Home / চট্টগ্রাম / বৈপ্লবিক পরিবর্তন চট্টগ্রামে যোগাযোগ ব্যবস্থায় আসছে

বৈপ্লবিক পরিবর্তন চট্টগ্রামে যোগাযোগ ব্যবস্থায় আসছে

আগামী একশ বছর এগিয়ে যাবে চট্টগ্রামের যোগাযোগ ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক গতি আনতে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকার কাজ চলছে। এর আগে কোনো সরকার এই ধরনের উদ্যোগ নেয়নি উল্লেখ করে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা সিডিএ বলছে, প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রাম। একই সাথে দক্ষিণ চট্টগ্রামকে উন্নয়নের মূল স্রোতে যুক্ত করতে অন্তত এক লাখ কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ শুরু হয়েছে। আগামী দশ বছরে আরো অন্তত এক লাখ কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ হবে।

চট্টগ্রামের উন্নয়নে অধিকাংশ প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। সিডিএ চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম বলেন, মানুষ স্বপ্নেও ভাবেনি এমন সব উন্নয়ন কার্যক্রম শুরু হয়েছে। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে চট্টগ্রামের অবকাঠামোগত উন্নয়ন মানুষের প্রত্যাশা ছাড়িয়ে যাবে। যোগাযোগ, শিল্পায়ন, ব্যবসা–বাণিজ্য, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং পর্যটনে চট্টগ্রাম বহুদূর এগিয়ে যাবে।

তিনি বলেন, অতীতে বহু প্রধানমন্ত্রী এসেছেন। ভবিষ্যতেও বহু প্রধানমন্ত্রী আসবেন। কিন্তু শেখ হাসিনার মতো চট্টলদরদী আর কোনো প্রধানমন্ত্রী কোনোদিন আসেননি, আসবেনও না। তিনি উন্নয়নের জয়যাত্রা ধরে রাখতে সরকারের ধারাবাহিকতার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন।

চট্টগ্রামের উন্নয়নে ব্যাপক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকার চট্টগ্রামের যোগাযোগ ব্যবস্থায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। বিশ্বমানের একটি নগরী গড়ে তোলার জন্য চট্টগ্রামের রাস্তাঘাট এবং দক্ষিণ চট্টগ্রামকে উন্নয়নের মূল স্রোতে যুক্ত করতে সরকারের নানা পরিকল্পনা রয়েছে। এ জন্য পতেঙ্গা থেকে ফৌজদারহাট পর্যন্ত প্রায় ২৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৭ কিলোমিটার দীর্ঘ ৪ লেন বিশিষ্ট চট্টগ্রাম সিটি আউটার রিং রোড নির্মাণ করা হচ্ছে।

প্রকল্পটির কাজ ইতোমধ্যে ৭০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে উল্লেখ করে সিডিএ চেয়ারম্যান বলেন, সাগরপাড়ের বিশাল জনগোষ্ঠীর জানমাল রক্ষা ও ইপিজেডসহ দেশি–বিদেশি শিল্পকারখানাসমূহকে জলোচ্ছ্বাস থেকে রক্ষা করার জন্য ৩০০ ফুট চওড়া, ৩০ ফুট উঁচু উপকূল রক্ষা বাঁধের উপরে ১০০ ফুট চওড়া রাস্তা নির্মাণের কার্যক্রম দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে। আগামী বছরের জুন মাসে রাস্তাটি দিয়ে যান চলাচল করবে। উপকূল রক্ষায় এই বাঁধটিতে ১১টি ্যুইসগেটসহ শক্তিশালী ওয়েভ প্রটেকশন ওয়াল তৈরি করা হচ্ছে। এছাড়া পতেঙ্গা থেকে ফৌজদারহাট পর্যন্ত মূল সড়কটির সাথে মূল শহরের যোগাযোগ ব্যবস্থা নির্বিঘ্ন করার লক্ষ্যে র‌্যাব–৭ রোড, পোর্ট টোল রোড এবং সাগরিকা রোডণ্ডএই তিন রোডের সাথে ফিডার রোডের ব্যবস্থা রেখে প্রত্যেকটি ফিডার রোডের মাথায় বাংলাদেশে প্রথম ডাইমন্ড ইন্টারচেঞ্জ বা ডাবল রাউন্ডঅ্যাবাউট ব্রিজের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সিইপিজেডের সাথে এই রিং রোডের সরাসরি সংযোগ থাকার কারণে বর্তমানে সিইপিজেডের সম্মুখে যে ভয়াবহ যানজটের সৃষ্টি হয়, তার অবসান হবে।

তিনি বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের পণ্যবাহী হাজার হাজার যানবাহন ফিডার রোড হয়ে এই রিং রোড ব্যবহার করতে পারবে। তাই মূল শহরের যানজট বহুলাংশে কমে যাবে। চট্টগ্রাম শহরের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বাইপাস সড়ক হিসেবে ফৌজদারহাট হতে বায়েজিদ বোস্তামী পর্যন্ত বাইপাস সড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে। একটি বাইপাস রোডের অভাবে উত্তর চট্টগ্রামের রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, হাটহাজারী, রাউজান, রাঙ্গুনিয়া, কাপ্তাই এবং দক্ষিণ চট্টগ্রামের যানবাহনসমূহ মূল শহরের ভেতর দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে যাতায়াত করে। এতে করে শহরের অভ্যন্তরে ভয়াবহ যানজট সৃষ্টি হয়। ৩২১ কোটি টাকা ব্যয়ে ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ ৪ লেনের চট্টগ্রামের প্রথম বাইপাস সড়কটি আগামী বছরের জুন মাসে পুরোপুরি চালু হবে। তবে চলতি বছরেই সড়কটি দিয়ে যান চলাচলের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এই সড়ক ব্যবহার করে উত্তর ও দক্ষিণ চট্টগ্রামের যানবাহনগুলো শহরে প্রবেশ না করে যাতায়াত করতে পারবে। নগরীর যান চলাচলের ক্ষেত্রে এই সড়কটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

চাক্তাই থেকে কালুরঘাট পর্যন্ত ২,২৭৫ কোটি টাকার রিং রোড–২য় প্রকল্পটিও নগরীর সড়ক যোগাযোগের ক্ষেত্রে বড় ধরনের মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হবে। এছাড়া অক্সিজেন থেকে কুয়াইশ পর্যন্ত ৪৫ কোটি টাকার সড়ক এবং ৫০ কোটি টাকার বাকলিয়া এক্সেস রোড, ২৭০ কোটি টাকা ব্যয়ে শাহ আমানত সেতু থেকে বহদ্দারহাট পর্যন্ত ৬ লেনের এপ্রোচ রোড প্রকল্প নগরীর যান চলাচলের ক্ষেত্রে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি গতিশীলতা সৃষ্টি করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে।

সড়ক নির্মাণের উক্ত প্রকল্পগুলোর পাশাপাশি নগরীর পতেঙ্গা এলাকায় পাঁচ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি বিশ্বমানের পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলা হচ্ছে। একই সাথে দশ হাজার পর্যটকের বিচরণের সুযোগ সম্বলিত পর্যটন এলাকাটিতে শিশুদের বিনোদনের জন্য আলাদা ‘কিডস জোন’ রাখা হচ্ছে। সী ক্রুজের জন্য ১০ টি ফ্লোটিং জেটির সুবিধা রাখা হচ্ছে। ৫ কিলোমিটার পর্যটন এলাকায় রিসোর্টসহ সাগরপাড়ে বিশ্বমানের একটি পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলার কাজ শুরু হয়েছে। এখানে একই সাথে এক হাজার গাড়ি পার্কিং সুবিধা রাখা হচ্ছে। এছাড়া ফ্লাইওভার এবং টানেল নির্মাণসহ বিভিন্নভাবে চট্টগ্রামের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে বিশ্বমানে উন্নীত করা হচ্ছে।

সিডিএ চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম বলেন, বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে বিশেষত বাণিজ্যকেন্দ্রিক নগরসমূহে স্থাপিত বিমানবন্দরের সঙ্গে নগরের অন্যান্য অংশের যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ এবং উন্নততর করা হয়েছে। কিন্তু ঐতিহ্যের এই চট্টগ্রামের ক্ষেত্রে ঘটেছে ঠিক তার উল্টো। ঢাকা থেকে বিমানে চট্টগ্রাম আসতে সময় লাগে ৪০ মিনিট। ব্যাংকক থেকে আসতে সময় লাগে ১ ঘণ্টা ৪৫ মিনিট। সেখানে কেবলমাত্র উন্নত ও সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থার অনুপস্থিতির কারণে বিমানবন্দর থেকে মূল শহরে অবস্থিত কালুরঘাট এবং নাসিরাবাদ শিল্প এলাকায় আসতে সময় লাগে ৩ ঘণ্টারও বেশি। এ সকল বিরূপ পরিস্থিতির কারণে বিগত ১০ বছরে বৃহৎ কোনো বৈদেশিক বিনিয়োগকারী চট্টগ্রামে বিনিয়োগের উৎসাহ দেখাননি। অপরদিকে দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী এবং সম্ভাবনাময় বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত গার্মেন্টস শিল্পের যাত্রা চট্টগ্রাম থেকে শুরু হলেও বর্তমানে সহজ ও উন্নততর যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকার কারণে এই খাতে বন্ধ্যাত্ব বিরাজ করছে। বছর কয়েক আগেও চট্টগ্রাম থেকে গার্মেন্টস শিল্পে জাতীয় রপ্তানির পরিমাণ ৪০ শতাংশ থাকলেও বর্তমানে তা ১০ ভাগেরও নিচে নেমে এসেছে।

তিনি বলেন, অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো বিবেচনা করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ঐকান্তিক আগ্রহে একটি পরিকল্পিত অবকাঠামোগত উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দর ও বিমানবন্দরের সাথে চট্টগ্রামের শিল্প এলাকাসমূহ এবং সম্ভাবনাময় দক্ষিণ চট্টগ্রামসহ বৃহত্তর চট্টগ্রামের যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজতর করতে ভিন্ন ভিন্ন প্রকল্পের আওতায় একটি সমন্বিত বৃহৎ পরিকল্পিত উন্নয়ন কর্মযজ্ঞ সিডিএ বাস্তবায়ন করছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*