Home / খবর / যা বলছেন আলেমরা

যা বলছেন আলেমরা

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ওয়াজ মাহফিল পর্যবেক্ষণ ও বক্তাদের বিষয়ে নজরদারি করতে নির্দেশনা দিয়েছে । এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন তৈরি করে এর আলোকে ইসলামিক  ফাউন্ডেশন ও বিভাগীয় কমিশনারদের চিঠি দেয়া হয়েছে। চিঠিতে ৬ নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ১৫ জন আলেমকে চিহ্নিত করে তাদের বিষয়ে নজরদারি বাড়নো ও ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের এই নির্দেশনাকে এক ধরণের নিয়ন্ত্রণ আরোপ বলে মনে করছেন আলেমরা। তারা বলছেন, ১৫ জন আলেমের বক্তব্যে নজরদারি কার্যত তাদেরকে ওয়াজ মাহফিলে নিষিদ্ধ করার মতো।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়, চিহ্নিত বক্তারা মাহফিলে সাম্প্রদায়িকতা ও জঙ্গিবাদে উৎসাহ দেয়াসহ রাষ্ট্রবিরোধী বক্তব্য দিচ্ছেন। তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিশেষ করে ইউটিউবে চ্যানেল খুলে তাদের ্বিদ্বেষপূর্ণ ও উগ্রবাদী বক্তব্যের প্রচারণা চালিয়ে আসছেন।

গত মার্চ মাসের তৃতীয় সপ্তাহে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক অধিশাখা-২ থেকে ১৫ জন বক্তার নাম উল্লেখ করে একটি প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। যাতে বলা হয়, এ বক্তারা তাদের বয়ানে সামপ্রদায়িকতা, জঙ্গিবাদে উৎসাহ দেয়া, ধর্মের নামে বিভিন্ন উপদল ও শোবিজ তারকাকে নিয়ে বিষোদ্গার, নারীদের পর্দা করা নিয়ে কটূক্তি, ধর্মবিদ্বেষ, জঙ্গিবাদ, গণতন্ত্রবিরোধী ও দেশীয় সংস্কৃতিবিরোধী বক্তব্য দেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে দেশের ধর্মপ্রাণ মুসলিমরা রেডিক্যালাইজড হয়ে উগ্রবাদের দিকে ধাবিত হচ্ছে।

মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে তালিকাভুক্ত ১৫ জন বক্তা হলেন- আবদুর রাজ্জাক বিন ইউসুফ (সালাফি), মাওলানা মুফতি মাহমুদুল হাসান (মুহতামিম, জামিয়াতুল উলুমিল ইসলামিয়া, মোহাম্মদপুর), আল্লামা মামুনুল হক (যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস), মুফতি ইলিয়াছুর রহমান জিহাদী (প্রিন্সিপাল, বাইতুল রসূল ক্যাডেট মাদ্রাসা ও এতিমখানা, ক্যান্টনমেন্ট), মুফতি ফয়জুল করিম (জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির, ইসলামী আন্দোলন), মুজাফফর বিন বিন মুহসিন, মুফতি সাখাওয়াত হোসাইন (যুগ্ম মহাসচিব, ইসলামী ঐক্যজোট), মতিউর রহমান মাদানী, মাওলানা আমীর হামজা, মাওলানা সিফাত হাসান, দেওয়ানবাগী পীর, মাওলানা আরিফ বিল্লাহ, হাফেজ মাওলানা ফয়সাল আহমদ হেলাল, মোহাম্মদ রাক্বিব ইবনে সিরাজ। এসব বক্তা ছাড়াও যারা আপত্তিকর বক্তব্য দেন তাদের বয়ান নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা গ্রহণের অংশ হিসেবে ছয়টি সুপারিশ করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

সুপারিশগুলো হলো- ওয়াজি হুজুররা যেন বাস্তবধর্মী ও ইসলামের মূল স্পিরিটের সঙ্গে সংহতিপূর্ণ বক্তব্য প্রদান করেন, সেজন্য তাদের প্রশিক্ষণ ও উদ্বুদ্ধকরণের ব্যবস্থা করা। এক্ষেত্রে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে স্থানীয় প্রশাসন ও কমিউনিটি পুলিশের ভূমিকা তাৎপর্যপূর্ণ। যারা ওয়াজের নামে হাস্যকর ও বিতর্কিত বক্তব্য প্রদানের মাধ্যমে ধর্মের ভাবগাম্ভীর্য নষ্ট করার চেষ্টা চালান তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণসহ প্রো-অ্যাকটিভ উদ্বুদ্ধকরণ করা। অনেক আলেমের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই। দাওরায়ে হাদিস ডিগ্রির মতো উচ্চশিক্ষা ব্যতীত যারা ওয়াজ করে তারাই জঙ্গিবাদ ও বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। তাই মাদরাসায় উচ্চশিক্ষিত ওয়াজকারীদের নিবন্ধনের আওতায় নিয়ে আসা। অনেকেই আছেন, যারা হেলিকপ্টারযোগে ওয়াজ মাহফিলে যোগ দেন এবং ঘণ্টাচুক্তিতে বক্তব্য দিয়ে বিশাল অঙ্কের অর্থ গ্রহণ করেন। তারা নিয়মিত ও সঠিকভাবে আয়কর প্রদান করেন কিনা তা নজরদারির জন্য আয়কর বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট সব বিভাগে কর্মতৎপরতা বৃদ্ধি করা। ওয়াজি হুজুরদের বক্তব্য স্থানীয় প্রশাসন কর্তৃক সংরক্ষণ ও পর্যালোচনার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেয়া এবং উস্কানিমূলক ও বিদ্বেষ ছড়ানোর বক্তব্য দিলে তাদের সতর্ক করা। প্রয়োজনে পরবর্তী সময়ে তাদের ওয়াজ করার অনুমতি না দেয়া। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করে ও রাষ্ট্রবিরোধী বক্তব্য প্রদানকারীদের আইনের আওতায় আনা।

এই সুপারিশের আলোকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ (ইফাবা), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও সব বিভাগীয় কমিশনারের কাছে একটি কপি পাঠানো হয়।
তবে এই সিদ্ধান্তকে দ্বীনি আলোচনার উপরে বাধা হিসেবে দেখছেন আলেমরা। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এর আমীর মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করিম মানবজমিনকে বলেন, যারা দ্বীনি আলোচনা করে তাদের বাইন্ডিংয়ের মধ্যে নিয়ে আসার যে পদক্ষেপ সরকার নিয়েছে এটাকে আমি দ্বীনি আলোচনার ওপরে বাধা মনে করি। যে কথাগুলো ইসলাম সমর্থন করে না এমন কোনো বক্তব্য কোনো বক্তা দিলে সে ব্যাপারে সরকার নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারে। এ ব্যাপারে কোনো কথা নেই। তবে এই ব্যবস্থা যদি কর আরোপসহ বিভিন্ন বাইন্ডিংয়ের মাধ্যমে হয় তাহলে এটা ইসলামবিরোধী মনোভাবে বহিঃপ্রকাশ বলে মানুষ মনে করবে।
ইসলামী ঐক্যজোটের সাংগঠনিক সম্পাদক মুফতি সাখাওয়াত হোসেন মানবজিমনকে বলেন, কী কারণে সরকারের মনে হলো যে বক্তারা ওয়াজে গিয়ে দেশ বিরোধী ও উস্কানিমূলক বক্তব্য দেয়, সেই বক্তব্যটা কী, মন্ত্রণালয়ের আপত্তির জায়গা কোনটা- এই বিষয়গুলো পুরোটা পরিষ্কার না। কুরআন সুন্নাহ অনুযায়ী কেউ ওয়াজ করলে তো তাতে কারো আপত্তি থাকার কথা না। সঠিকভাবে আলেমরা কুরআন সুন্নাহর ওপর কথা বলবেন। এটাতে কেউ বঁৎাধা দিতে পারেন না। বাধা দেয়ার অধিকার কারো নেই। ওয়াজ মাহফিলের মাধ্যমে ধর্মের বিষয়গুলো আলোচনা করা হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যে কর্মকর্তা এই আপত্তি করেছেন। যারা এটা করেছেন। তিনি বুঝে করেছেন কি না আমার সন্দেহ। দ্বিতীয়ত কোন পেশার উপরে তো কর হয় না। যে বক্তারা চুক্তি ভিত্তিক ওয়াজ করেন তারা তো আমাদের মধ্যেই সমালোচিত। আর যদি কেউ চুক্তিভিত্তিক ওয়াজ করেন সেই টাকার ওপর তো কর হয় না। বছর শেষে কী পরিমাণ টাকা আমার কাছে থাকবে তার ওপরে কর হবে। এখন কোনো পেশা বা শ্রেণির ওপর যদি কর আরোপ করা হয়, তাহলে তো বৈষম্য হবে।      


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Skip to toolbar