Home / খবর / ইতিমধ্যেই দোরগোড়ায় পরবর্তী মহামারি

ইতিমধ্যেই দোরগোড়ায় পরবর্তী মহামারি

২ বছর বয়সী কোনো শিশু যদি সাধারণ ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণে আক্রান্ত হয় বাংলাদেশ বা ভারতে দরিদ্র পরিবারের , তাহলে তার অ্যান্টিবায়োটিক চিকিৎসা কার্যকর হবে না, এমন ঝুঁকি ৫০ ভাগেরও বেশি। কোনো এক কারণে ওই শিশুর শরীরে এন্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী সংক্রমণ গড়ে উঠেছে। এমনকি যে এন্টিবায়োটিক ওষুধ সে জীবনেও নেয়নি, সেই ওষুধও তার শরীরে অকার্যকর। কীভাবে?

দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এই শিশু এমন এক স্থানে বসবাস করে যেখানে বিশুদ্ধ পানির সীমাবদ্ধতা রয়েছে। রয়েছে বর্জ্য নিষ্কাশনের সুবিধার অভাব। ফলে তারা প্রায়ই মানববর্জ্যের সংস্পর্শে আসে। অর্থাৎ, এর ফলে তারা নিয়মিতই কোটি কোটি প্রতিরোধী জিন ও ব্যাকটেরিয়ার সংস্পর্শে আসে। এদের মধ্যে চিকিৎসার উপযোগী নয় এমন ‘সুপারবাগ’ও থাকতে পারে।

এই গল্প করুণ হলেও ভয়াবহরকম সাধারণ একটি ঘটনা। বিশেষ করে, যেসব স্থানে দূষণ অনেক বেশি, আর বিশুদ্ধ পানির সংকুলানে সীমাবদ্ধতা রয়েছে, সেখানে শিশুদের মধ্যে এই প্রবণতা আরও বেশি।

বহু বছর ধরে মানুষ মনে করতো ব্যাকটেরিয়ার মধ্যে এন্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী সক্ষমতা জন্ম হয় মূলত ওষুধ হিসেবে অতিরিক্ত মাত্রায় এন্টিবায়োটিক সেবনের ফলে। কিন্তু প্রমাণ ক্রমেই বাড়ছে যে, এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধী প্রবণতার বিস্তারের জন্য পরিবেশগত বিষয়াদি সমান বা আরও বেশি ভূমিকা রাখে। উন্নয়নশীল বিশ্বের জন্য এই বক্তব্য আরও বেশি প্রযোজ্য।

আমরা এখানে এন্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার ওপর নজর দেব। তবে অন্যান্য মাইক্রোঅর্গানিজমেও ওষুধ-প্রতিরোধী প্রবণতা দেখা যায়। অর্থাৎ সব ধরণের সংক্রামক রোগের চিকিৎসা করার সামর্থ্য ক্রমেই এই প্রতিরোধ সক্ষমতার কারণে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর মধ্যে কোভিড-১৯ রোগ সৃষ্টিকারী করোনাভাইরাসও অন্তর্ভুক্ত।

সামগ্রিকভাবে এন্টিবায়োটিক, এন্টিভাইরাল, এন্টিফাঙ্গালের ব্যবহার অবশ্যই কমাতে হবে। তবে বিশ্বের বেশিরভাগ অঞ্চলে পানি, স্যানিটেশন ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার চর্চা ইত্যাদিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা যদি বিশুদ্ধতর পানি ও নিরাপদতর খাদ্য সর্বত্র নিশ্চিত করতে পারি, তাহলে পরিবেশে এন্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার বিস্তার এমনিতেই কমে যাবে।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও), বিশ্ব প্রাণি স্বাস্থ্য সংস্থা (ওআইই) ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)-এর সাম্প্রতিক সুপারিশমালায় বলা হয়েছে, এই ‘সুপারবাগ (এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া) সমস্যা’ কেবল এন্টিবায়োটিকের যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমেই সমাধান করা সম্ভব নয়। পানি, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা, স্যানিটেশন, ইত্যাদি ক্ষেত্রেও বৈশ্বিক অগ্রগতি প্রয়োজন হবে। অন্যথায়, পরবর্তী মহামারি কোভিড-১৯ এর চেয়েও ভয়ঙ্কর হবে।

পৃথিবীতে প্রাণের সূচনার পর থেকেই এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধের অস্তিত্ব ছিল। তবে মানুষের কারণে এই প্রবণতা মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। আপনি যখন এন্টিবায়োটিক গ্রহণ করেন, তখন সংক্রমণস্থলের বেশিরভাগ ভ্যাকটেরিয়ার মারা যায়। তখনই আপনি ভালো অনুভব করেন, সুস্থ হয়ে ওঠেন। কিন্তু এন্টিবায়োটিকের ফলে সকল ব্যাকটেরিয়া মারা যায় না। কিছু ব্যাকটেরিয়া প্রাকৃতিকভাবেই শক্তিশালী। কিছু আবার পার্শ্ববর্তী মাইক্রোবায়াল থেকে প্রতিরোধসক্ষম জিন আয়ত্ত করে নেয়। এর মানে হলো, কিছু ব্যাকটেরিয়া সবসময়ই টিকে যায়। এবং মানববর্জ্যের মাধ্যমে তা পরিবেশে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

এন্টিবায়োটিক গ্রহণের ফলে ভ্যাকটেরিয়ার মধ্যে প্রতিরোধসক্ষমতা বাড়ার পর ফার্মা শিল্প কোম্পানিগুলো আরও শক্তিশালী এন্টিবায়োটিক তৈরি করতে থাকে। তবে ব্যাকটেরিয়াও খুব দ্রুত পরিবর্তনশীল। ফলে নতুন এন্টিবায়োটিক খুব দ্রুতই তাদের কার্যকারিতা হারায়। এর ফলে নতুন এন্টিবায়োটিক তৈরির কাজ প্রায় থেমে যায়, কারণ এ থেকে লাভ তেমন হয় না। অপরদিকে বিদ্যমান এন্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধসক্ষমতা কেবল বাড়তেই থাকে। আর এই পরিস্থিতি বেশি বিদ্যমান অবিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশনহীন স্থানে।

উন্নত দেশে যখন মানুষ পায়খানা করে, তখন তা টয়লেটের মাধ্যমে বর্জ্য নিষ্কাশন প্লান্টে পৌঁছে যায়। এসব নিষ্কাশন প্লান্ট একেবারে শতভাগ কার্যকর না হলেও, সেগুলোর কারণে ৯৯ শতাংশেরও বেশি রেসিস্ট্যান্স ব্যাকটেরিয়া কমে যায়। ফলে পরিবেশে রেসিস্ট্যান্স ব্যাকটেরিয়া ছড়িয়ে পড়ার হার অত্যন্ত কম। অপরদিকে বিশ্বের ৭০ শতাংশেরও বেশি অঞ্চলে কোনো বর্জ্য শোধনাগার প্লান্ট অথবা এমনকি নর্দমাও নেই। ফলে প্রতিরোধী জিন ও ব্যাকটেরিয়া সমেত মানববর্জ্য ভূপৃষ্ঠ, ভূগর্ভস্থ পানি ও এমনকি খোলা ড্রেনে গিয়ে পড়ে। এর মানে হলো যেসব মানুষ মানববর্জ্য নিষ্কাশন ব্যবস্থাপনাহীন এলাকায় বসবাস করেন, তাদের মধ্যে বিভিন্ন মাধ্যমে এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধক্ষম ব্যাকটেরিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি। অর্থাৎ, যারা এন্টিবায়োটিক সেবনও করেননি, তাদের মধ্যেও এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। ঠিক দক্ষিণ এশিয়ার ওই ২ বছর বয়সী শিশুটির মতো।

এটি স্পষ্ট যে আমাদেরকে সামগ্রিক প্রচেষ্টা হাতে নিতে হবে যেন মানুষ, প্রাণি ও পরিবেশে শক্তিশালী ব্যাকটেরিয়ার বিস্তার কমে যায়। কিন্তু এই অসম বিশ্বে আমরা কীভাবে তা করতে পারবো? জাতিসংঘের ২০৩০ এজেন্ডা ফর সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট-এ বিশুদ্ধ পানিকে মানবাধিকার হিসেবে মেনে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু সকলের জন্য সহনীয় মুল্যে বিশুদ্ধ পানি কীভাবে আমরা নিশ্চিত করতে পারবো?

বিশুদ্ধ পানির সাথে সাথে এন্টিবায়োটিকের ব্যবহার হ্রাস করা হলে শক্তিশালী ব্যাকটেরিয়া বিস্তারের হার কমে যায়। এবং এটি অসম্ভবও নয়। কেনিয়ায় একটি গ্রামে মানুষের বাসার ল্যাট্রিনের থেকে একটু দূরে তাদের পানির উৎস সরিয়ে নেওয়া হয়। সাবান-পানি দিয়ে হাত ধোয়াও বাধ্যতামূলক করা হয়। এক বছর দেখা গেল গ্রামে এন্টিবায়োটিক ব্যবহার খুবই কমে গেল, কারণ খুব মানুষই অসুস্থ হয়েছে। এই সাফল্য এসেছে কারণ গ্রামটি অত্যন্ত প্রত্যন্ত অঞ্চলে। এছাড়া গ্রামবাসীও সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছে। তবে এ থেকে দেখা যায় যে, বিশুদ্ধ পানি ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বৃদ্ধি করা হলে এন্টিবায়োটিক ব্যবহারের হার সরাসরি হ্রাস পায়। বৈশ্বিক সমস্যা সমাধান করতে হলে এই ধরণের ব্যবস্থা এখনই সব খানে নিতে হবে। কিন্তু এটি বিনামূল্যে করা যাবে না। আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও প্রয়োজন হবে। অরাজনৈতিক নীতিমালা, পরিকল্পনা, অবকাঠামো ও ব্যবস্থাপনা চর্চা প্রয়োজন হবে।

কিছু সংস্থা দারুণ কিছু সমাধান নিয়ে কাজ করতে চেয়েছে। কিন্তু সেসব সমাধান আসলে প্রযুক্তিগত সমাধান। উন্নত বিশ্বের জন্য প্রযোজ্য অনেক সমাধান উন্নয়নশীল বিশ্বে কাজে লাগবে না। সেসব বেশ জটিল ও ব্যয়বহুলও। এছাড়া ব্যবস্থাপনা, স্পেয়ার পার্টস, পরিচালনা দক্ষতা ইত্যাদিও টেকসই নয়। উদাহরণস্বরূপ, যে এলাকার ৯০ শতাংশ মানুষের পায়খানা নিষ্কাশনের ড্রেনই নেই, সেখানে মানববর্জ্য নিষ্কাশন প্লান্ট করার কোনো মানে হয় না।

যত সাধারণভাবে করা যাবে, ততই সমাধান টেকসই হয়ে উঠবে। একটি সমাধান হলো যে, আমরা সস্তা ও সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য উপায়ে খোলাস্থানে মলত্যাগ কমাতে পারি। এটি হলো সবচেয়ে ভালো তাৎক্ষণিক সমাধান। বিশেষ করে প্রত্যন্ত ভারতে যেখানে স্যানিটেশন অবকাঠামো অত্যন্ত দুর্বল। সৃজনশীলতা বা উদ্ভাবনশীলতা নিশ্চয়ই গুরুত্বপূর্ণ। তবে এটি স্থানীয় বাস্তবতার কথা মাথায় রেখে করতে হবে। যেন ভবিষ্যতের জন্য এটি টেকসই হয়।

শক্তিশালী নেতৃত্ব ও সুশাসনও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। যেসব স্থানে সরকার কম দুর্নীতিপ্রবণ ও শক্তিশালী সুশাসন রয়েছে সেখানে এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ভাইরাসের উপস্থিতির মাত্রাও কম। এছাড়া, স্বাস্থ্য খাতে অধিকতর ব্যয় হওয়া স্থানগুলোতেও রেজিসট্যান্সের হার কম। আমরা সমস্যাটির সমাধান করছি না কেন? এন্টিবায়োটিক রেজিসট্যান্সের সমাধান রয়েছে। তবে এর জন্য বিজ্ঞান এবং প্রকৌশলবিদ্যা, ওষুধ, সামাজিক পদক্ষেপ ও সরকারি শাসনের মধ্যে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার ঘাটতি রয়েছে। এর পেছনে নানা কারণ বিদ্যমান। স্বাস্থ্য খাতের গবেষকরা, বিজ্ঞানীরা ও প্রকৌশলবিদদের মধ্যে এ ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। বিশেষজ্ঞরাও প্রায়ই, কোন বিষয়ে অগ্রাধিকার দেয়া উচিৎ তা নিয়ে একমত নন। এসব বিভেদ সমাধানের নির্দেশনার উপর প্রভাব ফেলে।

ব্যাকটেরিয়ার মধ্যে প্রতিরোধী ক্ষমতা অর্জনকে অন্যান্য বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জের মতো করে দেখতে হবে, যেসব চ্যালেঞ্জ মানব ও পৃথিবীর অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলে। জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশের বৈচিত্র্য বা কোভিড-১৯ মোকাবিলার মতোই, প্রতিরোধক্ষম জীবাণুর বিবর্তন ও বিস্তার কমাতে প্রয়োজন বৈশ্বিক সহযোগিতা। অধিক বিশুদ্ধ পানি ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বিধির উন্নয়ন এখানে গুরুত্বপূর্ণ। আমরা যদি এখনই একসঙ্গে কাজ না করি, ভবিষ্যতে আরও চড়া মূল্য গুনতে হবে আমাদের।

(ডেভিড গ্রাহাম বৃটেনের নিউক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকোসিস্টেমস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক। পিটার কলিগনন অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সংক্রমণশীল ব্যাধি ও মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের অধ্যাপক। তাদের এই প্রতিবেদন দ্য কনভারসেশনে প্রকাশিত হয়েছে।)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

%d bloggers like this: