Home / ফিচার / বৈশ্বিক প্রবণতা হাইব্রিড শাসনে ভোট কারচুপি

বৈশ্বিক প্রবণতা হাইব্রিড শাসনে ভোট কারচুপি

অধ্যাপক আলী রীয়াজ একজন বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী। তার বই বেরুনো নতুন ঘটনা নয়। কিন্তু সবে মাত্র বাজারে এসেছে ‘ভোটিং ইন এ হাইব্রিড রেজিম, এক্সপ্লেইনিং দ্য ২০১৮ বাংলাদেশ ইলেকশন।’ শংকর শাসনে ভোট, ২০১৮ সালের নির্বাচন ব্যাখ্যা। বইটি বের করেছে বিখ্যাত প্রকাশনা সংস্থা প্যালগ্রেভ ম্যাকমিলান।

এটির আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো- ম্যাকমিলান বইটিকে পলিটিক্স অব সাউথ এশিয়া সিরিজের আওতায় বের করেছে। বইটির সিরিজ এডিটরদের মধ্যে রয়েছেন সুমিত গাঙ্গুলী, তিনি আছেন বুলুমিংটনের ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়ে। আছেন রনোজয় সেন, তিনি সিঙ্গাপুর ভিত্তিক ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরের ইনস্টিটিউট অফ সাউথ এশিয়ান স্টাডিজের অধ্যাপক। এছাড়া এই প্যানেলে আরও রয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েক ফরেস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নেইল দে ভোত্তা এবং যুক্তরাজ্যভিত্তিক নটিংহ্যাম বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব পলিটিক্স অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল রিলেশন্সের ক্যাথরিন অ্যাডেনি।

আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. আলী রীয়াজ বিশ্বের নির্বাচন ব্যবস্থা ও হাইব্রিড রেজিম নিয়ে যারা গবেষণা করছেন, তাদের জন্য একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন।

কারণ হাইব্রিড রেজিম কথাটি একবিংশ শতাব্দীর শুরু থেকেই জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। হাইব্রিড শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো দোআঁশলা বা শংকর। একটি রাষ্ট্রের শাসন ব্যবস্থাকে উপর থেকে  দেখতে গণতান্ত্রিক মনে হবে। কিন্তু আসলে গণতান্ত্রিক নয়, এটি প্রকৃতপক্ষে কর্তৃত্ববাদী। এ বিষয়ে গত দুই দশকের বেশি সময় ধরে যতো গবেষণা বা লেখালেখি হয়েছে, তার মধ্যে একটা শূন্যতা লক্ষ্য করেন রীয়াজ।

বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত ২০১৮ সালের সাধারণ নির্বাচনকে মূলত একটি নমুনা হিসেবে বেছে নিয়েছেন তিনি। শুধু এটাই দেখানোর জন্য যে হাইব্রিড রেজিম নিয়ে যে ধারণা এতদিন পর্যন্ত রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মধ্যে প্রচলিত রয়েছে, সেখানে জানাশোনার মধ্যে শিক্ষাগত কতগুলো ফাঁক থেকে যাচ্ছিল। সেটাই তিনি শুধু পূরণ করতে চেয়েছেন। অধ্যাপক রীয়াজ এ বিষয়টি তার বইয়ের মুখবন্ধে পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করেছেন।

 রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা এপর্যন্ত হাইব্রিড রেজিম বা শংকর শাসনের উৎপত্তি, কার্যক্রম এবং এটা কতদিন পর্যন্ত একনাগাড়ে টিকে থাকতে পারে, সেই সামর্থ্য কতখানি, সেসব বিষয়ে লেখালেখি করেছেন। পণ্ডিতরা একমত যে, হাইব্রিড রেজিমের যারা অধিকর্তা, তারা নির্বাচনবিমুখ নন। তারা নির্বাচনের বেজায় অনুরাগী। তারা একে ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করতে একটা গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারে প্রাধান্য দিয়ে থাকেন। তবে হাইব্রিড রেজিমের নির্বাচন ব্যবস্থা আবার হাইব্রিড রেজিমের নেতৃবৃন্দের জন্য একটা গুরুতর উভয় সংকট ডেকে আনে। তাকে একটা পেরেশানির মধ্যে ফেলে দেয়।

যেমন নির্বাচন যদি অংশগ্রহণমূলক হয়, তাহলে সেটা তাদের গণতান্ত্রিক গ্রহণযোগ্যতার দাবি করার ভিত শক্ত করে। তারা জোর গলায় বলতে পারেন যে, আমরা  বৈধতা পেয়ে গেছি। কিন্তু তারা একইসঙ্গে সচকিত থাকে যে, নির্বাচন যে অবস্থাটি সমাজে তৈরি করে, সেটা আবার রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা দূর করে না, বরং বিরাট একটা অনিশ্চয়তা তৈরি করে। যা কিনা ক্ষমতায় টিকে থাকার ক্ষেত্রে শাসক দলের সামর্থ্যকে সবসময় একটা হুমকির মধ্যে রাখে ।

আলী রীয়াজ বলেছেন, এই ধরনের একটি প্রেক্ষাপটে হাইব্রিড রেজিমের শাসকরা নির্বাচনের প্রতি বিবিধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে থাকেন। তারা একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনে বিশ্বাসী নয়। আবার নির্বাচন ব্যবস্থাকে তারা নির্মূল করতেও চায় না।  এর পরিবর্তে তারা যেটা করেন, সেটা হলো নির্বাচনটা পেতে  ভোটের অনুষ্ঠানটাকেই  ম্যানুপুলেট করেন।
রীয়াজ লিখেছেন, এই ভোট কারচুপির ফলে সমাজে যে একটা অস্বস্তি ও ক্ষোভ দানা বাঁধে, সেটা প্রশমনেও এই শাসকরা সতর্ক থাকে। এজন্য তারা অন্যান্য কতগুলো বিকল্প পথ খুঁজে বার করে, যাতে জনগোষ্ঠী তাদেরকে উৎখাত করতে উতলা না হয়ে পড়ে।

উল্লেখ্য, এই যে ‘অন্যান্য বিকল্প বের করা’, সেটা হয়তো বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অনেকে ‘মেগা প্রকল্পের’ উদাহরণ দিতে পারেন। তবে ভোট কারচুপি করে মানুষের জন্য সান্ত্বনা পুরস্কার দেয়ার বিষয়টি যে সারা বিশ্বের হাইব্রিড নেতাদের পছন্দনীয় সেটা পণ্ডিত পেট্রভের বরাতে আলী রীয়াজ উল্লেখ করেছেন।  

আলী রীয়াজ এখন কেন বইটি লিখলেন, তিনি তার পাণ্ডিত্যসুলভ উত্তর দিয়েছেন বইয়ের সূচনাতেই। তাই তিনি প্রশ্ন রেখেছেন, ১. হাইব্রিড রেজিমের শাসকরা বাস্তবে ঠিক কীভাবে মেনুপুলেশনটা করে থাকে? ২. ওই অনিশ্চয়তা  দূর করতে গিয়ে তারা কি প্রক্রিয়ায় নির্বাচন করে নিজেদের বিজয়ী ঘোষণা করে থাকে? ৩. এ সময় তাদের সহযোগী হিসেবে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো কি ভূমিকা পালন করে?

আলী রীয়াজ লিখেছেন, এই সব প্রশ্নের উত্তর পেতে এ পর্যন্ত খুব বেশি সমীক্ষা বা গবেষণা হয়নি। গবেষকরা ম্যানেজড ইলেকশনের কর্মপদ্ধতি (মোডাস অপারেন্ডি) বিস্তারিত লিখেননি। গবেষণার জগতের এই শূন্যতা পূরণেই তিনি ২০১৮ সালের ৩০শে ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত বাংলাদেশের সংসদীয় নির্বাচনকে একটি নমুনা হিসেবে বেছে নিয়েছেন।
বইটিকে তাই সেই নিরিখেই দেখতে হবে। এটা ওই বুদ্ধিবৃত্তিক শূন্যতা পূরণের একটা চেষ্টা।   

রীয়াজ লিখেছেন, ‘২০১৮ সালে বাংলাদেশের সাধারণ নির্বাচনটি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের জন্য একটা নজিরবিহীন বিজয় এনে দিয়েছে। ৩০০ আসনের মধ্যে ২৮৮ আসন লাভ করেছে তারা। এই নির্বাচনকে প্রহসন বলেছে নিই ইয়র্ক টাইমসের এডিটরিয়াল বোর্ড। ওয়াশিংটন পোস্ট হুঁশিয়ার করে দিয়েছে যে, ফলাফল যেটা বেরিয়ে এসেছে, সেটা ’গণতন্ত্রের জন্য খারাপ’ এবং সিএনএন’র বিশ্লেষক বলেছেন, দেশটির জন্য ওই নির্বাচন একটি ভয়ঙ্কর নতুন অধ্যায়ের সূচনা ঘটিয়েছে।

রীয়াজ আরো লিখেছেন, বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য একে নেতিবাচক হিসেবে দেখিয়ে একাধিক স্বাধীন গবেষক অভিন্ন ভাবাবেগ ব্যক্ত করেছেন। অথচ বাংলাদেশ ১৯৯০-এর দশকে একটা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ধারায় ফিরে এসেছিল।  আর সেই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার কতগুলো চিহ্ন এখনো পর্যন্ত টিকে আছে। যেমন- বাংলাদেশে বিরোধী রাজনৈতিক দল আছে। নিয়মিতভাবে নির্বাচন হচ্ছে। এখানে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক সংবাদ মাধ্যম আছে। বিতর্কিত হলেও সেখানে পরপর দু’টো সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠান হলো। যা অবশ্য কর্তৃত্ববাদীতার দিকে ঝুঁকছে।
বইটি রীয়াজের ভাষায়, ’রাজনৈতিক উন্নয়ন এবং সেটা কি করে গণতন্ত্র এবং কর্তৃত্বাদীতার সঙ্গে দহরম-মহরম করছে, ২০১৮ সালের মতো একটি নির্বাচনের দিকে ঠেলেছে, এটা তারই একটি সংক্ষিপ্ত বয়ান।

বিগত দুই দশকে বাংলাদেশের যে গণতন্ত্র ছিল সেটা থেকে তার একটা পশ্চাদমুখী যাত্রা ঘটেছে অবশ্য সেটা এমন একটা সময়ে, যখন বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্র ব্যবস্থা পিছু হটছে। রীয়াজ এ পর্যায়ে দুই পণ্ডিত চিজম্যান এবং ক্লাসের বরাতে উল্লেখ করেন যে, ‘আমরা সচেতন রয়ে?ছি যে, এটা হলো একটা প্যারাডক্স। অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় এখন বেশি বেশি নির্বাচন হচ্ছে। আর বিশ্ব হয়ে পড়ছে আগের থেকে অনেক কম গণতান্ত্রিক।

অধ্যাপক আলী রীয়াজ এরপর লিখছেন, বইটি লেখার আমার প্রাথমিক লক্ষ্য হলা, এটা বুঝতে পারা  যে, একটি শংকর শাসনে নির্বাচন কারচুপির মেকানিজমটা কী। শাসক দলের কর্মীরা কী করে বেসামরিক প্রশাসন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে যোগসাজশে (চলবে)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Skip to toolbar