Home / আর্ন্তজাতিক / অবসান হচ্ছে সৌদি যুগের !

অবসান হচ্ছে সৌদি যুগের !

‘মেক সৌদি আরব গ্রেট এগেন’ নীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতোই । এই নীতির আদলেই দেশ সংস্কারের নানা উদ্যোগ হাতে নেন তিনি।

বিনোদনের জন্য মুসলিম শাসিত দেশটিতে পপ কনসার্ট ও র‌্যাসলিংয়ের আয়োজন করেন। ইসলামের মৌলিক নীতি পর্দা প্রথা ভেঙে নারীর ক্ষমতায়নের ভূমিকা রাখেন। সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য ও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে কর্তৃত্ব করতে এসব পরিকল্পনা তার।

পরিকল্পনাগুলো প্রাথমিকভাবে আশার সঞ্চার করলেও রাজনীতিতে তার অপরিপক্কতা ও বেপেরোয়া মনোভাবের কারণে দূরাশায় পরিণত হতে সময় লাগেনি। শ্রেষ্ঠত্বের বদলে দেশকে নিয়ে গিয়েছেন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। চরম ক্ষমতার পাশাপাশি অপব্যবহার করেছেন ইসলাম ধর্মেরও।

বিনোদনের ব্যবস্থা করতে গিয়ে তিনি দেশটির জাতীয় বাজেটে ঘাটতি ফেলে দেন। ফলে জনগণের মধ্যে সৃষ্টি হয় অসন্তোষ। নারীদের ক্ষমতায়নের চেষ্টা করলেও তার সময়েই দেশটিতে বেকারের সংখ্যা ২৯ শতাংশ। বন্ধ হয় বড় বড় মেগা প্রকল্পগুলো।

শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট পরতে ২০১৫ সালে ইরান সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে ইয়েমেনে যুদ্ধ শুরু করেন তিনি। প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, ‘এক সপ্তাহের মধ্যে হুতিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়লাভ করবেন’। কিন্তু যুদ্ধের বয়স পাঁচ বছর গড়ালেও রক্তক্ষয়ী এই যুদ্ধের সমাধান হয়নি এখনো।

আর হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদির এই যুদ্ধে লাভের বদলে ক্ষতিই হয়েছে বেশি। কারণ প্রায় প্রতিদিনই হুতিদের মিসাইলের আঘাতে জর্জরিত হচ্ছে আরবের বিভিন্ন অঞ্চল। প্রাণ হারাচ্ছে দেশটির বেসামরিক মানুষ।

২০১৭ সালের জুনে বিন সালমান সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রিন্স মোহাম্মদ বিন জায়েদের পরামর্শে কাতারকে ‘সন্ত্রাসবাদের’ মদদদাতার ব্লেইম দিয়ে গোটা আরব অঞ্চল থেকে আলাদা করার পরিকল্পনা করেন। কিন্তু তাতে তেমন লাভ হয়নি সৌদি জোটের।

একই বছরের নভেম্বরে বিন সালমান লেবাননের প্রধানমন্ত্রী সাদ হারারিকে সৌদির টেলিভিশনের লাইভে এসে পদত্যাগ করার পাশাপাশি তার কোয়ালিশনের পার্টনার ইরান সমর্থিত হিজবুল্লাহর কর্মকাণ্ডে নিন্দা জানাতে বাধ্য করেন। কিন্তু লাভের বদলে উল্টো বিন সালমানের এই কর্মকাণ্ডকে বোকামি হিসেবে উল্লেখ করে ব্যাপক সমালোচনা করে আন্তর্জাতিক মহল।

প্রতিরক্ষা মন্ত্রী থাকাকালে অজস্র ভুল করলেও ২০১৭ সালে ক্রাউন প্রিন্স হিসেবে নিযুক্ত করা হয় বিন সালমানকে। এর পরপরই কোনো রকমের পরিকল্পনা ছাড়াই ‘সামাজিক উদারীকরণের’ আদলে দেশকে তিনি একটি পুলিশি রাষ্ট্রে পরিণত করেন।

বিরোধী দলীয় নেতা, সাংবাদিক, সরকারি কর্মকতা, ধর্মীয় নেতা, শিক্ষাবিদ এবং মানবাধিকার কর্মীদের ওপর নির্যাতন চালান। সর্বশেষ তারই নেতৃত্বে ২০১৮ সালের অক্টোবরে ইস্তানবুলে সৌদি দূতাবাসে জামাল খাসোগিকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।

এতকিছুর পরেও শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের দৌড়ে ধ্বংসাত্মক নীতির পরিবর্তন করেননি বিন সালমান। ইয়েমেন ও কাতারের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নতি না করে সাম্প্রতিক কালে তিনি অবৈধ রাষ্ট্র ইসরায়েলের সঙ্গে নতুনভাবে সম্পর্ক শুরু করার পরিকল্পনা করেন।

বাবার (বাদশাহ সালমান) নির্দেশ অমান্য করে আরব আমিরাত ও বাহরাইনের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক স্বাভাবিকরণে সাহায্যে করেন তিনি। কারণ বাদশাহ সালমানের ইচ্ছা ছিল ফিলিস্তিনকে স্বাধীন রাষ্ট্র ঘোষণার পর ইসরায়েলের সঙ্গে আলোচনার টেবিলে বসবে সৌদি ও তার মিত্ররা।

মূলত মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও তুরস্কের মাথাচাড়া ঠেকাতে বেপরোয়া হয়ে ওঠেছিলেন বিন সালমান। যা তাকে ও সৌদি আরবকে ধ্বংসের কিনারায় নিয়ে গেছে।

প্রকৃতপক্ষে ইসরায়েলকে নিয়ে জুয়া খেলার মাধ্যমে বিন সালমান নিজেকে আরও বোকা প্রমাণিত করেছেন। কারণ এই ইসরায়েল রাষ্ট্রটি সম্পদের পরিবর্তে সৌদির জন্য একটি বড় বোঝা। যেটা বোঝেননি সৌদির এই অনভিজ্ঞ প্রিন্স। কারণ যদি যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ট্রাম্প নিজে বিন সালমানকে রক্ষা করতে না পারেন তাহলে নিশ্চিতভাবে ইসরায়েলও পারবে না।

রাজধানী রিয়াদে আসন্ন জি-২০ সম্মেলনের মধ্যে দিয়ে বিন সালমান সম্ভবত আবারও রাজনীতিতে শক্তভাবে ফিরতে চেষ্টা করবেন। কিন্তু সেটাও আর সম্ভব নয়।

[বিশ্লেষণটি আলজাজিরা থেকে অনূদিত]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

%d bloggers like this: