Home / খবর / প্রশিক্ষিত কর্মীর বিকল্প নেই উন্নয়নে

প্রশিক্ষিত কর্মীর বিকল্প নেই উন্নয়নে

দক্ষ জনশক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কোনো দেশের টেকসই উন্নয়নের জন্য । বলা যায়, দেশের উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহার, আর্থিক পরিসেবার প্রাপ্তি ও বৈদেশিক সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও এর কোনোটিই দক্ষ জনশক্তির চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমাদের দেশে বিপুল জনশক্তি রয়েছে, কিন্তু তাদের অনেকে এক বা একাধিক কাজে দক্ষ না হওয়ায় একদিকে যেমন দেশের শিল্পোন্নয়ন ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে জনশক্তি রপ্তানিতেও সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। বলতে চাচ্ছি, দেশে কর্মক্ষম লোকের অভাব না থাকলেও গুরুত্বপূর্ণ খাতে দক্ষ লোকের অভাব রয়েছে। যেমন চিকিৎসা খাতে একজন চিকিৎসক কতজন লোকের সেবা দিচ্ছেন তা হিসাব করলেই সমস্যাটি বোঝা সম্ভব। অথচ দেশে চিকিৎসাবিজ্ঞানে দক্ষতা অর্জন করে চিকিৎসক হতে ইচ্ছুক তরুণ-তরুণীর অভাব নেই।

ডিজিটাল যুগে দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতে যথাযথ উন্নয়ন ঘটাতে গেলেও বিপুলসংখ্যক দক্ষ আইটিকর্মী প্রয়োজন। আমরা গার্মেন্ট শিল্পে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না নেওয়ার কারণেই দেশে এ খাতে আজ অনেক বিদেশি কাজ করছে। কিন্তু প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এ খাতে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে পারলে বিদেশি বিশেষজ্ঞদের ওপর নির্ভরশীলতা কমানো সম্ভব। এমন বাস্তবতায় আগামী পাঁচ বছর দেশের কোন খাতে কত লোক দরকার, তা নির্ধারণ করে সে অনুযায়ী সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। এতে করে চাকরির বাজারও বিস্তৃত হবে। কথাটি যে কারণে বললাম তা হচ্ছে, সব উন্নয়নচিন্তা মানবসম্পদ থেকেই উদ্ভূত। মানবসম্পদের গুণগত মান ও সক্ষমতার ওপরই কোনো দেশ এবং এর প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রকৃত শক্তি-সামর্থ্য নির্ভর করে।

আধুনিক অর্থনীতির উন্নয়নে দক্ষ জনশক্তি যে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে তা অস্বীকারের কোনো উপায় নেই। তাই শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দেশের জনগণকে সম্পদে পরিণত করার মধ্য দিয়ে আমাদের মোট দেশজ উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব। প্রসঙ্গত, আমরা প্রায়ই মালয়েশিয়া, জাপান, সিঙ্গাপুর ও কোরিয়াকে উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে উল্লেখ করে থাকি। কিন্তু একটি কথা ভুলে যাই যে, এসব দেশ বিশেষ করে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা ও সঠিক নেতৃত্বের কারণেই এতটা চমকপ্রদ উন্নয়ন অর্জন করতে পেরেছে। বলতে হয়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে জেগে ওঠার এবং উন্নয়নের লক্ষ্যে এরা দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় কর্মসূচি ও পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে।

বাস্তবতা পর্যালোচনায় বলতে হচ্ছে, আমাদের দেশে শিক্ষিত জনসংখ্যা দ্রুতগতিতে বাড়লেও সে তুলনায় বাড়ছে না দক্ষ জনশক্তি। কারিগরি শিক্ষায় পিছিয়ে থাকার সুযোগেই দেশের বিভিন্ন কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠানে কম করে হলেও ২ লাখ বিদেশি কাজ করছে। যতটা জানা গেছে, শুধু টেক্সটাইলেই কি না বিদেশি কর্মজীবীর সংখ্যা প্রায় ১৯ হাজার। এর কারণ হিসেবে বলা যায়, উন্নত দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিতের হার খুবই কম। শিক্ষার মান নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। ফলে অগ্রসরমান কয়েকটি খাতে কারিগরি দক্ষতাসম্পন্ন বিদেশি শ্রমিকের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাকশিল্প, শিপ বিল্ডিং, মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং, ফুড অ্যান্ড বেভারেজসহ বিভিন্ন খাতের শিল্পোদ্যোক্তাদের অনেকটা বাধ্য হয়েই বিদেশি দক্ষ জনশক্তির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

কিন্তু কেন? এ কথা তো অস্বীকারের উপায় নেই, যেকোনো দেশের মানুষই গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। মানুষের শ্রমে-ঘামে-মেধায়-পরিকল্পনায় খুব সহজেই কোনো দেশ বা জাতির অগ্রগতি নিশ্চিত করা সম্ভব। তাই নানা মহল থেকে বারবার সংশ্লিষ্টদের এই বিষয়ে তাগিদও দেওয়া হচ্ছে। এক্ষেত্রে বলা জরুরি, আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারেও ক্রমেই আমাদের দক্ষ জনশক্তির চাহিদা বাড়ছে। আর দেশের অভ্যন্তরে বেকারের সংখ্যা যখন ক্রমেই বাড়ছে, তখন দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার বিষয়টি আরো গুরুত্ব নিয়ে সামনে আসছে। কারণ একজন দক্ষ-প্রশিক্ষিত মানুষ যথাযথ রাষ্ট্রীয় আনুকূল্য প্রাপ্তি সাপেক্ষে আত্মকর্মসংস্থানের পথ অনেকটা নিজেই খুঁজে নিতে পারেন। প্রসঙ্গত, দেশে এখন উচ্চশিক্ষায় অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২০ লাখের বেশি; সংখ্যাগত বিচারে যা রাশিয়া, চীন, ভারত কিংবা ব্রাজিলের মতো দ্রুত উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় কোনো অংশে কম নয়। কিন্তু কথা হচ্ছে, সে অনুপাতে আমাদের শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় শিক্ষা গ্রহণের পর কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা যাচ্ছে না কেন? এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের অবশ্যই ভাবতে হবে বলে মনে করি।

বাংলাদেশের শ্রমিক বিশ্বস্ত, কর্মঠ, নিষ্ঠাবান, দায়িত্বশীল, প্রতিশ্রুতিশীল হওয়ার কারণেই বিভিন্ন দেশে তাদের চাহিদা দিনদিন বাড়ছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত একাধিক সূত্রে জানা গেছে, ২০০৮ সালের পর ২০১৬ সালেই বাংলাদেশ থেকে সর্বোচ্চসংখ্যক কর্মী বিদেশে গেছে। সরকারি ও বেসরকারিভাবে গত বছর দেশের বাইরে গেছে প্রায় সাড়ে সাত লাখ কর্মী। পুরনো শ্রমবাজার খোলার পাশাপাশি নতুন নতুন বাজারেও লোক পাঠানো শুরু হচ্ছে। পুরুষের পাশাপাশি নারীকর্মী প্রেরণের হারও বাড়ছে। শুধু অদক্ষকর্মীই নয়, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, নার্স থেকে শুরু করে দক্ষ জনশক্তি রপ্তানির হারও বাড়ছে। মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্য এশিয়ার পাশাপাশি ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া, রাশিয়াসহ উন্নত দেশেও কর্মী পাঠানো শুরু হচ্ছে। নতুন কয়েকটি শ্রমবাজারের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে।

সম্প্রতি প্রকাশিত জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ ২০১৭ সালের জুন পর্যন্ত জনশক্তি রপ্তানিতে গত আট বছরের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। চলতি বছরে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে সাত লাখ ৪৯ হাজার ২৪৯ জন শ্রমিক গেছে। ২০১৬ সালে বাংলাদেশ থেকে সবচেয়ে বেশি কর্মী গেছে ওমানে, এক লাখ ৮৭ হাজার ৩৪৮ জন। ওমানের পরই সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার সৌদি আরবে গেছে এক লাখ ৩৯ হাজার ৪৫০ জন। কাতারে গেছে এক লাখ ১৯ হাজার ৬৩৭ জন। এর পরই বাহরাইনে ৭১ হাজার ৭৪০ জন, সিঙ্গাপুরে ৫৪ হাজার ও কুয়েতে গেছে ৩৮ হাজার ৬৮২ জন বাংলাদেশি শ্রমিক। এভাবে ১৬২টি দেশে বাংলাদেশ থেকে কর্মী পাঠানো হচ্ছে। শুধু সৌদি আরবেই বাংলাদেশি শ্রমিক আছে ২৬ লাখের বেশি। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সে সংখ্যা ৫০ লাখের বেশি। গত ৮ বছরে আট লাখ ৭৫ হাজার ৫৫ জন কর্মী বিদেশে গেছে। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য সৌদি আরবের শ্রমবাজার ফের চালু হয়েছে। এরপর সেখানেও কর্মী যাওয়ার হার বেড়েছে। নারীকর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে ২০১৬ সালে। গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত এক লাখ ১৫ হাজারের বেশি নারী শ্রমিক অভিবাসী হয়েছে। এমন বাস্তবতায় বিদেশে বাংলাদেশের শ্রম বাজারের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে প্রয়োজন নতুন নতুন শ্রম বাজার অনুসন্ধান এবং কূটনৈতিক তৎপরতার পাশাপাশি বিদেশে চাহিদা অনুযায়ী খাতভিত্তিক শ্রমিকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। এছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ভাষা শিক্ষা, পরিবেশ সম্পর্কে বিশেষ জ্ঞানার্জনের ব্যবস্থা করে জনশক্তি রপ্তানির উদ্যোগ নিতে হবে। তাতে নিঃসন্দেহে বৈদেশিক রেমিট্যান্স প্রবাহও বাড়বে। এদিকে সমুদ্র বিজয়ের ফলে দেশের সমুদ্র অর্থনীতিতে (ব্লু ইকোনমি) ব্যাপক সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। কিন্তু আমরা সেই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারছি না। মৎস্য আহরণ এবং পর্যটন খাতসহ নানা ক্ষেত্রে দেশের অর্থনীতিকে লাভবান করতে হলে আমাদের এ খাতে বিনিয়োগের পাশাপাশি অবশ্যই দক্ষ জনশক্তি বাড়াতে হবে।

তবে দশ কথার মূল কথা হচ্ছে, দক্ষ জনশক্তি তৈরির লক্ষ্যে কারিগরি শিক্ষার মান বাড়াতে হবে। কেননা, উন্নত বিশ্বের সব শিক্ষার্থীই উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে না। তারা বিশ্ববিদ্যালয়েই পড়তে হবে তেমন করে ভাবে না। সেখানে একটি নির্দিষ্টসংখ্যক শিক্ষার্থী শিক্ষা-গবেষণা ও বিশেষ ক্ষেত্রে কাজ করার লক্ষ্য নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। তাদের দেশের মোট শিক্ষার্থীর একটি বিশাল অংশ নির্দিষ্ট শিক্ষা গ্রহণের পর কারিগরি শিক্ষার দিকে ঝুঁকে পড়ে। ফলে সেসব দেশে দক্ষ জনশক্তির কোনো অভাব হয় না। এমনটি শুধু পশ্চিমা দেশেই নয়, এশিয়ার অন্যতম দুটি ধনী দেশ সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়া তাদের মানসম্পন্ন কারিগরি শিক্ষার মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি তৈরি করে নিজেদের দেশকে উন্নতির শীর্ষে পৌঁছে দিয়েছে। সিঙ্গাপুরে কারিগরি শিক্ষার হার ৬৫ শতাংশ এবং মালয়েশিয়ায় তা ৪০ শতাংশ। যুক্তরাজ্য, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাষ্ট্রে এই হার সর্বনিম্ন ১৭ থেকে সর্বোচ্চ ৫৮ শতাংশ পর্যন্ত। কিন্তু বাংলাদেশে এক্ষেত্রে বাস্তবতা হচ্ছে উল্টো। সরকারের পক্ষ থেকে কারিগরি শিক্ষার হার ১৪ শতাংশ বলা হলেও বাস্তবে তা আরও কম। কিন্তু কেন?

প্রসঙ্গত, স্টিফেন হকিং প্রতিবন্ধী হয়েও বিগব্যাং তথ্য দিয়ে বিশ্বকে অবাক করে দিয়েছেন। কবি জন মিলটন, হেলেন কিলার প্রতিবন্ধী হওয়া সত্ত্বেও নিজ কর্মগুণে বিশ্বজুড়ে খ্যাতি অর্জন করেছেন।

বলা যায়, আমাদের দেশে এখনো যে কোনো বৈধ কাজের প্রতি সম্মানবোধ তৈরি হয়নি বলেই কারিগরি শিক্ষার হার কম। অন্যদিকে কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বল্পতা, শিক্ষকের অভাব ও মানহীন শিক্ষার কারণেও দেশে মানসম্মত কারিগরি জ্ঞানসমৃদ্ধ জনশক্তি তৈরি হচ্ছে না। আর এ সুযোগে ভারত, ভিয়েতনাম, শ্রীলংকার মতো দেশের দক্ষ জনশক্তি বিভিন্ন দেশের শ্রমবাজার নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এখন আমাদের তৈরি পোশাকশিল্পেও কাজ করছে। আমাদের নিজেদের দেশের তৈরি পোশাকশিল্পে যে মানসম্পন্ন কারিগরি জ্ঞানসমৃদ্ধ জনশক্তির প্রয়োজন তার চাহিদাও পূরণ করতে পারছে না দেশের কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো। অজ্ঞাত কারণে সরকারও এ বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারছে না। শুধু মুখেই কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে দক্ষ জনশক্তি তৈরির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে বারবার। ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে এ শিক্ষার মর্যাদা বৃদ্ধিরও। আমরা কেন ভাবছি না যে, কারিগরি শিক্ষার মাধ্যমে দেশের প্রতিবন্ধীদেরও দক্ষ জনশক্তি হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Skip to toolbar