Home / আর্ন্তজাতিক / যুক্তরাষ্ট্র: কাতার সংকট যেভাবে মধ্যপ্রাচ্যে দুর্বল হয়েছে

যুক্তরাষ্ট্র: কাতার সংকট যেভাবে মধ্যপ্রাচ্যে দুর্বল হয়েছে

যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর এই মুহূর্তে সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগ করতে চায়। তবে তেহরানের প্রভাব রুখতে যেই জোট গঠন করেছে উপসাগরীয় আরব দেশগুলো, সেই উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ (জিসিসি) কাতার সংকটের কারণে এখন অনেক বেশি বিভাজিত ও দুর্বল। ইতিমধ্যেই সামরিক মহড়া সীমিত করতে বাধ্য হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও ইতিমধ্যেই মধ্যপ্রাচ্য সফরে গিয়ে কাতারের ওপর আরোপিত অবরোধ প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়ে এসেছেন। বার্তাসংস্থা এপির এক বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে।
এতে বলা হয়, জিসিসি গঠিত হয়েছে ৬টি সদস্যরাষ্ট্রের সমন্বয়ে: বাহরাইন, কুয়েত, ওমান, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। গত বছরের ৫ই জুন একযোগে কাতারের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করে বাহরাইন, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও মিশর।

এ ক্ষেত্রে ইরানের সঙ্গে কাতারের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ও মধ্যপ্রাচ্যের চরমপন্থী গোষ্ঠীসমূহের প্রতি কাতারের সমর্থনকে সম্পর্কচ্ছেদের কারণ হিসেবে তুলে ধরে ওই চার দেশ। শুধু তা-ই নয়, কাতারের ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ ও আকাশসীমা ব্যবহারের ওপর বিধিনিষেধও আরোপ করা হয়। সৌদি আরব বন্ধ করে দেয় কাতারের একমাত্র স্থলসীমান্ত। কাতারের জাহাজের জন্য এই চার প্রতিবেশী দেশের বন্দর ব্যবহারের ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়।

এই ঢামাঢোলের মধ্যে কাতার ইরানের সঙ্গে পূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করে। যুক্তরাষ্ট্র ইরান পারমাণবিক চুক্তি থেকে সরে যাওয়ার পরও, কাতার একটুও নতি স্বীকার করেনি। এ কারণে আঞ্চলিক উত্তেজনার এই সময়ে জিসিসি এখন অথৈ সাগরে।
জিসিসিকে সবসময়ই ইরানের আঞ্চলিক প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখা হতো। মার্কিন সামরিক বাহিনীর জন্যও ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ ভাবা হতো এই জোটকে। বাহরাইনে যেমন মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম বহর অবস্থান করছে। কুয়েতে রয়েছে মার্কিন সেনাবাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ড। মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে রয়েছে আমেরিকান যুদ্ধবিমান, ড্রোহ ও সেনা। দুবাইর জেবেল আলি বন্দর হলো মার্কিন নৌবাহিনীর ব্যস্ততম বৈদেশিক বন্দর। কাতারের প্রকান্ড আল-উদেইদ বিমানঘাঁটিতে রয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড। ওমানে কোনো মার্কিন সেনা নেই। তবে দেশটি নিজের বিমান ঘাঁটি ব্যবহার করতে দেয় মার্কিন বাহিনীকে। ইরানের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে মার্কিন ও পশ্চিমা কূটনীতিকদের মধ্যস্থতাকারী হিসেবেও কাজ করে ওমান। সৌদি আরব আবার ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মার্কিন সামরিক বাহিনীর ওপর নির্ভরশীল।
সৌদি আরব ও প্রতিবেশী সংযুক্ত আরব আমিরাত সাম্প্রতিককালে বেশ কট্টরপন্থী পররাষ্ট্রনীতি হাতে নিয়েছে। যেমনটা তাদের ইয়েমেন হস্তক্ষেপ থেকে প্রতীয়মান হয়। আবুধাবির ক্ষমতাধর ক্রাউন প্রিন্স শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান (৫৭) ও সৌদি আরবের জেদী ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের মধ্যে সম্পর্ক ক্রমেই ঘনিষ্ঠ হয়েছে। বাহরাইন অনেকদিন ধরেই সৌদি অর্থের ওপর নির্ভরশীল। সৌদির অবস্থান যা, তা-ই বাহরাইনের।
কুয়েত শাসন করছেন ৮৮ বছর বয়সী শেখ সাবাহ আল আহমাদ আল সাবাহ। তিনি এই সংকট নিরসন করতে চেয়েছিলেন। ডিসেম্বরে কুয়েত জিসিসি সম্মেলন আয়োজন করে। এই সম্মেলনে বিরোধ মীমাংসার প্রত্যাশা ছিল কুয়েতের। তবে শেষ অবদি সৌদি ও আমিরাতের কারণে তা আর হয়ে উঠেনি।
ওমানের শাসক ৭৭ বছর বয়সী সুলতান কাবুস বিন সাইদ। বৃহত্তর জিসিসি’র চেয়ে নিজস্ব কূটনৈতিক পরিচয় নিয়ে সবসময় সচেষ্ট ছিল ওমান। ওমান আবার কাতারের ওপর অবরোধে সম্মত হয়নি। এমনকি এই সংকটে ওমানের বন্দর ব্যবহার করে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে কাতার।
কুয়েত ও ওমান দুই দেশই কূটনৈতিক এই দ্বন্দ্বের চাপ অনুভব করেছে। দেশ দু’টির বয়োজ্যেষ্ঠ বাদশাহ ও সুলতানের উত্তরাধিকার নির্বাচনের কোনো প্রস্তুতিই নেই। সুলতান কাবুসের কোনো স্পষ্ট উত্তরাধিকারী নেই। অপরদিকে শেখ সাবাহর মৃত্যুর পর কুয়েতের রাজপরিবারের বিভিন্ন শাখার মধ্যে গৃহবিবাদ সৃষ্টি হবে এমন সম্ভাবনাই বেশি।
এছাড়া চলমান সংকটে সৌদি ও আমিরাতি সংবাদ মাধ্যমে কাতারের শাসক শেখ তামিম বিন হামাদের ব্যপক সমালোচনা করা হয়। এমনকি কাতার রাজপরিবারের নির্বাসিত সদস্যদেরকে দেশটির সম্ভাব্য ভবিষ্যত শাসক হিসেবেও পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয় সৌদি ও আমিরাতে। উপসাগরীয় দেশগুলোতে কোনো দেশের রাজপরিবারের প্রকাশ্যে সমালোচনা বেশ বিরল। নব্বইয়ের দশকে সীমান্ত নিয়ে যেই বিরোধ সৃষ্টি হয়েছিল, তখনও এমনটা দেখা যায়নি। সৌদি ও আমিরাতের এই আচরণ ওমান ও কুয়েতের শাসকদের নজর নিশ্চয়ই এড়ায়নি।
সংকট চলাকালে কাতারের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা প্রায়ই দেখা গেছে। সৌদি ও আমিরাতের যেই সৈন্য ও অস্ত্রসস্ত্র রয়েছে, সেই তুলনায় কুয়েত, ওমান ও কাতারের তেমন কিছুই নেই।
আশির দশকে পারশ্য উপসাগরে মার্কিন স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনে বলপ্রয়োগের যেই ঘোষণা দিয়েছিলেন ততকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার, তখন থেকেই উপসাগরীয় দেশগুলো মার্কিন বাহিনী এনে রেখেছে। মার্কিন বাহিনীকে ঘাঁটি বানিয়ে দেওয়াটা ছিল এই দেশগুলোর জন্য অনেকটা রক্ষাকবচের মতো। ৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধে ও পরবর্তীতে ইরাক ও আফগান যুদ্ধে এই ঘাঁটি আমেরিকার জন্য ভীষণ উপকারী ছিল।
কিন্তু এখন যখন উপসাগরীয় দেশগুলো নিজেরাই বিবাদে জড়িয়ে পড়েছে, আমেরিকার বিকল্প কী, তা স্পষ্ট নয়। ওদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পকে নিয়েও ক্রমেই অস্বস্তিতে আছে উপসাগরীয় দেশগুলো। কাতার সংকট শুরুর প্রায় সঙ্গে সঙ্গে ট্রাম্প তাতে সমর্থন দেন। অবশ্য পরে তিনি পুরোনো অবস্থান থেকে সরে আসেন। অপরদিকে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে যেই তদন্ত চলছে আমেরিকায় তাতে নাম এসেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারেরও। অপরদিকে সংকটে জড়িত যেসব দেশ, তাদের প্রত্যেকেই ওয়াশিংটনে লবিস্টের পেছনে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার খরচ করেছে।
এখন পর্যন্ত, এই সংকটের ফলে কাতার ও ইরানের মধ্যে সম্পর্ক ভালো হয়েছে। সংকট শুরুর সঙ্গে সঙ্গে কাতার এয়ারওয়েজের জন্য নিজের আকাশসীমা খুলে দিয়েছে ইরান। এছাড়া দোহায় পাঠিয়েছে খাদ্যসামগ্রী। বিনিময়ে কাতার দেশটির সঙ্গে পূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Skip to toolbar