Home / Alertnews.tv / যে ফিলিস্তিনি মেয়ে বলিউডের ভাষায় প্রতিবাদ করে যাচ্ছে

যে ফিলিস্তিনি মেয়ে বলিউডের ভাষায় প্রতিবাদ করে যাচ্ছে

ভিডিও তৈরি করে আয়া আব্বাসি প্রতি সপ্তাহে পূর্ব জেরুজালেমে তার ঘর বা অফিস কামরার কোনায় ক্যামেরা সেট করে নিজের ইউটিউব চ্যানেলের জন্য। ২৬ বছর বয়সী এই ফিলিস্তিনি নাগরিক হাজার হাজার আরবি ভাষাভাষীকে বলিউড ও হিন্দি-উর্দু সম্পর্কে শিখিয়ে যাচ্ছেন।আয়া হিন্দি-উর্দু শিখেছেন বলিউডের সিনেমা দেখে। তিনি আগে ঘরে বসেই ভিডিও তৈরি করতেন কিন্তু এখন এক টি প্রভাবশালী ইউটিউব চ্যানেলের সাথে চুক্তিবদ্ধ হওয়ায় পর অফিসে বসে ইউটিউবের জন্য ভিডিও তৈরি করেন আয়া।

জেরুজালেমের মুসলিম অধ্যুষিত এলাকার একটি বইয়ের দোকানে বসে তৈরি ভিডিওতে তার পিছনের বুকসেলফে ইসরাইল, ফিলিস্তিন, ইসরাইলের দখলদারিত্ব, ও মাহমুদ দারবিশের কবিতার বই দেখা যায়।

তার ইউটিউব চ্যানেলে আয়া বলেন, ‘এটা আমার জন্য করিনি। আমি একজন সাধারণ ফিলিস্তিনি। ফিলিস্তিন বললেই প্রথমেই মনে আসে ‘যুদ্ধ’। আমি ভিডিওগুলোর মধ্যমে এটা বদলাতে চাই। আমি চাই মানুষ জানুক আমরাও অন্য যে কারও মতই জীবন যাপন করি। অবশ্যই এটা যুদ্ধক্ষেত্র। আমাদের দেশ দখল করে রেখেছে, কিন্তু এর মানে এই নয় যে আমাদের কোনো কিছু দিয়ে দমিয়ে রাখা যাবে।’

‘আমাদের এখানেও মানুষ নতুন ভাষা শিখে। আমাদের এখানেও মানুষ ছবি তোলে। আমাদের দেশেও মানুষ অসাধারণ সব সিনেমা বানায়। আমাদের লেখা বই পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় অনুদিত হয়। আমাদের একটা স্বাভাবিক জীবন আছে। আমরা স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে চাই,’ ভিডিওতে বলেন আয়া।

মিডিয়াম-ক্লোজ শটে নেয়া আয়ার সব ভিডিওতে তার বড় বড় ডাগর চোখ, ডান গালের গভীর টোল আর নজরকাড়া রঙিন হিজাবে ঘেরা মুখ ফুটে ওঠে।

আয়া প্রথম ভিডিও তৈরি শুরু করেন ভারতীয়দের সাথে যোগাযোগ তৈরির উদ্দেশ্যে। ২০১২ সালে ভারতের স্বাধীনতা দিবসে তিনি একটি ভিডিও প্রকাশ করেন। ওই ভিডিওতে তিনি হিন্দি-উর্দুতে বলেন, ‘আমি ভারতের সব মানুষকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। তোমরা ভীষণ আনন্দে থাক এবং এই দিনটি তোমাদের দেশে বারবার ফিরে আসুক। আর আমি এই কামনাও করছি যেন আমাদের দেশেও যেন একদিন স্বাধীনতা দিবস পালন করা সম্ভব হয়। তখন আমরা সবাই একসাথে স্বাধীনতা উদযাপন করব।’

হিন্দি-উর্দুতে তার দক্ষতা দেখে ইউটিউবের কমেন্টে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও মিশরের অনেক মানুষ তাকে ভাষাটি শেখানোর আহ্বান জানান। কিন্তু আয়া প্রথমে বুঝতে পারেননি, হিন্দি ছবিতে যে ভাষা ব্যবহার করা হয় সেটা কী হিন্দি? নাকি উর্দু? নাকি হিন্দি-উর্দু?

হিন্দুস্তান টাইমসকে আয়া বলেন, ‘গুগলে সার্চ দিলে কোনো স্পষ্ট সংজ্ঞা পাওয়া যায় না। কেউ কেউ এটাকে বলেন হিন্দি, কেউ কেউ এটাকে বলেন উর্দু, কেউ কেউ এটাকে বলেন হিন্দি/উর্দু। পুরো বিষয়টাই ভীষণ গোলমেলে। আমার কাছে মনে এটাকে উর্দু বলাই ঠিক।’

হিন্দিতে তিনি নতুন ছবির ট্রেলার নিয়ে কথা বলেন। আরবিতে তিনি হিন্দি শেখান। জনপ্রিয় হিন্দি সিনেমা চালতে চালতে, হাম তুম, ককটেইল, ও তার প্রিয় সাল্লু ভাইয়ের (সালমান খান) ছবির ডায়লগ ব্যবহার করে হিন্দি শেখান আয়া।

‘কাভি খুশি কাভি গম’-এ শাহরুখ খানের বলা ‘জীবনে সফল হতে হলে, কিছু অর্জন করতে চাইলে…’ এই দীর্ঘ সংলাপটিসহ বিভিন্ন সিনেমার সংলাপের আক্ষরিক আরবি অনুবাদ ব্যবহার করে হিন্দি শেখান তিনি। আয়ার বেশিরভাগ ইউটিউব ভিডিও কয়েক হাজার বার দেখা হয়েছে, কিন্তু হিন্দি-উর্দু শেখানোর প্রথম ভিডিওটি এখন পর্যন্ত দেখা হয়েছে ৯ লক্ষ ২৩ হাজার ১০৪ বার।

আয়া কখনো ভারতে যাননি, কিন্তু প্রায় এক দশক ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে বলিউড সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়ে হিন্দি শিখেছেন তিনি। এক গ্রীষ্মের অলস বিকেলে ‘তাল’ সিনেমাটি দেখা শুরু করে এটির গান আর ঐশ্বরিয়ার রুপে মুগ্ধ হয়ে যান আয়া।

গোগ্রাসে হিন্দি সিনেমা গেলা শুরু করেন আয়া। হিন্দি গানের সুর গুনগুন করতে থাকেন। তিনি ও তার বোনেরা কথা বলার সময় হঠাত হঠাৎ হিন্দি শব্দ ব্যবহার করা শুরু করে।

মধ্যপ্রাচ্যে বলিউডের জনপ্রিয়তা নতুন কিছু নয়। জি এন্টারটেইনমেন্ট ১৯৯৪ সালে সেখানে সম্প্রচার শুরু করে এবং ২০০৮ সালে জি আফ্লাম আরবি সাবটাইটেল দিয়ে শুধুমাত্র হিন্দি ছবি প্রদর্শন শুরু করে। এরপর শুধু হিন্দি সিনেমা ও সিরিয়াল দেখাতে আরও নতুন নতুন চ্যানেল চালু হয়। কিন্তু ফিলিস্তিনে হিন্দি সিনেমার জনপ্রিয়তার কথা খুব বেশি মানুষ জানে না।

জেরুজালেমে আরব ড্রাইভাররা ‘আল হিন্দ’ বা ভারত থেকে পর্যটক দেখলে হিন্দি গান শোনানো শুরু করে। ২০১৫ সালে সেখানে তরুণ ফিলিস্তিনিরা হোলি বা রং মাখার উৎসব উদযাপন করেন।

নাবলুসের ট্যুর গাইড আমির আবু আলসৌদ হিন্দুস্তান টাইমসের প্রতিবেদককে ‘বর্ডার’ সিনেমাটি দেখার অনুভূতি জানাতে গিয়ে বলেন, ‘এটা দেখে ইসরাইল যেভাবে এখানকার সব আর পশ্চিম তীরে পাঁচশোরও বেশি বর্ডার নিয়ন্ত্রণ করছে সেকথা মনে পড়ে গিয়েছিল। কয়েকটি দৃশ্যে নাবলুসের চারপাশে অবরোধ থাকার ভয়ংকর সময়ের কথা মনে পড়ে গিয়েছিল। তখন সেখানে কেউ ঢুকতে বা সেখান থেকে বেরোতে পারত না।’

বলিউডের সিনেমার রক্ষণশীল পারিবারিক মূল্যবোধ ও সংযত পারিবারিক মূল্যবোধের সাথে নিজেদের সংস্কৃতির মিল খুঁজে পাওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের মানুষের কাছে এসব সিনেমা জনপ্রিয়।

কিন্তু এর মধ্যেও বিতর্ক আছে। আলসৌদ বলেন, তিনি যতবারই ভাবতেন এখন একটা চুম্বন দৃশ্য দেখা যাবে, ততবারই তাকে হতাশ হতে হত। অন্য দিকে, আয়া তার ছোট বোনদের স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন, ‘ইমরান হাশমি অভিনয় করলে, ওই ছবি দেখা তাদের জন্য সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।’

গত বছর দিওয়ান ভিডিও নামের একটি প্রতিষ্ঠান আয়াকে একজন প্রভাবশালী ভিডিও নির্মাতা হিসেবে আয়াকে চুক্তিবদ্ধ করে। গত বছর প্রভাবশালী ফোর্বস ম্যাগাজিন জানায়, দুবাই ও কায়রো ভিত্তিক ইউটিউব চ্যানেল দিওয়ান ভিডিওস আরব বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ইউটিউব চ্যানেল। তারা আয়ার ভিডিওগুলো প্রযোজনা করে এবং তাকে পরিকল্পনা তৈরিতে সহায়তা করে।

আয়ার বেশিরভাগ ভিডিওই আরবিতে তৈরি হলেও, সে এখনও ভারতীয় দর্শকদের উদ্দেশ্য করে ভিডিও প্রকাশ করে চলেছে। ভারতের জনসংখ্যা পৃথিবীর জনসংখ্যার পাঁচ ভাগের একভাগ। তার মতে, ‘আমি যদি তাদেরকে দেখাতে পারি, যে ফিলিস্তিন নামের একটা দেশ আছে… এখানে তাদের সিনেমা পছন্দ করে এমন অসংখ্য মানুষ আছে… সেটাই আমার জন্য যথেষ্ট।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Skip to toolbar