Home / আদালত / রাষ্ট্রপক্ষ তারেক-বাবরসহ ৩৮ জনের প্রাণদণ্ড চাইল

রাষ্ট্রপক্ষ তারেক-বাবরসহ ৩৮ জনের প্রাণদণ্ড চাইল

রাষ্ট্রপক্ষ ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ ৩৮ আসামির সর্বোচ্চ দণ্ড চেয়ে যুক্তি উপস্থাপন শেষ করেছে । একই সঙ্গে ১১ সরকারি কর্মকর্তার সাত বছর কারাদণ্ডও চেয়েছে রাষ্ট্রপক্ষ। এই মামলায় মঙ্গলবার যুক্তি উপস্থাপন করবে রাষ্ট্রপক্ষ।

বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম নৃশংস এই হামলার পর মামলা নিয়ে নানা ঘটনা ঘটেছে। বিএনপিণ্ডজামায়াত জোট সরকারের আমলে প্রকৃত আসামিদেরকে বাদ দিয়ে সাজানো আসামি করার ঘটনা ফাঁস হয় ওই সরকারের আমলেই। পরে তত্ত্বাবধায়ক সরকার একবার এবং পরে আওয়ামী লীগ সরকার আরেক দফা তদন্ত করেছে এই মামলায়।

দ্বিতীয় তদন্ত প্রতিবেদন জমা পড়ার পর ৫২ জনের বিচার শুরু হয় ২০১২ সালে। প্রায় ছয় বছর চলার পর মামলাটি রায়ের পর্যায়ে এসেছে।

তোলপাড় রাষ্ট্রপক্ষ এই মামলায় মোট ২৫ দিন য্ুিক্ত উপস্থাপন করেছে। নতুন বছরের প্রথম দিন সোমবার যুক্তি উপস্থাপনের শেষ দিন সৈয়দ রেজাউর রহমান দাবি করেন, আসামিদের বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণ হয়েছে। তিনি তাদের দৃষ্টান্তমূলক দণ্ডের স্বপক্ষে বিভিন্ন মামলায় দেয়া উচ্চতর আদালতের বেশকিছু সিদ্ধান্ত তুলে ধরেন।

মঙ্গলবার আসামিপক্ষকে যুক্তি উপস্থাপনের নির্দেশ দিয়ে বিচারক শাহেদ নূর উদ্দিন বলেন, ‘রাষ্ট্রপক্ষ এ পর্যায়ে যুক্তিতর্কের সমাপ্তি ঘোষণা করলেন। পলাতক আসামিদের পক্ষে রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবীরা মঙ্গলবার যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করবেন। ’

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী সৈয়দ রেজাউর রহমান বলেন, ‘২০০৪ সালের ২১ আগস্ট পরিচালিত ওই গ্রেনেড হামলার লক্ষ্য ছিলো আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বকে হত্যা করা। এতে করে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বশূন্য হতো। যাতে ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা  ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে নেতৃত্বশূন্য করে দেশকে ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করার অসৎ উদ্দেশ্য।’

আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ১২০ণ্ডবি, ৩২৪, ৩২৬, ৩০৭, ৩০২, ১০৯ ও ৩৪ এবং বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের ৩, ৪ ও ৬ ধারায় অভিযোগ গঠন হয়। দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় মানুষ হত্যার অভিযোগে এবং ১২০ণ্ডবি ধারায় হত্যার অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের অভিযোগের উভয় ধারায় সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড এবং সর্বনি¤œ যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।

অন্যদিকে বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের ৩ ধারায় বিস্ফোরক দ্রব্য দিয়ে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে প্রাণহানির অভিযোগে এবং ৬ ধারায় অর্থ, পরামর্শ ও বিস্ফোরক দিয়ে সহায়তার অভিযোগে একই দণ্ডের বিধান রয়েছে।

যাদের মৃত্যুদণ্ড চাওয়া হয়েছে
মৃত্যুদণ্ড দাবি করা ৩৮ আসামির মধ্যে তারেক রহমান ছাড়াও রাজনীতিবিদদের মধ্যে আছেন বিএনপিণ্ডজামায়াত জোট সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর ওই সরকারের উপমন্ত্রী আব্দুস সালাম পিন্টু, বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী, বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য কাজী শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন কায়কোবাদ, বিএনপি দলীয় ওয়ার্ড কমিশনার আরিফুল ইসলাম আরিফ।

জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা এনএসআই এর সাবেক মহাপরিচালক আবদুর রহিম ও রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরীরও মৃত্যুদণ্ড দাবি করা হয়েছে। এর বাইরে এ ছাড়া হানিফ এন্টার প্রাইজের মালিক মো. হানিফেরও একই দণ্ড চেয়েছে রাষ্ট্রপক্ষ।

অন্যরা হলেন: সাবেক উপমন্ত্রী আব্দুস সালাম পিন্টুর ভাই মাওলানা তাজউদ্দিন, জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদ নেতা আব্দুল মালেক ওরফে গোলাম মোহাম্মাদ ওরফে জিএম, শেখ আব্দুস সালাম, কাশ্মিরি নাগরিক আব্দুল মাজেদ ভাট, আব্দুল হান্নান ওরফে সাব্বির, মাওলানা ইয়াহিয়া, মাওলানা আব্দুর রউফ ওরফে পীর সাহেব, মাওলানা শাওকত ওসমান ওরফে শেখ ফরিদ, হাফেজ মাওলানা ইয়াহিয়া, মুফতি শফিকুর রহমান, মুফতি আব্দুল হাই, বাবু ওরফে বাতুল বাবু, মুফতি হান্নানের ভাই মুহিবুল্লাহ মফিজুর রহমান ওরফে অভি, মাওলানা আবু সাইদ ওরফে ডাক্তার জাফর, আবুল কালাম আজাদ ওরফে বুলুবুল, জাহাঙ্গীর আলম, হাফেজ মাওলানা আবু তাহের, শাহাদত উল্যাহ ওরফে জুয়েল, হোসাইন আহমেদ তামিম, মইনুদ্দিন শেখ ওরফে আবু জান্দাল, আরিফ হাসান সুমন, মো রফিকুল ইসলাম সবুজ, উজ্জ¦ল ওরফে রতন, জাহাঙ্গীর আলম বদর, মো. ইকবাল, আবু বকর ওরফে হাফেজ সেলিম হাওলাদার ও লিটন ওরফে মাওলানা লিটন।

ভারতে জঙ্গি হামলার অভিযোগে বন্দী দুই ভাই মহিবুল মুত্তাকিন ওরফে মুত্তকিন, আনিসুল মুরছালিন ওরফে মুনছালিনেরও সর্বোচ্চ দণ্ড চেয়েছে আদালত।

যাদের কারাদণ্ড চাওয়া হয়েছে
সাত বছর কারাদণ্ড চাওয়া ১১ জনের মধ্যে আছেন জোট সরকারের আমলে এই তদন্ত ভিন্নখাতে নেওয়া সাবেক বিশেষ পুলিশ সুপার রুহুল আমিন, সিআইডির সিনিয়র এএসপি মুন্সি আতিকুর রহমান, এএসপি আব্দুর রশীদ।
বাকি আট জন হলেন, সাবেক পুলিশ প্রধান আশরাফুল হুদা ও শহুদুল হক, সবেক ডিসি পূর্ব ওবায়দুর রহমান, সবেক ডিসি দক্ষিণ খান সাইদ হাসান, খালেদা জিয়ার ভাগ্নে লে. কমান্ডার (অব.) সাইফুল ইসলাম ডিউক ও লে. কর্নেল (অব.) সাইফুল ইসলাম জোয়ারদার, মেজর (অব.) এটিএম আমিন, সাবেক আইজিপি খোদা বক্স চৌধুরী।

কারণ দণ্ডবিধির ২০১, ২১২, ২১৭, ২৩০ ও ২১৮ ধারায় উক্ত আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন হয়। ওই ধারায় সর্বোচ্চ শাস্তি সাত বছরের কারাদণ্ড।

মামলা দুইটিতে মোট আসামি সংখ্যা ছিল ৫২ জন। বিচার চলাকালে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে জামায়াত নেতা আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদের এবং জঙ্গি হামলা মামলায় হরকাতুল জিহাদ নেতা মুফতি হান্নান ও শরিফ শাহেদুল ইসলাম বিপুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ায় তাদের এই মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
তদন্ত ও বিচারে দীর্ঘসূত্রতা

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনের জনসভায় গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। শেখ হাসিনাকে মানববর্ম বনিয়ে রক্ষা করেন নেতাণ্ডকর্মীরা। তবে আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদিকা ও প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের স্ত্রী আইভি রহমানসহ ২৪ জন নিহত হয়। আহত হন শতাধিত নেতাকর্মী।

এ ঘটনায় মতিঝিল থানার উপপরিদর্শক ফারুক হোসেন, আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল জলিল ও সাবের হোসেন চৌধুরী বাদী হয়ে মতিঝিল থানায় তিনটি এজাহার দায়ের করেন।

বিএনপিণ্ডজামায়াত জোট সরকারের আমলে এই মামলাটি ইচ্ছা করেই ভিন্নখাতে নেয়ার অভিযোগ আছে। নিরীহ জজ মিয়াকে এই মামলায় ফাঁসানোর চেষ্টা করে পুলিশ। পরে জজ মিয়ার মা সব ফাঁস করে দেন গণমাধ্যমে।

সেনাণ্ডসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে এই মামলায় বিএনপি নেতা সাবেক উপণ্ডমন্ত্রী আব্দুস সালাম পিন্টু, মুফতি আব্দুল হান্নানসহ ২২ আসামির বিরুদ্ধে প্রতিবেদন দেয় পুলিশ। আর ২০০৮ সালের ২৯ অক্টোবর অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় বিচার।

এরপর আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অধিকতর তদন্ত করে তারেক রহমানসহ ৩০ জনকে অভিযুক্ত করা হয়। ২০১২ সালের ১৮ মার্চ অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে বিচার শুরু হয় তাদের বিরুদ্ধে।

চলতি বছর ৩০ মে মামলাটিতে সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয়। গত ১২ জুন মামলাটিতে জামিনে ও কারাগারে থাকা ৩১ আসামির আত্মপক্ষ শুনানি শুরু হয়, যা গত ১১ জুলাই শেষ হয়।

আত্মপক্ষ শুনানিতে জামিনে ও কারাগারে থাকা ৩১ আসামির সকলেই নিজেদের নির্দোষ দাবি করে। এরপর শুরু হয় সাফাই সাক্ষ্য গ্রহণ। কারাগারে থাকা ২৩ আসামির মধ্যে ২০ জন আসামি সাফাই সাক্ষ্য দেয়।

গত বছর ১১ অক্টোবর মামলা দুইটিতে আসামিপক্ষের সাফাই সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয়। এরপরই গত বছর ২৩ অক্টোবর থেকে যুক্তিতর্ক শুরু হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Skip to toolbar