ইসরাইল সাহস করবে ইরানে আঘাত হানার ?

11

ইসরাইলি হামলার বিষয়টি আবার আলোচনায় উঠে এসেছে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে। ইরানের সাথে ছয় জাতির পরমাণু চুক্তির আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার আশঙ্কা আর একই সাথে পরমাণু বোমা বানানোর ক্ষেত্রে তেহরানের গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জনের গুজবের পরিপ্রেক্ষিতে ইসরাইলি গণমাধ্যমগুলোতে আবার এই আলোচনা মুখ্য হয়ে উঠেছে। ইসরাইলি সশস্ত্রবাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, তারা ‘যেকোনো সময়’ ইরানের পারমাণবিক প্রকল্পগুলো গুঁড়িয়ে দিতে প্রস্তুত রয়েছে। একই সাথে পাল্টা হুঁশিয়ারি আসছে ইরান থেকেও। ইরানি বিপ্লবী গার্ডবাহিনী বলছে, ইরানে যেকোনো হামলার জবাবে ইসরাইলের পরমাণু প্রকল্প নগরীতেই শুধু হামলা হবে না একই সাথে হাইফা তেলআবিব জেরুসালেমেও আঘাত করা হবে। ইরান এর মধ্যে বিভিন্ন মেয়াদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষাও চালিয়েছে। দু’পক্ষের মধ্যে এবারের যুদ্ধংদেহী বাগযুদ্ধের পুরোটাই যে কথার কথা নয়, এর প্রমাণ পাওয়া যায় ইসরাইল ও ইরানের তাৎপর্যপূর্ণ সামরিক মহড়ায়।

ইসরাইল কি সত্যিই হামলা চালাবে?
প্রশ্ন হলো, ইসরাইল কি সত্যি সত্যি ইরানের পরমাণু কেন্দ্রে হামলা চালাবে? আর হামলা চালালে এই দেশটির জন্য কী পরিণতি অপেক্ষা করবে? গত ২৩ ডিসেম্বর জেরুসালেম পোস্টে ইসরাইলি নিরাপত্তা বিশ্লেষক ইয়াকুব কাটজ এর নানা দিক বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি বলেন, সত্যি সত্যি যদি তেলআবিব এটি করে, তাহলে এর প্রথম টার্গেট হবে ইরানের প্রধান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কমপ্লেক্স- নাতাঞ্জ। কমপ্লেক্সটি প্রায় তিন লাখ বর্গফুট, প্রতিটি হল মাটির নিচে আট থেকে ২৩ ফুটের মধ্যে কোথাও খনন করা দু’টি বড় হল নিয়ে গঠিত। কংক্রিট আর ধাতুর বেশ কয়েকটি স্তর দ্বারা এটি আবৃত। প্রতিটি হলের দেয়াল আনুমানিক দুই ফুট পুরু। কমপেপ্লক্সটি সারফেস টু এয়ার মিসাইল দ্বারা বেষ্টিত।

হামলার পরবর্তী টার্গেট হতে পারে ইরানের আরাক শহরের কাছে নির্মাণাধীন ভারী পানির প্ল্যান্ট, যা একপর্যায়ে প্লুটোনিয়াম উৎপাদন করতে ব্যবহার করার মতো। ইরানিরা উপাদানটি চিকিৎসা এবং গবেষণা আইসোটোপ উৎপাদনের জন্য ব্যবহার করা হবে বলে উল্লেখ করেন। বাস্তবে এতে পারমাণবিক অস্ত্রের জন্য প্লুুটোনিয়াম তৈরি করার ক্ষমতা থাকতে পারে। এর পরেই রয়েছে ইরানের ইউরেনিয়াম কনভার্শন ফ্যাসিলিটি, যা ইস্ফাহান পারমাণবিক প্রযুক্তি কেন্দ্রে অবস্থিত। স্যাটেলাইট ইমেজের ওপর ভিত্তি করে ধারণা করা হয়, এই ফ্যাসিলিটি মাটির উপরে।

তারপরে রয়েছে কাস্পিয়ান সাগরের অদূরে কোম শহরের কাছে ফোরদো ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সুবিধা। সুবিধাটি হাজার হাজার সেন্ট্রিফিউজ ধারণ করতে পারে। একটি পাহাড়ে নির্মিত বলে সেখানে পৌঁছা বেশ কঠিন। সাবেক ইসরাইলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী এহুদ বারাক একাধিকবার উল্লেখ করেছেন যে, সুবিধাটি ‘মানক বোমা থেকে প্রতিরোধী’। ইসরাইলি সামরিক পরিকল্পনাকারীরাও সম্ভবত ইরানের সেন্ট্রিফিউজ ফ্যাব্রিকেশন সাইটগুলোতে আক্রমণ করতে চান যেন ইরানের জন্য তার প্রোগ্রাম পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত কঠিন হয়।

ইসরাইল এই মূল লক্ষ্যগুলো ছাড়াও ইরানের রাডার স্টেশন, ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি, সাইলো এবং লঞ্চারগুলোর পাশাপাশি বিমানঘাঁটিতে বোমা ফেলতে চাইবে, যার লক্ষ্য ইরানের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র বা যুদ্ধবিমান দিয়ে আঘাত করার ক্ষমতাকে রোধ করা।

ইসরাইল কিভাবে ইরানকে আক্রমণ করতে পারে, তার এই পরিকল্পনাটি ২০১২ সালে একবার প্রকাশিত হয়েছিল। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ইয়েজ হেন্ডেলের লেখা ‘ইসরাইল ভারসেস ইরান- দ্য শ্যাডো ওয়ার’ শিরোনামের একটি বইতে। তখন, কিছু ইসরাইলি কর্মকর্তাও ইরানের তেলক্ষেত্র এবং জ্বালানি অবকাঠামোতে বোমা হামলার সুপারিশ করেন। তারা বিশ্বাস করেছিলেন যে, এই ধরনের হামলা ইরানের ওপর একটি হতাশাজনক প্রভাব ফেলতে পারে এবং সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে।

ইরানের পাল্টা হুমকি
ইসরাইলের ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে হামলার হুমকির পাল্টা হিসেবে ইহুদি রাষ্ট্রটির দিমোনা ফ্যাসিলিটিতে বিস্ফোরণের হুমকি দিয়েছে ইরানের আইআরজিসি। গত ২৪ ডিসেম্বর ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর পরিচালিত একটি টুইটার অ্যাকাউন্টে ইসরাইলের পারমাণবিক স্থাপনা সমৃদ্ধ নেগেভ মরুভ‚মির দিমোনা শহরকে উড়িয়ে দেয়ার হুমকি দেয়া হয়েছে। টুইট বার্তায় দিমোনা পারমাণবিক কেন্দ্রের পাশাপাশি জেরুসালেম, তেলআবিব এবং হাইফা আক্রমণ করার হুমকি দেয়া হয়েছে। জেরুসালেম পোস্ট পত্রিকায় এ খবর প্রকাশ করা হয়।

এর আগে আইআরজিসির অ্যাকাউন্ট থেকে গত ১৩ ডিসেম্বরের একটি টুইটে ঘোষণা করা হয় যে, ‘ইহুদিবাদী শাসনের মূর্খতার ঘটনায়, ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান তেলআবিব এবং হাইফাকে ধ্বংস করতে আর প্রস্তুত নয়, তবে পবিত্র কুদসকে মুক্ত করতে সব কিছু করবে।’

গত ২৪ ডিসেম্বরের এক খবরে বলা হয়, ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ডবাহিনী-আইআরজিসি তাদের সামরিক মহড়ার চতুর্থ ও শেষ দিনে একই সাথে বিভিন্ন ধরনের ১৬টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছে। ‘মহানবী সা:-১৭’ নামের এই মহড়ার শেষদিনে ইরানি সেনারা দীর্ঘ, মধ্য ও স্বল্প পাল্লার এসব ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালায়। ইরানের প্রেস টিভি জানিয়েছে, মহড়ায় ইমাদ, কদর, সিজ্জিল, জিলজাল ও জুলফিকার নামের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। এসব ক্ষেপণাস্ত্র শতভাগ নিখুঁতভাবে কাক্সিক্ষত লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনে সেগুলো ধ্বংস করেছে। একই দিনে ইরানের অ্যারোস্পেস ফোর্সের দশটি কমব্যাট ড্রোন একসাথে বিভিন্ন অভিযানে অংশ নিয়েছে এবং কাক্সিক্ষত লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করেছে।

আইআরজিসি ডেপুটি চিফ অব অপারেশন্স এবং এই মহড়ার মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আব্বাস নিলফোরুশান বলেছেন, তার বাহিনীর এই মহড়া ইহুদিবাদী ইসরাইলের জন্য সরাসরি সতর্ক বার্তা বহন করছে। এর পাশাপাশি, ইরানের প্রতিবেশী এবং বন্ধুপ্রতিম দেশগুলোর জন্য রয়েছে শান্তির বার্তা।

চাইলেই কি সম্ভব?
কিন্তু, প্রশ্ন হলো ইসরাইল চাইলেই কি হামলা করতে পারবে? ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে আক্রমণ করার সময় তেলআবিব যে প্রধান সমস্যাটির সম্মুখীন হবে, তা হলো ইসরাইল থেকে ৭০০ মাইলেরও বেশি দূরত্ব, যার মূল লক্ষ্যগুলো ইসরাইল থেকে এক হাজার থেকে এক হাজার ৫০০ মাইলের দূরত্বের মধ্যেও রয়েছে। বেশির ভাগ অনুমান অনুসারে, ইসরাইল তাদের এফ-১৬ এবং এস-১৫ বিমান দিয়ে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে একতরফাভাবে আক্রমণ করতে সক্ষম। ১৯৮১ সালে ইরাকের বিরুদ্ধে অপারেশন অপেরার মতো একটি বিরতিহীন অপারেশনে ইরানকে আঘাত করতে ইসরাইল সক্ষম বলে মনে করা হয়, যার যুদ্ধ পরিসর ছিল দুই হাজার মাইল।

২০১২ সালে ইসরাইলের জন্য ইরানে যাওয়ার জন্য তিনটি সম্ভাব্য রুট ছিল। উত্তর রুট, যা তুর্কি-সিরিয়ান সীমান্ত বরাবর ইরানে প্রবেশ করেছে; কেন্দ্রীয় রুট, যা সবচেয়ে বেশি সরাসরি কিন্তু গুরুতর কূটনৈতিক বাধা রয়েছে; এবং দক্ষিণ রুট, যা ইসরাইলি বিমানগুলোকে সৌদি আরবের উপর দিয়ে ইরানে নিয়ে যাবে।

তখন, আইএএফের কাছে ইরানি স্থাপনা ধ্বংস করতে এবং নাতাঞ্জের সুরক্ষিত বাঙ্কারে প্রবেশের জন্য প্রয়োজনীয় কিছু যুদ্ধাস্ত্র ছিল, যা অভ্যন্তরীণভাবে তৈরি হয়েছে অথবা যুক্তরাষ্ট্র থেকে কেনা হয়েছে। অবশ্য, নাতাঞ্জ সবচেয়ে কঠিন লক্ষ্যবস্তুগুলোর মধ্যে একটি। বলা বাহুল্য, ১০ বছর আগে এ নিয়ে লেখার পর থেকে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। ইসরাইল তার অস্ত্র এবং প্ল্যাটফর্মগুলোকে উন্নত করেছে, যেমন এফ-৩৫ যেটি গোপনে ইরানের আকাশসীমায় উড়তে এবং রাডার স্টেশনগুলোকে বের করে নিতে সক্ষম, যা নন-স্টিলথ হওয়ায় বিমানকে ঝুঁকি ছাড়াই বোমায় বোঝাই ফিউসিলেজসহ প্রবেশ করতে সক্ষম করবে।

রুট সম্ভাবনাও পরিবর্তিত হয়েছে। আজ সিরিয়ার উপর দিয়ে উড়ে যাওয়া ২০১২ সালের মতো নয়, যখন বাশার আসাদের একটি উন্নত সামরিক বাহিনী ছিল এবং ইসরাইল খুব কমই তার আকাশসীমায় প্রবেশ করে। ইরাকে তখনকার মতো আমেরিকা আর মোতায়েন নেই; এবং ‘আব্রাহাম চুক্তি’ ইসরাইল ও সৌদি আরবের মধ্যে গতিশীলতা পরিবর্তন করেছে। ইসরাইলের এল আল বিমানগুলো এখন খোলাখুলিভাবে সৌদি আরবের উপর দিয়ে উড়ে। তার মানে, রিয়াদ আইএএফ ফাইটার জেটকে একই কাজ করতে দেবে কিনা সেটি নিশ্চিত নয়।

তবে একই সাথে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও অন্যান্য সক্ষমতাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচিতে অগ্রগতি অর্জন করেছে। জেরুসালেম তেহরানের বিরুদ্ধে একা যেতে পারে কি না তা বিবেচনা করার সময় লোকেরা প্রায়ই যা উপেক্ষা করে তা হলো, ইরানি প্রযুক্তিগত জ্ঞান। এটি কোনো বিদেশী উৎস থেকে পাওয়া নয়। এর অর্থ হলো ইসরাইল আক্রমণ করে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটাতে সফল হলেও, তা পুনর্গঠনের জন্য ইরানের সাহায্যের প্রয়োজন হবে না- তেহরান নিজেরাই এটি করতে সক্ষম হবে।

অন্য প্রধান পার্থক্য হলো, ২০১২ সালে ইসরাইলের বিকল্পটি কার্যকর এবং বাস্তব ছিল। এয়ারফোর্স তীক্ষ্ণ ছিল এবং পাইলটরা প্রশিক্ষিত ছিল এবং তাদের লক্ষ্যগুলো জানত; কিন্তু তাদের কখনোই সবুজ আলো দেয়া হয়নি এবং সেই সামর্থ্য বদলে গেছে। এখনো আইডিএফের জেনারেলরা আত্মবিশ্বাসী যে, তারা কাজটি সম্পন্ন করতে পারেন। ইসরাইলের সামরিক বাহিনী শক্তিশালী, আর ইরানকে এমন একটি আঘাত মোকাবেলা করতে হলে তার পারমাণবিক অগ্রগতি পিছিয়ে যাবে; কিন্তু এর পরিণতি কী হবে সেটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু।

নেতানিয়াহু প্রধানমন্ত্রী থাকাকালেও একবার ইসরাইলি সংবাদপত্রগুলো এই খবর প্রকাশ করেছিল যে, তাদের সরকার ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ধ্বংস করার পরিকল্পনা বিবেচনা করছে। তারপর ইরানিরা, তাদের পক্ষ থেকে, এই ধরনের হামলার সম্ভাবনার প্রতি ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। আরো কয়েকটি সরকার পরিকল্পনাটির সরাসরি নিন্দা করেছে। এরপর সামনে রয়েছে সর্বশেষ, হামাস-ইসরাইল ১১ দিনের যুদ্ধের অভিজ্ঞতা।

বিশ্লেষকরা কী বলেন?
ইসরাইল বিশ্লেষক, ইয়েদিওথ আহরোনোথের আমোস শাভিত বিশ্বাস করেন, সামরিক পদক্ষেপ ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই : ‘ইসরাইলের পক্ষ থেকে ইরানের ক্রমবর্ধমান পারমাণবিক হুমকির দিকে কেউ খেয়াল রাখবে না।’ কিন্তু, তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘আমাদের কি বিনা দ্বিধায় একটি অপারেশন শুরু করা উচিত? অবশ্যই না, আমাদের অবশ্যই হাজারবার ভাবতে হবে, কঠিন প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করতে হবে এবং সমস্ত সমস্যা বিবেচনা করতে হবে- ঠিক যেমনটি শুরু করেছিলেন; তবুও দিনের শেষে আমাদের অবশ্যই এই সবুজ আলো দেয়ার লক্ষ্য রাখতে হবে, কারণ অন্য কেউ আমাদের জন্য কাজটি করবে না।’

বৃহত্তম ইসরাইলি দৈনিক হারেৎজ, খোলামেলাভাবে ইরান বিষয়ে বিতর্ক নিয়ে গুরুত্বসহকারে আলোচনা করে। হারেৎজের সম্পাদকীয়তে জোর দিয়ে বলা হয়েছে, ‘ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোকে আক্রমণ করা কার্যকরভাবে একটি যুদ্ধ শুরু করার সমতুল্য। এ ধরনের সিদ্ধান্তের প্রভাব সমগ্র ইসরাইলি জনসাধারণের জন্য নাটকীয় এবং বেদনাদায়ক হতে পারে। এর পরিপ্রেক্ষিতে, সরকার এবং জনসাধারণের মধ্যে এবং জনসাধারণের বিভিন্ন অংশের মধ্যে এই ধরনের হামলার সম্ভাবনার বিষয়ে যে সীমিত সংলাপ চলছে তার বড় রকমের গুরুত্ব রয়েছে।’

ইসরাইল বিশ্লেষক ইয়োসি ইয়েহোশুয়া বিশ্বাস করেন, ‘হামলা করা হলে, ইসরাইলি বিমানবাহিনীর হাতে থাকা সব মডেলের অনেক ফাইটার জেট থাকতে হবে। সব অনুমান অনুসারে, এ ধরনের বায়বীয় অনুপ্রবেশের সম্ভাবনা অপ্রত্যাশিত, এবং কার্যকর অনুমান অনুযায়ী একটি পরিষ্কার সঙ্কেত হলো, কতগুলো বিমান নিরাপদে তাদের ঘাঁটিতে ফিরবে না; তখন গাজায় একজন অপহৃত সৈন্যের সাথে নয়, বরং ইরানের হাতে বন্দী ১০ জন পাইলটের বিষয় নিয়ে আমাদের লড়াই করতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে, সামরিক বিকল্পটি সম্পূর্ণরূপে বাদ দেয়া উচিত, তবুও এটি একটি শেষ অবলম্বন হিসেবে আসতে হবে, যখন আমরা সত্যিই আমাদের গলার উপর তলোয়ার ধরা হয়েছে বলে অনুভব করব। এটি কোনোভাবেই সহজ কোনো মিশন হবে না।’

আরেকটি উপসাগরীয় দৈনিক, দ্য পেনিনসুলা এক সম্পাদকীয়তে বলেছে, ‘ইরানে আক্রমণ করা একটি কঠিন কাজ হবে। এটি আরো দূরবর্তী লক্ষ্যবস্তু এবং ইসরাইলি যুদ্ধবিমানকে সম্ভবত সিরিয়া, ইরাক বা সৌদি আরবের প্রতিক‚ল আকাশসীমা অতিক্রম করতে হবে সেখানে পৌঁছানোর জন্য…। ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোও অনেক জায়গায় ছড়িয়ে আছে বলে মনে করা হয়, গভীর মাটির নিচে চাপা পড়ে আছে। ইরানের সামরিক বাহিনী সিরিয়া বা ইরাকের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী, অত্যাধুনিক বিমানবিধ্বংসী প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এবং ইসরাইলের যেকোনো স্থানে আঘাত হানতে সক্ষম শক্তিশালী মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে সজ্জিত। প্রযুক্তিগতভাবে উচ্চতর বিমানবাহিনীর পাশাপাশি, ইসরাইলের দূরপাল্লার বোমারু বিমানের অভাব রয়েছে যা ইরানের দূরবর্তী, বিচ্ছুরিত এবং সুরক্ষিত স্থাপনায় দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি করতে পারে।’

ইসরাইলের ঘাড়ে ইরানি প্রক্সির নিঃশ্বাস
ইরানের আনুষ্ঠানিক সমরশক্তির বাইরে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ প্রক্সি-শক্তি। এর মধ্যে ‘হিজবুল্লাহ’ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। হিজবুল্লাহর সাথে ইসরাইলের ২০০৬ সালে যুদ্ধের অভিজ্ঞতা রয়েছে। গত মে মাসের হামাসের সাথে যুদ্ধের সময় হিজবুল্লাহ জড়িয়ে যাবার ভয়ে তেলআবিব দ্রæত যুদ্ধবিরতি করতে সম্মত হয়। হিজবুল্লাহকে দুর্বল করার জন্য ইসরাইল বৈরুতে ভয়ঙ্কর গুপ্ত হামলা করে লেবাননের অর্থনীতিকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে। অব্যাহতভাবে রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরিতে ইন্ধন দিয়েছে। কিন্তু এত কিছুর পরও হিজবুল্লাহর শক্তির বড়ভাবে ক্ষুণ্ণ হয়েছে মনে করা কঠিন। সিরিয়া গৃহযুদ্ধে সামরিকভাবে দুর্বল হয়েছে কিন্তু দেশটির বিভিন্ন স্থানে রয়েছেন ইরানের সামরিক কর্মকর্তারা। দুই বৃহৎ শক্তি, রাশিয়া ও চীনের সাথে এখন ইরানের বোঝাপড়া অনেক গভীর। ইসরাইলের ‘আয়রন ডোম’ হামাসের ঘরে বানানো রকেট মোকাবেলা করে তাদের জনগণের নিরাপত্তা বিধান করতে পারেনি। ইরানের শত শত ক্ষেপণাস্ত্র আয়রন ডোম ভেদ করে যখন বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানবে তখন দেশটির নাগরিকরা যার যার মূল দেশে দ্রæত সরে পড়তে শুরু করবে। এর মধ্যে একটি ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে একেবারে ইসরাইলি পরমাণু স্থাপনার কাছে আঘাত করে তেহরান বার্তা দিতে চেয়েছে, তারা ইসরাইলের যেকোনো স্থানে আঘাত হানতে সক্ষম।

এসব বিবেচনা ইসরাইলের নেতাদের রয়েছে বলে মনে হয়, যার কারণে নেতানিয়াহু আমলের প্রান্তিক ভাবনা থেকে এখনকার নেতাদের নমনীয় হওয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। ইরান আর ইসরাইলের সঙ্ঘাতের পার্থক্য হলো, ইরানে আঘাত করা হলে দেশটি অল্প সময়ের মধ্যেই ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। আর ইসরাইলে ভেতর থেকে যে ক্ষয় আসা শুরু হয়েছে তাতে দেশটির ওপর যেকোনো বড় আঘাত বিশ্ব-মানচিত্র থেকে তেলআবিবের মুছে যাওয়ার কারণ হতে পারে।