Home / খবর / রাতের ফ্লাইওভার যখন আতঙ্কের

রাতের ফ্লাইওভার যখন আতঙ্কের

আতঙ্কের নাম ফ্লাইওভারগুলো পরিবহন সেবায় কিছুটা স্বস্তি নিয়ে এলেও রাতের বেলায় নগরের অনেকের কাছে। প্রায়ই রাতে ফ্লাইওভারগুলোতে ছিনতাইয়ের কবলে পড়ছে প্রাইভেট গাড়ি ও মোটর সাইকেল চালকরা। অভিযোগ রয়েছে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যথাযথ নজরদারি না থাকায় এগুলো অরক্ষিত হয়ে আছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, নগরের গুরুত্বপূর্ণ ফ্লাইওভারের ল্যাম্পপোস্টগুলোতে রাতে লাইট জ্বলে না। সিসি ক্যামেরাও নেই। অভিযোগ রয়েছে, খুঁটির গোড়া থেকে চোরেরা বৈদ্যুতিক তার কেটে নিয়ে যাওয়ায় রাতে ফ্লাইওভারগুলো অন্ধকারে ডুবে থাকে। সব মিলিয়ে অপরাধীদের কারণে রাতে ফ্লাইওভার ব্যবহারকারী প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস, মোটর সাইকেল আরোহীরা যখন-তখন বিপদে পড়ছেন। মাদকসেবীদের আস্তানা হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে কোনো কোনো ফ্লাইওভার। বেশির ভাগ ফ্লাইওভারের নিচে ভোরে ও সন্ধ্যায় চলে মাদক সেবন ও বিক্রি। কিন্তু প্রতিরাতে ফ্লাইওভারগুলোতে ঘটা এসব অপরাধের দায় নিচ্ছে না কেউ। ট্রাফিক পুলিশ বলছে, এই দায়িত্ব ক্রাইম বিভাগের। ক্রাইম পুলিশ বলছে, দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের। এভাবেই প্রতি রাতে ফ্লাইওভারগুলোতে প্রশাসনের অবহেলার সুযোগ নিচ্ছে অপরাধীরা।
গত ৩০ আগস্ট নগরের দেওয়ানহাট এলাকায় দায়িত্ব পালন করছিলেন ট্রাফিক সার্জেন্ট আবদুল কুদ্দুস। এ সময় হঠাৎ ওপর থেকে পড়ে একটি চটের বস্তা। কৌতূহলবশত অন্যান্য সদস্যদের সহায়তায় বস্তাটি পুলিশ বক্সে নেয়া হয়। এরপর তারা দেখতে পান বস্তাভর্তি বিপুল পরিমাণ ইয়াবা। এ ঘটনা তদন্ত করতে ওই এলাকার অসংখ্য সিসিটিভির ফুটেজ সংগ্রহ করে পুলিশ। এর মধ্যে সিএমপির নিজস্ব উদ্যোগে স্থাপিত সিসিটিভির ফুটেজও ছিল।
একটি ফুটেজে দেখা যায়, ওই রাতে একটি কাভার্ড ভ্যান ফ্লাইওভার অতিক্রম করছিল। কাভার্ড ভ্যানের কয়েক ফুট দূরে দাঁড়ানো ছিল একটি মাইক্রোবাস। এ সময় কাভার্ড ভ্যানের সামনের সিট থেকে কেউ একজন একটি ব্যাগ ফ্লাইওভারের নিচে ফেলে দেয়। পরে গোয়েন্দা পুলিশের ইউনিফর্ম পরা তিন ব্যক্তি কাভার্ড ভ্যানের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। তারা ফ্লাইওভারের নিচে ইয়াবা ফেলা সেই ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে। এরপর উভয়ে ওই স্থান ত্যাগ করে। ওই ব্যাগ থেকে ৪০ হাজার পিস ইয়াবা জব্দ করে পুলিশ।
এ বিষয়ে ডবলমুরিং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সদীপ কুমার দাশ দৈনিক আজাদীকে বলেন, বিষয়টি এখনো তদন্তনাধীন। তাই মন্তব্য করবো না। সিনিয়র স্যাররা বিষয়টি খতিয়ে দেখছেন। তবে রাতের ফ্লাইওভারে সংঘটিত অপরাধ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অভিযোগ এলেই আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি। ফ্লাইওভার আলোকিত করার দায়িত্ব আমাদের নয়।
এদিকে রাতের বেলায় ফ্লাইওভারগুলোতে অপরাধীদের আনাগোনার পাশাপাশি নানা দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে মানুষ। তাই নিরাপত্তা বৃদ্ধির দাবি করেছেন ভুক্তভোগীরা। পাশাপাশি রাতে অরক্ষিত ফ্লাইওভারে বিপদে পড়লে সহযোগিতার জন্য খোঁজ করেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের পাওয়া যায় না বলে অভিযোগ রয়েছে।
গত এক সপ্তাহ ধরে চলা অনুসন্ধানে এসব ফ্লাইওভারের ওপরে ও প্রবেশমুখে সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত তেমন কোনো নিরাপত্তারক্ষীর ভূমিকা চোখে পড়েনি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নির্জন স্থান হিসেবে ফ্লাইওভারগুলোকেই বেছে নিচ্ছে সন্ত্রাসীরা। বিভিন্ন ফ্লাইওভারের নিচে প্রকাশ্যেই বিক্রি হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের মাদক। আর এসব মাদক ক্রয়ের টাকা জোগাড় করতেই ফ্লাইওভার দিয়ে যাতায়াতকারী পথচারীদের টার্গেট করছে অপরাধীরা। দিনের বেলায় পুলিশ পাহারা থাকলেও রাতে নগরের ফ্লাইওভারগুলো নির্জন হয়ে পড়ে। এ সময় পুলিশি পাহারা দেখা যায় না। তবে এ অভিযোগ মানতে নারাজ কোতোয়ালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহম্মদ মহসীন। তিনি বলেন, কিছু অপরাধ হচ্ছে, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে পুলিশ ভূমিকা রাখছে না, এটা ঠিক নয়। বরং পুলিশি তৎপরতা আছে বলেই এ ধরনের ঘটনা হাতে-গোনা।
সরেজমিনে আরো দেখা গেছে, নগরের বহদ্দারহাট ফ্লাইওভারের বিভাজকে বসানো শ’খানেক লোহার রেলিং উধাও। রাতে পর্যাপ্ত আলোর অভাবে দেওয়ানহাট ও কদমতলী ফ্লাইওভার মাদকসেবী ও ছিনতাইকারীদের আখড়ায় পরিণত হয়েছে।
আখতারুজ্জামান ফ্লাইওভারের ডিভাইডার থেকে লাইট চুরি করছে মাদকাসক্ত পথশিশুরা। এ পর্যন্ত প্রায় অর্ধশতাধিক লাইট চুরি হয়ে গেছে। ফ্লাইওভারের প্রতি দুই পিলারের (মধ্যে) নিচে ছয়টি করে সড়ক বাতি রয়েছে। মুরাদপুর, দুই নম্বর গেট ঘুরে দেখা যায়, দুই-তিনটি পিলারের পর একটি করে লাইট জ্বলছে। আবার কোথাও কোথাও চার-পাঁচটি পিলারের পর মাত্র একটি বা দুটি লাইট জ্বলছে। এতে পুরো সড়ক অন্ধকারে রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অব্যবস্থাপনার কারণে বৈদ্যুতিক তার রেলিংয়ে ছড়িয়ে রয়েছে। এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে যাদের জন্য সরকার ফ্লাইওভার নির্মাণ করেছে, সেই জনগণের ক্ষতি হবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত ফ্লাইওভারগুলো একটি সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনায় নিয়ে আসা। পাশাপাশি নিরাপত্তার বিধান করা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Skip to toolbar