Home / ঢাকা / ঢাকায় শান্তির দূত

ঢাকায় শান্তির দূত

পোপ ফ্রান্সিস রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশের পাশে দাঁড়াতে বিশ্ববাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তিনদিনের সফরে ঢাকায় পা রেখেই শান্তির দূত পোপ এ আহ্বান জানান। যদিও ঢাকায় দেয়া প্রথম বক্তৃতায় ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি উচ্চারণ করেননি ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের এ ধর্মগুরু। সফরের শুরুতে সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে স্বাধীনতা যুদ্ধের বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান পোপ। পরে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা জানান। বঙ্গবন্ধু স্মৃতি যাদুঘরও ঘুরে দেখেন তিনি।

 সন্ধ্যায় বঙ্গভবনে প্রেসিডেন্টের সাক্ষাৎ ও সেখানে সমবেত সুধীজনের উদ্দেশে বক্তব্য রাখেন পোপ ফ্রান্সিস। দ্বিতীয়দিনের সফরসূচিতে আজ সোহ্‌রাওয়ার্দী উদ্যানে ৮০ হাজার ক্যাথলিক ভক্তের সামনে আসবেন পোপ। সেখানে অনুষ্ঠিত হবে প্রার্থনা সভা। বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী বাহন রিকশায়ও চড়বেন তিনি। বঙ্গভবনে দেয়া বক্তৃতায় পোপ কথা বলেন, রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়েও। স্পেনিশ ভাষায় তার দেয়া বক্তব্যের ইংরেজি অনুলিপি অনুষ্ঠানে সরবরাহ করা হয়। রোহিঙ্গা সঙ্কটের প্রতি ইঙ্গিত করে পোপ ফ্রান্সিস তার বক্তব্যে বলেন, গত কয়েক মাসে রাখাইন থেকে আসা বিপুলসংখ্যক শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে এবং তাদের মৌলিক প্রয়োজন পূরণ করার মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশের সমাজ উদার মন এবং অসাধারণ ঐক্যের পরিচয় দিয়েছে। এটা ছোট কোনো বিষয় নয়, বরং পুরো বিশ্বের সামনেই এটি ঘটেছে। পুরো পরিস্থিতি, মানুষের অবর্ণনীয় কষ্ট এবং শরণার্থী শিবিরগুলোতে থাকা আমাদের ভাই-বোন, যাদের  বেশির ভাগই নারী ও শিশু, তাদের ঝুঁকির গুরুত্ব বুঝতে আমরা  কেউই ব্যর্থ হইনি। এই সঙ্কট সমাধানে আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়ের এগিয়ে আসাটা অপরিহার্য বলে মন্তব্য করেন  পোপ। বলেন, কঠিন এই সঙ্কট সমাধানে আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়ের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত। তবে শুধু রাজনৈতিক বিষয় সমাধানই নয়, বাংলাদেশে দ্রুত মানবিক সহায়তাও দিতে হবে। সফরে পোপ ফ্রান্সিসের রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শনের কর্মসূচি না থাকলেও ঢাকায় রোহিঙ্গাদের ১৫ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে তার আলোচনার কথা রয়েছে বলে বাংলাদেশের খ্রিস্টান নেতারা জানিয়েছেন। ভাষণের শুরুতেই পোপ সফরের আমন্ত্রণ জানানোয় প্রেসিডেন্টকে ধন্যবাদ জানান। এ সময় তিনি তার দুই পূর্বসূরি পোপ ষষ্ঠ পল, পোপ দ্বিতীয় জন পলের বাংলাদেশ সফরের কথাও স্মরণ করেন। বাংলাদেশকে ‘ইয়াং স্টেট’ রাষ্ট্র উল্লেখ করে পোপ ফ্রান্সিস বলেন, পোপদের হৃদয়ে এই দেশের জন্য সবসময়ই বিশেষ স্থান রয়েছে। বাংলাদেশে আসার পথে এই দেশকে ‘সোনার বাংলা’ হিসেবে তার কাছে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়েছিল উল্লেখ করেন তিনি। এদেশে জালের মতো ছড়িয়ে থাকা ছোট-বড় নদী আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সম্পর্কেও জেনেছেন তিনি। পোপ বলেন, আমি মনে করি, এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যই আপনাদের বিশেষ পরিচয়ের ধারক। বাংলাদেশ এমন একটি দেশ, যেখানে বিভিন্ন ভাষাভাষী ও সংস্কৃতির জাতি-গোষ্ঠীর মধ্যে ঐক্য রয়েছে। বর্তমান বিশ্বে কোনো দেশ, জাতি কিংবা রাষ্ট্র একা এগিয়ে যেতে পারে না উল্লেখ করে পোপ বলেন, মানবজাতির সদস্য হিসেবে আমাদের একে অন্যকে প্রয়োজন এবং পরস্পরের ওপর নির্ভর করতে হয়। বাংলাদেশের জাতির জনকের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট শেখ মুজিবুর রহমান বিষয়টি বুঝতে পেরেছিলেন এবং এই আদর্শ সংবিধানে যুক্ত করার কথা বলেছিলেন। তিনি একটি আধুনিক, বহুত্ববাদী এবং অংশগ্রহণমূলক একটি সমাজের স্বপ্ন দেখেছিলেন, যেখানে প্রতিটি মানুষ এবং জাতি মুক্ত, শান্তি ও নিরাপত্তার মধ্যে বসবাস করতে পারবে, যেখানে পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ এবং সমান অধিকার থাকবে। বক্তৃতায় শুক্রবার রমনার সমাবেশের কথাও উল্লেখ করেন পোপ। বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে যদিও আমার সফরের উদ্দেশ্য হচ্ছে বাংলাদেশের ক্যাথলিক সমপ্রদায়ের উদ্দেশে বক্তব্য দেয়া, তারপরও আগামীকাল রমনায় বিভিন্ন ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎও গুরুত্বপূর্ণ। আমরা সেখানে সবাই একসঙ্গে শান্তির জন্য প্রার্থনা করব এবং শান্তির জন্য কাজ করতে আমাদের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করব। সফরের দিন শুক্রবার সকালে সোহ্‌রাওয়ার্দী উদ্যানে প্রার্থনা সভায় অংশ নেবেন পোপ ফ্রান্সিস। বাংলাদেশে বিভিন্ন ধর্মের মানুষের সহাবস্থানের প্রশংসা করেন পোপ। তবে বিভক্তি তৈরি করতে কখনও কখনও ধর্মকে ব্যবহার করা হয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। এ সময় তিনি গত বছর গুলশানে জঙ্গি হামলার কথা স্মরণ করেন। বাংলাদেশে ক্যাথলিকরা সংখ্যায় কম হলেও স্কুল, ক্লিনিক এবং স্বাস্থ্যসেবা দেয়ার মধ্যে দিয়ে এই দেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ রেখে চলেছে বলে মন্তব্য করে ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত থাকবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
এদিকে পোপের সম্মানে বঙ্গভবনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে রাখাইন থেকে বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের উপর চলা বর্মী বাহিনীর বর্বরতার করুণ কাহিনীগুলোর খণ্ডচিত্র তুলে ধরেন প্রেসিডেন্ট আবদুল হামিদ। বলেন, হাজার হাজার নারী-পুরুষ-শিশুকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। ধর্ষিত হয়েছেন হাজারো নারী। অনেকের চোখের সামনে তাদের বাড়িঘর, সহায়-সম্বল পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত ওই রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের ১০ লাখ লোক সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। মানবিক কারণে বাংলাদেশ তাদের আশ্রয় দিয়েছে। কিন্তু সবাই জানেন বাংলাদেশ জনবহুল একটি দেশ। এ দেশের পক্ষে মিয়ানমারের বিশাল এ জনগোষ্ঠীকে দীর্ঘদিন বহন করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশ চাইছে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন। একই সঙ্গে রাখাইনে তাদের ফেরত যাওয়ার পর রাজনৈতিক, সামাজিক ও নাগরিক অধিকার এমনভাবে নিশ্চিত করতে হবে যাতে তারা সেখানে শান্তিপূর্ণ বসবাস করতে পারে। প্রেসিডেন্ট এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহায়তা প্রত্যাশা করেন।
রোহিঙ্গাদের কথা ভুলে যাননি পোপ: ভ্যাটিকান: এদিকে পোপের মিয়ানমার সফরে রোহিঙ্গা শব্দ উচ্চারণ না করা এবং সে দেশের সেনাপ্রধানের সঙ্গে পোপের আকস্মিক বৈঠকের একটি ব্যাখ্যা দিয়েছে ভ্যাটিকান সিটি। তাদের দাবি, পোপ রোহিঙ্গাদের দুর্দশার কথা ভুলে গেছেন; এমনটা মনে করা ঠিক হবে না। প্রকাশ্যে রোহিঙ্গাদের কথা না বললেও পোপ একান্ত বৈঠকে এ নিয়ে কথা বলে থাকতে পারেন বলেও ইঙ্গিত দিয়েছে তারা। বুধবার ইয়াঙ্গুনে এক সংবাদ সম্মেলনে পোপের অবস্থানের ব্যাখ্যা হাজির করে ভ্যাটিকান। রোমান ক্যাথলিক প্রার্থনালয়ের সদর দপ্তর হিসেবে পরিচিত ভ্যাটিক্যান সিটির মুখপত্র ক্রাক্স নাউ.কম প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে এসব কথা জানা গেছে। অবশ্য মিয়ানমারের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার, সংখ্যালঘু ক্যাথলিকদের সুরক্ষা আর রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়ন জোরদারের আশঙ্কা থেকেই পোপ ফ্রান্সিস পৃথিবীর সবচেয়ে বিপন্ন ওই জনগোষ্ঠীর নাম উচ্চারণে সমর্থ হননি। এমনটাই বলছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি’র এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সংখ্যালঘু ক্যাথলিকদের সুরক্ষায় ভ্যাটিকান সিটি এবং মিয়ানমারের মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পকোর্ন্নয়নের স্বার্থেই পোপ মিয়ানমার সফরের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। চ্যানেল নিউজ এশিয়ার এক বিশ্লেষণেও পোপের সফরকে পূর্ণাঙ্গ কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হয়েছে। তবে রোহিঙ্গাদের নাম না নেয়াকে মিয়ানমারের শক্তিশালী সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে এক সতর্ক কূটনৈতিক পদক্ষেপ আখ্যা দিয়েছে এশিয়াভিত্তিক ওই সংবাদমাধ্যম। একইভাবে কানাডাভিত্তিক টরেন্টো স্টার প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে দাবি করা হয়েছে, মিয়ানমারের সামরিক নেতৃত্বের বিরুদ্ধে যেতে পারেননি বলেই শব্দটি ব্যবহার করেননি পোপ।
বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি দেখলেন পোপ: রাজধানীর ধানমন্ডিতে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শন করেছেন পোপ ফ্রান্সিস। বিকাল ৫টার দিকে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শনে যান তিনি। এরপর ঘুরে ঘুরে জাদুঘরের বিভিন্ন প্রদর্শনী দেখেন এবং সেখানে রাখা পরিদর্শন বইয়ে সই করেন। এ সময় বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ রেহানা, তার ছেলে রাদওয়ান সিদ্দিক ববি, আইনমন্ত্রী আসিনুল হক, ভ্যাটিকান দূতাবাসের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বিমানবন্দরে উষ্ণ অভ্যর্থনা: এদিকে বৃহস্পতিবার বিকালে শান্তি ও সমপ্রীতির বার্তা নিয়ে ঢাকায় পৌঁছান পোপ ফ্রান্সিস। বাংলাদেশ বিমানের (বোয়িং-৭৩৭-৮০০) মেঘদূতে চড়ে ইয়াংগুন শাহজালাল বিমানবন্দরে পৌঁছান ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের প্রধান ধর্মগুরু। বিমানবন্দরে ফুলেল শুভেচ্ছা আর তোপধ্বনিতে তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানো হয়। সেখানে প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদ তাকে স্বাগত জানান। বিমানবন্দরে পোপকে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান জানানো হয়। সেখান থেকে তিনি সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে যান। স্মৃতিসৌধে ফুল দিয়ে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। সেখানে পরিদর্শন বইয়ে স্বাক্ষর এবং একটি নাগেশ্বর চাপা রোপণ করেন তিনি। সাভার  থেকে ঢাকার ধানমন্ডিতে গিয়ে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শন করেন পোপ। বঙ্গবন্ধু জাদুঘর  থেকে বিকাল সোয়া ৫টার দিকে বঙ্গভবনে যান। সেখানে প্রথমেই প্রেসিডেন্ট আবদুল হামিদের সঙ্গে একান্ত বৈঠক করেন তিনি। পরে বঙ্গভবনের দরবার হলে মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ও কূটনীতিকদের উপস্থিতিতে এক মিলনমেলায় বক্তৃতা করেন। সেখানে মন্ত্রীদের মধ্যে ছিলেন আবুল মাল আবদুল মুহিত, সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, আনিসুল হক, হাসানুল হক ইনু, এ এইচ মাহমুদ আলী, আসাদুজ্জামান নূর ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা গওহর রিজভী, মসিউর রহমান, ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বী মিয়া প্রমুখ। বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে সম্পাদক গোলাম সারওয়ার, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হাসান ইমাম, সারাহ বেগম কবরী, রামেন্দু মজুমদার প্রমুখ। তিন বাহিনী প্রধান, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিবরাও উপস্থিত ছিলেন সেই আয়োজনে। মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাটসহ বিভিন্ন দেশের জ্যেষ্ঠ কূটনীতিকরা উপস্থিত ছিলেন। বাংলাদেশের কার্ডিনাল প্যাট্রিক রোজারিও, ভ্যাটিকানের দূত জর্জ কোচেরি তাদের প্রধান ধর্মগুরুর সঙ্গে ছিলেন।
পোপের বরণ যেভাবে: ৩০ বছরে এই প্রথম  কোনো পোপ বাংলাদেশ সফরে এলেন। সর্বশেষ সফর করেছিলেন পোপ দ্বিতীয় জন পল, ১৯৮৬ সালে। পোপ বিমান থেকে  নেমে আসার সময় ২১বার তোপধ্বনিতে তাকে স্বাগত জানানো হয়। দুটি শিশু ফুল দিয়ে বরণ করে নেন ৮৮ বছর বয়সী খ্রিস্টান ধর্মগুরুকে। কিছুটা দূরে একদল শিশু তখন রবি ঠাকুরের আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে গানের সঙ্গে ঝালোর নাড়িয়ে নৃত্য পরিবেশন করছিল। সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে ছিলেন বাংলাদেশে খ্রিস্টান সমপ্রদায়ের ধর্মীয় নেতারা। প্রেসিডেন্ট আবদুল হামিদ  পোপ ফ্রান্সিসকে নিয়ে মঞ্চে আসার পর ভ্যাটিকান ও বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত বাজানো হয়। তিন বাহিনীর একটি সুসজ্জিত দল তাকে গার্ড অব অনার দেয়। পরে পোপ গার্ড পরিদর্শন  করেন এবং সেখানে উপস্থিত সবার সঙ্গে পরিচিত হন। গাড়িতে ওঠার আগে শিশুদের পরিবেশিত নাচও তিনি  দেখেন। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, বাণিজ্যমন্ত্রী  তোফায়েল আহমেদ, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বিমানবন্দরে উপস্থিত ছিলেন। মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম,  সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আবু বেলাল  মোহাম্মদ শফিউল হক, নৌবাহিনীর প্রধান এডমিরাল নিজামউদ্দিন আহমেদ, বিমান বাহিনীর প্রধান এয়ার মার্শাল আবু এসরার, ঢাকায় ভ্যাটিকানের রাষ্ট্রদূত আর্চবিশপ জর্জ  কোচেরি, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব সুরাইয়া বেগম, রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের সচিব সম্পদ বড়ুয়া, পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক, পুলিশ মহাপরিদর্শক একেএম শহীদুল হক এবং ঢাকার আর্চবিশপ প্যাট্রিক ডি  রোজারিও বিমানবন্দরে উপস্থিত ছিলেন  পোপকে স্বাগত জানাতে। পোপের সফর উপলক্ষে ঢাকার পাশাপাশি বিমানবন্দর এলাকা সাজানো হয় বর্ণিল সাজে। টার্মিনালের উপরে এবং সামনে বাংলাদেশ ও ভ্যাটিকানের পতাকা দেখা যায়। ভিভিআইপি টার্মিনালের দুই পাশে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধান আবদুল হামিদ ও ভ্যাটিকানের রাষ্ট্রপ্রধান পোপ ফ্রান্সিসের দুটি বড় ছবি স্থাপন করা হয়। টার্মিনালের উপরে বড় করে লেখা ছিল ‘স্বাগতম হে মহামান্য অতিথি’।
আজ-কাল যা হবে: সফরের দ্বিতীয় দিন আজ শুক্রবার সকালে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নাগরিক সমাবেশে প্রার্থনা করবেন পোপ ফ্রান্সিস। এরপর ভ্যাটিকান দূতাবাসে সাক্ষাৎ  দেবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। বিকালে তিনি যাবেন কাকরাইলের রমনা ক্যাথেড্রালে, সেখানে আর্চবিশপ হাউজে বিশপদের সঙ্গে বৈঠক করবেন তিনি। শান্তি কামনায় আন্তঃধর্মীয় ও সমপ্রদায়গত ঐক্য বিষয়ক সভায় অংশ নেবেন। সফরের শেষ দিন শনিবার সকালে তেজগাঁওয়ে মাদার  তেরেসা হাউজ পরিদর্শনে যাবেন পোপ। এরপর তেজগাঁও হলি রোজারিও চার্চে খ্রিস্টান যাজক, ধর্মগুরু ও ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে চার্চের কবরস্থান পরিদর্শন করবেন। দুপুরের পর ঢাকায় নটরডেম কলেজে তরুণদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন। সফরের ইতি টেনে বিকাল ৫টায় শাহজালাল বিমানবন্দর ছাড়বেন ক্যাথলিক ধর্মগুরু। তাকে বিদায় জানাবেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী। ২০১৩ সালের ১৩ই মার্চ ভ্যাটিকানের ২৬৬তম পোপ নির্বাচিত হন ফ্রান্সিস। রোমের বিশপ হিসেবে তিনি বিশ্বব্যাপী ক্যাথলিক চার্চ এবং সার্বভৌম ভ্যাটিকান সিটির প্রধান। পোপ ফ্রান্সিসের জন্ম ১৯৩৬ সালের ১৭ই ডিসেম্বর আর্জেন্টিনার বুয়েন্স আয়ার্সে। ক্যাথলিক পুরোহিত হিসেবে তার অভিষেক হয় ১৯৬৯ সালে। পুরো আমেরিকা অঞ্চল এবং দক্ষিণ  গোলার্ধ থেকে নির্বাচিত প্রথম পোপ তিনি।
পোপের দেখা পাচ্ছেন ১৫ রোহিঙ্গা: ওদিকে আমাদের স্থানীয় প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, পোপ ফ্রান্সিসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে নিজেদের দুর্ভোগের কথা জানাবেন মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের ১৫ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল। শুক্রবার দুপুরে কাকরাইলের আর্চবিশপ হাউসে তাদের  পোপের সাক্ষাৎ পাওয়ার কথা রয়েছে। প্রতিনিধি দলে থাকা একাধিক রোহিঙ্গা জানিয়েছেন, মিয়ানমারে তারা যে নির্যাতন ও নৃশংসতার শিকার হয়েছেন সেসব কথা জানাবেন। পাশাপাশি পোপের কাছে সুনির্দিষ্ট কিছু দাবিও তুলে ধরবেন। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) এ সাক্ষাতের ব্যবস্থা করছে। এজন্য এরইমধ্যে পুলিশ পাহারায় কক্সবাজার থেকে রওনা হয়েছেন তারা। শুক্রবার ভোরে তাদের ঢাকায় পৌঁছার কথা রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*