Home / খবর / রায় যুগান্তকারী

রায় যুগান্তকারী

হাইকোর্ট সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত গুণী চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদের পরিবারকে ৪ কোটি ৬১ লাখ ৭৫ হাজার ৪৫২ টাকা ক্ষতিপূরণ দেয়ার নির্দেশ  দিয়েছেন। ক্ষতিপূরণ চেয়ে প্রয়াত তারেক মাসুদের স্ত্রী ক্যাথরিন মাসুদের করা এক মামলায় বিচারপতি জিনাত আরা ও বিচারপতি কাজী মো. ইজারুল হক আকন্দের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ গতকাল এ রায় দেন। রায়ে বলা হয়েছে, বাসের (চুয়াডাঙ্গা ডিলাক্স) তিন মালিক দেবেন ৪ কোটি ৩০ লাখ ৮৫ হাজার ৪৫২ টাকা, বাসচালক জমির উদ্দিন দেবেন ৩০  লাখ টাকা এবং ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি দেবে ৮০ হাজার টাকা। বাসের তিন মালিক সমান হারে টাকা দেবেন। রায়ের কপি পাওয়ার তিন মাসের মধ্যে এ টাকা দিতে বলা হয়েছে রায়ে। আর এ টাকা প্রয়াত তারেক মাসুদের স্ত্রী ক্যাথরিন মাসুদ, ছেলে নিষাদ মাসুদ ও বৃদ্ধ মা নুরুন নাহার পাবেন।

 এর আগে গত ১৭ই নভেম্বর এ সংক্রান্ত শুনানি শেষে ২৯শে নভেম্বর রায়ের দিন ধার্য করেন হাইকোর্ট। পরে ২৯ ও ৩০শে নভেম্বর এবং গতকাল ৩রা ডিসেম্বর বিকাল পর্যন্ত রায় পাঠ শেষ করে এ রায় দেন হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট বেঞ্চ। আদালতে আবেদনকারী ক্যাথেরিন মাসুদের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন আইনজীবী ড. কামাল হোসেন ও রমজান আলী সিকদার। বাস মালিকদের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন আইনজীবী আবদুস সোবহান তরফদার। অন্যদিকে রিলায়েন্স ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী এহসান এ সিদ্দিক ও ইমরান এ সিদ্দিক। আর রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। সঙ্গে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ইশরাত জাহান।
রায়ের প্রতিক্রিয়ায় ক্যাথরিন মাসুদের আইনজীবী সারা হোসেন বলেন, এই রায়ে আমরা অবশ্যই সন্তুষ্ট। এই রায়ে একটি স্বীকৃতি পাওয়া গেছে যে যারা এ ধরনের দুর্ঘটনার স্বীকার হোন তাদের যে ক্ষতিপূরণ পাওয়ার অধিকার আছে এই ব্যাপারটারও আজকে স্বীকৃতি পাওয়া গেল। সারা হোসেন বলেন, আদালত তার পর্যবেক্ষণে বলেছেন যে ক্ষতিপূরণের দাবি সকলেরই থাকা উচিত। মোটর যান অধ্যাদেশ আইন অনুযায়ী প্রত্যেক জেলা প্রশাসকের অধীনে একটি ট্রাইব্যুনাল থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, প্রতিনিয়ত যারা মারা যাচ্ছেন তারা ওই ট্রাইব্যুনালে ক্ষতিপূরণের মামলা করতে পারছেন না। এখন থেকে সেখানে সংশ্লিষ্টরা ক্ষতিপূরণ দাবি করে মামলা করতে পারবেন। তিনি বলেন, স্নেহ ও ভালোবাসার ক্ষতির বিষয়ে আদালত তার পর্যবেক্ষণে বলেছেন যে, একেক জনের সামাজিক অবস্থান, আয় বা উপার্জন একেক  রকম। এ বিষয়ে ক্ষতিপূরণের দাবি একেক রকম হতে পারে। তবে স্নেহ  বা ভালোবাসা সবারই সমান। তাই এক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণের দাবির একটি মাপকাঠি থাকা প্রয়োজন। সারা হোসেন আরো বলেন, রায়ের পর্যবেক্ষণে গাড়ি চালকদের সতর্ক করে দিয়ে বলা হয়েছে, দুর্ঘটনার দায় চালককেও নিতে হবে। ব্যক্তিগতভাবে চালকও ক্ষতিপূরণের অর্থ পরিশোধ করবে। তা নাহলে তারা সতর্ক হবে না। রায়ের পর ক্যাথরিন মাসুদ সাংবাদিকদের বলেন, আমিতো আর তারেক মাসুদকে ফিরে পাবো না। সাত বছরের ছেলে নিষাদও তার বাবাকে পাবে না। বৃদ্ধ মা তার সন্তানকে পাবে না। তবে এই রায় আমাদের সকলের জন্য কিছুটা হলেও সান্ত্বনা হয়ে থাকবে। এতদিনের যন্ত্রণার পর এ রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করছি। যারা প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনায় প্রিয়জন হারাচ্ছেন তাদের সমবেদনা জানাচ্ছি। বাস মালিকের পক্ষে শুনানি করা আইনজীবী আব্দুস সোবহান তরফদার বলেন, রায়ে ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিকে ৮০ হাজার টাকা, ওই বাসের চালককে ৩০ লাখ টাকা এবং বাকি টাকা বাস মালিকদের দিতে বলা হয়েছে। তিনি বলেন, আমরা এই রায়ে সংক্ষুব্ধ। রায়ের বিরুদ্ধে আমরা আপিল করবো।
মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার জোকা এলাকায় ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে ২০১১ সালের ১৩ই আগস্ট এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন গুণী চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদ ও বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল এটিএন নিউজের তখনকার সিইও (প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা) মিশুক মুনীর। একটি ছবির জন্য লোকেশন দেখে ফেরার পথে ওই স্থানে তাদের বহনকারী মাইক্রোবাসটির সঙ্গে চুয়াডাঙ্গাগামী একটি বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে তারেক মাসুদ ও মিশুক মুনীরসহ মাইক্রোবাসের পাঁচ আরোহী নিহত হন। পরে পুলিশ এ ঘটনায় বাদী হয়ে একটি মামলা করে। নিহতদের পরিবারের সদস্যরা ২০১৩ সালের ১৩ই ফেব্রুয়ারি মানিকগঞ্জ জেলা জজ আদালতে মোটরযান অর্ডিন্যান্সের ১২৮ ধারায় ১০ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ চেয়ে বাস মালিক, চালক এবং ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির বিরুদ্ধে পৃথক দুটি মামলা করেন। পরে মামলা দুটি হাইকোর্টে বদলির নির্দেশনা চেয়ে ২০১৩ সালের ১লা অক্টোবর হাইকোর্টে আবেদন করেন তারেক মাসুদের স্ত্রী ক্যাথরিন মাসুদ এবং মিশুক মনিরের স্ত্রী কানিজ এফ কাজী ও তাঁদের ছেলে। প্রাথমিক শুনানি শেষে ৩রা অক্টোবর রুল জারি করেন হাইকোর্ট। সংবিধানের ১১০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মামলা দুটি কেন উচ্চ আদালতে বদলি করা হবে না- তা জানতে চাওয়া হয় রুলে। একই সঙ্গে মামলা দুটির নথিও তলব করেন আদালত। ওই রুলের চূড়ান্ত শুনানি শেষে ২০১৪ সালের ২৯শে অক্টোবর মানিকগঞ্জ জেলা ও মোটর ক্লেইমস ট্রাইব্যুনালে করা মামলা দুটি হাইকোর্টে বদলির আবেদন মঞ্জুর করে রায় দেন  হাইকোর্ট। পরবর্তীতে বিষয়টি শুনানির জন্য বিচারপতি জিনাত আরার নেতৃত্বে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চে পাঠান সাবেক প্রধান বিচারপতি। এরই ধারাবাহিকতায় শুনানি শেষে গতকাল এ রায় দেয়া হলো। এদিকে একই দুর্ঘটনায় নিহত মিশুক মুনীরের জন্য ক্ষতিপূরণ চেয়ে করা মামলায় শুনানি আগামী বছর ৪ঠা ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মুলতবি করা হয়েছে।
এই রায় ‘ঐতিহাসিক’
সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত আন্তর্জাতিক খ্যাতিমান চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেয়ার রায়কে ‘ঐতিহাসিক’ বলে মন্তব্য করেছেন  বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী। তিনি বলেন, দীর্ঘ ৬ বছর ধরে আদালতের বারান্দায় ঘুরে তারেক মাসুদের পরিবার হতাশ হননি। হাইকোর্ট যে রায় দিয়েছেন তা বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বরণীয় হয়ে থাকবে। তিনি আরো বলেন, গত বছর হাইকোর্ট একটি মামলা নিষ্পত্তি করে সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে অপরাধীদের শাস্তি ৭ বছরের কারাদণ্ড বহাল রেখে বলেছিল এই শাস্তিও যথেষ্ট নয়। অথচ সড়ক পরিবহন আইন-২০১৭ এ  সড়ক দুর্ঘটনার মামলায় অপরাধের শাস্তি ৩ বছরের কারাদণ্ড রাখা ও নিহতের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ প্রদানের বিষয়ে সুস্পষ্ট কোন বিধান না থাকায় সড়কে যে মৃত্যুর মিছিল চলছে তা থামানো কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছে না। সড়ক দুর্ঘটনায় দায়ী চালক, মালিক, যাত্রী, হেলপার, কন্ডাক্টর, সড়ক নির্মাণ প্রকৌশলী, সড়ক সুপার ভিশন কর্মকর্তা, সড়ক নির্মাণ ঠিকাদার, বিলবোর্ড স্থাপনকারী, প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকারী, আনফিট যানবাহনে ফিটনেস প্রদানকারী বা অন্য যে কোন ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের  সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড এবং সড়ক দুর্ঘটনায় আহতদের চিকিৎসা ও নিহতদের প্রয়োজনীয় ক্ষতিপূরণ প্রদানে অনতিবিলম্বে সড়ক দুর্ঘটনা তহবিল গঠনের বিষয়টি প্রস্তাবিত সড়ক পরিবহন আইন-২০১৭ এ অন্তর্ভুক্তির দাবি জানান তিনি। রায়ের প্রতিক্রিয়ায় বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক কাজী সাইফুন নেওয়াজ বলেন,  এই মামলায় চালক, মালিক ও ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিকে ক্ষতি পূরণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। শুধু এই দুর্ঘটনা নয়, যে কোনো দুর্ঘটনার পর যদি পুলিশ ও বিশেষজ্ঞ টিম দিয়ে তদন্ত করে এভাবে শাস্তির আওতায় আনা হয় তাহলে সড়ক দুর্ঘটনা কমবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*