ব্রেকিং নিউজ
Home / ফিচার / অপ্রতিরোধ্য কিশোরদের গ্যং কালচার !

অপ্রতিরোধ্য কিশোরদের গ্যং কালচার !

‘কিশোর গ্যাং’ ২০১৯ সালে দেশের আলোচিত বিষয়গুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল। গ্যাং কালচারের কারণে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মারামারি, হানাহানি এমনকি প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দৃষ্টিতে এলে গ্রেপ্তার করা হয় বেশ কিছু কিশোর গ্যাং দলনেতা ও সদস্যকে। এরপর এসব গ্যাং অনেক দিন নিশ্চুপ ছিল। সম্প্রতি আবার তা মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। একই বয়সের ছেলেদের একত্রে চলার মানসিকতা এবং তাদের মধ্যে মাদক, ছিনতাই, স্থানীয়ভাবে প্রভাব বিস্তারের প্রবণতা যখন প্রবেশ কওে, তখনই তা রূপ নিচ্ছে কিশোর গ্যাং-এ। পরিস্থিতি বলছে, কিশোরদের এমন গ্যং কালচার অপ্রতিরোধ্য!

পুলিশের ভাষ্যমতে, রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাঁশবাড়িতে প্রথম কিশোর গ্যাং জন্ম নেয়। ‘লাড়া দে’ নামের ওই গ্যাং গড়ে তোলে মিম ও নাহিদ নামের দুই কিশোর। পুলিশের বক্তব্য এমনটা হলেও বাস্তবতা অন্য কিছু বলে।

স্বাধীনতার পর মোহাম্মদপুরে বসবাস শুরু করে বাংলাদেশে আটকে পড়া পাকিস্তানিরা। তাদের মধ্যে এভাবে গ্যাং হিসেবে চলাফেরার প্রবণতা ছিল, এমন দাবি ওই এলাকার পুরনো বাসিন্দাদের। নব্বইয়ের দশকে মোহাম্মদপুর এলাকায় কিশোরদের গ্যাং কালচার অব্যাহত ছিল। সেই ধারাবাহিকতায় এখনো পর্যন্ত তা রয়ে গেছে। সে সময় এমন গ্যাং কম থাকলেও বর্তমানে এর প্রবণতা দিন দিন বেড়ে চলেছে।

নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে জনসংখ্যা বাড়তে শুরু করে মোহাম্মদপুর ও আশপাশের এলাকায়। একবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে মোহাম্মদপুরের নি¤œাঞ্চলে জনসংখ্যা আরও বেড়ে যায়। জলাধার ভরাট করে গড়ে ওঠে  আদাবর, শেখেরটেক, সুনিবিড় হাউজিং, কাটাসুর, বেড়িবাঁধ পাড়ের চাঁদ উদ্যান, সাত মসজিদ হাউজিং, রহিম ব্যাপারীর ঘাট, কাটাসুর নামার বাজার, গ্রীণ ভিউ হাউজিং (গিরিঙ্গি হাউজিং) এমন অর্ধশতাধিক এলাকা। এই প্রবণতা এখনো চলমান।

এসব এলাকায় মানুষ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কিশোরদের একত্রে চলাচলের মানসিক ও সামাজিক প্রবণতা দেখা যায়। এরা একেকটি দলে পরিণত হয়। এসব দলকে স্থানীয়দের ভাষায় বলা হয় ‘ব্যাচ’। একেকটি ব্যাচে ৫ থেকে ৫০ জন পর্যন্ত থাকতে পারে। মূলত এক বয়সের ছেলেদের নিয়ে এ ধরনের ব্যাচ গড়ে ওঠে। বয়সভেদে প্রতিটি এলাকায়, এমনকি সড়কে ৩ থেকে ৬টা পর্যন্ত ব্যাচ থাকার তথ্য পাওয়া যায়। যারা একত্রে চলাফেরা করে।

স্থানীয়ভাবে নিজেদের পরিচয় জানান দিতে ব্যাচগুলো নিজেদের নামকরণ করে। এসব ব্যাচের আড্ডা দেয়ার জায়গা, স্কুল-কলেজের সামনের সড়ক বা দেয়ালে তারা রং বা স্প্রে রং দিয়ে নিজেদের ব্যাচের নাম লিখে রাখে। এসব ব্যাচের সবাই যে একই ধরনের কাজ করে তা নয়। ব্যাচের কেউ পড়াশোনা করে, অবসর সময়ে এসে আড্ডা দেয়। কেউবা পরিবহণ শ্রমিক, কেউ টোকাই, কেউবা কোনো কাজেই জড়িত না।

বিপত্তির জায়গা তৈরি হয় তখনই, যখন ব্যাচের এক বা একাধিক সদস্য মাদকে জড়ায়। প্রথমে কেউ কেউ সিগারেটের নেশায় আসক্ত হয়। সে ব্যাচের অন্যদের সেটি শেখায়। এরপর ড্যান্ডি ও গাঁজার মতো মারাত্মক নেশা। একজন থেকে আরেকজন, তারপর আরেকজন এভাবে ব্যাচের একাধিক সদস্য মাদকে যুক্ত হয়। নেশার টাকা জোগাতে দু-একজন বা তার বেশি সদস্য ছিনতাই শুরু করে। এ ক্ষেত্রে সাহসীদের হাতে চলে যায় ব্যাচের নিয়ন্ত্রণ। লাঠি, দেশীয় অস্ত্র হাতে পেয়ে এসব ব্যাচ হয়ে ওঠে ভয়ানক।

এরপর আসে সংঘর্ষের বিষয়। একই গলিতে একই বয়সের একাধিক ব্যাচ থাকলে সেখানে সংঘর্ষ বাধে। স্থানীয় প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে হামলা, মারামারি, কোপাকুপির ঘটনা ঘটে। তাতে আহত এবং প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। বড় ধরনের সংঘর্ষ হয় পাশের এলাকার একই বয়সের ব্যাচের সঙ্গে।

বিভিন্ন ঘটনার প্রেক্ষাপট বলছে, এক এলাকার কিশোর গ্যাং অন্য এলাকার গ্যাংকে নিজেদের শক্তির ব্যাপারে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়। সময় এবং জায়গা নির্ধারণ করে দিয়ে একে-অন্যের ওপর হামলা করে। কখনো কখনো বিপরীত ব্যাচের কাউকে একা পেলে তার ওপর হামলা চালানো হয়। হামলার প্রতিশোধ নিতে ঘটে পাল্টা হামলা।

হামলা, মারামারি, ছিনতাইয়ের মতো ঘটনা যখন কোনো ব্যাচে নিয়মিত হয়ে যায়, তখন অনেকে ব্যাচ ছেড়ে বের হয়ে আসে। বাকিরা অপরাধে আরও বেশি করে মনোযোগ দেয়। ব্যাচের দু-একজনের সাহসকে পুঁজি করে তারা অনায়াসে অপরাধমূলক কাজ চালিয়ে যায়। আর কিশোরদেও এই সাহস হয়ে ওঠে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা বা বড় ভাইদের হাতিয়ার।

 লেখক: গণমাধ্যমকর্মী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

%d bloggers like this:
Skip to toolbar