Home / চট্টগ্রাম / চট্টগ্রাম নগরীর ফ্লাইওভারগুলো দিন দিন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে

চট্টগ্রাম নগরীর ফ্লাইওভারগুলো দিন দিন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে

নিরাপত্তা বেষ্টনী পর্যাপ্ত নয় চট্টগ্রামের ফ্লাইওভারগুলোর। বহদ্দারহাট ও আখতারুজ্জামান ফ্লাইওভারে ডিভাইডার থাকলেও কদমতলী ও দেওয়ানহাট ফ্লাইওভারে নেই। অধিকাংশ সময়ই এসব ফ্লাইওভারের ওপর দিয়ে অতিরিক্ত গতিতে যানবাহন চলাচল করে। ফ্লাইওভারগুলোয় যান চলাচল তুলনামূলক কম থাকায় ওভারটেকিংয়ের প্রবণতাও বেশি। এসব অব্যবস্থাপনায় ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে চট্টগ্রাম নগরীর ফ্লাইওভারগুলো। মাঝেমধ্যেই ঘটছে দুর্ঘটনা। সর্বশেষ গত ২৫ জানুয়ারিও আখতারুজ্জামান ফ্লাইওভারে দুই যানের মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রাণ হারিয়েছেন একজন।

২০১৭ সালের মাঝামাঝি খুলে দেয়া হয় আখতারুজ্জামান ফ্লাইওভার। চালুর পর থেকেই ফ্লাইওভারের ওপর একাধিক দুর্ঘটনায় বেশ কয়েকজন হতাহত হয়েছেন। সম্প্রতি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হওয়া ফ্লাইওভারের লুপ ও র্যাম্প নির্মাণের কাজ চলমান থাকায় ফ্লাইওভারটির একটি লেন বন্ধ রেখেছে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান। মাত্র একটি লেন দিয়ে উভয়মুখে যান চলাচলের কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরো বেড়েছে। বৃহস্পতিবার ফ্লাইওভারটিতে একজন নিহত হওয়ার আগে ২০১৭ সালের ৫ নভেম্বর দুর্ঘটনায় একজন মোটরসাইকেল আরোহী প্রাণ হারান। একই বছরের ৮ সেপ্টেম্বর লালখান বাজার এলাকায় ফ্লাইওভারের ওপর বাসের ধাক্কায় নিহত হন আরো এক মোটরসাইকেল আরোহী। ওই মাসেই মোটরসাইকেলের আরো দুই আরোহী দুর্ঘটনায় নিহত হন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আক্তারুজ্জামান ফ্লাইওভারের প্রবেশ ও বহির্গমনের মুখে যানজট লেগে থাকায় দুর্ঘটনায় পড়ছে বিভিন্ন যানবাহন। আনুষ্ঠানিকভাবে চালুর পর এখন পর্যন্ত পথিমধ্যে কোনো ট্রাফিক সাইন না বসানোর কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে।

চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. জাহাঙ্গীর আলম এ প্রসঙ্গে বলেন, ফ্লাইওভারে দক্ষ ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার অভাব রয়েছে। পর্যাপ্ত লাইটিং ও ট্রাফিক সাইনের ব্যবহার না বাড়ানো গেলে ফ্লাইওভার আরো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠবে।

তবে ঝুঁকিমুক্তভাবে যাতে যান চলাচল করতে পারে, সেজন্য শিগগিরই বন্ধ লেনটি খুলে দেয়া হবে বলে জানান চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) নির্বাহী প্রকৌশলী ও আখতারুজ্জামান ফ্লাইওভারের প্রকল্প পরিচালক মো. মাহফুজুর রহমান।

তিনি বলেন, চট্টগ্রাম শহরের যানজট নিরসনের স্বার্থে নির্মাণকাজ শতভাগ শেষ না করেই আখতারুজ্জামান ফ্লাইওভার যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়েছে। সম্প্রতি লুপ ও র্যাম্প নির্মাণের জন্য একটি লেন বন্ধ রাখতে হচ্ছে। লুপ ও র্যাম্পের কাজ শেষ হয়ে আসায় কয়েক দিনের মধ্যেই বন্ধ লেনটি খুলে দেয়া হবে।

১৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে চট্টগ্রামে প্রথম বহদ্দারহাট ফ্লাইওভার নির্মাণ করে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। ১ দশমিক ৩৩ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের ফ্লাইওভারটির নির্মাণ কাজ ২০১০ সালে শুরু হয়ে শেষ হয় ২০১৩ সালে। মাঝে ২০১২ সালে নির্মাণ ত্রুটিতে ফ্লাইওভারের গার্ডার ধসে ১৩ জন নিহত হন। বড় এ দুর্ঘটনার কিছুদিন আগেও ফ্লাইওভারটির একটি গার্ডার ধসে পড়ে। যদিও ওই ঘটনায় কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। তবে ২০১৬ সালে ফ্লাইওভারটি থেকে নিচে নামার সময় পণ্যবাহী ট্রাকের ধাক্কায় নিহত হন দুই অটোরিকশাযাত্রী।

লুপ চালু হওয়ার প্রায় তিন বছর পর সিডিএ ফ্লাইওভারটিতে ৩০০ মিটারের র্যাম্প নির্মাণ করে। গত বছরের ১৬ ডিসেম্বর র্যাম্পটি উদ্বোধন করা হয়। তবে মূল ডিজাইনের বাইরে র্যাম্প নির্মাণ করায় বহদ্দারহাট ফ্লাইওভারের সঙ্গে র্যাম্পটি কৌণিকভাবে সংযুক্ত হয়েছে। স্বাভাবিক নিয়মে সড়কের যেকোনো সংযুক্তি অর্ধবৃত্তাকার হওয়ার কথা থাকলেও কৌণিক অবস্থানের কারণে ফ্লাইওভারটিতে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

২০১২ সালে কাজ শুরু হয়ে ১ দশমিক ১ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের সড়ক বিভাজক বা ডিভাইডারবিহীন কদমতলী ফ্লাইওভারটি উদ্বোধন হয় ২০১৫ সালে। যদিও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেকোনো ফ্লাইওভারে ডিভাইডার দেয়া জরুরি। এছাড়া স্পিড ব্রেকার না থাকলেও ফিউশন ব্রেকার (সীমিত গতিরোধক) দেয়া উচিত। তা না হলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকবেই।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নগর পরিকল্পনাবিদ বলেন, চট্টগ্রামের ফ্লাইওভারগুলো নির্মাণের আগে যথাযথভাবে সম্ভাব্যতা যাচাই হয়নি। এরপর দুটি ফ্লাইওভারের মূল কাজ শেষ হওয়ার পর লুপ ও র্যাম্প নির্মাণ করা হচ্ছে। এতে ফ্লাইওভারের মূল কাঠামোর সঙ্গে লুপ ও র্যাম্পগুলোর সমন্বয় থাকছে না। একটি আধুনিক ও নিরাপদ ফ্লাইওভারের জন্য দক্ষ ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, ট্রাফিক আইন বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি এবং ট্রাফিক আইন অমান্যকারীদের যথাযথ আইনের আওতায় আনা জরুরি। কিন্তু চট্টগ্রামের ফ্লাইওভারগুলোয় পরিকল্পিত কোনো ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নেই।

সিডিএর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাহফুজুর রহমান এ প্রসঙ্গে বলেন, ফ্লাইওভারে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব ট্রাফিক বিভাগের। এরই মধ্যে ফ্লাইওভারে যানবাহন চলাচলের একাধিক সতর্কতামূলক সাইন সংবলিত ব্যানার-পোস্টার লাগানো হয়েছে। দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমিয়ে আনার বিষয়টি আমরা শিগগিরই ট্রাফিক বিভাগকে অবহিত করব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Skip to toolbar