Home / চট্টগ্রাম / মহিউদ্দিনের উত্তরসূরি কে হচ্ছেন চট্টগ্রামে?

মহিউদ্দিনের উত্তরসূরি কে হচ্ছেন চট্টগ্রামে?

চেয়ার এখন শূন্য চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি মহিউদ্দিন চৌধুরীর । তবে এই চেয়ারে বসার যোগ্য উত্তরসূরি কে- এ নিয়ে তোড়জোর চলছে নগর আওয়ামী লীগের নেতাদের মধ্যে। যদিও মুখে চেয়ারে বসার কথা না বলে শোকই বেশি প্রকাশ করছেন নেতারা।

এরমধ্যে মহিউদ্দিন চৌধুরীর বড় ছেলে ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সস্পাদক ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলকে ঘিরে মহিউদ্দিন বলয়, নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন বলয় এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসির একটি বলয় রয়েছে।

দলীয় নেতাকর্মীরা জানান, এই তিনটি বলয়ে একাধিক নেতা রয়েছেন যাদের বেশিরভাগই চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি পদে অধিষ্ঠিত। এরমধ্যে খোরশেদ আলম সুজন, জহিরুল আলম দোভাষ, আলতাফ হোসেন চৌধুরী বাচ্চু ও চউক চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম প্রয়াত মহিউদ্দিন চৌধুরীর অনুসারী।

আর মাহতাব উদ্দিন চৌধুরী ও নঈম উদ্দিন চৌধুরী হলেন সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দিনের অনুসারী। এছাড়া ডা. আফছারুল আমীন পৃথক মেরুতে থাকলেও মেয়র নাছিরকেন্দ্রিক তার অবস্থান। অ্যাডভোকেট ইব্রাহিম হোসেন চৌধুরী বাবুল আফছারুল আমীনের অনুসারী হলেও সাংগঠনিক কর্মসূচিতে তিনি নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রাখেন। এর বাইরে মাঝখানে রয়েছেন মন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি।

নেতাকর্মীরা জানান, গত ১৫ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীকে দাফনের পর রাতেই তার চশমা হিলের বাসভবনে রুদ্ধদ্বার বৈঠকে বসেন নগর আওয়ামী লীগের নেতারা। পরদিন ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসের কর্মসূচিসহ পরবর্তী সাংগঠনিক কর্মসূচিতে সভাপতিত্ব কে করবেন, সে বিষয়টি বৈঠকের আলোচনায় উঠে আসে।

নেতাদের তিন পক্ষের যুক্তি-তর্ক শেষে সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত হয়, আপাতত সাংগঠনিক কর্মসূচিগুলোতে নয়জন সহসভাপতির মধ্যে যারা সক্রিয় এবং সভায় যারা আগে আসবেন, তাদের মধ্য থেকে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে একজন সভাপতিত্ব করবেন। নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দিন এ সভায় উপস্থিত ছিলেন।

তবে পরে মহিউদ্দিন চৌধুরীর সভাপতির চেয়ারে বসার বিষয়ে কেন্দ্রের ওপর ছেড়ে দিয়ে বৈঠক শেষ করেন নেতারা।

নগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক শফিক আদনান ও প্রচার সম্পাদক শফিকুল ইসলাম ফারুক ওইদিন বৈঠকে অংশ নেন। তারা বলেন, শোকের মধ্যেও মহিউদ্দিন চৌধুরীর শূন্য চেয়ারে বসা নিয়ে নেতাদের তোড়জোর শুরু হয়ে গেছে।

এ বিষয়ে মহিউদ্দিন চৌধুরীর বড় ছেলে ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল ঢাকাটাইমসকে বলেন, এসব নিয়ে এখন কথা বলার ইচ্ছা আমার নেই। আমাদের পুরো পরিবার শোকের মধ্যে সময় পার করছে। নেতাকর্মীরাও এখনো শোক কাটিয়ে উঠতে পারেননি।

নওফেল বলেন, তবে এটাই বলব, আমার বাবা ১৭ বছর চট্টগ্রামের মেয়র ছিলেন। দীর্ঘ একযুগ নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন। খালেদা-এরশাদবিরোধী আন্দোলনে চট্টগ্রামের মাঠে তিনিই ছিলেন। নিজ দল ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় চট্টগ্রাম বন্দর বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেয়ার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। বন্দরসহ সরকারি প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতি, চট্টগ্রামের স্বার্থের প্রশ্নে বারবার রাজপথে দাঁড়িয়েছেন।

মহিউদ্দিনপুত্র বলেন, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ আর শেখ হাসিনার নেতৃত্বের রাজনৈতিক মতাদর্শই আমার বাবা আমাকে দিয়ে গেছেন। এই প্রক্রিয়ার মধ্যেই আমি সবার সমর্থন প্রত্যাশা করছি। সবার সঙ্গে সমন্বয় করেই আমি সামনের দিকে এগিয়ে যাব।

মহিউদ্দিন চৌধুরীর একনিষ্ঠ অনুসারী নগর আওয়ামী লীগের সাত নম্বর সহ-সভাপতি খোরশেদ আলম সুজন বলেন, আমি অষ্টম শ্রেণি থেকেই মহিউদ্দিন ভাইয়ের সঙ্গে রাজনীতি করছি। তার রাজনীতি দিয়েই আমাদের মতো ভাবশিষ্য তৈরি করেছেন। অনুসারীরা মহিউদ্দিন ভাইয়ের ভাবশিষ্য হিসেবে আমাকে ভালোবাসেন। তবে আমি চাই, মহিউদ্দিন ভাইয়ের সুযোগ্য সন্তান নওফেল কেন্দ্রীয় রাজনীতির পাশাপাশি চট্টগ্রামেও যেন হাল ধরেন। আমরা নওফেলকে সহযোগিতা করে যাব।

মেয়র আ জ ম নাছিরকেন্দ্রিক নগর আওয়ামী লীগের বর্তমান সহ-সভাপতি ডা. আফছারুল আমিনের অনুসারী সহ-সভাপতি ইব্রাহিম হোসেন চৌধুরী বাবুল ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘রাজনৈতিক উত্তরসূরি বসিয়ে দেয়ার জিনিস নয়। মহিউদ্দিন ভাই নিজের কর্ম দিয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। কর্মের মধ্য দিয়েই মাঠ থেকে উঠে আসবেন মহিউদ্দিন ভাইয়ের উত্তরসূরি। যিনি উনার আদর্শের লাখ লাখ কর্মীকে নেতৃত্ব দেবেন।’

নগর আওয়ামী লীগের চার নম্বর সহসভাপতি ডা. আফছারুল আমীন ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘নগর আওয়ামী লীগের কমিটি মেয়াদোত্তীর্ণ। তবে আওয়ামী লীগের মতো একটা গণসংগঠনের কমিটির মেয়াদ তিন-চার বছর উত্তীর্ণ হওয়া খুব একটা অস্বাভাবিক নয়। দেশের কোনো জেলা কিংবা মহানগরে চার বছরের মধ্যে কমিটি ভেঙে দেয়ার রেওয়াজ নেই। এ অবস্থায় কেউ একজনকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি করতে কার্যনির্বাহী কমিটির সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য দলীয় সভানেত্রীর কাছে মত দিতে পারেন।’

নগর আওয়ামী লীগের পাঁচ নম্বর সহসভাপতি নুরুল ইসলাম বিএসসি ঢাকাটা্মসিকে বলেন, ‘কমিটি কি ভেঙে দেয়া হবে নাকি কাউকে ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হবে তা নির্ভর করবে কার্যনির্বাহী কমিটির সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতাদের মতামতের ওপর। তবে কার্যনির্বাহী কমিটি এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে বলে আমার মনে হয় না। দলীয় সভানেত্রী এ নিয়ে সিদ্ধান্ত দিলে খুব ভালো হয়।’

প্রসঙ্গত, ২০১৩ সালের ১৩ নভেম্বর চট্টগ্রাম নগর আওয়ামী লীগের ৭১ সদস্যের সর্বশেষ কমিটি গঠিত হয়েছিল। তিন বছরের জন্য গঠিত এ কমিটি গত ১৩ নভেম্বর চার বছর মেয়াদ পার করেছে। এ নিয়ে দলীয় নেতারা কোনো সময় উচ্চবাচ্য না করলেও মহিউদ্দিন চৌধুরীর মৃত্যুর পর সভাপতির পদ শূন্য হওয়ায় কমিটির মেয়াদ নিয়েও কথা তুলেছেন নেতারা।

নগর আওয়ামী লীগের এক নম্বর যুগ্ম সম্পাদক রেজাউল করিম চৌধুরী এ প্রসঙ্গে ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘সহ-সভাপতিদের মধ্যে অনেকেই বয়সের ভারে ন্যুব্জ। তাই আমি মনে করছি, কাউকে ভারপ্রাপ্তের দায়িত্ব না দিয়ে আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে ডাইনামিক লিডারশিপ তৈরি করা উচিত।’

তবে দায়িত্বশীল নেতাদের অনেকেই মনে করছেন, ভারপ্রাপ্ত সভাপতি নির্ধারণে গঠনতন্ত্র অনুযায়ী নগর আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটি ইচ্ছা করলে এ বিষয়ে সভা ডাকতে পারেন। কিন্তু তর্ক-বিতর্ক এড়াতে নেতারা চাইছেন, কেন্দ্র থেকেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসুক।

আওয়ামী লীগের চট্টগ্রাম বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক এনামুল হক শামীম এ প্রসঙ্গে ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম নগর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের সংকট নিরসন করা হবে। কিন্তু এ বিষয়ে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী সহসা সিদ্ধান্ত নেবেন বলে মনে হয় না। এ নিয়ে সিদ্ধান্ত আসতে অন্তত মাস দেড়েক সময় লাগতে পারে।’

গত ১৪ ডিসেম্বর ভোর রাত সাড়ে ৩টায় নগরীর ম্যাক্স হাসপাতালে জীবনাবসান ঘটে চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*