উপসচিবের বাবা টিসিবির কার্ড পেলেন কমলগঞ্জে !

25

সরকারি বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) উপকারভোগীদের তালিকা তৈরিতে ব্যাপক অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে কমলগঞ্জে । সরকার স্বল্প আয়ের জনগোষ্ঠীকে উপকারভোগী হিসেবে তালিকায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অন্তর্ভুক্তির নির্দেশনা দিলেও তৃণমূলে সেই নির্দেশনা মানা হয়নি। কমলগঞ্জের আদমপুর ইউনিয়নে টিসিবির উপকারভোগী কার্ডধারী তালিকায় রয়েছেন পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উপসচিবের বাবার নাম। এছাড়া ইউপি সদস্যদের বাবা, ছেলে, বোনসহ সচ্ছল আত্মীয়স্বজনের নামও তালিকায় আছে। এ ইউনিয়নে টিসিবির উপকারভোগী তালিকায় বিত্তশালী ব্যক্তিদের নাম-ই বেশি।

এতে বঞ্চিতদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। সুবিধাবঞ্চিতদের অভিযোগ, স্থানীয় চেয়ারম্যান ও মেম্বাররা রাজনৈতিক লেবাসধারী নেতাদের মাধ্যমে ও নিজের অনুসারী এবং ভোটার ও আত্মীয়স্বজনের মাধ্যমে টিসিবির ফ্যামেলি কার্ড করা হয়েছে। নিজস্ব লোকদের মাধ্যমে তালিকা প্রণয়ন করায় স্বল্প আয়ের লোকজন তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন।

সংশ্লিষ্টদের সাথে আলাপ করে ও অনুসন্ধানে জানা গেছে, কমলগঞ্জ উপজেলার প্রায় সব কয়টি ইউনিয়নে জনপ্রতিনিধিরা তাদের স্বজন ও আস্থাভাজন লোকজন দিয়ে তালিকা তৈরি করায় তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন সুবিধাবঞ্চিতরা।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, কমলগঞ্জের আদমপুর ইউনিয়নে টিসিবির পণ্য বিতরণের নামের তালিকায় হতদরিদ্রদের নামের বদলে বিত্তবানদের জয়জয়কার। এ ইউনিয়নের তালিকায় পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উপসচিবের বাবা, এলাকার বিত্তশালী ও প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীদের নাম রয়েছে। ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ডের উত্তর ভানুবিল গ্রামের বাসিন্দা পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উপসচিব প্রদীপ কুমার সিংহের বাবা অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা কৃষ্ণ কুমার সিংহ ইতিমধ্যে টিসিবির প্রথম কিস্তির পণ্য নিয়েছেন। একই ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য আব্দুল গফুরের বাবা জহুর উল্যা, ভাই এরফান আলী ও তার ছেলে ধান ব্যবসায়ী আবুল হোসেনের নাম রয়েছে টিসিবির উপকারভোগী তালিকায়। অথচ এ ইউপি সদস্যের দুই ছেলে ফ্রান্স ও দুবাই প্রবাসী।

এছাড়া উত্তর ভানুবিল গ্রামের বিত্তশালী মো. গনু মিয়া নামও রয়েছে এ তালিকায়। গনু মিয়ার দ্বিতল বাড়ি রয়েছে। তার তিন ভাই থাকেন প্রবাসে। তালিকায় রয়েছে আদমপুর বাজারের ওষুধ ব্যবসায়ী কীর্তিজিত সিংহের নামও। স্বজনপ্রীতি ও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে ৬নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আলমগীর ফারুকের বিরুদ্ধে। সচ্ছল হয়েও তিনি তার ছেলে শামসুল আলম শুভর নাম দিয়েছেন তালিকায়। ৩নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আব্দুল আজিমের ছেলে ফাহাদ আলী, মেয়ের জামাই জুবের মিয়া ও বোন সাহেদা আক্তারের নামও রয়েছে টিসিবির তালিকায়। ইউনিয়নের সংরক্ষিত নারী সদস্য গুলনাহার বেগমের ভাই ও স্বজনদের নামও রয়েছে টিসিবির তালিকায়। একইভাবে ৩নং ওয়ার্ডের অধিবাসী আদমপুর বাজারের ওয়ালটন টিভি শোরুমের মালিক মইনুল ইসলামের নামও স্থান পেয়েছে ওই তালিকায়। স্থানীয়রা বলছেন, টিসিবির তালিকা তৈরিতে আরও যাচাই-বাছাই ও স্বচ্ছতার প্রয়োজন ছিল। এ পণ্য দরিদ্ররা পেলে উপকার হতো।

আলাপকাল ৭নং ওয়াডের্র ইউপি সদস্য আব্দুল গফুর টিসিবির তালিকায় উপসচিবের বাবার নাম, নিজের ছেলে, বাবা ও ভাইয়ের নাম অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি স্বীকার করে সাংবাদিকদের বলেন, আসলে আমি এতসব বুঝিনি। এটা আমার ভুল হয়েছে। চেয়ারম্যান সাহেবকে বলে তালিকা থেকে ওই নাম কেটে দেব। ইউপি সদস্য আজিম মিয়া বলেন, দরিদ্র অনেকে টাকা দিয়ে পণ্য কিনতে আগ্রহী না হওয়ায় সচ্ছলদের নাম তালিকায় দিতে হয়েছে।
আদমপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবদাল হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, আমি অনিয়ম পছন্দ করি না। মেম্বারদের তালিকায় কিছুটা স্বজনপ্রীতি হয়েছে। তালিকা দেখে আমি সচ্ছলদের নাম কেটে দেব।

কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আশেকুল হক বলেন, জনপ্রতিনিধিদের দেওয়া তালিকা অনুযায়ী কার্ডে স্বাক্ষর করেছি। কারা সচ্ছল তা জানি না। এ রকম হলে সচ্ছলদের নাম কেটে দেওয়ার জন্য চেয়ারম্যানকে বলে দেব। শুধু আদমপুর ইউনিয়নে নয় অন্যান্য ইউনিয়নেও উপকারভোগীদের তালিকা তৈরিতে ব্যাপক অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতি হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।