Home / অন্যান্য / অপরাধ / ৬ মাসের শিশুর ছিনতাইকারীর থাবায় প্রাণ গেল

৬ মাসের শিশুর ছিনতাইকারীর থাবায় প্রাণ গেল

শাহ আলম দম্পতি  চার বছরের শিশু সন্তানের চিকিৎসার জন্য শরিয়তপুর থেকে ঢাকায় এসেছিলেন । সঙ্গে ছিল ছয় মাসের শিশুপুত্র আরাফাত। কিন্তু নির্মম এক নিষ্ঠুরতার শিকার হয়ে তারা হারিয়েছেন কোলের শিশু সন্তানকে। ছিনতাইকারীর থাবায় কোল থেকে পড়ে গিয়ে মারা যায় আরাফাত। মর্মান্তিক এ ঘটনাটি ঘটেছে গতকাল রাজধানীর দয়াগঞ্জ এলাকায়। ভোরে সদরঘাট থেকে রিকশা করে শনির আখড়ায় যাওয়ার পথে এ ঘটনা ঘটে।

 এক সন্তানের চিকিৎসা করাতে এসে কোলের সন্তান হারিয়ে পাগলপ্রায় এ দম্পতির আহাজারিতে ভারি হয়ে উঠে ঢাকা মেডিকেলের পরিবেশ। বিকালে মৃত সন্তানের লাশ নিয়ে তারা রওয়ানা দেন শরিয়তপুরের উদ্দেশে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায় নিহত শিশুর মা আকলিমা বেগম আহাজারি করছেন। স্বজনরা তাকে সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করছেন। বার বার তিনি বলছিলেন, আল্লারে আমার কলিজার টুকরাটাকে এনে দাও। আমি এখন কি নিয়ে বাঁচবো।
আকলিমা বেগম মানবজমিনকে বলেন, আমার বড় ছেলে ৪ বছর বয়সী আল আমিন গিটা বাতের রোগী। তাকে চিকিৎসা করানোর জন্য রোববার রাতে শরিয়তপুর থেকে লঞ্চে করে ভোর ৫টায় সদরঘাটে এসে পৌঁছাই। পরে একটি রিকশা ভাড়া করে আমার বোনের বাসার উদ্দেশ্য রওয়ানা দেই। রিকশাটি দয়াগঞ্জ ওভারব্রিজ পার হওয়ার পর পরই একজন ছিনতাইকারী রিকশার সামনে দিয়ে আমার পাশে চলে আসে। চলন্ত রিকশাতেই আমার কাছে থাকা ব্যাগ ধরে টানাটানি শুরু করে। টানাটানির একপর্যায়ে আমার কোলে থাকা আরাফাতসহ আমি রিকশা থেকে পড়ে যাই। সঙ্গে সঙ্গে একটি লেগুনা এসে আরাফাতকে ধাক্কা দেয়। ছিনতাইকারী আমার ব্যাগ নিয়ে পালিয়ে যায়। পরে আমরা সিএনজি ভাড়া করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আরাফাতকে নিয়ে আসি। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা আরাফাতকে মৃত ঘোষণা করে।
নিহত শিশুর বাবা শাহ আলম গাজী মানবজমিনকে বলেন, আমি গ্রামে কৃষি কাজ করি। শনির আখড়ায় আমার স্ত্রীর এক বোন থাকেন। তাদের সঙ্গে কথা বলেই আল আমিনের চিকিৎসার জন্য ঢাকায় আসি। কথা ছিল তাদের বাসায় কিছুক্ষণ থেকে পরে শ্যামলী শিশু হাসপাতালে গিয়ে আল আমিনকে ভর্তি করব। ছিনতাইকারীরা যে ব্যাগ নিয়ে গেছে সেই ব্যাগে নগদ টাকা, মোবাইল ফোন ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিস পত্রের সঙ্গে আল আমিনের চিকিৎসার কাগজপত্রও ছিল। তিনি বলেন, দয়াগঞ্জ  ব্রিজ থেকে ১০০ গজ দূরে ভিশন ইম্পোরিয়াম নামক একটি দোকানের সামনে আনুমানিক ২৫ বছর বয়সী যুবক এসে ব্যাগ ধরে টানাটানি শুরু করে। তখন রিকশাও ধীরে ধীরে চলছিল। সড়কে তেমন গাড়ি চলাচল ছিল না। আশে পাশে যে কয়জন লোক ছিল তারা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘটনা দেখছিল। কেউ এগিয়ে আসেনি।
দুপুরে ঘটনাস্থল দয়াগঞ্জ মোড়ে সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ভোরের ছিনতাইয়ের ঘটনা নিয়ে আলোচনা করছেন অনেকে। ঘটনার সময় দোকানপাট বন্ধ থাকায় প্রত্যক্ষদর্শী পাওয়া যায়নি। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, প্রায়ই এ এলাকায় এ ধরনের ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে।
দয়াগঞ্জের মোড় দুই থানার অধীনে পড়ে। মোড়ের বাম পাশ পড়ে গেণ্ডারিয়া এবং ডানপাশ যাত্রাবাড়ী থানা এলাকায়। শিশু মারা যাওয়ার খবর শুনেই সেখানে দুই থানার পুলিশ সদস্যরা পরিদর্শনে যান। আশপাশের দোকান ও বাসা-বাড়ি থেকে ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করেছে পুলিশ। ফুটেজগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। পুলিশ ছিনতাইকারীদের শনাক্ত ও তাদের ধরতে অভিযান চালাচ্ছে।
সূত্র জানায়, কয়েকমাস আগে দয়াগঞ্জের মোড়ে হরহামেশা ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটতো। দুর্বৃত্তরা রিভলবার ও ধারালো অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে নিরীহ লোকজনের কাছ থেকে সব ছিনিয়ে নিতো। ইদানীং তারা কৌশল পাল্টে মোটরসাইকেলে করে ছিনতাই করছে। মোড় দিয়ে রিকশায় করে কেউ গেলে তাদের ব্যাগ টান দিয়ে নিয়ে যায় ছিনতাইকারীরা। কয়েকটি ঘটনার পর পুলিশ সেখানে টহলের ব্যবস্থা করে। ঘটনার সময় টহল পুলিশের দল ওই এলাকায় ছিল বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
দয়াগঞ্জ মোড়ের ফুটপাতের চা দোকানি শফিকুল ইসলাম জানান, যাত্রাবাড়ী এলাকাটি ছিনতাই প্রবণ এলাকা। দুর্বৃত্তরা ছিনতাইয়ের ধরন বদলেছে। আগে তারা দাঁড়িয়ে ওঁৎপেতে ছিনতাই করতো। এখন চলন্ত মোটরসাইকেল থেকে রিকশায় থাকা যাত্রীদের কাছ থেকে ব্যাগ ছিনিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। কেউ রাস্তায় দাঁড়িয়ে মোবাইলে কথা বললে ছোঁ মেরে মোবাইল ফোনটি নিয়ে যায়।
স্থানীয় বাসিন্দা আরজু খান মানবজমিনকে জানান, এলাকায় বসবাসীকারী অনেকেই রাতে ভয়ে মোবাইল ফোন নিয়ে বের হতে পারেন না। আমরা বিষয়টি সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশ ও ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের জানিয়েছি।
এ বিষয়ে যাত্রাবাড়ী থানার ওসি মো. আনিসুর রহমান মানবজমিনকে জানান, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়। ছিনতাইকারীদের ধরার চেষ্টা চলছে। তিনি আরো জানান, এ ঘটনার কোনো প্রত্যক্ষদর্শী পাওয়া যায়নি। কাউকে আটক করা যায়নি। তবে আমরা তদন্ত করছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*