Home / খবর / বাংলাদেশ পরমাণু বিশ্বে

বাংলাদেশ পরমাণু বিশ্বে

বাংলাদেশ পাবনার রূপপুর পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মূল স্থাপনার নির্মাণ কাজের মধ্য দিয়ে পরমাণু বিশ্বে প্রবেশ করলো । ঐতিহাসিক এ  কর্মযজ্ঞের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ হলে দেশের প্রথম এই পরমাণু প্রকল্প থেকে ২০২৩ সালে প্রথম দফায় ১২০০ এবং পরের বছর আরো ১২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যোগ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। নির্মাণ কাজের উদ্বোধনের পর প্রধানমন্ত্রী এক সুধি সমাবেশে বক্তব্য রাখেন। তিনি বলেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ও নির্মাণ খরচ অনেক বেশি হয়। কিন্তু একবার চালু হয়ে গেলে উৎপাদন খরচ অনেক কম হয়।

 এই রূপপুর কেন্দ্র  থেকে দেশের প্রয়োজনের ১০ ভাগ বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে। দেশে কিছু লোক আছেন, যারা উচ্চশিক্ষিত। তারা সব কিছুতে সরকারের বিরোধিতা করেন। এরা অপরের ভালো দেখতে পারে না। এসব লোকেরা আমাদের করে দেয়া টেলিভিশনে বসে সরকারের বিরোধিতায় ইচ্ছেমতো বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, একজন ভালো কাজ করলে অপরজনের উৎসাহ থাকে না। থাকে গা জ্বালা। তারা অবান্তর প্রশ্ন করেন। জনগণকে ভুলভাল বোঝানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু দেশের উন্নয়নের কথা কখনোই ভাবেন না।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়া নেই আমার। বাবা সপরিবারে জীবন দিয়েছেন। আমি আপনাদের জন্য কিছু করতে চাই। দিয়ে যেতে চাই আগামী প্রজন্মকে নতুন কিছু। তিনি বলেন, হাত পেতে নয়, ভিক্ষা নিয়ে নয়, নিজের যা আছে তাই নিয়ে বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে চলতে চাই। তিনি বলেন, ৬ বছর দেশে আসতে পারিনি। রিফিউজি হয়ে থাকতে হয়েছে দেশে দেশে। দেশের মানুষের সকল অধিকার প্রতিষ্ঠায় দেশের মানুষের জন্য নিজের জীবন বাজি রেখেই দেশে পা রেখেছিলাম।
দুপুরে সুধি সমাবেশে ২০ মিনিট বক্তব্য রাখেন প্রধানমন্ত্রী। পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা নিরাপত্তার বিষয়টি খুব গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছি। এজন্য আমরা স্বাধীন পারমাণবিক শক্তি নিয়ন্ত্রণ কমিশন গঠন করে দিয়েছি। যাতে প্রাকৃতিক দুর্যোগে কোনো দুর্ঘটনা না ঘটে। পরিবেশ ও মানুষের কোনো ক্ষতি না হয় সে ধরনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। অত্যন্ত স্বচ্ছতার সঙ্গে এগিয়েছি, পদক্ষেপ নিয়েছি। এজন সেনাবাহিনী, পুলিশসহ অন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রকল্পের কাজে নিয়োগ দিয়েছি। তাদের  ট্রেনিংয়ের পরিকল্পনা করেছি। কিন্তু কিছু উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তি আছেন যারা সব কিছুতেই ভয় পায়। আমরা কিছু করতে গেলেই তারা প্রশ্ন তোলেন।
বর্জ্য রাশিয়া নিয়ে যাবে দাবি করে তিনি আরো বলেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বাংলাদেশের মতো একটি ঘনবসতিপূর্ণ দেশ এ বর্জ্য বহন করতে পারবে না। এ জন্য আমি রাশিয়াকে বলেছি- বর্জ্য তাদের নিয়ে যেতে হবে। তারা রাজি হয়েছে। বর্জ্য নিয়ে যাওয়ার জন্য রাশিয়ার সঙ্গে একটি চুক্তিও হয়েছে।
সুধি সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আরো বলেন, একটি স্বাধীন দেশ উন্নত, সমৃদ্ধশালী হবে। স্বাধীন দেশ হিসেবে বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে চলবে বাংলাদেশ। এ জন্য আমরা কাজ করে যাচ্ছি। তিনি বলেন, রূপপুরে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের জন্য ১৯৬৬ সালে সিদ্ধান্ত হয়েছিল। কিন্তু এখানে না করে প্রকল্পটি পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর যুদ্ধবিধ্বস্ত স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নেন। আমার বলতে দ্বিধা  নেই, সেই প্রকল্পের পরিচালক ছিলেন বিশিষ্ট পারমাণবিক বিজ্ঞানী ড. ওয়াজেদ মিয়া। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর ২১ বছর যারা দেশের ক্ষমতায় ছিল তারা পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের কোনো উদ্যোগ নেয়নি। ’৯৬ সালে আমরা ক্ষমতায় আসার পর বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়নে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নেই। এ জন্য আন্তর্জাতিক কিছু নিয়ম-কানুন মানতে হয়। সময় লাগে। এর মধ্যে আমাদের ৫ বছর শেষ হয়ে যায়। ২০০১ সালের নির্বাচনে স্বাভাবিকভাবে বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় আসে। আবারও থেমে যাওয়া এ প্রকল্প।
প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, ২০০৮ সালের আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করা হয়। এর ভিত্তিতে নির্বাচনের পর ক্ষমতায় এসে আমরা আবারও উদ্যোগ নেই এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের। ২০১০ সালের ১০ই নভেম্বর জাতীয় সংসদে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এ জন্য আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে আলাপ-আলোচনা চালিয়ে যাই। কিন্তু এ প্রকল্পে অনেক অর্থের প্রয়োজন। আমি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনকে প্রস্তাব দিলাম। পুতিন আমাদের আশ্বাস দিলেন একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করে দেয়ার। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১১ সালের ২রা নভেম্বর রাশিয়ান ফেডারেশন ও বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে প্রকল্প নির্মাণে সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ক্ষমতার পালবদলের পর ক্ষমতাসীনরা প্রকল্পটি পরিত্যক্ত করে দিলেও সত্যি আজ আনন্দের দিন। বাংলাদেশ পরমাণু বিশ্বে প্রবেশ করলো। মূল কাঠামো তৈরির কাজ শুরু করলাম। রাশিয়ার অর্থায়নে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়নে আজ সেই পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র উদ্বোধন হলো।’
এর আগে বৃহস্পতিবার বেলা ১১টা ৫০ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের কংক্রিট ঢালাইকাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১২টা ২ মিনিটে স্মারক ডাকটিকিট অবমুক্ত করেন। একই সময়ে নির্মাণ কাজের ব্যবহৃত বেলচা (স্থানীয় ভাষায় কুর্ণি) প্রকল্প সংশ্লিষ্ট রাশিয়ার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা প্রধানমন্ত্রীর হাতে তুলে দেন স্মারক হিসেবে।
সুধি সমাবেশে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী স্থপতি ড. ইয়াফেস ওসমানের সভাপতিত্বে প্রকল্প পরিচিতি তুলে ধরেন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ড.  সৌকত আকবর। স্বাগত বক্তব্য দেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন। বিশেষ অতিথির বক্তব্যদেন, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কমিশনের মহাপরিচালক দৌহি হান এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী প্রফেসর ডা. আফম রুহুল হক।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন রোসাটম’র মহাপরিচালক আলেক্সি লিখেচিভ। তিনি বলেন, আধুনিক এবং নিরাপদ বিদ্যুৎ প্লান্ট হচ্ছে রূপপুরে। এ ধরনের প্রকল্প রাশিয়াতে রয়েছে। বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উদ্বোধনের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তার দেশকে নিউক্লিয়ার যুগে প্রবেশ করিয়েছেন। আমরা বিশ্বাস করি, নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যেই এই প্রকল্পের কাজ শেষ করা হবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানের এই নিউক্লিয়ার ক্ষেত্র তৈরি হবে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের পরিচালক ড. শওকত আকবর বলেন, রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক শক্তি কর্পোরেশন (রসাটমের) নেতৃত্বে ২০১৩ সালে শুরু হয় বাংলাদেশের সবচেয়ে ব্যয়বহুল ‘রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজ। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই শেষ হয়েছে ৫ হাজার ৮৭  কোটি ৯ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ের কাজ। বৃহস্পতিবার ৩০শে নভেম্বর, প্রধানমন্ত্রীর উদ্বোধনের মধ্যে দিয়ে শুরু হলো ১ লাখ ১৩ হাজার ৯২ কোটি ৯১ লাখ টাকা ব্যয়ে দ্বিতীয় বা শেষ পর্যায়ের কাজ। নির্মাণ কাজে প্রতিদিন রাশিয়ার বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশি মিলে প্রায় ১ হাজারের বেশি কর্মী কাজ করছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Skip to toolbar