধু একটি কথাই বলছে সাগর।

‘আমি আর্মি অফিসার হতে পারবো তো?’ ডাক্তারদের কাছে একই কথা জানতে চাইছে বারবার। একই কলেজের শিক্ষার্থী নাইম রহমানের স্বপ্ন ছিল বিমানের পাইলট হওয়ার। দুর্ঘটনায় নাইমের স্বপ্নও চুরমার হওয়ার পথে। মাথায় গুরুতর আঘাত পেয়েছে সে। অতীতের অনেক কিছু মনে করতে পারছে না নাইম। তার বাবা জানান, ওই দিনের ঘটনার পর অতীতের অনেক কিছু মনে করতে পারছে না তার ছেলে। তিনি জানান, ছোটবেলা থেকে বিমানের পাইলট হওয়ার স্বপ্ন লালন করতো নাঈম। ছেলে স্বাভাবিক হবে কী নাÑ তা নিয়েই এখন আমি শঙ্কিত। সড়ক দুর্ঘটনার পর শুধু সাগর বা নাইমই নয়, আহত ১০ জন শিক্ষার্থীর স্বপ্ন এখন অধরা। অনেকেরই হাত ভেঙে গেছে, চোখ নষ্টসহ শরীরে বিভিন্ন অঙ্গ নষ্ট হওয়ার উপক্রম। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, ওই দিনের ঘটনায় রমিজ উদ্দিন কলেজের ১০ শিক্ষার্থী আহত হয়। এদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় আরো উন্নত চিকিৎসার কথা ভাবা হচ্ছে। তিনজনকে বাসায় পাঠানো হলেও বাকিদের অবস্থা স্বাভাবিক হতে অনেক সময় লাগবে। ঢাকা জেলা শিক্ষা অফিসের তথ্যমতে, আহত দশজনের মধ্যে অন্যতম একাদশ শ্রেণির মানবিক বিভাগের ছাত্রী রুবাইয়া আক্তার। দুর্ঘটনায় তার বাম কাঁধ ভেঙে গেছে। আঘাত লেগেছে পাঁজরে। তার অবস্থা গুরুতর না হলেও সিএমএইচে চিকিৎসাধীন। আরেকজন শিক্ষার্থী তৃষ্ণা রানী দাস। ব্যবসা শিক্ষা বিভাগের দ্বাদশ শ্রেণির এ ছাত্রীর বাসা ভাটারা। কলেজ শেষে প্রতিদিন জাবালে নূর বাসেই আসা-যাওয়া করতো। তার বড় ভাই রাজন মানবজমিনকে বলেন, ওই দিন বাসের জন্য অপেক্ষা করছিল তৃষ্ণা। বাস যখন ফুটপাথে উঠে যায় তখন তৃষ্ণা ছিল সবার সামনে। বাসের ধাক্কায় তার ডান হাত ভেঙে গেছে। হাতে অপারেশন হলেও স্বাভাবিক চলাফেরা করতে পারছে না। তার ভাই জানান, গতকাল আবার এক্স-রে করা হয়েছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, অবস্থা উন্নতি হলে তাকে রিলিজ দেয়া হবে। একাদশ শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র নাইম রহমানের অবস্থা খুবই গুরুতর। গুরুতর আঘাত লেগেছে তার মাথা ও শরীরের বিভিন্ন অংশে। প্রথম দিকে প্রতিদিন বমি করতো। এখন একটু স্বাভাবিক হলেও অতীতের অনেক কথা মনে করতে পারছে না নাইম। তার বাবা বদরুল আলম মানবজমিনকে বলেন, নাইম খুবই মেধাবী। ৫ম ও ৮ম শ্রেণিতে মেধা কোটায় বৃত্তি পেয়েছে। আর এসএসসিতে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে পেয়েছে গোল্ডেন জিপিএ-৫। বিমানের পাইলট হওয়ার স্বপ্ন ছিল তার। এ আঘাতের পর এ স্বপ্ন অনেকটা ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। নাইম ছোট বেলা থেকে পড়াশোনার প্রতি প্রচুর মনযোগী ছিল। কোরআনের হাফেজ হওয়ার পর ৫ম শ্রেণিতে ভর্তি হয়েই ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পায় নাইম। এসএসসিতে গোল্ডেন জিপিএ-৫ পাওয়ার পর ভর্তি হয় শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজে। তার বাবা বলেন, ভাটারা আসার জন্য ঘটনার দিন এমইএস বাসস্ট্যান্ডে বাসের জন্য অপেক্ষা করছিল। এরপর কি হয়েছে তা এখন আর বলতে পারছে না। প্রথম দিকে শুধু তাকিয়ে থাকতো। এখন কথা বললেও ওইদিন কী হয়েছিল তা বলতে পারছে না। তিনি শঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, তার স্মৃতিশক্তি লোপ হয়েছে কী তা এখন আমরা বলতে পারছি না। বদরুল আলম বলেন, আমি স্থানীয় একটি মসজিদে মাত্র ৭ হাজার টাকার বেতনে চাকরি করি। এ অল্প টাকায় বেতন দিয়ে ৫ সন্তানের লালন পালন, সংসার চালাই। পড়াশোনায় ভালো বলে কষ্ট করে হলেও চালিয়ে যেতে বলেছি। এখন এ দুর্ঘটনায় তার স্বপ্ন মাঠিতে মিশে যাওয়ার উপক্রম।

একই কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র মেহেদী হাসান সাগর। ওই দিন ক্লাস শেষে আশকোনা বাসায় ফেরার জন্য বাসের জন্য অপেক্ষা করছিল। তার ভাই মো. সোলায়মান বলেন, বাসটি যখন গাছের সঙ্গে ধাক্কা লেগে সামনে গ্লাস ভেঙে সাগরের মুখের মধ্যে পড়ে। তাৎক্ষণিক মুখের অনেক অংশ কেটে যায়। এরপর চোখ দিয়ে রক্ত বের হতে থাকে। হাসপাতাল নেয়ার পর তার চোখে গ্লাস ঢুকেছে বলে ডাক্তাররা জানান। ডান চোখ শঙ্কামুক্ত হলেও তার বাম চোখের অবস্থা আশঙ্কাজনক। বাম চোখের ইতিমধ্যে অপারেশন করা হয়েছে। ৮টি সেলাই লেগেছে। সে শঙ্কামুক্ত নয় বলেও জানিয়েছেন ডাক্তাররা। ২০ দিন পর্যবেক্ষণের পর তার সেলাই কাটা হবে। তারপর বুঝা যাবে তার চোখের কী অবস্থা। সাগরের ভাই জানান, ছোটবেলা থেকে সাগরের সেনাবাহিনীর অফিসার হওয়ার স্বপ্ন ছিল। সে বাবা মার কাছে প্রায়ই এ স্বপ্নের কথা বলতো। এমনকি হাসপাতালে বেডেও ডাক্তারদের কাছে তার স্বপ্নের কথা বলেছে। চোখের অপারেশন হওয়ার পর সেনাবাহিনীতে চাকরি পাওয়া যাবে কী ডাক্তারদের কাছে বারবার জানতে চাইছিল।
সিএমএইচে চিকিৎসাধীন জয়ন্তী রানী দাস ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রী। তার অবস্থা কিছুটা উন্নতির দিকে। তবে ব্যবসা শিক্ষা বিভাগের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রী প্রিয়াঙ্কা বিশ্বাস। তার অবস্থা সবচেয়ে খারাপ। সে সিএমএইচের এইডিও-তে আছে। তার মাথায় গুরুতর আঘাত পাওয়ার পর রক্ত বের হচ্ছিল। তার মাথায় অপারেশন করা হলেও এখনো আশঙ্কামুক্ত নয়। তার উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে বলে ডাক্তাররা জানিয়েছেন। একাদশ শ্রেণির ব্যবসা শিক্ষা বিভাগের ছাত্র সজিব শেখের বাসা রাজধানীর ভাটারা। বাসের ধাক্কায় ভেঙে গেছে তার বাম হাত। সেও সিএমএইচে চিকিৎসাধীন আছে। তার বাম হাতে অপারেশন হয়েছে। একই বিভাগের ছাত্র রাহাতের বাম হাত ভেঙে গেছে। তার হাতে ব্যান্ডেজ দেয়া হয়েছে। মানবিক বিভাগের ছাত্র ইমন চৌধুরী শরীরের বিভিন্ন অংশে আঘাত পেয়েছিল। প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে রিলিজ দেয়া হয়েছে। একই বিভাগের ছাত্র সোহেল রানাকে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে রিলিজ দেয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীদের চিকিৎসার সার্বিক অবস্থা নিয়ে শহীদ রমিজ উদ্দিন কলেজের অধ্যক্ষ নূর নাহার ইয়াসমিন মানবজমিনকে বলেন, ওই দিনের ঘটনার পর ১০ জন গুরুতর আহত হওয়ার পর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিল। এরমধ্যে ৩ জনকে বাসায় পাঠানো হয়েছে। বাকি ৭ জনের মধ্যে তিনজনের অপারেশন হয়েছে। ডাক্তাররা বলেছে, সবাই এখন আশঙ্কামুক্ত, কিছুদিনের মধ্যে বাকিরা বাসায় ফিরে যেতে পারবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Skip to toolbar