Home / চট্টগ্রাম / রোগীরা একটি সিটি মনিটরের অভাবে উন্নত সেবা পাবে না ?

রোগীরা একটি সিটি মনিটরের অভাবে উন্নত সেবা পাবে না ?

আজ ১৩ নভেম্বর চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের ক্যান্সার ওয়ার্ডে নতুন রেডিওথেরাপি মেশিনটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হচ্ছে । দুপুর ১২টায় সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন মেশিনটির সেবা আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন। হাসপাতালের ক্যান্সার (রেডিওথেরাপি) বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. সাজ্জাদ মোহাম্মদ ইউসুফ আজাদীকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
এর মাধ্যমে দীর্ঘ তিন বছরেরও বেশি সময় পর এই রেডিওথেরাপি সেবা পেতে যাচ্ছে চট্টগ্রাম অঞ্চলের ক্যান্সার রোগীরা। তবে দীর্ঘ সময় পর চালু হলেও একটি সিটি মনিটরের (সিটি সিমুলেটর মনিটর) অভাবে মেশিনটির উন্নত সেবা (থেরাপি) থেকে বঞ্চিত হতে হবে। ক্যান্সার ওয়ার্ড সূত্রে জানা যায়- উন্নত প্রযুক্তির নতুন কোবাল্ট মেশিনটি থেকে তিন রকমের সেবা (রেডিওথেরাপি) পাওয়া যায়। এগুলো হচ্ছে- টু ডাইমেনশনাল এঙটার্নাল বিম রেডিয়েশন থেরাপি (টু ডি ইবিআরটি), থ্রি ডি ইবিআরটি এবং ইনটেনসিটি মডিউলেটেড রেডিয়েশন থেরাপি (আইএমআরটি)। এর মধ্যে থ্রি ডি ইবিআরটি ও আইএমআরটি হচ্ছে আধুনিক পর্যায়ের সেবা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন- উন্নত প্রযুক্তির মেশিনটির মাধ্যমে টু ডি ইবিআরটি সেবা পাওয়া গেলেও থ্রি ডি ইবিআরটি এবং আইএমআরটি সেবা পাবে না এখানকার ক্যান্সার রোগীরা। ক্যান্সার ওয়ার্ডে নতুন রেডিওথেরাপি মেশিনটি পরিচালনায় এখন একটি কন্ট্রোল প্যানেল মনিটর রয়েছে। যা দিয়ে টু ডাইমেনশনাল এঙটার্নাল বিম রেডিয়েশন থেরাপি (টু ডি ইবিআরটি) সেবা দেয়া যাবে। থ্রি ডি ইবিআরটি এবং আইএমআরটি সেবা দিতে হলে একটি সিটি সিমুলেটর মনিটর প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন ক্যান্সার ওয়ার্ডের বিভাগীয় প্রধান ডা. সাজ্জাদ মোহাম্মদ ইউসুফ। যা বর্তমানে ওয়ার্ডে নেই। এই মনিটরটি পেলে উন্নত প্রযুক্তির এই কোবাল্ট মেশিনটি দিয়ে অত্যাধুনিক পর্যায়ের সব রকম সেবা দেয়া সম্ভব হবে জানিয়ে ডা. সাজ্জাদ মোহাম্মদ ইউসুফ বলেন- এক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি ব্যক্তি বা প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে এগিয়ে আসা প্রয়োজন। সেটি হলে এ অঞ্চলের বিশাল সংখ্যক গরিব-অসহায় রোগী সুফল পাবেন, উপকৃত হবেন।
সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা গেছে- উন্নত প্রযুক্তির একটি সিটি সিমুলেটর মনিটরের দাম হতে পারে আনুমানিক ৬ থেকে ৮ কোটি টাকা। যেটি পেলে রেডিওথেরাপি সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে ক্যান্সার ওয়ার্ডের অসম্পূর্ণতা অনেকাংশে দূর হবে। আর রাজধানী ঢাকায় ছুটোছুটির ভোগান্তি থেকে রেহাই পাবেন এ অঞ্চলের বহু ক্যান্সার রোগী। উন্নত প্রযুক্তির এই মনিটরটি চেয়ে হাসপাতাল প্রশাসন বরাবর ইতোমধ্যে কয়েকদফা চিঠি দিয়েছে ক্যান্সার ওয়ার্ড। এর প্রেক্ষিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়েও কয়েক দফা চিঠি দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন চমেক হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. আখতারুল ইসলাম। তিনি বলেন-আমরা বেশ কয়বার লিখেছি। কিন্তু ইতিবাচক সাড়া এখনো পাইনি।
পুরোদমে চালুর পর অত্যাধুনিক মেশিনটির মাধ্যমে এখন দৈনিক ৭০ থেকে একশ রোগী রেডিওথেরাপি সেবা পাবেন বলে জানিয়েছেন ক্যান্সার ওয়ার্ডের আবাসিক সার্জন ডা. আলী আসগর চৌধুরী। ক্যান্সার ওয়ার্ডের তথ্য মতে, একবার এ সেবা নিতে রোগীর খরচ পড়বে ২০০ টাকার কিছু কম-বেশি। কিন্তু প্রাইভেট কোন হাসপাতালে এ ফি দুই হাজার টাকার কম নয়। যদিও চমেক হাসপাতাল ছাড়া সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে চট্টগ্রামের কোথাও আর এ সেবা পাওয়ার সুযোগ নেই। এদিকে, আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের আগে ৭ নভেম্বর থেকে মেশিনটির অনানুষ্ঠানিক সেবা চালু করা হয়। ওইদিন (৭ নভেম্বর) থেকে দৈনিক ৫ জন রোগীকে এ সেবা দেয়া হয়। সে হিসেবে গত ৫ কর্মদিবসে মোট ২৫ জন ক্যান্সার রোগী প্রাথমিক ভাবে রেডিওথেরাপি সেবা পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন বিভাগীয় প্রধান ডা. সাজ্জাদ মোহাম্মদ ইউসুফ।
এদিকে, স্থাপনের কাজ শেষে অক্টোবরের শেষ দিকে সেবা চালুর জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত করা হয় মেশিনটি। কিন্তু মেশিনটির সোর্স থেকে রেডিয়েশন নির্গমন সংক্রান্ত ‘বিপদমুক্ত’ সার্টিফিকেটের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। পরমানু শক্তি কমিশন এ সংক্রান্ত সার্টিফিকেট দিয়ে থাকে। সর্বশেষ গত ৩১ অক্টোবর (বুধবার) মেশিনটির সোর্স পরীক্ষা-নিরীক্ষায় পরমানু শক্তি কমিশনের তিন সদস্যের উচ্চ পর্যায়ের একটি প্রতিনিধি দল চমেক হাসপাতালে আসেন। প্রতিনিধি দলটি বুধ ও বৃহস্পতিবার দুই দিন পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালান। প্রতিনিধি দলটি ঢাকায় ফিরে গত রোববার ৪ নভেম্বর ‘বিপদমুক্ত’ সার্টিফিকেট সরবরাহ করে। পরমাণু শক্তি কমিশন থেকে এ সার্টিফিকেট পাওয়ার পরই মেশিনটির সেবা চালুর এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে হাসপাতাল ও ওয়ার্ড সংশ্লিষ্টরা। ৭ নভেম্বর অনানুষ্ঠানিক সেবা চালুর পর থেকে নিরাময় অযোগ্য (প্যালেটিভ) ক্যান্সার রোগীদের সেবায় অগ্রাধিকার দেয়ার কথা জানিয়েছেন ওয়ার্ড সংশ্লিষ্টরা। এ প্রসঙ্গে বিভাগীয় প্রধান ডা. সাজ্জাদ মোহাম্মদ ইউসুফ বলেন- প্রাথমিক ভাবে আমরা প্যালেটিভ রোগীর সেবায় অগ্রাধিকার দিয়েছি। অর্থাৎ যাদের রোগটা নিরাময়যোগ্য নয়। কিন্তু রেডিওথেরাপির মাধ্যমে তাদের কষ্টটা কিছুটা হলেও কমবে। জীবনযাত্রায় কিছুটা হলেও স্বস্তি আসবে। তবে ১৩ নভেম্বর (আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের পর) থেকে সব ধরণের ক্যান্সার রোগীকে এ রেডিওথেরাপি সেবা পাবেন বলেও নিশ্চিত করেন তিনি।
প্রসঙ্গত, পুরণো মেশিনটি অকেজো হয়ে পড়ায় গত তিন বছর ধরে (২০১৫ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে) এই রেডিওথেরাপি সেবা থেকে বঞ্চিত চট্টগ্রামের বিশাল সংখ্যক ক্যান্সার রোগী। ক্যান্সারের চিকিৎসায় অত্যাবশ্যক হিসেবে এই থেরাপি সেবা পেতে রাজধানী ঢাকায় ছুটোছুটি করতে হয়েছে এ অঞ্চলের রোগীদের। প্রায় সাড়ে দশকোটি টাকা মূল্যের উন্নত প্রযুক্তির নতুন এ মেশিনটির সেবা চালু হওয়ায় এখন থেকে ঢাকায় ছুটোছুটির ভোগান্তি থেকে নিস্তার পাওয়া যাবে। এর আগে গত বছরের নভেম্বরের শেষ দিকে জার্মানি থেকে একটি জাহাজে করে এ মেশিন চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছে। বন্দর থেকে গত ৩০ জানুয়ারি চমেক হাসপাতালের রেডিওথেরাপি (ক্যান্সার) ওয়ার্ডে এটি আনা হয়। এর আগে পুরনো/অকেজো রেডিওথোরপি মেশিনটি কক্ষ থেকে সরানো হয়। নতুন মেশিনটি ওয়ার্ডে আনার পর গত ৫ জুন সেটি স্থাপনের কাজ শুরু হয়। সরবরাহকারী জার্মান প্রতিষ্ঠান বিআইবিআইজি’র বাংলাদেশি এজেন্সি প্রতিষ্ঠান ‘প্রযুক্তি ইন্টারন্যাশনাল’ মেশিনটি স্থাপন করে।
সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা যায়- জার্মান প্রতিষ্ঠান বিআইবিআইজি’র কাছ থেকে একই সাথে চারটি রেডিওথেরাপি মেশিন ক্রয় করে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়। প্রতিটি মেশিনের মূল্য প্রায় সাড়ে দশকোটি টাকা। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর প্রায় একই সময়ে (নভেম্বরের শেষ দিকে) চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছায় নতুন চারটি রেডিওথেরাপি মেশিন। এগুলো দেশের চারটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও সিলেট) জন্য বরাদ্দ দেয়া হয়।
উল্লেখ্য, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের ক্যান্সার (রেডিওথেরাপি) ওয়ার্ডটি চট্টগ্রামসহ গোটা দক্ষিনাঞ্চলের মানুষের ক্যান্সারের চিকিৎসায় একমাত্র ভরসাস্থল। এর আগের কোবাল্ট সিঙটি নামের রেডিওথেরাপি মেশিনটি অকেজো হওয়ার পর থেকে সেবা বন্ধ থাকে প্রায় তিন বছর ধরে। ফলে বাধ্য হয়ে রাজধানীতে ছুটোছুটি করতে হয়েছে অসহায় রোগীদের।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়- ক্যান্সারের চিকিৎসায় ২০০২ সালে কোবাল্ট নামের রেডিওথেরাপি মেশিনটির সেবা চালু হয় রেডিওথেরাপি ওয়ার্ডে। এর কার্যকারিতার মেয়াদ দেয়া হয় দশ বছর। সে হিসেবে ২০১২ সালে মেশিনটির মেয়াদ শেষ হয়। তবে জোড়াতালি দিয়ে হলেও মেশিনটির মাধ্যমে সেবা দিয়ে আসছিলো ক্যান্সার ওয়ার্ড। কিন্তু ২০১৪ সালের শেষ দিকে অচল হওয়ার পর থেকে তা আর সচল করা যায় নি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Skip to toolbar