Home / অন্যান্য / সড়ক দুর্ঘটনা / শীঘ্রই নতুন সড়ক আইন বাস্তবায়ন

শীঘ্রই নতুন সড়ক আইন বাস্তবায়ন

সড়ক শাসনে প্রণীত নতুন আইনের বাস্তবায়ন শুরু হচ্ছে শীঘ্রই প্রায় ৮০ বছরের পুরনো আইন বাতিল করে । গত ১ নভেম্বর থেকে কার্যকর হওয়া আইনটি বাস্তবায়নে প্রথমদিকে ‘গো-স্লো’ নীতি গ্রহণ করা হলেও এবার পুরোদমে মাঠে নামার প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ ও চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ ঢাকার দিকে তাকিয়ে আছে। ঢাকায় আইনটি প্রয়োগ শুরু হলে চট্টগ্রামেও শুরু হবে বলে জানা যায়। এছাড়া নতুন এই আইন কার্যকরের একসপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও দেশের কোথাও এই আইনে কোনো মামলা রেকর্ড হয়নি। মামলার স্লিপ, রেজিস্ট্রার ও সফটওয়ার আপডেট করা হচ্ছে। পুলিশের পক্ষ থেকে আইনটি কার্যকরের আগে পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের সচেতন করার উপরও গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।
পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে, প্রায় ৮০ বছরের পুরনো আইনের উপর ভিত্তি করে প্রণীত সড়ক পরিবহন অধ্যাদেশ বাতিল করে নতুন সড়ক পরিবহন আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। গত ১ নভেম্বর থেকে সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ কার্যকরের ঘোষণা দিয়ে গত ২২ অক্টোবর সরকার প্রজ্ঞাপন জারি করে। নতুন আইন তফসিলভুক্ত করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ। বিধিমালা প্রণয়নের কাজও চলছে। নতুন আইনে বেপরোয়া বা অবহেলায় গাড়ি চালানোর কারণে কেউ গুরুতর আহত বা কারো প্রাণহানি হলে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড বা অনধিক ৫ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। অবশ্য উক্ত ঘটনার ব্যাপারে তদন্তে যদি দেখা যায় যে, উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে চালক বেপরোয়া গাড়ি চালিয়ে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, তাহলে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় হত্যার অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এ ধরনের ঘটনায় সর্বোচ্চ সাজা হবে ফাঁসি। তবে এটা তদন্ত সাপেক্ষে এবং তথ্যের ওপর ভিত্তি করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নির্ধারণ করবে। এটি অজামিনযোগ্য অপরাধ। আগের আইনে এটি ছিল ৩ বছরের কারাদণ্ড এবং জামিনযোগ্য।
নতুন সড়ক আইনে শিক্ষানবিশ লাইসেন্স ছাড়া কর্তৃপক্ষের দেওয়া যে কোনো লাইসেন্সের বিপরীতে ১২ পয়েন্ট দেওয়া থাকবে। চালক লালবাতি ও গতিসীমা অমান্য, ওভারটেকিং, বিপরীত দিক থেকে গাড়ি চালানো, ওজনসীমা লংঘন এবং নেশাগ্রস্ত হয়ে গাড়ি চালালে পয়েন্ট কাটা যাবে। এ বিধান আগে ছিল না।
নতুন আইনে বৈধ চালক ছাড়া নিয়োগ না দেওয়ার বিধান আবারও যুক্ত করে বলা হয়েছে, কারো ড্রাইভিং লাইসেন্স না থাকলে তাকে চালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া যাবে না। বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ অনুসারে, লিখিতভাবে চুক্তি সম্পাদন ও নিয়োগপত্র ছাড়া কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কোনো ব্যক্তিকে গণপরিবহনের চালক নিয়োগ করতে পারবে না। নিয়োগপ্রাপ্ত চালক তাঁর কাগজপত্র গাড়িতে প্রদর্শন করবেন। এ ছাড়া কন্ডাক্টর লাইসেন্স ছাড়া কন্ডাক্টর নিয়োগ করা যাবে না বলে বিধান করা হয়েছে। ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালালে ছয় মাসের কারাদণ্ড বা অনধিক ২৫ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। আগে এ অপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তি ছিল চার মাসের কারাদণ্ড বা ৫০০ টাকা অর্থদণ্ড। কর্তৃপক্ষ ছাড়া কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বা সমিতি ড্রাইভিং লাইসেন্স তৈরি, প্রদান ও নবায়ন করলে শাস্তি অনধিক দুই বছর। তবে অন্যূন ছয় মাসের জেল বা এক থেকে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা বা উভয়দণ্ডের বিধান রয়েছে। নিবন্ধন ছাড়া গাড়ি চালালে অনধিক ছয় মাসের জেল বা অনধিক ৫০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। নতুন আইনে ফিটনেস সনদ ছাড়া বা মেয়াদ পেরোনো ফিটনেস সনদ ব্যবহার করে ইকোনমিক লাইফ অতিক্রান্ত বা ফিটনেসের অনুপযোগী, ঝুঁকিপূর্ণ গাড়ি চালালে ছয় মাসের জেল বা অনধিক ২৫ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড দেওয়া হবে। ৭৯ বছর আগের আইনের ভিত্তিতে প্রণীত মোটরযান অধ্যাদেশে অত্যন্ত সীমিত সাজা ছিল- এমন বিভিন্ন অপরাধে বেশ কঠোর শাস্তির বিধান যুক্ত করা হয়েছে। মাত্র দুইশ’ টাকা জরিমানা করা হতো এমন অপরাধে জরিমানার পরিমান দশ হাজার টাকায় উন্নীত করা হয়েছে।
সূত্র বলেছে, গত বছরের ১৯ সেপ্টেম্বর সড়ক পরিবহন আইনটি জাতীয় সংসদে পাস হয়। কিন্তু এর বিরুদ্ধে পরিবহন শ্রমিকরা আন্দোলনে নামেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আইনটি কার্যকরের উদ্যোগ নেয়া হয়। গত ১ নভেম্বর থেকে আইনটি কার্যকরের উদ্যোগ নিলে সারাদেশে রাস্তাঘাট ফাঁকা হয়ে যায়। যানবাহন চলাচল একেবারে কম যায়। পরবর্তীতে সরকারের পক্ষ থেকে নতুন আইনে কারো বিরুদ্ধে এক সপ্তাহ ব্যবস্থা নেয়া হবে না মর্মে আশ্বস্ত করা হলে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক হয়। সেই এক সপ্তাহ অতিক্রান্ত হতে চলেছে। নতুন আইন কার্যকরের ব্যাপারে আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এই অবস্থায় খুব শীঘ্রই নতুন সড়ক পরিবহন আইন কার্যকরে পুলিশ চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছে। মাঠ পর্যায়ে নতুন এই আইন প্রয়োগের আগে কেস স্লিপ, রেজিস্ট্রার এবং সফটওয়ার আপডেট করছে। মামলা রুজুর ব্যাপারে সব ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করা হচ্ছে। তবে গত ১ নভেম্বর থেকে আইনটি কার্যকর হলেও গতকাল পর্যন্ত দেশের কোথাও ট্রাফিক পুলিশ কোনো মামলা রেকর্ড করেনি। ঢাকায় মামলা রেকর্ড শুরু হলে চট্টগ্রামেও পুলিশ মাঠে নামবে বলে সূত্র উল্লেখ করেছে।
চট্টগ্রাম জেলা এবং মহানগরী পুলিশ ঢাকার দিকে তাকিয়ে থাকার কথা উল্লেখ করে সূত্র জানিয়েছে, চট্টগ্রাম আইন কার্যকরে পুরোপুরি প্রস্তুত। তবে ঢাকা শুরু না করা পর্যন্ত চট্টগ্রাম আইন কার্যকর করবে না। ঢাকা অঞ্চল এবং রাজধানীতে আইনটি বাস্তবায়ন শুরু করা হলে সারাদেশে সিগন্যাল পেয়ে যাবে বলেও সূত্র মন্তব্য করেছে।
আইনটি বাস্তবায়নে জনসচেতনতার উপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি খন্দকার গোলাম ফারুক আজ বৃহস্পতিবার সকালে হালিশহর জেলা পুলিশ লাইনে পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের সাথে বৈঠক করবেন। বৈঠকে নতুন আইনটি বাস্তবায়নের ব্যাপারে বিভিন্ন দিক তুলে ধরবেন। সিএমপিও আইনটি কার্যকরের ব্যাপারে পুরোপুরি প্রস্তুতি নিয়ে অপেক্ষা করছে বলে জানা গেছে।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের শীর্ষ একজন কর্মকর্তা জানান, আইনটি কার্যকর হয়ে গেছে। এটি এখন বাস্তবায়ন করতেই হবে। আর এই বাস্তবায়ন শুরু হওয়াটা সময়ের ব্যাপার মাত্র। তিনি বলেন, প্রায় ৮০ বছর আগের আইন দিয়ে বর্তমানের মোটরযান সেক্টরকে নিয়ন্ত্রণ অসম্ভব। নতুন আইনে কিছুটা কড়াকড়ি রয়েছে। তবে এই কড়াকড়ি সড়কে শৃংখলা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে তিনি মন্তব্য করেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা বলেন, আমরা কারো ওপর আইনটি প্রয়োগ করতে চাই না। কেউ আইন লংঘন না করলেতো কড়া আইন প্রয়োগ হবে না। চালকরা সোজা হয়ে গেলেতো রাস্তাও ঠিক হয়ে যাবে। কোথাও কোনো বিশৃংখলা থাকবে না। আর সবাইতো বিশৃংখলামুক্ত একটি সড়ক ব্যবস্থাপনা চাই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Skip to toolbar