Home / খবর / বিদায় নক্ষত্রের

বিদায় নক্ষত্রের

মেয়র আনিসুল হক হাসপাতাল থেকে না ফেরার দেশে পাড়ি দিলেন । রাজনীতির বাইরেও যার পরিচয় ছিল নানামাত্রিক। চলনে-বলনে নিখুঁত পরিপাটি  আনিসুল হক ছিলেন একজন প্রকৃত আধুনিক মানুষ। সর্বদা হাস্যোজ্জ্বল মুখের এ স্বপ্নবাজ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই দেখিয়েছেন সাফল্য। টেলিভিশনে চৌকষ উপস্থাপনার মাধ্যমে দারুণ জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন। সফল উদ্যোক্তা তার সুনাম ছিলো সর্বজনবিদিত।

দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন ব্যবসায়ী সংগঠন পরিচালনায়। জনপ্রতিনিধি হিসেবেও অর্পিত দায়িত্ব পালনে দক্ষতার চিহ্ন রেখে অল্প দিনে ঠাঁই করে নিয়েছেন নগরবাসীর মনে। নানামুখী কর্মকাণ্ডে নিজেকে যুক্ত রেখে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নাগরিক সমাজের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠা একজন কর্মনিষ্ঠ, বিনয়ী মানুষ হিসাবে সর্বমহলে সমাদৃত ছিলেন তিনি। সজ্জন মানুষ হিসাবে মেয়র আনিসুল হকের অকাল মৃত্যু অত্যন্ত বেদনাদায়ক। না-ফেরার দেশে চলে গেলেও সামাজিক-অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা দেশবাসীর কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র আনিসুল হক আর নেই (ইন্নালিল্লাহি… রাজিউন)। বাংলাদেশ সময় বৃহস্পতিবার রাত ১০টা ২৩ মিনিটে লন্ডনের ওয়েলিংটন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। চিকিৎসকেরা তাঁর কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাসযন্ত্র (ভেনটিলেশন যন্ত্র) খুলে নিয়ে তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৫ বছর। তিনি স্ত্রী, দুই মেয়ে ও এক ছেলে রেখে গেছেন। মেয়রের পারিবারিক বন্ধু ও নাগরিক টেলিভিশনের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা ডা. আবদুর নূর তুষার তার এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে জানান, আনিসুল হক লন্ডনের স্থানীয় সময় ৪টা ২৩ মিনিটে এবং বাংলাদেশের স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার রাত ১০টা ২৩ মিনিটে পরলোক গমন করেছেন। মৃত্যুর সময় তার পাশে স্ত্রী, পুত্র ও কন্যারা উপস্থিত ছিলেন। আজ বাদ জুমা লন্ডনের রিজেন্ট পার্ক মসজিদে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। আগামীকাল শনিবার বেলা ১১টা ৪০মিনিটে আনিসুল হকের মরদেহ ঢাকায় আনা হবে। সকাল ১১টা ৪০মিনিটে বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইটে তার মরদেহ হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। বিমানবন্দর থেকে মরদেহ নেওয়া হবে তার বাসায়। ওই দিন বাদ আসর আর্মি স্টেডিয়ামে নামাজে জানাজা শেষে তার মরদেহ রাজধানীর বনানী কবরস্থানে দাফন করা হবে। গত রাতে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এ তথ্য জানায়। মেয়রের পরিবারের পক্ষ থেকে ডা. আবদুর নূর তুষার ঢাকাসহ সারা দেশে তার সকল শুভান্যুধায়ী, গুণগ্রাহী যারা তাঁর জন্য দোয়া করেছেন, সকল গণমাধ্যমকর্মী ও তার স্ব^জনদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। এদিকে আনিসুল হকের মৃত্যুর খবরে তার স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও গুণগ্রাহীদের মাঝে নেমে আসে শোকের ছায়া। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র ও ব্যবসায়ী নেতা আনিসুল হকের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, সড়ক পরিবহনমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রমুখ ।
উল্লেখ্য, নাতির জন্ম উপলক্ষে গত ২৯শে জুলাই ব্যক্তিগত সফরে মেয়র আনিসুল হক সপরিবার যুক্তরাজ্যে যান। সেখানে অসুস্থ হয়ে পড়লে ১৩ই আগস্ট তাকে লন্ডনের ন্যাশনাল নিউরোসায়েন্স হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকরা তাঁর শরীরে মস্কিষ্কের প্রদাহজনিত রোগ ‘সেরিব্রাল ভাস্কুলাইটিস’ শনাক্ত করেন। তারপর দীর্ঘদিন ধরে সেখানে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি। ধীরে ধীরে অবস্থার উন্নতি ঘটলে তাঁর কৃত্রিম শ্বাসযন্ত্র খুলে তাকে গত ৩১শে অক্টোবর আইসিইউ থেকে রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টারে স্থানান্তর করা হয়। কিন্তু কয়েকদিন আগে রক্তে সংক্রমণ ধরা পড়ায় তাঁকে ফের আইসিইউতে নেওয়া হয়। ওইদিনই তার মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। মেয়রের অসুস্থতা নিয়ে নানা গুঞ্জনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন সম্প্রতি এক বিবৃতিতে জানিয়েছিল, কোনো কোনো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও অনলাইন নিউজ পোর্টাল মেয়র আনিসুল হক ও তার শারীরিক অবস্থা নিয়ে নেতিবাচক প্রচারণা করে চলেছে, যা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও বিভ্রান্তিকর। অবশেষে বাংলাদেশ সময় বৃহস্পতিবার রাতে চিকিৎসকরা মেয়রকে আনুষ্ঠানিকভাবে মৃত ঘোষণা করেন। তাঁর চিকিৎসক সূত্র জানায়, এ রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত মেডিসিনের প্রভাবে আনিসুল হকের শরীরের স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ কারণেই তিনি ইনফেকশনে আক্রান্ত হয়েছিলেন।
১৯৫২ সালের ২৭ অক্টোবর নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তবে তাঁর শৈশবের একটি বড় সময় কাটে ফেনীর সোনাগাজীর আমিরাবাদ ইউনিয়নের সোনাপুর গ্রামে নানার বাড়িতে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক সম্পন্ন করেন তিনি। ব্যবসায় উদ্যোক্তা ও কবিতার জন্য সার্ক সাহিত্য পুরস্কার বিজয়ী রুবানা হক তার স্ত্রী। বর্তমান সেনাপ্রধান জেনারেল আবু বেলাল মোহাম্মদ শফিউল হক মেয়র আনিসুল হকের ছোট ভাই। আনিসুল হকের অন্য ভাইদের মধ্যে ইকবাল হক যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী চিকিৎসক, অন্যজন হেলাল হক যুক্তরাষ্ট্র নৌবাহিনীর ক্যাপ্টেন। আনিসুল হকের ছেলে নাভিদুল হক বোস্টনের বেন্টলি ইউনিভার্সিটি থেকে ব্যবস্থাপনায় উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন শেষে বর্তমানে মোহাম্মদী গ্রুপের পরিচালক ও দেশ এনার্জি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসাবে কর্মরত আছেন। দুই মেয়ের একজন ওয়ামিক উমাইরা স্নাতক শেষ করে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থায় কাজ করছেন। অন্যজন তানিশা ফারিয়ামান যুক্তরাষ্ট্রের বস্টনের সিমন্স কলেজ থেকে স্নাতক করেছেন।
আশির দশকে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের বিকাশ পর্বে এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন তিনি। কারখানায় চাকরি নিয়ে এক সময় নিজেই শুরু করেন ব্যবসা। সফলভাবে প্রতিষ্ঠিত করেন মোহাম্মদী গ্রুপ। মোহাম্মদী গ্রুপের চেয়ারম্যান আনিসুল হক তৈরি পোশাক শিল্পের পাশাপাশি ব্যবসার বিস্তৃতি ঘটিয়েছিলেন বিদ্যুৎ, তথ্যপ্রযুক্তি, আবাসন, কৃষিভিত্তিক শিল্পখাতে। ডিজিযাদু ব্রডব্যান্ড লিমিটেড ও নাগরিক টেলিভিশনের মালিকানাও আছে তার ব্যবসায়িক গ্রুপের। শিখরস্পর্শী ব্যবসায়ী হিসেবে সুনাম অর্জন করেন তিনি। আশি ও নব্বইয়ের দশকে টিভি উপস্থাপক হিসেবে আনিসুল হক ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছিলেন। তার উপস্থাপনায় ‘আনন্দমেলা’, ‘অন্তরালে’ ও ‘জলসা’ অনুষ্ঠান পেয়েছিল ব্যাপক জনপ্রিয়তা। ১৯৯১ সালের নির্বাচনের আগে বিটিভিতে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার মুখোমুখি একটি অনুষ্ঠান ‘সবিনয়ে জানতে চাই’ উপস্থাপন করেছিলেন তিনি। মোহাম্মদী গ্রুপ ও দেশ এনার্জি লিমিটেডের কর্নধার আনিসুল হক ২০০৫-০৬ সালে বিজিএমইএর সভাপতির দায়িত্ব পালনের পর ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি হন। ২০১০ থেকে ২০১২ সাল মেয়াদে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন সার্ক চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির। অনেকটা চমক হিসেবে ২০১৫ সালে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র প্রার্থী হন ব্যবসায়ীদের দুই শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই, বিজিএমইএ ও বিআইপিপির সাবেক এ সভাপতি, ব্যবসায়ী ও একসময়কার টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব আনিসুল হক। নির্বাচনী আরেক তরুণ ব্যবসায়ী তাবিথ আউয়ালকে হারিয়ে মেয়র নির্বাচিত হন তিনি।
দুই বছর দায়িত্ব পালনকালে বেশ কিছু আলোচিত ঘটনার জন্ম দেন তিনি। আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে ঢাকা উত্তরের মেয়র পদে মনোনয়নপত্র জমা দিয়ে আনিসুল হক বলেছিলেন, ‘দলীয় প্রার্থী নন, প্রধানমন্ত্রীর সমর্থনই তার শক্তি।’ স্ত্রী রুবানা হককে পাশে নিয়ে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণাকালে ‘স্মার্ট’ ঢাকা গড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনি। মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর অভিনেতা-অভিনেত্রীদের নিয়ে ঝাড়– হাতে পরিচ্ছন্নতা অভিযানে নামেন আনিসুল হক। দায়িত্ব নেয়ার চার মাসের মাথায় মিট দ্য প্রেসে দখলদারদের ‘মাস্তানির’ জবাব দিয়ে আনিসুল হক বলেছিলেন, ‘আমি ব্যবসায়ী মানুষ, তবে মাস্তানি করতেই এখানে এসেছি।’ উত্তরায় বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি শুরু করে ‘সবুজ ঢাকা’ গড়তে তিন থেকে চার বছর সময় চান তিনি। মেয়র হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার দুই বছর পূর্তি অনুষ্ঠানে নগরবাসীর সহায়তা চেয়ে বলেছিলেন, ‘পাশে থাকেন, ভিন্ন ঢাকা পাবেন। তবে মেয়র হিসাবে নগরীর সৌন্দর্য বর্ধন এবং গণপরিবহন ব্যবস্থায় শৃংখলা আনার ক্ষেত্রে ব্যাপক উদ্যেগ নেন আনিসুল হক। রাজধানীর তেজগাঁওয়ের সাত রাস্তার মোড় থেকে ট্রাক স্ট্যান্ড উচ্ছেদ করে ডিভাইডারসহ রাস্তা সংস্কার, গাবতলীতে ট্রাক স্ট্যান্ড সরিয়ে রাস্তা সংস্কার, হলি আর্টিজানের হামলার ঘটনার পর কূূটনৈতিক অঞ্চল হিসেবে গুলশান-বারিধারার নিরাপত্তা জোরদার, গুলশান-বনানী এলাকা থেকে পুরনো বাস সরিয়ে ‘ঢাকা চাকা’ নামের নতুন এসি বাস সার্ভিস চালু, অভিজাত এলাকা গুলশান-বনানীতে বেপরোয়া রিকশা নিয়ন্ত্রণ, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনভুক্ত বিভিন্ন এলাকায় প্রচুর উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ, ‘সবুজ ঢাকা’ নামের বিশেষ সবুজায়ন কর্মসূচি গ্রহণ করে নাগরিকমহলে বিশেষ প্রশংসিত হন। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন সমস্যায় দিনে-রাতে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়েও নাগরিকবাসীর আস্থাভাজন হন তিনি। বিমানবন্দর সড়কে যানজট কমাতে মহাখালী থেকে গাজীপুর পর্যন্ত সড়কে ইউলুপ করার উদ্যোগ নেন আনিসুল হক। এরইমধ্যে মহাখালী থেকে উত্তরা পর্যন্ত ১১টি ইউটার্ন নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। এছাড়া ঢাকার খালগুলো উদ্ধারে সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছিলেন আনিসুল হক। তার নির্দেশে বনানীর ২৭ নম্বরে যুদ্ধাপরাধী মোনায়েম খানের বাড়ি ‘বাগ এ মোনয়েম’র অবৈধ দখলে থাকা অংশ উদ্ধার করে সড়ক প্রশস্ত করা হয়েছে। মেয়র হিসেবে নগরবাসীর কাছে আরও কিছু প্রতিশ্রুতি ছিল আনিসুল হকের, সেগুলো বাস্তবায়নের আগেই জীবনাবসান ঘটল তার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*