Home / সম্পাদকীয় / দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে দোষীদের

দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে দোষীদের

নিজ বাসায়ও নিরাপদ থাকছে না মানুষ। সমাজে যেভাবে খুনখারাবি বাড়ছে তাতে স্বাভাবিক মৃত্যুর কোনো গ্যারান্টি দিতে পারছে না কেউ। প্রতিদিনই নৃশংস সব হত্যার ঘটনা ঘটছে। দেশের সুশীল সমাজ, মানবাধিকার সংস্থা, বিভিন্ন সামাজিক–সাংস্কৃতিক সংগঠন, এমনকি গণমাধ্যমও হত্যাকান্ডের বিরুদ্ধে সোচ্চার। কিন্তু হত্যাযজ্ঞ থামছে না। প্রকাশ্যে খুন হচ্ছে, ঘরেও হচ্ছে খুন! ফলে ক্রমেই মানুষ নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়ছে।

দুর্বৃত্তদের ছুরিকাঘাতে গত মঙ্গলবার নগরীতে প্রকাশ্যে খুন হয়েছে এক স্কুল ছাত্র। নিহত আদনান ইসফার (১৪) চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্র। সে খাগড়াছড়ির এলজিইডির প্রকৌশলী আদনান আখতারুল আজমের ছেলে। বেলা আড়াইটার দিকে নগরীর জামালখানস্থ আইডিয়্যাল স্কুলের সামনে এ ঘটনা ঘটে। এমন হত্যাকান্ড ক্রমেই বাড়ছে। এটি আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। নিজগৃহ একজন মানুষের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ স্থান। সেখানেও খুন হচ্ছে মানুষ। জামালখানের মতো ব্যস্ত এ এলাকায়ও সবার সামনে খুন করা হলো কিশোর আদনানকে। এ হলো নিরাপত্তার ঘাটতি, সুশাসনের অভাব, যা খুবই দুঃখজনক।

কিশোরদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ হত্যা, ছিনতাই, মাদকসেবন, ইভটিজিং ইত্যাদিসহ এমন সব ভয়াবহ কাজ করছে এবং এমন সব লোমহর্ষক কর্মকান্ডের সাথে যুক্ত হচ্ছে যা কি না অকল্পনীয়। বিষয়টি সমাজবিজ্ঞানী, অপরাধবিজ্ঞানী, আইনবিদ ও সুশীলসমাজকে গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলছে। একবিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে সভ্যতার এ চরম উৎকর্ষের যুগে আমাদের আগামী দিনের আশা ভরসার স্থল কিশোরসমাজের এ ব্যাপক বিপর্যয় সত্যিই বড় দুঃখ ও দুর্ভাগ্যজনক। আমরা জানি, কিশোর অপরাধের ক্ষেত্রে সঙ্গ দলের প্রভাব একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিশোর–কিশোরীরা এই বয়সে পরিবারের প্রভাবমুক্ত হয়ে স্বাধীনভাবে চলতে চায় এবং পাড়া–প্রতিবেশী, খেলার সাথি ও সমবয়সীদের সাথে মিলে মিশে একাকার হয়ে যায়। এ ধরনের সম্পর্কের মাধ্যমে শিশু–কিশোররা অত্যন্ত সহজে ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষা লাভ করতে পারে, যা পিতা–মাতা, আত্মীয়–স্বজন বা পরিবার–পরিজনের নিকট থেকে তা করতে পারে না। সুতরাং সঙ্গী–সাথিদের মধ্যে কেউ অসৎ প্রকৃতির বা অপরাধপ্রবণ থাকলে তাদের প্রভাবে অনেক সময় কিশোর–কিশোরীরা অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে।

সন্ত্রাসী গডফাদাররা কিছু কিছু কিশোরকে টার্গেট করে তাদের দ্বারাই মূলত বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজ সংঘটিত করছে আর এসব অপরাধী বেপরোয়াভাবে হত্যা, অপহরণ, ছিনতাই, চাঁদাবাজি থেকে শুরু করে প্রতিদিনই বিভিন্ন অপরাধে অংশ নিচ্ছে। আন্ডারওয়ার্ল্ডের ভয়ংকর সন্ত্রাসীরা এদের নিয়ন্ত্রণ করছে। ঢাকা–চট্টগ্রাম মহানগরসহ সারাদেশে দাবড়ে বেড়াচ্ছে এসব অপরাধী। কিন্তু আইন–শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এদের গ্রেফতার করতে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে। মাঝে মধ্যে দু’একদল ধরা পড়লেও অধিকাংশই থেকে যাচ্ছে ধরা–ছোঁয়ার বাইরে। আর এসব কিশোর অপরাধীর সন্ত্রাসী গডফাদারদের তো কেশাগ্র স্পর্শ করা যায় না। তারা সব সময়ই থাকে নিরাপদে। একথা স্বীকার না করার উপায় নেই যে, সামাজিক অস্থিরতাসহ নানা কারণে শিশু–কিশোররা সন্ত্রাসী গডফাদারদের স্বার্থের ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

একের পর এক খুনের ঘটনার শাস্তি না হওয়ায় এ রকম অপরাধের ঘটনা বাড়ছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। নিরাপত্তাহীনতা এমন পর্যায়ে এসে ঠেকেছে যে, ছোটখাটো ঘটনাতেও মানুষ খুন হচ্ছে। এ ধরনের পরিস্থিতি কিছুতেই কাম্য নয়। জননিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে সর্বত্র। সুশাসনও প্রতিষ্ঠিত হয় না। আর সুশাসন প্রতিষ্ঠিত না হলে একটি সমাজের কাঙ্খিত উন্নয়ন কখনো সম্ভব নয়। এ কারণেই জনমনে নিরাপত্তাবোধ ফিরিয়ে আনার কোনো বিকল্প নেই। সুশাসন প্রতিষ্ঠায় জনসাধারণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে সবার আগে। এ জন্য সব হত্যাকান্ডের যথাযথ তদন্ত এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। জানমালের নিরাপত্তা পাওয়া জনগণের অধিকার, কোনো অনুকম্পার বিষয় নয়। বিপদগ্রস্ত মানুষ ন্যায় বিচার ও সেবা পাওয়ার আশায় পুলিশের শরণাপন্ন হয়। সেবাধর্মী জনবান্ধব প্রতিষ্ঠানের সদস্য হিসেবে পুলিশের সকল সদস্যকে সেবার মনোভাব নিয়ে দায়িত্ব পালন করতে হবে। জামালখানে স্কুল ছাত্র খুন হওয়ার ঘটনা পুরো আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য লজ্জা, দুঃখ ও বিব্রতকর। এ হত্যাকান্ডের কূলকিনারা খুঁজে না পেলে এবং দোষী ব্যক্তিদের শাস্তি দেওয়া না গেলে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হবে মারাত্মকভাবে। কেননা ঘটনা যেখানে যখন যেভাবে ঘটুক না কেন, প্রশাসন তার দায় এড়াতে পারে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*