Home / প্রশাসন / ‘এই ডাক্তারদের জন্যই তো আজ আমি বিধবা’

‘এই ডাক্তারদের জন্যই তো আজ আমি বিধবা’

কোয়ারেন্টাইনে থাকা অবস্থায় মৃত্যুবরণকারী আলমগীর কবীর সনুর স্ত্রী সানজিদা কবীর চিকিৎসকের বিরুদ্ধে তার স্বামীকে মেরে ফেলার অভিযোগ করেছেন যশোর জেনারেল হাসপাতালের । বৃহস্পতিবার ভোরে মারা যান সনু। তিনি কিডনি রোগের চিকিৎসা নিতে ভারত যান। দেশে ফিরে বাধ্যতামূলক প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে ছিলেন যশোর জেনারেল হাসপাতালে। সেখানে কিডনি ডায়ালাইসিস করতে না পারায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন ৪৫ বছর বয়সের এই ব্যক্তি।

যশোরের চৌগাছা উপজেলার হাকিমপুর ইউনিয়নের স্বরূপপুর গ্রামের আনোয়ারুল হকের ছেলে সনু। তার মৃত্যুর জন্য স্ত্রী সানজিদার অভিযোগের তীর ডা. উবায়দুল কাদির উজ্জ্বলের দিকে। বলছেন, ‘আমি কখনো ওই ডাক্তারকে ক্ষমা করবো না’।

সানজিদা কবীরের ভাষ্য, যশোর জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসক ওবায়দুল কাদির উজ্জ্বলের অবহেলায় চিকিৎসা না পেয়ে তার স্বামী মারা গেছেন। বারবার তাকে খবর দেওয়ার পরেও ওই চিকিৎসক রোগীকে দেখতে আসেননি। তবে এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ডাক্তার উজ্জ্বল এবং হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. দিলীপকুমার রায়।

সানজিদা কবীর বলেন, গত ১০ এপ্রিল সন্ধ্যা ৭টায় যশোর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হন তার স্বামী আলমগীর কবীর। সেদিনই তারা ভারতের কলকাতা থেকে দেশে ফেরেন। তিনি বলেন, সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী বিদেশফেরত হিসেবে আমরা (তিনিসহ) জেনারেল হাসপাতালের কোয়ারেন্টাইনে থাকতে সম্মত হই। আমার স্বামীর ডায়ালাইসিস করার ব্যবস্থা করার বিষয়ে আগে থেকেই হাসপাতালের চিকিৎসকদের জানিয়েছি। তারাও আমাকে ডায়ালিসিসের ব্যবস্থা করা হবে বলে আশ্বাস দেন। কিন্তু ওই হাসপাতালের কিডনি রোগের বিশেষজ্ঞ ডাক্তার উজ্জ্বল দীর্ঘ এই সময়ে আমার স্বামীর কিডনি ডায়ালিসিসের ব্যবস্থা করেননি।

সানিজিদা বলেন, বুধবার রাতে (১৫ এপ্রিল) যখন আমার স্বামীর অবস্থা বেশ খারাপ, তখন ওয়ার্ডে থাকা সিস্টার ও আমি মিলে ডা. উজ্জ্বলকে কমপক্ষে ৫০ বার ফোন দিই। কিন্তু তিনি রিসিভ করেননি। ওই রাতে যদি আমার স্বামীর ডায়ালাইসিস করা যেতো হয়তো তিনি মারা যেতেন না।

সরকার ডাক্তারদের জন্যে হাসপাতালে হাজার হাজার পিপিইসহ সরঞ্জাম দিয়েছে ব্যবহারের জন্যে। কিন্তু ডাক্তাররা কী করছেন? কোয়ারেন্টাইনে থাকা রোগীদের যদি অন্য কোনো অসুখ থাকে, তার কি চিকিৎসা হবে না?- কান্নাজড়িত কণ্ঠে প্রশ্ন এই সদ্য বিধবার।

তিনি দাবি করেন, যশোরের একটি বেসরকারি হাসপাতাল তার স্বামীর ডায়ালাইসিস করাতে রাজি ছিল; কিন্তু ডা. উজ্জ্বলই কোয়ারেন্টাইনের অজুহাতে রোগীকে সেখানে যেতে দেননি।

এসব অভিযোগের বিষয়ে ডা. ওবায়দুল কাদির উজ্জ্বলের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘ওই রাতে আমার ডিউটি ছিল না। যে ডাক্তার দায়িত্বে ছিলেন, তিনি ওই ভদ্রলোককে (রোগী) অ্যাটেন্ড করেছেন।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘হাসপাতালের প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে থাকা রোগী মানেই আমরা সন্দেহ করি তিনি করোনা আক্রান্ত। সুতরাং নমুনা পরীক্ষা ছাড়া হাসপাতাল ত্যাগের কোনো সুযোগ তার নেই। আমরা এই রিস্ক নিতে পারি না। সে কারণে আমরা করোনা পরীক্ষার রেজাল্ট আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করেছি।’

তিনি বলেন, ‘যেদিন ওই রোগী এখানে আসেন, আমরা তাকে ঢাকায় রেফার করেছিলাম। ঢাকায় করোনা পরীক্ষার রেজাল্ট একদিনে পাওয়া সম্ভব। যশোর থেকে খুলনায় নমুনা পাঠিয়েও দুই তিন দিন অপেক্ষা করতে হয়।’

জানতে চাইলে যশোর জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. দিলীপকুমার রায় বলেন, ওই রোগীকে আগেও চিকিৎসা দিয়েছেন ডা. উজ্জ্বল। কিন্তু ভারত থেকে ফেরার কারণে সমস্যা হয়েছে। জেনারেল হাসপাতালে ডায়ালিসিস করানোর কোনো ব্যবস্থা নেই। প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে থাকায় করোনা পরীক্ষা ছাড়া হাসপাতালের ডাক্তারও যেমন তাকে বাইরে পাঠাতে চাননি, তেমনি যেখানে ডায়ালাইসিস করানো হয়, তারাও নিতে চায়নি।

তিনি বলেন, ‘ভারত ফেরত অন্য জেলার রোগীকে আমরা ঢাকাসহ তাদের স্ব-স্ব জেলায় পাঠিয়ে দিয়েছি। কিন্তু, এই রোগীর বাড়ি যশোরে। তাছাড়া চুয়াডাঙ্গার সিভিল সার্জনও (মৃত সনুর আত্মীয়) যশোরের মানুষ, তিনিও অনুরোধ করেন যশোরে রেখে চিকিৎসা করানোর। আমরা আসলে তার করোনা পরীক্ষা না করিয়ে বাইরে পাঠাতে পারি না।

ডা. দিলীপকুমার বলেন, ‘ওই রাতে ডা. উজ্জ্বলের দায়িত্ব ছিল না। সেখানে মেডিসিন ডাক্তার দেবাশীষ ছিলেন। তিনি ওই রোগীকে চিকিৎসাও দিয়েছেন। এছাড়া বৃহস্পতিবার দুপুরে হাসপাতালের আরএমও রোগীকে ছাড়পত্রও দেন। কিন্তু তারা যাননি। আমি শুনেছি ওই রোগীর অ্যাটেনডেন্ট যশোরের ইবনে সিনায় ডায়ালাইসিস করিয়ে একবারে বাড়ি নিয়ে যেতে চাইছিলেন।

বুধবার আমরা মৌখিকভাবে খুলনা থেকে জানতে পারি আলমগীর কবীরের করোনা পরীক্ষার ফল নেগেটিভ। তারপরই ইবনে সিনায় তাকে ডায়ালিসিসের জন্যে বলা হয়। বৃহস্পতিবার সকালে ডায়ালাইসিসের কথা ছিল। কিন্তু, সকাল সাড়ে ছয়টার দিকে চুয়াডাঙ্গার সিএসের ফোনে জানতে পারি, তিনি এক্সপায়ার্ড হয়েছেন (মারা গেছেন)।’

ফের প্রশ্ন করা হলে সানজিদা বলেন, ‘বুঝুন তাহলে অবস্থা! আমার স্বামী যশোর জেনারেল হাসপাতালে মারা গেছেন। আর এই হাসপাতালের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা চুয়াডাঙ্গার সিভিল সার্জনের কাছ থেকে তার মৃত্যুর সংবাদ শুনছেন। আপনারাই বলুন, আমি কিভাবে এইসব ডাক্তারকে ক্ষমা করবো? ওদের জন্যই তো আজ আমি বিধবা।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

%d bloggers like this: