Home / রাজনীতি / ঘনিষ্ঠতা বিএনপির সঙ্গে ঘোষণা তৃতীয় শক্তি হওয়ার

ঘনিষ্ঠতা বিএনপির সঙ্গে ঘোষণা তৃতীয় শক্তি হওয়ার

কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই দুই প্রধান দলের বাইরে গিয়ে তৃতীয় শক্তি হওয়ার বাসনায় যুক্তফ্রণ্ট গঠনের ঘোষণা দেয়া চার রাজনীতিকের গত ছয় মাসে নিজেদের জোট শক্তিশালী করতে । বরং জোটের নেতা মাহমুদুর রহমান মান্না ইদানীং বিএনপি নেতাদের সঙ্গে বিভিন্ন আয়োজনে অংশ নিচ্ছেন। কথা বলছেন বিএনপির সুরেই।

এর মধ্যে যুক্তফ্রন্টের নেতারা শনিবার বিএনপির ইফতারে অংশ নিয়েছেন। সেখানে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঐক্যের আহ্বানও জানিয়েছেন।

আলোচিত পাঁচ রাজনীতিক গণফোরাম সভাপতি কামাল হোসেন, বিকল্পধারার সভাপতি এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) সভাপতি আ স ম আবদুর রব, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি আবদুল কাদের সিদ্দিকী আবদুল কাদের সিদ্দিকী ও নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদর রহমান মান্না গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে জোট গঠনের উদ্যোগ নেন।

গত ডিসেম্বরের শুরুর দিকে কামাল হোসেনকে বাইরে রেখে জোটের ঘোষণা দেন বাকি চার নেতা। নাম দেয়া হয় যুক্তফ্রন্ট। সে সময় কামাল হোসেন দেশের বাইরে থাকায় তিনি এই জোটে আসেননি বলে জানানো হয়। তবে দেশে ফিরে কামাল হোসেন জোটে যোগ দেননি।

যুক্তফ্রন্টের অন্যতম শরিক বদরুদ্দোজা চৌধুরী বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন নেতা আর মান্না ও কাদের সিদ্দিকী আওয়ামী লীগে সম্পৃক্ত ছিলেন।

১৯৯৬ সালের আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার দুই বছর পর কাদের সিদ্দিকী আওয়ামী লীগ ছেড়ে নতুন দল গঠন করেন। আর মান্না সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায় সরকারের আমলে দলে সংস্কারপন্থী হিসেবে পরিচিত হন আর পরে দল থেকে বহিষ্কৃত হন।

আরেক শরিক জেএসডি নেতা আ স ম আবদুর রব ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ঐক্যমতের সরকারে মন্ত্রী হন।

এর আগে জাতীয় পার্টি ক্ষমতায় থাকাকালে ১৯৮৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে প্রধান সব বিরোধী দল বর্জন করলেও তিনি ছোট ছোট অনেকগুলো দল নিয়ে ভোটে যান এবং সে সময় বিরোধীদলীয় নেতা হন রব।

জোট গঠনের আলোচনায় যাচ্ছেন যুক্তফ্রন্ট নেতারা। এই ছবিতে নেই কাদের সিদ্দিকী

জোট গঠনের আলোচনায় যাচ্ছেন যুক্তফ্রন্ট নেতারা। এই ছবিতে নেই কাদের সিদ্দিকী

২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে রাষ্ট্রপতি বানায় বিএনপি। পরে তাকে এই ছাড়তে বাধ্যও করা হয়। আর সে সময় আলাদা দল গঠন করার পর তার ওপর হামলাও হয় প্রকাশ্যে।

গত ডিসেম্বরে যুক্তফ্রন্ট ঘোষণার পর এর অন্যতম শরিক মান্না ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘দুই জোটের বিপরীতে নতুন একটা রাজনীতিক জোট গড়ার দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা ছিল আমাদের। সাধারণ মানুষও সেটা চাইছে। আমরা সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা পুরণে পথ চলা শুরু করেছি। আমরা মানুষের কাছে যাব। আশা করছি দুই রাজনৈতিক জোটের বাইরে বৃহৎ শক্তি নিয়ে আমরা রাজনীতিতে আবির্ভূত হতে পারব।’

তৃতীয় শক্তি হওয়ার ঘোষণা এর আগেও নানা সময় নানা পক্ষ থেকে এসেছে। সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে এটি একটি বহুল আলোচিত বিষয় ছিল। কিন্তু কার্যত বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বাইরে কেউ কখনও বড় হয়ে উঠতে পারেনি।

জাতীয় পার্টি ও জামায়াত নানা সময় জোট করে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আসনে জিততে পারলেও সারা দেশে তাদের শক্তি নেই। আর ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু রাজধানীতে দুটি দলের অবস্থানই শূন্যের কোটায়।

যুক্তফ্রন্টের ঐক্যবদ্ধ কোনো কর্মসূচি নেই। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বিএনপি নেতাদের সঙ্গেই অংশগ্রহণ কার তাদের সুরেই কথা বলার বিষয়ে জোটের অন্যতম উদ্যোক্তা মাহমুদুর রহমান মান্নার কাছে প্রশ্ন ছিল। জবাবে ঢাকাটাইমসকে তিনি বলেন, ‘এখন যারা ক্ষমতায় আছে তারা স্বোচ্ছাচারী। এই সরকারকারকে ক্ষমতা থেকে সরাতে একটি বৃহৎ আকারে ঐক্য দরকার। আমরা আমাদের মতো আন্দোলন করছি, আমরা একটি কল্যাণ রাষ্ট্রের জন্য আন্দোলন করছি। বিএনপিও জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়েছে। আমাদের থেকে বিএনপির বিপদ আরও বেশি। সবাই যার যার জায়গা থেকে গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন করছি। এখানে আমাদের ঐক্য হতেই পারে, সেটা আন্দোলনের জন্য।’

কিন্তু বিএনপির সঙ্গে যদি ঐক্য হয় তাহলে তৃতীয় শক্তি হয়ে উঠার বাসনার কী হবে?-এমন প্রশ্নে মান্না আবার বলেন, ‘আমাদের আন্দোলন মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার আন্দোলন। শেখ হাসিনার বিপক্ষে বা খালেদা জিয়ার পক্ষে নয়। বিএনপির সাথে আমাদের মাখামাখির বিষয় নয়, এটা গণতন্ত্রের বিষয়। আমি আওয়ামী লীগ বিএনপিকে একই পাল্লায় মাপি।’

আওয়ামী লীগ আর বিএনপি একই পাল্লায় মাপলেও বিএনপি নেতাদের সঙ্গে প্রায়শই কেন আলোচনায় যোগ দিচ্ছেন-জানতে চাইলে যুক্তফ্রন্ট নেতা বলেন, ‘বিএনপির সাথে মাখামাখির সুযোগ আমাদের কম, গণতান্ত্রিক আন্দোলনের জন্য এক সাথে দেখা যায়। আমরা একটি কল্যাণ রাষ্ট্রের জন্য আন্দোলন করছি। বিএনপিও তাদের ভিশনে কল্যান রাষ্ট্রের কথা বলেছে।’

আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতার কোনো সম্ভাবনা আছে কি না, এমন প্রশ্নে ডুক্তফ্রন্ট নেতা বলেন, ‘এরা ভোটের জন্য হেফাজতের সাথে হাত মিলায়, এরশাদের সাথে হাত মেলায়। বর্তমান অবস্থায় আওয়ামী লীগের সাথে সমোঝোতার কোন প্রশ্ন আসে না। তারা মানুষের ভোটের অধিকার কেড়ে নিয়েছে। দেশে এখন সংকট উত্তরণের পথ একটি গ্রহণ যোগ্য নির্বাচন, কিন্তু আওয়ামী লীগ একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করছে না।’

খালেদা জিয়ার কারাদণ্ড হওয়ার পর বিএনপি এবং সমমনাদের বাইরে তীব্র সমালোচনা করে বক্তব্য এসেছে মান্নার পক্ষ থেকে। তবে ঢাকাটাইমসকে তিনি বলেন, ‘আমরা খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য বলেছি, প্রতিবাদ করেছি। কিন্তু খালেদা জিয়ার আজকের অবস্থার জন্য তিনিই দায়ী। তিনি লোয়ার কোর্টকে স্বাধীনতা দেননি।’

যুক্তফ্রন্টের কোনো কাজ দৃশ্যমান নয় কেন-জানতে চাইলে জোট নেতা বলেন, ‘যুক্তফ্রন্টের কার্যক্রম আছে। কিন্তু সারা দেশের গণতন্ত্রের যে পরিবেশ, গণতন্ত্রহীনতার যে পরিবেশ তাতে কিছুতেই আমরা ভালো করে কাজ করতে পারিছি না।’

‘আমরা দেশের বহু জায়গায় কমিটি করেছি, তারা প্রকাশ হতে পারছে না। বের হলেই তাদের ‍বিরুদ্ধে হামলা মামলা করা হচ্ছে। বিভিন্ন ধরনের নির্যাতন করা হচ্ছে। কিন্তু আমাদের কাজটা অনেক দূর এগিয়েছে। তারা ভেতরে ভেতরে সক্রিয়ভাবেই যুক্তফ্রন্টের কাজ করে যাচ্ছে। আমরা তাদের সমর্থনও পেয়েছি।’

“দেশে ‘গণতন্ত্র পুণরুদ্ধারে’ আগামী আন্দোলনে যুক্তফ্রন্ট সক্রিয়ভাবে থাকবে। সেটা রাজপথের আন্দোলন হোক, নির্বাচনী আন্দোলন হোক, দেশের স্বাধীনতা, গণতন্ত্র পুণরুদ্ধারের আন্দোলন হোক আমরা ভালো ভূমিকা রাখতে পারব।”

যুক্তফ্রন্টের শরিক হওয়ার কথা ছিল কামাল হোসেনের। কিন্তু তিনি এই জোট যোগ না দিয়ে ডাক দিয়েছেন ‘জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ায়’।

এ বিষয়ে মান্না বলেন, ‘আমরা একসাথেই চেষ্টা করছিলাম গণতন্ত্র পুণরুদ্ধারের আন্দোলন সফল করার জন্য। যখন এটা ফাইনাল স্টেজে আছে তখন ওনি (ড. কামাল) আমাদের থেকে চলে গেছেন। কেন তিনি আমাদের থেকে আলাদা হয়ে গেলেন সেটা তিনিই বলতে পারবেন।’

‘জাতীয় ঐক্যপ্রক্রিয়ার অভিষ্ঠ লক্ষ্য আমি জানি না, যদিও যথেষ্ট শক্তিশালী বক্তব্য রেখেছেন। আমি আশা করব যে ওনি এ গণতান্ত্রিক আন্দোলনে প্রক্রিয়াগতভাবে সম্পৃক্ত হবেন।’

বিএনপির ৯২ দিনের আন্দোলনে ব্যাপক নাশকতা. একুশে আগস্টের গ্রেনেড হামলার বিষয়ে যুক্তফ্রন্টের অবস্থান কী-এমন প্রশ্নে মান্না বলেন, ‘এগুলো প্রাসঙ্গিক তো না, এখন যদি ওই ৯২ দিনের সমালোচনা করি, তাতে আমার গণতান্ত্রিক আন্দোলনের কী লাভ হবে? অতএব এটা করছি না। এটা করলে নিজেদের করতে পারি, ওনারা যদি শুনতে চান।’

‘আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি ওই আন্দোলনটা খুবই একটা চিন্তাহীন আন্দোলন ছিল। ওই আন্দোলনের মধ্যে কোন দিকনির্দেশনা ছিল না।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Skip to toolbar