Home / অন্যান্য / অপরাধ / ঐশীর ফাঁসি হলো না যে কারণে

ঐশীর ফাঁসি হলো না যে কারণে

পুলিশ দম্পতি মাহফুজুর রহমান হত্যা মামলায় মেয়ে ঐশী রহমানের মৃত্যুদণ্ড বাতিল করে হাইকোর্টের দেয়া যাবজ্জীবন দণ্ডাদেশের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়েছে। রবিবার (২২ অক্টোবর) ৭৮ পৃষ্ঠার এই পূর্ণাঙ্গ রায় সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। পূর্ণাঙ্গ রায়ে আদালত বলেছেন, ঐশীর বিরুদ্ধে উপস্থাপিত সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতে তার ফাঁসিই উপযুক্ত।

তারপরেও কী কারণে বাবা-মায়ের হত্যাকারী ঐশীর মৃত্যুদণ্ড বাতিল করে যাবজ্জীবন দেয়া হয়েছে পূর্ণাঙ্গ রায়ে সে বিষয়টি উঠে এসেছে। পূর্ণাঙ্গ রায়ের ৭৫ পৃষ্ঠায় বলা হয়,‘আসামি ঐশীর বিরুদ্ধে উপস্থাপিত সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতে তার ফাঁসিই উপযুক্ত। কিন্তু বিশেষ কিছু বিষয়ে বিবেচনা করে তাকে যাবজ্জীবন সাজা প্রদান করা হয়।’

আদালত বলেছেন, ৫ টি বিষয় বিবেচনা করে ঐশীর সাজা কমানো হয়েছে। আর এগুলো হলো-১.আসামি এ খুনের ঘটনা ঘটিয়েছে সুস্পষ্ট উদ্দেশ্য ছাড়া এবং মানসিকভাবে বিচ্যুতির কারণেই। ২.ওই সময় সে অ্যাজমাসহ নানা রোগে আক্রান্ত ছিল। ৩.বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী পারিবারিকভাবে তার দাদি ও মামা অনেক আগ থেকেই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিল। অর্থাৎ মানসিক বিপর্যয়ের ইতিহাস তার পরিবারে পূর্ব থেকেই ছিল। ৪.ঘটনার সময় তার বয়স ছিল ১৯ বছর এবং সে এ ঘটনার সময় সাবালকত্ব পাওয়ার মুহূর্তে ছিল। তার বিরুদ্ধে অতীতে ফৌজদারি অপরাধের নজির নেই। ৫.ঘটনার দু’দিন পরই স্বেচ্ছায় থানায় আত্মসমর্পণ করে। উদ্ভুত পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে সাজা কমানো হয়।

বাবা-মাকে হত্যার দায়ে ২০১৫ সালের ১২ নভেম্বর ঐশীর মৃত্যুদণ্ডের রায় দেন ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল। পরে এই রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করে ঐশী। ঐশীর আপিল এবং ডেথ-রেফারেন্স শুনানি শেষে চলতি বছরের ৫ জুন রায় ঘোষণা করে হাইকোর্ট। হাইকোর্টের ওই রায়ে ঐশীর মৃত্যুদণ্ড বাতিল করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়।

পূর্ণাঙ্গ রায়ে আদালত বলেন, ‘ঐশীর পিতা পুলিশ বাহিনীতে ও মা ডেসটিনিতে চাকরিরত ছিলেন। জীবন-জীবিকা নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। ঐশীকে পর্যাপ্ত সময় দিতে পারেননি। তারা যখন উপলব্ধি করছিল ঠিক সে সময় তার জীবন আসক্তিতে ও উচ্ছন্নে চলে গেছে।’

হাইকোর্টের রায়ে বলা হয়, ‘আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, কানাডাসহ বিভিন্ন দেশে মৃত্যুদণ্ডকে নিরুৎসাহীত করা হয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে মৃত্যুদণ্ড কমানোর কোনও গাইডলাইন নেই। এমনকি তা বিলুপ্ত করার পরিবেশ আসেনি। শিক্ষার হার বেড়েছে। জনসংখ্যাও বেড়েছে। ফলে অপরাধের প্রবণতাও বাড়ছে। এ অবস্থায় মৃত্যুদণ্ড রহিত করা যুক্তিসংগত নয়।’

আদালত বলেন, ‘মৃত্যুদণ্ডই একমাত্র দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নয়। এটা কার্যকর করলেই যে সমাজ থেকে অপরাধ দূর হয়ে যাবে তা নয়। কম সাজাও অনেক সময় সমাজ থেকে অপরাধ কমাতে সুস্পষ্টভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বা সাহায্য করে। মৃত্যুদণ্ড রহিত করতে সমাজের প্রতিটি স্তরে সুশাসন ও মানুষের মধ্যে অপরাধ প্রবণতা রোধে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। শুধু রাষ্ট্রের মধ্যে নয় সমাজের প্রতিটি স্তরে সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে।’

রায়ে বলা হয়, ‘তবে সন্তানদের জন্য বাবা-মা ও অভিভাবকই হলেন প্রাথমিক শিক্ষক। এ হিসেবে তাদের জন্য ভালো পরিবেশ ও সময় দেয়া প্রয়োজন ছিল।’

আপিল শুনানিকালে গত ১০ এপ্রিল বিচারকের খাসকামরায় এ মামলায় ঐশীর বক্তব্য শোনেন ২ বিচারপতি। কারাগার থেকে ঐশীকে হাইকোর্টে হাজির করার পর তার বক্তব্য শোনা হয়। আদালতে ঐশীর পক্ষে আইনজীবী ছিলেন অ্যাডভোকটে আফজাল এইচ খান ও সুজিত চাটার্জী। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল জহিরুল হক জহির ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল আতিকুল ইসলাম সেলিম।

রাজধানীর চামেলীবাগে নিজেদের বাসা থেকে ২০১৩ সালের ১৬ আগস্ট অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান ও তার স্ত্রীর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পরদিন ১৭ আগস্ট নিহত মাহফুজুর রহমানের ভাই মশিউর রহমান বাদী হয়ে পল্টন থানায় হত্যা মামলা করেন। ওই দিনই নিহত দম্পতির মেয়ে ঐশী রহমান পল্টন থানায় আত্মসমর্পণ করে তার বাবা-মাকে নিজেই খুন করার কথা স্বীকার করেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*