Home / অন্যান্য / অপরাধ / শহরে কোণঠাসা জঙ্গিরা সীমান্ত এলাকায় আস্তানা গাড়ছে

শহরে কোণঠাসা জঙ্গিরা সীমান্ত এলাকায় আস্তানা গাড়ছে

এখন সীমান্ত এলাকায় আস্তানা গড়ে তুলছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একের পর এক অভিযানে কোণঠাসা হয়ে পড়া জঙ্গিরা নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে । দেশত্যাগের সহজ সুযোগ থাকায় শীর্ষ জঙ্গিরাও এখন সীমান্তমুখি হয়ে উঠছে। পাশাপাশি অস্ত্র ও গোলাবারুদ আমদানি এবং প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালানোর উদ্দেশ্যেও তারা এই পথ বেছে নিয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।

সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বেশি জঙ্গি আস্তানার খোঁজ মিলেছে দেশের ভারত সীমান্তবর্তী জেলা রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে। ভারতে অবৈধ যাতায়াত সহজ হওয়ার কারণেই এ অঞ্চলে জঙ্গিরা আশ্রয় নিচ্ছে বলে মনে করছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা। সাম্প্রতিক সময়ে এই অঞ্চলের কয়েকটি জঙ্গি আস্তানা ধ্বংস করা হলেও এখনো জঙ্গিদের ঘাপটি মেরে থাকার আশঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছেন না তারা।

র‌্যাব-৫ এর মেজর এ এম আশরাফুল ইসলাম জানান, চাঁপাইনবাবগঞ্জের চর আলাতুলির জঙ্গি আস্তানায় অভিযানের দুই দিন পরও অনেক র‌্যাব সদস্য পদ্মার চরে অবস্থান করছেন। বৃহস্পতিবার দুপুর পর্যন্ত তারা চর আলাতুলি ও তার পাশের এলাকা চর কোদালকাটি, বকচর এবং চর আষাড়িয়াদহ এলাকার প্রতিটি পাড়া চষে বেড়িয়েছেন। সেসব এলাকায় অচেনা ব্যক্তির আনাগোনা রয়েছে কি না তা জানার চেষ্টা করছেন র‌্যাব সদস্যরা। গ্রামবাসীকে অনুরোধ করা হচ্ছে, পরিস্থিতি সন্দেহজনক মনে হলে র‌্যাবকে তথ্য দেয়ার জন্য।

গত মঙ্গলবার ভারতীয় সীমান্ত লাগোয়া চর আলাতুলিতে জঙ্গিদের একটি আস্তানার সন্ধান পায় র‌্যাব। র‌্যাবের আত্মসমর্পণের আহ্বানে সাড়া না দিয়ে আত্মঘাতী হয় জঙ্গিরা। এর মধ্যে দু্ই পক্ষে গোলাগুলিল ঘটনা ঘটে। আস্তানায় বড় ধরনের বিস্ফোরণও হয়।  অভিযান শেষে সেখানে তিন ব্যক্তির ছিন্নভিন্ন লাশ উদ্ধার হয়।

র‌্যাবের কর্মকর্তা আশরাফুল ইসলাম জানান, নিহত জঙ্গিদের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে তারা জামায়াতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশের (জেএমবি) সক্রিয় সদস্য বলে জানান তিনি। জঙ্গিরা নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজেই মিথ্যা পরিচয়ে সীমান্ত সংলগ্ন বাথানবাড়ি ভাড়া নিয়ে আস্তানা গেড়েছিল।

রাশিকুল নামের যে ব্যক্তির বাথানবাড়িটি ভাড়া নিয়েছিলেন জঙ্গিরা তার স্ত্রী, শ্বশুর ও শাশুড়িকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য র‌্যাব কার্যালয়ে নেয়া হয়। এদের মধ্যে শুধু রাশিকুলের স্ত্রী ওই জঙ্গিদের দেখেছিলেন। তাই তাকে এখনো জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। সঙ্গে তার বাবাও আছেন। তবে তার মাকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে।

র‌্যাব-৫ এর অধিনায়ক লে. কর্নেল মাহাবুবুল আলম বলেন, পদ্মার চারাঞ্চল দুর্গম হওয়ার সুবাদে জঙ্গিরা এ অঞ্চলকে নিরাপদ ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করছে। যেহেতু এটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারির একটু বাইরে তাই এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে তারা এখানে প্রশিক্ষণ ক্যাম্প ও বিস্ফোরক তৈরির কারখানা হিসেবে ব্যবহার করছিল।

এদিকে সীমান্তের দুই কিলোমিটারের মধ্যে জঙ্গিদের অবস্থানে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী-বিএসএফ সীমান্তে রেড অ্যালার্ট জারি করেছে। রাজশাহী থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ পর্যন্ত এলাকায় এই উচ্চ সতর্কতার আওতায় এসেছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো এ খবর জানাচ্ছে। আলাতুলিতে জঙ্গিদের এমন ডেরা খুঁজে পাওয়ার পর বিএসএফ সীমান্তে কড়া নজরদারি করছে, যেন লুকিয়ে থাকা কোনো জঙ্গি পালিয়ে ভারতে ঢুকতে না পারে।

রাজশাহীতে এর আগেও জঙ্গি আস্তানা ধ্বংস করে পুলিশ।  গত ১১ মে আলাতুলির চর থেকে মাত্র ১২ কিলোমিটার দূরে রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার বেনীপুর গ্রামে অভিযান পরিচালনা করে পুলিশ। অভিযানের সময়ই এক নারী জঙ্গির হাঁসুয়ার কোপে নিহত হন ফায়ার সার্ভিসের এক কর্মী। পরে আত্মঘাতী বোমার বিস্ফোরণে নিহত হয় বাড়ির মালিকসহ চার জঙ্গি। বাড়িটি বোমা তৈরির প্রশিক্ষণের জন্য ব্যবহার করা হতো বলে জানিয়েছে পুলিশ।

গত ২৬ এপ্রিল চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলায় এক জঙ্গি আস্তানায় পুলিশের অভিযানে মারা পড়ে চার জঙ্গি। এই আস্তানায় নিহত চারজনের মধ্যে গুলশান হামলার অন্যতম সমন্বয়ক বাশারুজ্জামান ও ছোট মিজানও ছিল। পরে ১২ জুন রাজশাহীর তানোরে জঙ্গি আস্তানার সন্ধান পুলিশ। এ অভিযানে কেউ হতাহত হয়নি। তবে অস্ত্রসহ প্রথমে ১২ জনকে আটক করা হয়। পরে তিনজনকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে তাদের আদালতে তোলা হয়।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানের মুকে ঢাকা কিংবা অন্য শহরে নিরাপদ মনে না করায় জঙ্গিরা গ্রাম কিংবা চরে আশ্রয় নিচ্ছে। এসব এলাকায় তারা ট্রেনিং সেন্টারও বানাচ্ছে। নতুন সদস্যদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয় এসব দুর্গম এলাকায়।

সম্প্রতি চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে দুর্ধর্ষ জঙ্গি সোহেল মাহফুজ ওরফে হাতকাটা সোহেলকে যখন গ্রেপ্তার করা হয়, তখনও সে সঙ্গীদের প্রশিক্ষণ দেয়ার কাজ করছিল।

জঙ্গিদের এই ডেরা বদলের বিষয়ে পুলিশ সচেতন বলে জানান রাজশাহী রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) এম খুরশীদ হোসেন। তিনি বলেন, আগের যেকোনো সময়ের চাইতে বেশি নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। সাদা পোশাকে গোয়েন্দা সদস্যরাও কাজ করছেন। জঙ্গিদের দুর্গ ভেঙে দিতে এখন দুর্গম এলাকাগুলোতেও মাঝেমধ্যেই ব্লক রেইড চালানো হবে বলে জানান তিনি।

ডিআইজি বলেন, স্থানীয় লোকজনের দেয়া তথ্য বিশ্লেষণ এবং নিজস্ব গোয়েন্দাদের দেয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে এ অভিযান চলবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*