Home / অন্যান্য / কাতারে অবৈধ ভিসা ব্যবসায় সিন্ডিকেট

কাতারে অবৈধ ভিসা ব্যবসায় সিন্ডিকেট

 ভিসা সিন্ডিকেট কাতারে পাঁচ বাংলাদেশির সমন্বয়ে গঠিত হয়েছে। তারাই অবৈধ ভিসা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। এ সিন্ডিকেটের কারণে কাতারে ক্রমবর্ধমান শ্রমবাজার বিনষ্ট হচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিয়ে চার সপ্তাহের মধ্যে জানাতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। গত ১৯শে সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিচালক-৯ নিরুপম দেবনাথ-এর স্বাক্ষরে চিঠিটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পৌঁছেছে। এখন বিষয়টি নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চলছে ফাইল চালাচালি। সূত্রে জানা গেছে, কাতারের দোহায় নিযুক্ত বাংলাদেশ দূতাবাসের কাউন্সিলর (শ্রম) ড. মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম গত আগস্টে ভিসা সিন্ডিকেটের কারণে বাংলাদেশের শ্রম বাজার নষ্ট হওয়ার আশঙ্কার বিষয়টি জানিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব, পররাষ্ট্র সচিব, পুলিশের আইজি ও র‌্যাবের ডিজিকে চিঠি দেন। স্মারক নং: বিই(কিউ)/এলডব্লিউ/২০১৬২৭৮-এর মাধ্যমে কাউন্সিলর (শ্রম) কাতারে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধনশীল শ্রম বাজার বিনষ্টে অবৈধ ভিসা ব্যবসায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ জানায়। এতে তিনি উল্লেখ করেন, কাতার বাংলাদেশের একটি শীর্ষ শ্রমবাজার। কাতারে কর্মী নিয়োগে কাতারস্থ বিভিন্ন কোম্পানি, রিক্রুটিং এজেন্সি ও বাংলাদেশের রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো অবাধ স্বাধীনতা ও সহজ প্রবেশের অধিকার পেয়ে আসছে। সাম্প্রতিককালে বিজনেস ভিসায় অনেক বাংলাদেশি কর্মী কাজের সন্ধানে কাতারে প্রবেশ করেছে। বিজনেস ভিসা মূলত একটি ভিজিট ভিসা। এ ভিসার মেয়াদ এক মাস। অনেক ক্ষেত্রে এ ভিসার মেয়াদ তিন মাস পর্যন্ত বাড়ানো হয়। কাতারের শ্রম আইন অনুযায়ী বিজনেস ভিসাকে কখনো ওয়ার্ক ভিসায় রূপান্তর করা যায় না। অথচ বাংলাদেশ থেকে অনেক কর্মী বিজনেস ভিসায় কাতারে আসছে। বাংলাদেশের কিছু রিক্রুটিং এজেন্সি ও অবৈধ ভিসা ব্যবসায় জড়িত ব্যক্তিরা বিজনেস ভিসাকে ওয়ার্ক ভিসায় রূপান্তর করার মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে তিন থেকে পাঁচ লাখ টাকা আদায় করে কাতার পাঠাচ্ছে। কাতারে এসে তারা বুঝতে পারে এদেশে বিজনেস ভিসায় বৈধভাবে কাজ করার সুযোগ পাবে না। অনেক ক্ষেত্রে তারা স্পন্সর কোম্পানিকে খুঁজে পায় না। দূতাবাসে প্রায় প্রতিদিনই এ ধরনের অভিযোগ আসছে এবং কাতারের প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটি অনেক দিন ধরে অবৈধ ভিসা বাণিজ্য বন্ধ করতে দূতাবাসের কাছে দাবি জানিয়ে আসছে। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে, কাতারে বিজনেস ভিসায় যাওয়া কয়েক জন বাংলাদেশি কর্মীর আবেদনের ভিত্তিতে অভিযুক্তদের দূতাবাসে ডেকে পাঠানো হয়। ওই শুনানিতে সভাপতিত্ব করেন কাতারে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত। শুনানিতে অভিযোগকারী বাংলাদেশি কর্মী মোহাম্মদ রিয়াদ কাউসার (পিতা-মোহাম্মদ আবুল কালাম, চট্টগ্রাম, পাসপোর্ট নং অউ৯৩৩৪৭৩২) এবং নুরুল আবছার (পিতা-আবদুল নবী, চট্টগ্রাম, অঋ২৩৮১৬৪৭) জানান, গত ৬ই জানুয়ারি তারা কাতারে প্রবেশ করে। তাদেরকে দুই বছরের ভিসার কথা বলে এক মাসের বিজনেস ভিসা দিয়ে কাতার পাঠানো হয়। পাঠানোর সময় বলা হয় কাতারে গেলে দুই বছরের ওয়ার্ক ভিসা দেয়া হবে। কাতারে প্রবেশ করে প্রতারণার শিকার হওয়ার বিষয়টি বুঝতে পারেন। মোহাম্মদ রিয়াদ কাউসার শুনানিতে জানান, গার্ডেন ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরসকে তিন লাখ ১৬ হাজার টাকা এবং নূরুল আবছার জানান, তিনিও একই কোম্পানিকে তিন লাখ টাকা পরিশোধ করে কাতারে আসেন। তারা রাষ্ট্রদূতের নেতৃত্বাধীন দূতাবাসের কর্মকর্তাদের জানান, অভিযুক্ত লোকমান হোসেন ও ডা. শাহজাহান (ভারতীয় পাসপোর্টধারী) তাদেরকে কাতার বিমানবন্দর থেকে রিসিভ করে। চার দিন পর ডা. শাহজাহান তাদেরকে আরেক অভিযুক্ত আক্তার হোসেনের অফিসে নিয়ে যান। ডা. শাহজাহান বলেন, এটাই তাদের কোম্পানি। আকতার হোসেন তাদেরকে ভিসা দিয়েছেন। অভিযোগকারী ওই দুজন দূতাবাস কর্মকর্তাদের আরো জানায়, কাতারে তারা খুব অসহায় অবস্থায় আছেন এবং এ বিষয়ে তারা দূতাবাসের আইনি সহায়তা চান। অভিযোগকারীদের কাছ থেকে বিষয়গুলো শুনে অভিযুক্ত আক্তার হোসেন, লোকমান হোসেন এবং ডা. শাহজাহানকে দূতাবাসে ডেকে পাঠানো হয়। নির্ধারিত দিনের জিজ্ঞাসাবাদে আক্তার জানায়, তাদের তিনজনকে আলজারা ইন্টিরিয়রস (অখ তঅজজঅঅ ওঘঞঊজওঙজঝ) কোম্পানি থেকে তিনটি বিজনেস ভিসা দিয়েছে। তবে ভিসাবাবদ তিনি তাদের কাছ থেকে কোনো অর্থ নেননি। এ সময় অভিযোগকারী দুই বাংলাদেশি কর্মী জানান, গার্ডেন ট্র্যাভেলস অ্যান্ড ট্যুরস-এর মালিক বনি আমিন (আমিন) এবং খোকন তাদেরকে জানায় ভিসার জন্য কাতারস্থ আক্তারকে টাকা দিতে হবে। এরপর আলোচনার সময় আক্তার, খোকন এবং আমিনের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে আক্তার জানায়, তিনি খোকনকে চিনেন না। খোকনের সঙ্গে তার কোনো যোগাযোগও নেই। শ্রম (কাউন্সিলর) সিরাজুল ইসলাম চিঠিতে উল্লেখ করেন, বিষয়টি স্পষ্ট করতে দূতাবাস থেকে খোকনকে ফোন করা হয়। এ সময় খোকন জানায়, ৪৭টি ভিসা ইস্যুর জন্য খোকন আক্তারকে ৫৩ লাখ টাকা দিয়েছে। এ বিষয়ে খোকনের কাছে কোনো প্রমাণ আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি জানান, কোনো তারিখে আক্তারকে কত টাকা দেয়া হয়েছে তা রেজিস্ট্রারে লিপিবদ্ধ আছে। এছাড়া কোন্‌ একাউন্টে টাকা জমা দেয়া হয়েছে তাও তিনি জানেন। এসব প্রমাণ দূতাবাসের ই-মেইলে পাঠানোর জন্য খোকনকে অনুরোধ করা হয়। খোকন ঠিক সময়ে দূতাবাসে ই-মেইল করেন। খোকনের পাঠানো ই-মেইল পর্যালোচনায় দূতাবাস দেখতে পায় ২০১৫ সালের ৩১শে আগস্ট থেকে ১৫ই অক্টোবর পর্যন্ত আক্তার মৃধার (কাতারপ্রবাসী বর্তমানে বাংলাদেশে অবস্থান করছেন) ইজঅঈ ইঅঘক অঈ-১১১০২০২১৭০৫৫২০০১ মাধ্যমে ৫৩ লাখ ৬৭ হাজার পাঁচশ টাকা দিয়েছে। এ বিষয়ে আক্তারকে তাৎক্ষণিকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তিনি জানান, খোকন তার সঙ্গে শত্রুতা করে টাকার বিষয়টি নিয়ে এসেছে। তবে খোকনের সঙ্গে তার সম্পর্ক এবং যোগাযোগ আছে বিষয়টি ওই সময় স্বীকার করেন। এরপর আলাদাভাবে বাংলাদেশি কর্মী আবু সাঈদ, মোহাম্মদ জসিম উদ্দীন এবং শহিদুল ইসলাম আলাদাভাবে দূতাবাসের কাছে অভিযোগ করেন। এ অভিযোগে তারা বলেন, খোকন এয়ার ইন্টারন্যাশনাল (হাউজ # ১৭৩, রোড নং-১, ডিওএইচএস বারিধারা, ঢাকা-১২০৬) এর মাধ্যমে বিজনেস ভিসায় কাতারে আসেন। কাতারস্থ বাংলাদেশি প্রবাসী লোকমান (গ্রাম: ফটুইগা, ডাকঘর চাটগাঁও, থানা: লাকসাম, জেলা: কুমিল্লা) এবং ডাঃ শাহজাহান এর ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে কাজ করে ঠিকমত বেতন-ভাতা পাননি। এদের মধ্যে দুই জনই অবৈধ হয়েছে। প্রতিবেদনে শুনানি পর্যালোচনায় কাউন্সিলর (শ্রম) বলেছেন, অভিযোগকারীদের অভিযোগ, সাক্ষীদের বক্তব্য, তথ্য বিবরণী এবং আক্তারের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য থেকে এটা স্পষ্ট আক্তার একজন ভিসা ব্যবসায়ী ও প্রতারক। তিনি ওয়ার্ক ভিসার কথা বলে বিজনেস ভিসায় বাংলাদেশ থেকে নিরীহ, দরিদ্র এবং অসচেতন লোকদের বিপুল অঙ্কের টাকার বিনিময়ে কাতারে নিয়ে আসছে এবং তাদেরকে মানবেতর জীবনযাপনে বাধ্য করছে। এ কারণে কাতারে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান শ্রম বাজার নষ্ট হচ্ছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ থেকে কাতারে টাকা পাচার হচ্ছে। দূতাবাসে অভিযোগকারী মোহাম্মদ রিয়াদ কাউসার, নুরুল আবছার, আবু সাঈদ, জসিম উদ্দীন ও শহিদুল ইসলাম এর আবেদন ও পাসপোর্ট পর্যালোচনা করে দেখা যায়, তাদের পাসপোর্টে রিক্রুটিং এজেন্সির সিল স্বাক্ষর রয়েছে। এদের মধ্যে সংশ্লিষ্ট রিক্রুটিং এজেন্সি, এয়ার ইন্টারন্যাশনালকে টেলিফোন করলে তিনি জানান, তার স্বাক্ষর নকল করা হয়েছে। এই বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না। আবেদনকারীদের ছয়টি পাসপোর্টই পরীক্ষা করে দেখা গেছে বিভিন্ন রিক্রুটিং এজেন্সির সিলমোহর ব্যবহার করা হলেও সবগুলোর ক্ষেত্রে স্বাক্ষর অভিন্ন। দূতাবাসের প্রতিবেদনে বলা হয়, অভিযুক্ত আক্তার হোসেন, লোকমান হোসেন এবং ডা. শাহজাহান অবৈধ ভিসা ব্যবসায় জড়িত। এর মধ্যে আক্তার হোসেন কাতারের বিভিন্ন কোম্পানি থেকে ভিসা বের করে বাংলাদেশের খোকন এয়ার ইন্টারন্যাশনাল (হাউজ-১৭৩, রোড নং- ১, ডিওএইচএস বারিধারা, ঢাকা-১২০৬) এর মালিক খোকন-এর সহায়তায় কর্মীদের কাতারে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মী নিয়োগের প্রলোভন দেখিয়ে বিজনেস ভিসায় কাতারে নিয়ে আসে। এ কারণে দূতাবাসের পক্ষ থেকে আক্তার হোসেন ও মোহাম্মদ লোকমান হোসেনকে কাতারের প্রচলিত আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ওই দেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে অনুরোধ করা হয়। এরপর থেকে কাতারের আইন প্রয়োগকারী সংস্থা তাদেরকে পুলিশ হেফাজতে নিয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গার্ডেন ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরস-এর মালিক বনি আমিন (আমিন) এবং খোকন এয়ার ইন্টারন্যাশনাল  ট্রাভেল এজেন্সির মালিক খোকন-এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এছাড়া কাতারে আটক আক্তার হোসেন ও লোকমানের বাংলাদেশের ব্যাংক একাউন্ট জব্ধ করার প্রক্রিয়া চলছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*