অর্ধেক রেস্টুরেন্ট বন্ধ চট্টগ্রামে : মালিক শ্রমিকদের দুর্দশা

147

রেস্টুরেন্টের শহর বন্দরনগরী চট্টগ্রামকে অনেকে বলেন। ছোট বড় সবমিলিয়ে এখানে আছে কমপক্ষে সাড়ে ৫ হাজার রেস্টুরেন্ট। তবে চলমান করোনায় ভোজনরসিক চট্টলাবাসীর প্রিয় এই খাবার দোকানগুলোর অর্ধেকেরই বেশি এখন বন্ধ হয়ে গেছে। আর যেগুলো খোলা আছে সেগুলোও চলছে অনেকটা ঝিমিয়ে। যার ফলে রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ীরা এখন হতাশায় রয়েছেন। আর কাজ হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন এসব প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
চট্টগ্রাম মহানগর রেস্টুরেন্ট মালিক সমিতির তথ্যমতে, বন্দরনগরীতে তাদের কাছে নিবন্ধিত প্রায় ৪ হাজার হোটেল রেস্টুরেন্ট আছে। আর অনিবন্ধিত আছে এর প্রায় অর্ধেক। এসব খাবার দোকানগুলোতে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন প্রায় ৪ লাখ মানুষ। তবে সর্বনাশা করোনায় এখানকার এই চিরচেনা রেস্টুরেন্ট ব্যবসায় ধস নেমেছে। এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত লোকদের সামনে এখন ঘোরতর অন্ধকার।
নগরীর চকবাজারের হোটেল জামানে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করতেন বাঁশখালীর জলদি এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ হাসান। মহামারির প্রকোপ একটু কমায় গত বছরের ডিসেম্বরের শেষে বিয়ে করেছিলেন তিনি। তবে করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের কারণে সরকার ঘোষিত লকডাউনে হোটেল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অন্যদের মতো তাকেও চাকরি হারাতে হয়। ভুক্তভোগী হাসান বলেন, গত বছরের এমন দিনেও ৭ দিনের জন্য বলে ৪ মাস লকডাউন চলেছিল। সে সময় অন্তত মালিক পক্ষ অর্ধেক করে বেতন দিয়েছেন। টাকা পয়সাওয়ালারা কিছু সহযোগিতা করেছিল। তবে এবার কোথাও থেকে এক পয়সাও সহযোগিতা পাইনি। নতুন সংসার ও আত্মীয়স্বজন নিয়ে এখন কষ্ট হয়ে যাচ্ছে খুব। ধারকর্জ করে বিয়ে করেছি। এখন ধারকর্জ দেয়ারও আর কেউ নেই।
জানা যায়, গত বছরের লকডাউনের শুরু থেকেই চট্টগ্রামের অতি পরিচিত রেস্টুরেন্ট ব্যবসায় বিপর্যয় ঘটেছে। আর গত মাসের দ্বিতীয় দফা লকডাউন যেন এই ব্যবসায় শেষ পেরেক ঠুকে দিয়েছে। এখন পুঁজি হারিয়ে একেবারে নিঃস্ব হয়ে গেছে তারা। একসময় পরিবার পরিজন নিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে বসবাস করা মানুষগুলোর জীবনে হঠাৎ করে অন্ধকার নেমে এসেছে।
নগরীর মুরাদপুরে চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী মেজবানের আয়োজন নিয়ে গড়ে ওঠা রেস্টুরেন্ট ডেইলি মেজ্জান। দুই বছর আগে শুরু হওয়া এই রেস্টুরেন্টটি অল্প সময়ের মধ্যেই শহরে বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গা থেকেও ভোজনরসিকরা এখানে আসতো মেজবানের স্বাদ নিতে। তবে চার বন্ধুর হাতে গড়া এই স্বপ্নের রেস্তরাঁ এখন করোনার ঢেউয়ে যেন আছড়ে পড়েছে। গত বছরের প্রথম দফা লকডাউন শেষে অনেকটা ভর্তুকি দিয়ে চালালেও এখন দ্বিতীয় দফার লকডাউনে এসে রেস্টুরেন্টটির কপাট আর ভেজাইনি মালিকপক্ষ।
গত বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার সন্ধ্যার পর সরজমিন নগরীর বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে দেখা যায় সম্পূর্ণ অপরিচিত একটি চিত্র। একসময় যেখানে ইফতারে সময় মানুষজন ঠাসা থাকতো, সেখানে অধিকাংশ রেস্টুরেন্টই ছিল বন্ধ। গত বছর রমজানেও লকডাউনের কারণে এসব রেস্টুরেন্ট বন্ধ ছিল।
জানা যায়, চলতি লকডাউনের প্রথমদিকে অন্যান্য দোকানপাটের মতো সরকার রেস্টুরেন্টও বন্ধ করে দেয়। গত মাসের ২৫ তারিখ থেকে শর্তসাপেক্ষে সকাল থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত সব দোকানপাট খোলার অনুমতি দেয়। তবে এই সময়ের ব্যবসায় উল্টো ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কায় অনেকেই রেস্টুরেন্ট খোলেননি আর। নগরীর দুই নাম্বার গেট এলাকার রেস্টুরেন্ট ক্যাফ এন্ড চিল-এর মালিক মরতুজা রায়হান এই প্রতিবেদককে বলেন, পুরো বছর ঘাটতি দিয়ে গেছি। আশা করেছিলাম, এই রমজানে ভালোভাবে ব্যবসা করবো। তবে সরকার আর দিলো কোথায়। সবকিছু খোলা, শুধু হোটেল- রেস্টুরেন্ট বন্ধ রাখলো। আবার বললো বিকাল ৫টা পর্যন্ত দোকান খোলা রাখা যাবে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এমবিএ করে রেস্টুরেন্ট ব্যবসায় আসা এই তরুণ বলেন, এই ধরাবাঁধা সময়ের মধ্যে দোকান খুললে লাভ তো দূরের কথা, স্টাফদের বেতনও দিতে পারবো না। তাই আর রেস্টুরেন্ট খুলিনি৷ এখন আগের পুঁজি ভেঙে ভেঙে খাচ্ছি। আর আমরা নিজেরাই চলতে পারছি না, এখানের কর্মচারীদের কীভাবে বেতন দিবো।
এদিকে করোনাকালীন সময়ে কর্মহীন শ্রমিকদের জন্য সরকারে ঘোষিত প্রণোদনা দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর অংশ হিসেবে সারা দেশের মতো চট্টগ্রাম মহানগর রেস্টুরেন্ট মালিকদের পক্ষ থেকে অসহায় শ্রমিকদের একটি তালিকাও পাঠানো হয়েছে। তবে এই তালিকা তৈরিতে নয়ছয় হয়েছে বলে জানা যায়। অভিযোগ উঠেছে, শ্রমিকদের আইডি কার্ড বা নিয়োগপত্র কিছুই না থাকার সুযোগে মালিকেরা তাদের মতো করে সরকারের কাছে তালিকা পাঠিয়েছেন। এই তালিকার অনেকেই প্রকৃত শ্রমিক নয়। আবার হলেও তারা মালিকের কাছের লোকজন।
এই বিষয়ে চট্টগ্রাম জজ কোর্টের আইনজীবী এডভোকেট আনোয়ার শাহাদাত চৌধুরী বলেন, শ্রম আইন অনুসারে সব ধরনের শ্রমিকদের মতো হোটেল কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও কাজে যোগদানের সময় নিয়োগপত্র ও পরিচয়পত্র দিতে হবে। তবে এখানকার অধিকাংশ মালিকপক্ষ তা করেন না। যার ফলে এসব অসহায় শ্রমিকদের রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এদিকে প্রণোদনার তালিকা প্রস্তুতিতে অনিয়মসহ সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম মহানগর হোটেল রেস্টুরেন্ট মালিক সমিতির সভাপতি ইলিয়াস হোসেন ভুঁইয়া মানবজমিনকে বলেন, এখনো আমরা প্রণোদনা কিছুই পাইনি। তবে দুস্থ শ্রমিকদের তালিকা করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এতে কোনো ধরনের অনিয়ম হয়নি। বিভিন্ন জটিলতার কারণে হোটেল রেস্টুরেন্টগুলোতে নিয়োগপত্র ও পরিচয়পত্র দেয়া হয় না। এই রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ী জানান, এই করোনায় বন্দরনগরীর রেস্তরাঁ শিল্প প্রায় ধ্বংস হওয়ার পথে। এখানকার পাঁচ হাজার রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ী প্রায় দেউলিয়া হয়ে পড়েছে। প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা লোকসান হচ্ছে। এই অবস্থায় দ্রুত সরকারি প্রণোদনা খুব বেশি প্রয়োজন। পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের সহজ কিস্তিতে ব্যাংক লোন নিশ্চিত করা এবং বিদ্যুৎ- পানির বিল কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ দেয়ারও দাবি জানান রেস্টুরেন্ট মালিকদের এই নেতা।