Home / অন্যান্য / কৃষি / হাসি ফুটবেই কৃষকের মুখে

হাসি ফুটবেই কৃষকের মুখে

আট ক্লাস পড়ালেখা শেষে এখন একজন পুরোদস্তুর কৃষক, মোসলেম শেখ,ফরিদপুর শহর থেকে মাত্র পাঁচ কিলোমিটার দূরে বসতিস্থল। প্রচলিত ধারার সব কৃষি কাজই তিনি করেন। তবে বেশ কিছু ক্ষেত্রে তার কৃষি কাজে রয়েছে ভিন্ন মাত্রা। তিনি যেমন ধান, পাট, পেঁয়াজ রসুনের আবাদ করেন আবার পাশপাশি বিলুপ্ত প্রায় শষ্যাদির চাষাবাদও করেন। চাষাবাদ করেন নানা রকম মৌসুমী ফসলেরও।

প্রচলিত ধারার কৃষি কাজের পাশাপাশি ভিন্ন মাত্রার চাষাবাদের ফলে তার সংসারে আয়ও বেশ। নিজের তিনটি দুধেল গাভী, উন্নত জাতের ছাগলও পালন করে লাভবান হচ্ছেন তিনি। এছাড়া রাজহাঁস, চীনা হাঁস, দেশি প্রজাতির হাঁস, দেশি মুরগি পালনও তার সংসারের চাহিদা মিটিয়ে বাড়তি আয়ের সুযোগ করে দিয়েছে।

এ উপার্জনের জন্য তাকে অবশ্য একটু বাড়তি পরিশ্রমও করতে হয়। ফজর নামাজের আগেই ঘুম থেকে উঠে হাঁস মুরগি গরু ছাগলের ঘর পরিষ্কার করে খাবার দিতে হয়। তারপর চলে যান শষ্য ক্ষেতে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শাক-সব্জি ও মৌসুমী ফসলের চাহিদা বাজারে একটু বেশিই। বাজারে এসবের দামও বেশি।

হাসি-খুশি মোসলেম শেখের এই চাষাবাদে হঠাৎ করেই ছন্দপতন হয়। বিশেষ করে গত ধানের সিজনে উৎপাদন খুব ভালো হয়নি। মৌসুমী ফসল টমেটোরও মোড়ক লেগেছে। একই অবস্থা অন্যান্য ফসলেরও। কিন্তু কারণ খুঁজে পাচ্ছেন না তিনি।

নিয়মিত সবধরণের ঔষুধ দেয়া হচ্ছে। পরিচর্যারও কোনো অভাব নেই। মাজরা পোকায় ধান নষ্ট করেছিল, কিন্তু ঔষুধ দিয়ে কোনো লাভ হয়নি। টমেটো চাষে পচন ধরেছে, ঔষুধ দিয়ে কাজ হচ্ছে না। আলু ক্ষেতে যেয়ে দেখলেন আলুর দাদ (গায়ে অমসৃন দাগ) রোগ হয়েছে, ঔষুধ দিয়েও কাজ হয়নি। সরিষার দানাও পুষ্ট হচ্ছে না। পালং শাক, ধনে পাতার ক্ষেতেও একই অবস্থা। পাতাগুলো বিবর্ণ, পাতার আকার বিকৃত, কোন গাছটি বড় আবার কোনটি ছোট। বেগুন ক্ষেতের অবস্থাও যেন একবারে বিমর্ষ। পোকাগুলো ঢুকে পড়েছে বেগুনের ভেতর।  এসব দেখে আর চিন্তায় বেশ কিছুদিন মনোকষ্টে ভুগছিলেন। স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তার সাথেও কথা বলেন। তিনি সব দেখে বললেন সার কীটনাশক, ঔষুধ সবই তো ঠিকই আছে। ঔষুধের বোতল, প্যাকেট দেখে মেয়াদও দেখলেন ঠিক আছে।

ফসলের দূরাবস্থা হলেও হাল ছাড়লেন না কৃষক মোসলেম শেখ। সংসারের কাজ কর্মও অব্যাহত রাখলেন আগের মতই। এই মাঝে পারিবারিক প্রয়োজনেই কৃষক মোসলেম শেখ একদিন কানাইপুর এলাকায় এক আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে গেলেন। দুপুরে আত্মীয়ের বাড়িতে সুগন্ধি পোলায়ের চালের পোলাও আর দেশি মুরগির মাংস খেলেন। পেটের দিকে তাকিয়ে দেখলেন পেটটা তরমুজের মত বড় বড় দেখাচ্ছে। কৃষক মানুষ, শহুরেদের মত ভাল-মন্দ খেয়ে সেভেন আপ বা কোকাকোলা খাবার অভ্যাস নাই। তবে যেদিন বেশি পরিমাণে খাবার খান সেদিন খাবার শেষে একটু পান চিবান। কখনো কখনো ফাঁকা জায়গা পেলে দু-একটান বিড়ি খান। কিন্তু আজ বাধ সাধল আত্মীয়ের বাড়ি। ও বাড়িতে পান নেই, আর বিড়ি যেহেতু নিয়মিত খান না, সেই প্রসঙ্গ বাদ।

একটু বেশি পরিমাণে খেয়ে শরীরটাও ম্যাজম্যাজ করছিল, তাই আত্মীয়ের বাড়ির বাইরে এলেন একটু সামনে এগিয়ে দেখলেন দোকান। চা-পান আর সিগারেটসহ মুদি পসরা সাজানো। চা খেতে মন চাইল না, তাই একটা পান নিলেন, পান চিবুতে চিবুতে সামনে তাকিয়ে দেখলেন একটা সাইনবোর্ডে লেখা বিসিক শিল্প নগরী। এরই মধ্যে দোকানি বলল, ভাই ভাংতি টাকা নাই, আর কিছু নেন, মোসলেম শেখ একটা বিড়ি চাইলেন। কিন্তু দোকানে বিড়ি নাই। বললেন সিগারেট আছে। একটা সিগারেট নিলেন। কিন্তু আত্মীয়ের এলাকা, নিয়মিত সিগারেট খান না, কেউ দেখলে কি বলবেন। তাই সিগারেটায় আগুন দিয়ে সামনের দিকে গেলেন, দেখলেন সামনে বিসিক শিল্পনগরীর আরো একটা গেট। সেখানে দু চারজন কামলা টাইপের লোক। একজনকে সিগারেট টানতে দেখলেন, ভাবলেন এখানেই ঢুকে পড়ি সিগারেটা নির্ভয়ে টানা যাবে, আবার বিসিকটাও ঘুরে দেখা যাবে।

যেই চিন্তা সেই কাজ, ঢুকে পড়লেন বিসিকের ভেতরে। আনমনে হাঁটছেন হঠাৎ চোখ ফড়ল একটি সাইন বোর্ডে কেবিএস ব্রান্ড লিমিটেড। কেমন যেন মনে হলো নামটা পরিচিত। চিন্তা করতে লাগলেন কোথায় দেখেছি এই নামটা, কোথায় দেখেছি। মনে পড়ল ফষলের ক্ষেতেযে সার আর ঔষুধ প্রয়োগ করেন, সেই কোম্পানীর নামও এই কেবি। কিন্তু যতদূর মনে পড়ে সেই সেখানে ঠিকানা লেখা ঢাকা। আর এটাতো  ফরিদপুরের কানাইপুর। ভাবলেন ভেতরে কি আছে দেখবেন। সিগারেটটা ফেলে দিলেন, দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকলেন, কিন্তু লোক সমাগম নেই। অনেক বড় গোডাউন। একে তো অপরিচিত, তার উপর লোকজন নেই, কেউ কি চোর মনে করবে, এই চিন্তায় মনটা একটু ভড়কে গেল।  এরই মধ্যে দেখলেন ভেতরের একবোরে কর্নারের দিকে একচন লোক বসে অনেকগুলো বোতল নিয়ে বসে কি যেন করছেন। এগিয়ে গেলেন। তাকে সালাম দিয়ে তার সাথে গল্প করতে শুরু করলেন।

মোসলেম শেখ দেখলেন, লোকটি পুরাতন বোতলের লেবেল উঠিয়ে সেখানে নতুন লেবেল লাগাচ্ছেন।  প্রথমে বুঝতে পারলেন না, কী কারণে পুরাতন লেবেল উঠিয়ে আবার নতুন লেবেল লাগচ্ছেন? কিছু না বলে একটি লেবেল হাতে নিলেন। হতে নিয়ে চমকে উঠলেন। এতে সেই কীটনাশক যা তিনি তার ফসলের ক্ষেতে ব্যবহার করেন। নিজে নিজে কিছু বোঝার চেষ্টা করলেন। এবার বোতলের গায়ের লেবেলটি পড়তে থাকলেন, কীটনাশকের নাম জি-ফেন, উৎপাদনের তারিখ ১৭ আগস্ট ২০১৪ ই্ং, মেয়াদ উত্তীর্ণের তারিখঃ ১৬ আগস্ট ২০১৬ ইং। এবার আস্তে করে পুরাতন বোতলটি নামিয়ে নতুন লেবেল লাগানো একটি বোতল উঠালেন, দেখলেন কীটনাশকের নাম, পরিমাণ উপাদান সবই ঠিক, শুধু উৎপাদনের তারিখ আর মেয়াদ উত্তীর্ণের তারিখ নতুন করে বসানো। বুঝতে বাকি রইলো কৃষক মোসলেম শেখের। তিনি বুঝলেন মেয়াদ উত্তীর্ণ পুরাতন কীটনাশকের শুধু লেবেল পরিবর্তন করে নতুন লেবেল লাগানো হচ্চে। অথচ বোতলের ভেতরে সেই মেয়াদ উত্তীর্ণই রয়ে গেছে। এছাড়া কোম্পানির ঠিকানাও ভুয়া। কিছু না বলে মোসলেম শেখ আরও কিছুক্ষণ গল্প করে, উঠে আসলেন। এই দুই নম্বরি ঔষুধ ব্যবহারে কারণেই তার ফসলের বাজে অবস্থা হয়েছে, এটা তিনি নিশ্চিত হলেন।

বিসিক  থেকে বের হয়ে আত্মীয়ের বাড়ি, সেখান থেকে নিজের বাড়ি। বাড়ি এসে দেখলেন ছোট ছেলে মোবাইল নিয়ে বসে আছে। মাথাটা গরম হয়ে গেল। এই ছোট ছেলেকে নিয়ে মোসলেম শেখ আছেন মহা মছিবতে; পড়ালেখার বাইরে যেটুকু সময় পায় খালি মোবাইল নিয়ে কি যেন করে। আবার ভাবলেন তবুও ভাল, বড়টাতো পড়ালেখা না করে এখন বিদেশের মাটিতে যেয়ে কাজ করছে। মোবাইলটা ওই পাঠিয়েছিল।

মাথা ঠান্ডা করে ছেলেকে কাছে ডাকলেন। এ ঘটনাটি ছেলেকে বললেন। কী করা যায় ভাবলেন। ছেলে বলে বসল এখনই ব্যবস্থা নেয়া যায়। বাপের জিজ্ঞাসা কেমনে, ছেলে বলল, ফেসবুকে ডিসি স্যারকে জানিয়ে দেই। সে ব্যবস্থা নেবে। কাজ হবে, বাপের জিজ্ঞাসা। ছেলে বলল দেখি কী হয়।

ফরিদপুর জেলা প্রশাসন পরিচালিত জেলা প্রশাসন, ফরিদপুর পেজ এবং এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট, ফরিদপুর পেজে  ঘটনাটি মেসেজ আকারে পাঠিয়ে দিল ছেলে রাসেল।

এরপরের ঘটনাটি অন্যরকম;

আসুন দেখি এর পরে কী ঘটেছিল…

ফরিদপুর জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কার্যালয়ের এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ পারভেজ মল্লিক ঘটনাটি নিয়ে নড়েচড়ে বসলেন। ভ্রাম্যমাণ আদালতের টিম কাজ শুরু করলো। গোপনে তথ্যানুসন্ধানে নেমে পড়ল। গোপন তথ্যানুসন্ধানে ঘটনার সত্যতা পাওয়া গেল। এবার অভিযানের পালা।

২০১৭ সালের ১২ জানুয়ারি, সকাল তখন ১১টা। পৌষের শেষের দিকে, সামনে মাঘের শীতের ঘনঘঠা উকি দিতে শুরু করেছে। এর  মধ্যে দিয়ে সূর্য যতদূর সম্ভব তার তেজ প্রকাশ করে যাচ্ছে।

প্রস্তুত হচ্ছে ফরিদপুর জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কার্যালয়েল ভ্রাম্যমাণ আদালত। পুলিশের একটি দল এবং র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটেলিয়ন (র‌্যাব)-০৮ এর একটি দল প্রস্তুত। তিনটি গাড়ি যোগে ভ্রাম্যমাণ আদালতের চৌকস দলটি রওনা হল। গন্তব্য ফরিদপুর জেলার কাইপুরের বিসিকি শিল্প নগরীর প্রতারক কেবিএস ব্রান্ড লিমিটেড।

সো সো করে ছুটে চলেছে গাড়ি। পুলিশ, র‌্যাব শৃঙ্খলার জন্য রয়েছেনই। আছেন ম্যাজিস্ট্রেট তাদের পুরো টিম নিয়ে।

ভ্রাম্যমাণ আদালতের টিমটি কেবিএস ব্রান্ড লিমিটেড, বিসিক শিল্প নগরী, কানাইপুর, ফরিদপুরে পৌঁছে গেল বেলা সাড়ে ১১টা নাগাদ। রিসিভ রুমে ম্যানেজার মো. আবু মুঈদ চৌধুরী বসে বিভিন্ন কীটনাশকের ভুয়া উৎপাদন  তারিখ ও মেয়াদ উত্তীর্ণের সিল দিচ্ছেন। গোডাউনের ভেতরে দেখা গেল কর্মচারী মো. আজাদ মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে যাওয়া কীটনাশকের বোতলের লেবেল উঠিয়ে ভুয়া উৎপাদনের লেবেল লাগাচ্ছেন। গ্রেপ্তার করা হলো দুজনকেই। তারা অপরাধ স্বীকার করে ক্ষমা চাইলেন। পাঁচ হাজার ৬৩৮ টি ভুয়া কীটনাশক [জি-ফেন, জি-সার্ফ], কেবিএস ঝলক বোরন সার, ফিক্সাল কেবিএস ব্রান্ড, এগ্রিবেন উদ্ধারপূর্বক তা জব্দ করা হলো।

হাতেনাতে প্রমানসহ গ্রেপ্তারকৃতদের এক লাখ ২৫ হাজার টাকা জরিমানা, করা হলো।

রায় ঘোষণার পরে উদ্ধারকৃত মালামাল জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কার্যালয়ে এনে বিজ্ঞ এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট এর  নির্দেশে তাদের সম্মুখে পৌরসভার বুল ডোজার দিয়ে বিনষ্ট করে, মাটিতে পুতে দেয়া হলো।

পরে মোবাইল কোর্টেও খবর জেনে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কার্যালয়ে এসেছিলেন কৃষক মোসলেম শেখ। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।

এই অভিযানটি গল্পের মতো মনে হলেও অতি বাস্তব। অভিযানে ব্যবহৃত মোসলেম শেখ ও রাসেল মূলত ছদ্মনাম। নিরাপত্তার জন্য তাদের এ ছদ্মনাম ব্যবহার করা হয়েছে। মেয়াদ উত্তীর্ণ এই ঔষুধের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার ফলে এখন আর এ অঞ্চলের কৃষকরা প্রতারিত হবে না। তাদের ক্ষেতের ফসল আবার বেড়ে উঠবে, হয়ে উঠবে তরতাজা, ফুটে উঠবেই কৃষকের মুখে হাসি।

লেখক: নেজারত ডেপুটি কালেক্টর, জেলা প্রশাসন ফরিদপুর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*