Home / চট্টগ্রাম / রীমা ট্র্যাজেডি তিন কারণে

রীমা ট্র্যাজেডি তিন কারণে

এ তিন কারণেই অতিরিক্ত ভিড়, কিছুটা অব্যবস্থাপনা ও কমিউনিটি সেন্টারের প্রবেশ পথের ত্রুটি ‘রীমা কমিউনিটি সেন্টারে’ পদদলনের ঘটনা ঘটেছে। তিন দিন তদন্ত শেষ করে গতকাল এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন জমা দেন সিএমপির তদন্ত টীম। তদন্ত টীমের প্রধান ছিলেন উপ পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) এ এস এম মোস্তাইন হোসাইন। গতকাল ২১ ডিসেম্বর রাতের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদনটি সিএমপি কমিশনারের কার্যালয়ে জমা দেয়ার কথা জানিয়ে ডিসি সাউথ আজাদীকে বলেন, দুর্ঘটনার জন্য কোন ব্যক্তি বিশেষ কিংবা এককভাবে কারো দায় আমরা তদন্তে পাইনি। তবে কমিউনিটি সেন্টারের মূল প্রবেশপথের পরে যে খাদটা আছে সেটার জন্য দুর্ঘটনা ঘটেছে। আর আয়োজক যারা ছিলেন তাদেরও একটা ব্যর্থতা আছে। তারা এত মানুষের সমাগম হবে সেটা আগে থেকে বুঝতে পারেননি এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেননি। যারা প্রয়াত এই নেতাকে শ্রদ্ধা জানাতে এসেছিলেন তারা কোনভাবেই সচেতন ছিলেন না। তাদের সামলাতে পারেননি পুলিশ এবং স্বেচ্ছাসেবকরা। তবে আরো পুলিশ যদি মোতায়েন করা যেত তাহলে হয়ত ক্ষয়ক্ষতিটা একটু কম হত। সামগ্রিকভাবে পুলিশ অনেক চেষ্টা করেছে। এছাড়াও প্রতিবেদনে কয়েকটা সুপারিশ করা হয়েছে।

প্রসঙ্গত: গত ১৪ ডিসেম্বর গভীর রাতে নগরীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে মারা যান চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী। ১৮ ডিসেম্বর মহিউদ্দিনের কুলখানিতে তার পরিবার নগরীর বিভিন্ন কমিউনিটি সেন্টারে মেজবানের আয়োজন করে। কুলখানিতে নগরীর এস এস খালেদ সড়কে রীমা কমিউনিটি সেন্টারে পদদলিত হয়ে দশজনের মৃত্যু হয়। আহত হন ২৫জন। ঘটনার পর তিন সদস্য বিশিষ্ট এ তদন্ত কমিটি গঠন করেন পুলিশ কমিশনার। নগর পুলিশের উপ–কমিশনার (দক্ষিণ) এস এম মোস্তাইন হোসেনের নেতৃত্বে কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন–নগর বিশেষ শাখার অতিরিক্ত উপ কমিশনার জসিম উদ্দিন ও নগর গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী কমিশনার (দক্ষিণ) কাজল কান্তি নাথ। মোস্তাইন হোসেন বলেন, ঘটনাস্থল থেকে সংগ্রহ করা সিসিটিভির ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, রীমা কনভেনশন সেন্টারের পশ্চিম পাশের ফটক খুলে দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিপুল সংখ্যক মানুষ ভেতরে ঢুকছেন। ঢালু জায়গা হওয়ায় প্রথমে এক যুবক পড়ে যান। তারপর একজনের ওপর পড়ে আরেকজন। এভাবে পদদলনের ঘটনা ঘটে। তিনি আরও বলেন, ঘটনার দিন সেখানে পর্যাপ্ত পুলিশ সদস্য ছিলেন। কমিউনিটি সেন্টারের ভেতরে–বাইরে, সিঁড়িতে ও বাইরের রাস্তায় সব মিলিয়ে ২২ জন পুলিশ সদস্য ছিলেন। স্বেচ্ছাসেবকও ছিলেন পর্যাপ্ত। এক সঙ্গে অনেক লোক এসে ভিড় করায়, পেছন থেকে চাপের কারণে এবং সর্বোপরি ঢোকার পথটি ঢালু হওয়ায় এ দুর্ঘটনাটি ঘটে।

প্রতিবেদনে সুপারিশের মধ্যে কী রয়েছে জানতে চাইলে উপ পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) বলেন, প্রধান সুপারিশ হচ্ছে রীমা কমিউনিটি সেন্টার কর্তৃপক্ষ যতদিন পর্যন্ত প্রবেশপথ ঠিক না করবে ততদিন সেটা বন্ধ রাখতে হবে। আমরা নির্মাণ ত্রুটি অপসারণের সুপারিশ করেছি। এছাড়া যে কোন বড় ধরনের আয়োজনের ক্ষেত্রে লোকসমাগমসহ সার্বিক বিষয়ে আয়োজকদের প্রস্তুতি থাকা ও পুলিশকে প্রয়োজনীয় তথ্য দেয়া। আরো কয়েকটি সুপারিশ করা হচ্ছে। এর আগে ভিড়ের চাপে পদদলিত হয়ে ১০ জন নিহতের ঘটনায় সিসি টিভির ফুটেজ পর্যবেক্ষণ শেষে কোতোয়ালি জোনের সহকারী কমিশনার জাহাঙ্গীর আলম আজাদীকে জানিয়েছিলেন, অতিরিক্ত ভিড়ের পাশাপাশি রীমা কনভেনশন সেন্টারের ত্রুটির কারণেই পদদলিত হয়ে মাত্র কয়েক সেকেন্ডে ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে নিশ্চিত হয়েছে পুলিশ। এদিকে সিসি টিভির ফুটেজে দেখা গেছে, আগে থেকে রীমা কনভেনশন সেন্টারের গেইট বন্ধ থাকলেও দুপুর পৌনে দু’টার দিকে পাঞ্জাবি পড়া এক লোক হঠাৎ করেই গেট খুলে দেয়। এসময় গেইটে মাত্র একজন পুলিশ ও একজন আনসার সদস্য দায়িত্ব পালন করছিলেন। গেইট খুলে দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে কুলখানিতে আসা অপেক্ষমাণ লোকজন হুড়োহুড়ি করে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করে। এসময় ঢালুতে জায়গায় পড়ে গিয়ে পদদলিত হয়ে ১০ জনের মৃত্যু হয়।

সিএমপির তদন্ত কমিটি ছাড়াও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ মাশহুদুল কবিরকে প্রধান করে পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করে জেলা প্রশাসন। কমিটির অপর সদস্যরা হলেন, ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. মো. হুমায়ুন কবির, নগর পুলিশের চকবাজার জোনের সহকারী কমিশনার নোবেল চাকমা, গণপূর্ত বিভাগের প্রকৌশলী এস এম শাহরিয়ার নেওয়াজ এবং ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মুহাম্মদ হাসানুজ্জামান। এই কমিটিকে সাত কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।

এদিকে, এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর কুলখানিতে পদপিষ্ট হয়ে আহত ১৪ জনের মধ্যে ৪ জনের অবস্থা সঙ্কটাপন্ন। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ১৪ জনের ৯ জন ক্যাজুয়েলিটি ওয়ার্ডে, ৪ জন আইসিইতে এবং একজন নিউরো মেডিসিন ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন আছেন। গত সোমবার ১০জন নিহত হওয়ার ব্যাপারে সিভিল সার্জন বলেন, হুড়োহুড়িতে জনস্রোতের পদদলনে ঘাড়, মস্তিষ্ক এবং বুকের হাড় ভেঙে যাওয়ায় তারা মারা গেছেন। এর মধ্যে কয়েকজনের বুকের হার ভেঙে ফুসফুস স্পর্শ করেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*