Home / ফিচার / জনপ্রত্যাশা ও বাংলাদেশ পুলিশ

জনপ্রত্যাশা ও বাংলাদেশ পুলিশ

দেশের আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে পুলিশের দায়িত্ব ও কর্তব্য অতি ব্যাপক ও গুরুত্বপূর্ণ। তাই পুলিশের প্রতি মানুষের প্রত্যাশাও অনেক। আর এই প্রত্যাশা পূরণে পুলিশকে জনসাধারণের আশা-আকাঙ্ক্ষার সাথে একাত্ম হয়ে যেতে হয়। কেননা, জনগণের সাথে পুলিশ প্রশাসনের দূরত্ব কমিয়ে আনা এবং কালের বিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালনে অধিকতর সক্রিয় হওয়ার মধ্যেই পুলিশ বাহিনীর সাফল্য বহুলাংশে নিহিত রয়েছে। পুলিশ ও জনসাধারণের মধ্যে যদি একটি ভাবের সেতুবন্ধন গড়ে তোলা যায়, তাহলে উভয়ের জন্যই তা কল্যাণ বয়ে আনতে পারে এবং সারাদেশে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ ও আর্থ-সামাজিক টেকসই উন্নয়নে (Sustainable Development) অগ্রণী ভূমিকা রাখতে পারে। পুলিশ হবে জননিরাপত্তার অতন্দ্রপ্রহরী। জনগণের স্বার্থে সে, যেমন অপরাধ ও অপরাধীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে, তেমনি মানুষের মনে নিরাপত্তাবোধ উন্নত করার জন্য অপরাধ প্রতিরোধে জনগণের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করবে। প্রতিজন পুলিশ সদস্যকে তাই হতে হবে নির্ভীক, নিরপেক্ষ এবং আস্থার প্রতীক।

অবশ্যই তাকে লোভ সামলাতে হবে এবং কারো অনভিপ্রেত অন্যায় নির্দেশ বা ক্ষুদ্র স্বার্থচিন্তা তাকে যেন ক্ষমতার অপব্যবহারে লিপ্ত না করে তা নিশ্চিত করতে হবে। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাই হচ্ছে সব সংস্কারের মূল উদ্দেশ্য। জনগণের বিশ্বাস অর্জন করা হবে পুলিশ প্রশাসনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য। পুলিশ বাহিনীর প্রতিজন সদস্যই নির্দিষ্ট মূল্যবোধের মাধমে পরিচালিত হবে। তাহলেই নাগরিকদের জানমাল রক্ষা ও আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ সম্ভব হবে। অপরাধ দমন, অপরাধ নিবারণ এই উভয় প্রক্রিয়াতেই অপরাধের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালাতে হবে। সাধারণ লোকজনের কাছ থেকে যে রকম সততা আশা করা হয়, পুলিশ বাহিনীর সদস্যদেরকে তার চেয়েও অনেক বেশি সৎ থাকতে হবে। কারণ তাদের কাছে মানুষের সেরকমই প্রত্যাশা।

আমাদের সবসময় মনে রাখতে হবে, ক্ষমতাহীন দায়িত্ব নিরর্থক, আবার দায়িত্বহীন ক্ষমতা ও মারাত্মক। মোটামুটিভাবে সাতটি সামাজিক অপরাধ বিশ্বব্যাপী সহিংসতা উস্কে দেয়। নীতিহীন রাজনীতি, চরিত্রহীন শিক্ষা, শ্রমহীন সম্পদ, নৈতিকতাহীন বাণিজ্য, মানবতাহীন বিজ্ঞান, বিবেকহীন আনন্দ ও ত্যাগহীন অর্চনা। যদি আমরা আন্তরিকভাবে সভ্য আচরণ ও মানবতাবোধের প্রতিষ্ঠা কামনা করি, তাহলে আমাদের দ্বিমাত্রিক মান পরিহার করে সুস্থ মানসিকতায় সুশাসন ও সহনশীলতার একটি আবহ সৃষ্টি করতে হবে। তা না হলে আমাদের অধঃপতন সুনিশ্চিত। আর কলঙ্ক থাকবে চিরকাল। পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের সাধারণভাবে যে কাজগুলো করতে হয় তা হলো আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা, অপরাধ প্রতিরোধ ও দমন এবং সমাজে গণউপদ্রব সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিয়ে সবাই যাতে নিরাপদে ও নির্বিঘ্নে নিজ নিজ কার্যাবলী সম্পাদন করতে পারে তা নিশ্চিত করা।

আতঙ্কের বিষয় হলো, এই কাজগুলো সবসময়ই পারস্পরিক সাংঘর্ষিক হয়ে পড়ে। যেমন রাস্তায় সুষ্ঠু ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ কিংবা ভিভিআইপি, ভিআইপি নিরাপত্তা বিধান করতে গিয়ে পুলিশকে অনেক সময়ই সাধারণ জনগণের অসুবিধা সৃষ্টি করতে হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করতে গিয়ে ও পুলিশকে অনিচ্ছাকৃতভাবে এমন কিছু ব্যবস্থা নিতে হয়। এটা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে কিছুটা হলেও বিঘ্নিত করে। এক্ষেত্রে পুলিশকে ভারসাম্য বজায় রেখে কাজ করতে হবে যাতে করে পুলিশের কাজে সাধারণ মানুষের হয়রানি না হয় কিংবা একবারেই কম হয়। সর্বোপরি, পুলিশ হবে জনগণের প্রকৃত বন্ধু, সেবাধর্মী সংগঠন-এটাই জনপ্রত্যাশা।

সাধারণ জনগণের প্রতি একজন পুলশ সদস্যের আচরণ নিম্নরূপ হওয়া আবশ্যক যা তার দৈনন্দিন কাজে প্রতিফলিত হবে। প্রথমত: পুলিশ সদা সর্বদা মিষ্টভাষী, সদালাপী হবে যেন তার আচরণে কোনো ব্যক্তির মনে আঘাত না লাগে। দ্বিতীয়ত: বিতর্কিত বিষয় সব সময় এড়িয়ে চলতে চেষ্টা করবে। বিশেষ করে ধর্ম, রাজনীতি, নারী সহকর্মী বা আইনের বিষয়ের আলাপের সময় অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। তৃতীয়ত: সাধারণ জনগণের সাথে ব্যবহারের সময় পুলিশকে সর্বদা ধৈর্য্যশীল থাকতে হবে। চতুর্থত: হঠাৎ রাগান্বিত হওয়া পুলিশের জন্য অশোভন এবং চারিত্রিক দুর্বলতার লক্ষণ। কারণ এতে জ্ঞান-বৃদ্ধি ও বিবেচনা শক্তি লোপ পায় এবং কর্তব্য-কর্মে সফলতা আসে না। কাজেই যেকোনো পরিস্থিতিতে ক্রোধ পরিহার করতে হবে। পঞ্চমত: জনগণের সাথে আলাপ-আলোচনা কালে সর্বদা শালীন ভাষা ব্যবহার করতে হবে। ষষ্ঠত: জনগণের সাথে পুলিশ সদস্যরা সর্বদা নম্র, ভদ্র এবং বিনয়ী আচরণ করবে। সপ্তমত: আলাপ-আলোচনাকালে নিজের মতামত অন্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যাবে না এবং অপরের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকতে হবে।

অষ্টমত: কর্তব্য পালন করার সময় অবশ্যই পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন পোশাক পরিধান করে নিজের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা বজায় রাখতে হবে। অনীহা, বিরক্তি, অলসতা সম্পূর্ণভাবে পরিহার করতে হবে যেন জনসাধারণ পুলিশকে আত্মবিশ্বাসী ও কর্তব্যপরায়ণ মনে করে। নবমত: অন্যের ন্যয়সঙ্গত কাজে সহায়তার মনোভাব পোষণ করতে হবে। দশমত: জনসাধারণের শান্তি ও নিরাপত্তা বিধানের পবিত্র দায়িত্ব পালনের আইনগত কর্তব্য ছাড়াও জনসেবার মনোভাব পোষণ করতে হবে এবং প্রয়োজনবোধে দুর্বল, দুস্থ ও বিপদাপন্ন লোকের সাহায্যে এগিয়ে আসতে হবে। একদশত: জননিরাপত্তা বিধানে জনগণের ভূমিকা সব দেশে স্বীকৃত। তাই এ ক্ষেত্রে জনপ্রত্যাশাকে জনশক্তিতে রূপান্তরিত করতে হবে। কারণ, দেশের ১৬ কোটি মানুষের ৩২ কোটি চোখ সজাগ থাকলে অনেক অপরাধই দ্রুত শনাক্ত এমনকি আগে ভাগেই রোধ করা সম্ভব হতে পারে। দ্বাদশত: সর্বোপরি, স্ব স্ব ধর্মের প্রতি একনিষ্ঠ এবং অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে নিজের ওপর অর্পিত আইনসিদ্ধ (Lawful) দায়িত্ব পালনে সর্বদা সচেষ্ট থাকতে হবে। অপরাধ চাক্ষুস দেখেও নৈর্ব্যত্তিক পর্যবেক্ষকের মতো নীরবতায়-উদাসীনতায় থাকা কিংবা ৯টা-৫টা চুপিসারে ছকবাঁধা চাকরি করার মাঝে কোনো যৌক্তিকতা নেই। আইনি ক্ষমতাকে দায়িত্বে রূপান্তরিত করে সেবার মানসিকতা সৃষ্টি।

লেখক: সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার, ৩১তম বিসিএস ( পুলিশ)।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*