Home / খবর / অর্ধেক শ্রমিক শিশু সাড়ে ৯ হাজার স্থানীয় পোশাক কারখানায় !

অর্ধেক শ্রমিক শিশু সাড়ে ৯ হাজার স্থানীয় পোশাক কারখানায় !

দেশের নানা খাতে শিশু শ্রমিক নিয়োগের ঘটনা সরকারের নানা উদ্যোগের পরও কমছে না। মহামারি করোনাকালে এই হার আরও বেড়েছে। বিশেষ করে রাজধানীর পাশে কেরানীগঞ্জে ছোট-বড় সাড়ে নয় হাজার দেশীয় পোশাক কারখানার মোট শ্রমিকদের প্রায় অর্ধেকই শিশু। বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন বিশেষজ্ঞরা।

  • দরিদ্রতার সুযোগে স্থানীয় পোশাক কারখানায় বাড়ছে শিশুশ্রম

  • দারিদ্র্যের সুযোগ নিচ্ছে সুযোগ সন্ধানী মালিকরা
  • শিশুদের সরকারি সহায়তায় অন্তর্ভুক্তির সুপারিশ বিএলএফের

বাংলাদেশ লেবার ফাউন্ডেশনের (বিএলএফ) পরিচালিত জরিপে এসব তথ্য উঠে এসেছে। রবিবার রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

জরিপে বলা হয়েছে, কেরানীগঞ্জে সাড়ে নয় হাজার ছোট-বড় কারখানায় মোট শ্রমিক দুই লাখ ৩০ হাজার। এর মধ্যে ৪৭ শতাংশ শ্রমিকের বয়স ১৭ বছরের নিচে। এরমধ্যে পাঁচ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুর সংখ্যা প্রায় ২০ হাজার এবং ৫-১৭ বছর বয়সী শিশুর সংখ্যা প্রায় এক লাখ ২০ হাজার।

জরিপের তথ্য বলছে, যেসব শিশু এসব প্রতিষ্ঠানে কাজ করে তারা বেশিরভাগই দরিদ্র পরিবারের। এদের মধ্যে আবার ৯০ শতাংশ ঢাকার বাইরে থেকে আসা। ফলে পরিবারের আয়ের জন্য শিশুদের কাজে পাঠাতে হয়। অন্যদিকে সমান কাজ করলেও শিশুদের বড়দের মতো পারিশ্রমিক দিতে হয় না। এই সুযোগেও অনেকে শিশুদের কাজে নিয়োগ দিয়ে থাকেন।

২০১১ সালের জাতীয় শিশু নীতি অনুযায়ী ১৮ বছরের নিচে কিশোর-কিশোরীকে শিশু হিসেবে গণ্য করা হয়।

‘স্থানীয় পোশাক প্রস্তুতকারী কারখানার শিশুশ্রম নিরসন: সমস্যা ও করণীয়’ শীর্ষক এই আলোচনার আয়োজন করে বাংলাদেশ লেবার ফাউন্ডেশন (বিএলএফ)। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিএলএফের নির্বাহী পরিচালক এ কে এম আশরাফ উদ্দিন।

প্রতিবেদনে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার এবং যৌন নির্যাতনের শিকারের কথাও তুলে ধরা হয়। তবে এর পরিসংখ্যান দেয়া হয়নি।

শিশুশ্রমের এমন তথ্য পেয়ে অনুষ্ঠানে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব কে এম আবদুস সালাম বলেন, ‘সরকার শিশুশ্রম বন্ধে কাজ করছে। এদের অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে তাদের এ বিষয়ে বোঝাতে হবে। প্রয়োজনীয় সহোযোগিতা করতে হবে।’

এসময় তিনি কেরানীগঞ্জের এসব প্রতিষ্ঠানে বিশেষ নজরদারি করার আশ্বাস দেন।

যদিও শিশুশ্রমিকদের বিষয়ে এমন তথ্যের সঙ্গে কিছুটা দ্বিমত করেছেন কেরানীগঞ্জ গার্মেন্টস ব্যবসায়ী সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক তোফাজ্জেল হোসেন। তার দাবি, পাঁচ বছর নয়, সর্বনিম্ন ১২ বছরের শিশুরা কারখানাগুলোতে কাজ করছে। সরকার এসব শিশুর পরিবারকে সহায়তা করলে শিগগিরই শিশুশ্রম অনেকাংশে কমে আসবে বলে মনে করেন এই ব্যবসায়ী।

প্রতিবেদনে শিশুদের কাজের অনিরাপদ পরিবেশ, কাঠামোগত মজুরি নির্ধারণ না করা, কর্মঘণ্টা নির্ধারিত না থাকার বিষয়টি উঠে আসে। এতে বলা হয়, স্বাভাবিক মৌসুমে শিশুরা প্রতিদিন গড়ে ১৩ ঘণ্টা করে। আর মৌসুমের সময় কমপক্ষে ১৬ ঘণ্টা কাজ করে। এতে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

জানা গেছে, পোশাকের দেশীয় বাজারে চাহিদার ৮০ শতাংশ পূরণ করে স্থানীয় এসব পোশাক কারখানা। অন্যান্য অঞ্চলের মধ্যে এমন ছোট কারখানা কেরানীগঞ্জেই বেশি। এসব কারখানায় জিন্স, টি-শার্ট, শার্ট, ফতুয়া, থ্রি পিস, বোরখা, পাঞ্জাবিসহ শিশু ও নারীদের নানা ধরনের পোশাক তৈরি করে।

অনুষ্ঠানের শেষভাবে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব উপস্থিত মালিক ও শ্রমিক নেতাদের কাছে কেরানীগঞ্জে শিশুশ্রম পুরোপুরি বন্ধ কবে নাগাদ সম্ভব এমন প্রশ্ন রাখেন। জবাবে তারা সবার সহযোগিতা পেলে ২০২২ সাল নাগাদ শিশুশ্রম মুক্ত করা সম্ভব হবে বলে আশ্বাস দেন।

এসময় উপস্থিত কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের যুগ্ম মহাপরিদর্শক ড. মো. মুস্তাফিজুর রহমানকে কমিটি করে এ বিষয়ে কাজ করার নির্দেশ দেন শ্রম সচিব।

অনুষ্ঠানে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা-আইএলও’র ন্যাশনাল প্রজেক্ট কো-অর্ডিনেটর সৈয়দা মনিরা সুলতানা বলেন, ‘২০১৩ সালের পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব মতে বাংলাদেশে ১৭ লাখ শিশু শ্রমিক আছে তার মধ্যে ১২ লাখ ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে। এ থেকে রক্ষা পেতে এসব শিশুর পরিবারকে সরকারের সেফটি নেটের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। এটা করা হলে পরিবার শিশুকে আর কাজে দেবে না।’

বিএলএফের চেয়ারম্যান আব্দুস সালাম খান বলেন, ‘করোনায় স্থানীয় পোশাক তৈরি কারখানায় শিশুশ্রম বাড়ছে। কেরানীগঞ্জের অবস্থা খুবই নাজুক। যেখানে শিশুরা কাজ করে, সেখানেই ঘুমায়। শুধু তাই নয়, এসব শিশুর কাজ নেই, বেতন নেই ভিক্তিতে কাজ করে।’

শিশুশ্রম বন্ধে বিএলএফের সুপারিশ

সভায় শিশু শ্রম নিরসনে বেশ কিছু সুপারিশ করা হয়। এরমধ্যে রয়েছে- সরকার ঘোষিত বিপজ্জনক শিশুশ্রম তালিকায় স্থানীয় পোশাক কারাখানার শিশু শ্রমিকদের অন্তর্ভুক্ত করা, শিশুদের স্কিল ডেভেলপমেন্ট ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করা, শিশুর অভিভাবকদের সরকারের সহায়তা কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা, এসব কারখানাকে ক্ষুদ্র শিল্প হিসেবে গণ্য করা। এসময় সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিভাগের নিয়মিত পরিদর্শন ও শ্রম আইনের যথাযথ বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হয়।

গোলটেবিল আলোচনায় অন্যান্যের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির নতুন সভাপতি সালমা আলী, বিএনএফের মহাসচিব এ জেড এম কামরুল আনাম, মহাসচিব জেড এম কামরুল আনাম প্রমুখ বক্তব্য দেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

%d bloggers like this: