Home / ফিচার / রাশিয়া বিশ্বকাপে বিশ্ব জিতবে!

রাশিয়া বিশ্বকাপে বিশ্ব জিতবে!

কে জিতবে বিশ্বকাপ? ঘুরে ফিরে হয়ত ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা বা জার্মানির মত কোনো দলই জিতবে এবারের বিশ্বকাপ। রাশিয়া কি জিততে পারে এবারের বিশ্বকাপ? ফুটবল সম্পর্কে জগতের সবচেয়ে কম জ্ঞানধারীও এমন প্রশ্ন করে নিজের মান-সম্মান খোয়াতে চাইবেন না। তবে রাশিয়া যে এবার বিশ্ব জিতবে, এই কথা আমি চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলতে পারি। হ্যাঁ, রাশিয়া বিশ্বকাপ হয়ত জিতবে না, তবে বিশ্ব নিশ্চয় জিতবে। কীভাবে?

রাশিয়া নিয়ে আমার বিশেষ আগ্রহ দেখে বছর কয়েক আগে এক তরুণ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক মন্তব্য করেছিলেন, ‘রাশিয়া ইজ অ্যা ডেড হর্স’! রাশিয়া থেকে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন নাকি সম্মানের নয়, এমনই তাঁর অভিমত! আসলে রাশিয়া সম্পর্কে আমাদের কয়জনই ঠিকঠাক জানি? মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইংল্যান্ড-ফ্রান্সের মিডিয়া তথা এপি, এএফপি, রয়টার্স, সিএনএন ও বিবিসির মতো তথাকথিত আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আমাদের সামনে রাশিয়াকে তার প্রকৃত বিশালত্ব, ক্ষমতা, সামর্থ্য আর সম্ভাবনা নিয়ে হাজির হতে দেয় না। আমাদের চোখে পট্টি পড়িয়ে রাখে এই সব পশ্চিমা মিডিয়া। সামর্থ্যের দিক থেকে আন্তর্জাতিক হলেও কাজের ধরন ও স্বার্থের দিক থেকে এসব সংবাদমাধ্যম শুধুই পশ্চিমা।

১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে গেলে পৃথিবী হয়ে পড়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-নির্ভর। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে গেলেও আকারের দিক থেকে রাশিয়া এখন পর্যন্ত এককভাবে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় রাষ্ট্র হিসেবে টিকে আছে। তবে সোভিয়েত ট্র্যাজেডির পর থেকে বৈশ্বিক তথ্য ও সংবাদ প্রবাহে ইঙ্গ-মার্কিন জোটের একাধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। বিবিসি, সিএনএন, রয়টার্স, এপি কিংবা এএফপির মত পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমগুলো পারতপক্ষে রাশিয়ার ইতিবাচক  কোনো সংবাদ বা ছবি আমাদের সামনে হাজির হতে দেয় না। তাই রাশিয়া আমাদের অনেকের চোখ, মন ও মগজ থেকে অনেক দূরের একটি রাষ্ট্র। তবে আমরা জানি না বলে যে রাশিয়ার বিস্ময়কর শক্তি-সামর্থ্য মিথ্যা হয়ে যাবে, তা তো নয়!

রাশিয়া সম্পর্কে জানা বাংলাদেশের মানুষের নৈতিক কর্তব্যের মধ্যেও পড়ে। কারণ সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে জাতিসংঘে না দাঁড়ালে হয়ত যুদ্ধে জেতা আমাদের পক্ষে আরও কঠিন হয়ে যেত। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ছিল পাকিস্তানের পক্ষে। শুধু কূটনৈতিক সাপোর্ট নয়, পাকিস্তানের পক্ষে যুদ্ধজাহাজ পর্যন্ত পাঠিয়ে দেয়া শুরু করেছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। জাতিসংঘে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেটো না দিলে, যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধেও আমাদের যুদ্ধ করতে হত! সোভিয়েত ইউনিয়ন সরাসরি আমাদের পক্ষ নেয়। তাই সোভিয়েত ইউনিয়ন বা রাশিয়া-সংক্রান্ত কিছু ঘটলে নিজের মনের গহীনে এক ধরণের বাড়তি আগ্রহ অনুভুত হয়। আর এবার তো বিশ্বকাপ ফুটবলের আসর বসছে প্রিয় রাশিয়াতে।

রাশিয়াকে রাজনীতি ও ইতিহাস সচেতন পড়াশুনা জানা মানুষেরা জানে লেনিন-স্ত্যালিনের দেশ হিসেবে। ইদানিং নতুন প্রজন্ম জানে ভ্লাদিমির পুতিনের দেশ হিসেবে। আমরা যখন ছোট ছিলাম, তখন পত্র-পত্রিকায় কেবল মিখাইল গর্বাচেভ আর বরিস্ ইয়েলৎসিন এর নাম শুনতাম। আমাদের ছোটবেলায় সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল অস্ত যাওয়া সূর্য। আমরা বড় হয়েছি, রাশিয়াও ধীরে ধীরে তাঁর যৌবন ফিরে পেয়েছে। আমাদের যৌবনে আমরা রাশিয়াকে দেখছি, যুক্তরাষ্ট্রসহ কাউকে ছেড়ে কথা বলছে না। সংবাদ প্রবাহে এখনো ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়নি যদিও, বিশ্ব রাজনীতিতে আবার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে রাশিয়া। চলমান সিরিয়া সংকটে রাশিয়ার শক্ত ভূমিকা প্রমাণ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একক আধিপত্যের দিন শেষ। ইরান, রাশিয়া, চীন ও উত্তর কোরিয়া মিলে তৈরি করেছে শক্তিশালী মার্কিনবিরোধী বলয়।

আমাদের বর্তমান বাংলাদেশেও রাশিয়া দারুণ ভূমিকা রাখতে শুরু করেছে। বাংলাদেশের ইতিহাসের বৃহত্তম বিদ্যুৎ প্রকল্পেও রাশিয়া সবচেয়ে বড় বন্ধুর ভূমিকা রাখছে। অথচ এই রাশিয়ার সাথে আমাদের সম্পর্ক প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছিল। আসলে ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্মম হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ পথ হারিয়ে ফেলেছিল। যে হারিয়ে যাওয়া পথে প্রায় বিলীন হয়ে গিয়েছিল রাশিয়া-বাংলাদেশ বন্ধুত্ব। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার হাত ধরে রাশিয়ার সাথে আবার যোগাযোগ বেড়েছে বাংলাদেশের। যদিও বঙ্গবন্ধুর আমলে যে সম্পর্ক ছিল, এখনো সেই সম্পর্ক ফিরিয়ে আনা যায়নি। রোহিঙ্গা সংকটে রাশিয়ার অনাকাঙ্ক্ষিত ভূমিকাই প্রমাণ করে, আমাদের পুরনো সম্পর্ক এখনো পুরোপুরি জীবিত হয়নি।

ফুটবল বিশ্বকাপ যেন রাশিয়াতে কোনোভাবেই হতে না পারে সেজন্য কম কূটনীতির আশ্রয় নেয়নি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। তবে রাশিয়া সে চ্যালেঞ্জ ভালোভাবেই অতিক্রম করেছে। অবশেষে ‘গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’ বলে পরিচিত ফুটবল বিশ্বকাপ রাশিয়াতেই হচ্ছে। তবে রাশিয়াকে কাবু করতে এবং বিশ্ববাসীর সামনে রাশিয়া ‘ছোট’ করতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার ইউরোপীয় দোসররা নানা অবরোধের হুমকি-ধামকি দিচ্ছে। তবে নতুন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনে রাশিয়ার বহুল আলোচিত ‘প্রভাব’ খাটানোর সংবাদও আমরা সংবাদমাধ্যমগুলোতে নিয়মিত পড়েছি। সবকিছু মিলে রাশিয়া এখন আর খুব একটা পিছিয়ে নেই। সামরিকভাবে রাশিয়া কখনোই কারো থেকে পিছিয়ে ছিল না। নতুন করে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবেও শক্তিশালী হয়েছে।

রাশিয়ার সরকার মনে করছে, ফুটবল বিশ্বকাপ থেকে সেদেশের আয় হবে প্রায় ১.৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। রাশিয়ার অর্থ মন্ত্রণালয় বলছে, বিশ্বকাপ উপলক্ষে রাশিয়া আসা বিদেশিরা ১০০ বিলিয়ন রুবল (১.৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) খরচ করবে। বিশ্বকাপকে ঘিরে রাশিয়া জুড়ে অবকাঠামোগত বিরাট পরিবর্তন আনা হয়েছে যার ইতিবাচক দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব পড়বে দেশের অর্থনীতি আর মানুষের জীবনযাপনে, এমনটাই মনে করছে

সরকার। অর্থনৈতিক উন্নয়ন মন্ত্রী ম্যাক্সিম ওরেশকিন, ক্রীড়া সংবাদপত্র সোভেটস্কাইকে বলেছেন, কিছু পশ্চিমা রাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা আরোপের নামে বিশ্বকাপকালীন রাশিয়ার অর্থনীতির উপর নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টির চেষ্টা চালাচ্ছে, কিন্তু তারা নিশ্চয় জানে ফুটবল বিশ্বকাপ এমন এক আয়োজন যেখানে মানুষের আগ্রহকে থামিয়ে রাখা যায় না। জুন-জুলাই মাসে বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে রাশিয়া জুড়ে ৪ লাখ নতুন পর্যটক ভ্রমণ করবে। রাশিয়াতে প্রতিবছরই পর্যটকের সংখ্যা বাড়ছে। আগামী বছর রাশিয়াতে পর্যটকের সংখ্যা ২০ শতাংশ বাড়বে বলে আশা করছে সেদেশের ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন।

রাশিয়াকে আমরা অনেকে ইউরেশিয়া নামেও অভিহিত করেন। এক কোটি ৭১ লাখ ২৫ হাজার দুইশত বর্গ কিলোমিটার আয়তনের বিশাল রাষ্ট্র রাশিয়ার ইউরোপ এবং এশিয়ার ভূখণ্ড মিলে তৈরি। তাই এর আন্তঃমহাদেশীয় অস্তিত্বকে বোঝানোর জন্য ইউরেশিয়া নামেও রাশিয়াকে বলা হয়ে থাকে। তবে রাশিয়ার মোট জনসংখ্যার ৭৭ ভাগই বসবাস করে পশ্চিম ইউরোপিয় অঞ্চলে। পৃথিবীতে বসবাসযোগ্য ভূমির ৮ ভাগের এক ভাগ জায়গা নিয়ে রাশিয়া গঠিত। ২০১৭ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী মাত্র ১৪৪ মিলিয়ন মানুষ বসবাস করে বিশাল এই দেশে। জনসংখ্যার হিসেবে রাশিয়া পৃথিবীর নবম রাষ্ট্র। নমিনাল জিডিপির হিসাবে রাশিয়া পৃথিবীর ১২তম এবং পারচেজিং পাওয়ার প্যারিটির হিসাবে ষষ্ঠ বৃহৎ অর্থনীতির রাষ্ট্র। সামরিক দিক থেকে রাশিয়া পৃথিবীর তিনটি অধিক শক্তিশালী রাষ্ট্রের একটি। অন্য দুটি রাষ্ট্র হল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন। গণবিধ্বংসী অস্ত্রের মুজতের দিক থেকে রাশিয়া পৃথিবীতে এক নম্বর। পরমাণু শক্তিধর পাঁচটি স্বীকৃত রাষ্ট্রের একটি রাশিয়া এবং জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী ও ভেটো ক্ষমতাপ্রাপ্ত সদস্য।

একুশতম ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপের ম্যাচগুলো রাশিয়ার ১১ টি বড় শহর- মস্কো, সেইন্ট পিটারস্ বুর্গ, সোচি, কাজান, সারানস্ক, কালিনিনগ্রাদ, ভলগোগ্রাদ, রোশ্তভ-অন-ডন, নিঝনিনভোগ্রাদ, ইয়েকাটেরিনবার্গ এবং সামারা’য় অনুষ্ঠিত হবে। রাশিয়া এই বিশ্বকাপ আয়োজন করতে সময় পেয়েছিল ৮ বছর। এই ৮ বছরে রাশিয়া বিশ্বকাপ আয়োজন বাবদ খরচ করেছে ৭০০ বিলিয়ন রুবল। সব প্রাপ্তি কি রুবল বা ডলারের হিসেবে চলে? বিশ্বের এমন কোনো মানুষ থাকবে না, যিনি বিশ্বকাপ ফুটবল সম্পর্কে একটু খোঁজখবর নেবেন না। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের কোটি কোটি মানুষের কাছে শুধু মস্কো নয়, সোচি, কাজান, ভলগোগ্রাদ নামগুলো অমর হয়ে যাবে। মেসি, রোনালদো, নেইমার কিংবা সালাহরা গোল করবেন; প্রতিটি গোল কিংবা ম্যাচের সাথে রাশিয়ার শহরগুলো, স্টেডিয়ামগুলোও বিশ্বের আনাচে কানাচে নিজের অস্তিত্ব নিয়ে হাজির হবে। লাখ লাখ বিদেশি ফেসবুকে পোস্ট দিবে, সেলফি তোলে প্রিয় সড়ক-মহাসড়ক, বার-রেস্তোরাগুলো সম্পর্কে নিজেদের বন্ধু-বান্ধবকে জানাবে। একটা মাস বিশ্ব পড়ে রইবে রাশিয়া নিয়ে। এভাবেই রাশিয়া আবার পুরো বিশ্বে পরিচিতি পাবে তার প্রকৃত বাস্তবতা নিয়ে। ফুটবলীয় মানে রাশিয়া বিশ্বকাপ জেতার মত দেশ নয়, সত্যি। তবে এটা বলাই যায় যে, রাশিয়া এবার বিশ্ব জিতবেই।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Skip to toolbar