Home / আর্ন্তজাতিক / কখন আসবে টিকা, অপেক্ষায় পৃথিবীর মানুষ

কখন আসবে টিকা, অপেক্ষায় পৃথিবীর মানুষ

প্রায় দুই লাখ মানুষ বিশ্বজুড়ে করোনা ভাইরাস (কভিড-১৯) মহামারিতে প্রাণ হারিয়েছেন। আক্রান্ত হয়েছেন ২৭ লাখের বেশি। প্রতিদিন মৃত ও আক্রান্তের তালিকা বেড়েই চলেছে। ভাইরাসটি নতুন ও দ্রুত বিবর্তিত হওয়ায় এখন পর্যন্ত এর সম্পর্কে অনেক তথ্যই অজানা। এখন পর্যন্ত ভাইরাসটির কোনো কার্যকরী চিকিৎসা নেই। স্বীকৃত কোনো টিকা বা ওষুধও নেই। বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, চলতি বছর কোনো টিকা আবিষ্কারের সম্ভাবনাও কম। আবিষ্কার হলেও সে টিকার বাণিজ্যিক উৎপাদন ও বিক্রি শুরু হতে আগামী বছরের মাঝামাঝি সময় লাগতে পারে।

তবে ভাইরাসটির টিকা তৈরিতে বিশ্বজুড়ে চেষ্টা করছেন কয়েক ডজন বিজ্ঞানীদের দল। এদের মধ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সাংস্থা অনুসারে, ছয়টি টিকার মানব দেহে (ক্লিনিক্যাল) পরীক্ষা চালানো হচ্ছে। এছাড়া, প্রাণীদেহে পরীক্ষাসহ প্রাথমিক বা প্রি-ক্লিনিক্যাল পর্যায়ে রয়েছে আরো ৭৭টি টিকা। এসব টিকার মধ্যে অন্যকোনো রোগ নিরাময়ে ব্যবহৃত ওষুধ থেকে শুরু করে প্রাণীদেহের অ্যান্টিবডি পর্যন্ত রয়েছে।
গত ২৩শে এপ্রিল প্রকাশিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রকাশিত এক তালিকা অনুসারে, বর্তমানে ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা চালানো হচ্ছে ছয়টি সম্ভাব্য টিকা নিয়ে। এর মধ্যে ৩টি চীনা, ২টি মার্কিন ও ১টি বৃটিশ টিকা রয়েছে। এছাড়া, সপ্তাহখানেকের মধ্যে নতুন আরেকটি টিকার ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা শুরু করার ঘোষণা দিয়েছে জার্মান বায়োটেক প্রতিষ্ঠান বায়নটেক।
প্রতিষ্ঠান ভিত্তিতে অগ্রগতি   
করোনা ভাইরাসের উৎপত্তি চীনের উহানে। গত ফেব্রুয়ারিতে ভাইরাসটির জিনোম সিকুয়েন্স প্রকাশ করে চীনের বিজ্ঞানীরাই। মার্চ থেকেই শুরু হয় সম্ভাব্য একটি টিকার মানব দেহে পরীক্ষা। ক্লিনিক্যাল পরীক্ষার দিক দিয়ে সবচেয়ে এগিয়ে আছে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনুসারে, তিনটি চীনা টিকার মধ্যে, একটি তৈরি করছে ক্যানসিনো বায়োলজিক্যাল ইনকরপোরেশন ও বেইজিং ইন্সটিটিউট অব বায়োটেকনোলজি; দ্বিতীয় টিকাটি তৈরি করছে বেইজিং ইন্সটিটিউট অব বায়োলজিক্যাল প্রোডাক্টস ও উহান ইন্সটিটিউট অব বায়োলজিক্যাল প্রোডাক্টস; তৃতীয় টিকাটি তৈরি করছে সিনোভেক।
ক্যানসিনোর টিকাটি বর্তমানে ক্লিনিক্যাল পরীক্ষার দ্বিতীয় পর্যায়ে আছে। এর আগে এই টিকাটি ইবোলা মহামারির চিকিৎসায় প্রয়োগ করা হয়েছিল। গত মার্চ মাসে এ টিকাটির ক্লিনিক্যাল পরীক্ষার অনুমোদন দেয়া হয়। তাদের পরীক্ষা চালানো ভাইরাসটির নাম এডি৫-এনসিওভি। মার্চের ১৬ থেকে ৩১ তারিখ পর্যন্ত ১৮ থেকে ৬০ বছর বয়সী বিভিন্ন রোগীর উপর এ ওষুধটি প্রয়োগ করা হয়।
বেইজিং ইন্সটিটিউট অব বায়োলজিক্যাল প্রোডাক্টস ও উহান ইন্সটিটিউট অব বায়োলজিক্যাল প্রোডাক্টসের টিকাটি ক্লিনিক্যাল পরীক্ষার প্রথম পর্যায়ে রয়েছে। চলতি মাসের ১০ তারিখ থেকে এটি পরীক্ষার অনুমোদন দেয়া হয়েছে। টিকাটি এর আগে অন্যকোনো রোগ সারাতে ব্যবহৃত হয়নি।
এদিকে, সিনোভ্যাকের টিকাটিও মানব দেহে পরীক্ষার প্রথম পর্যায়ে রয়েছে। সম্প্রতি টিকাটি নিয়ে আশা জাগানিয়ে খবর প্রকাশ হয়েছে। ক্লিনিক্যাল পরীক্ষার আগে আটটি বানরের মধ্যে টিকাটি প্রয়োগ করা হয়েছিল। সম্প্রতি সিনোভ্যাক জানিয়েছে, তিন সপ্তাহ পর বানরগুলোর মধ্যে নতুন করোনা ভাইরাসটি প্রবেশ করানো হলেও কোনো বানরের মধ্যেই সম্পূর্ণরূপে সংক্রমণ দেখা যায়নি। ভাইরাসটি প্রয়োগের এক সপ্তাহ পর গবেষকরা বানরগুলোর শরীরে ভাইরাসটির কোনো চিহ্ন খুঁজে পাননি।
এদিকে, করোনার টিকা আবিষ্কারের প্রতিযোগিতায় এগিয়ে আছে যুক্তরাষ্ট্রের দুটি প্রতিষ্ঠানও। এর মধ্যে ইনোভিও ফার্মাসিউটিক্যালস আইএনও-৪৮০০ নামের একটি টিকা তৈরি করছে। তাদের টিকাটি পূর্বে নিপা, লাসা, এইচআইভি, জিকা সহ অন্যান্য জটিল রোগের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়েছিল। টিকাটি বর্তমানে মানব দেহে পরীক্ষার প্রথম পর্যায়ে রয়েছে। গত ১৩ই এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া এই পরীক্ষায় আনুমানিক ৭০০ মানুষের উপর চার মাস ধরে ওষুধটি প্রয়োগ করে দেখা হবে। চলতি বছরের মধ্যেই টিকাটির মানব দেহে পরীক্ষার চূড়ান্ত ফল পাওয়া যাবে বলে প্রত্যাশা করছেন গবেষকরা।
মডার্নার পাশাপাশি ন্যাশনাল ইন্সটিটিউশন অব এলার্জি অ্যান্ড ইনফেকশিয়াস ডিজিসের (এনআইএআইডিএস) সঙ্গে মিলে অন্য আরেকটি টিকা তৈরি করছে মার্কিন প্রতিষ্ঠান মডার্না। এটি ক্লিনিক্যাল পরীক্ষার প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। পূর্বে ২০০২-২০০৩ সালের সারস করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রয়োগের জন্য টিকাটি তৈরি করা হয়েছিল। এখন কভিড-১৯ মোকাবিলায় নতুন করে এটি ব্যবহারের জন্য তৈরি করছে মডার্না। গত মার্চ মাস থেকে এমআরএনএ-১২৭৩ নামের টিকাটির মানব দেহে পরীক্ষা শুরু হয়। আগামী জুনের মধ্যে এর প্রথম দফা পরীক্ষা শেষ হতে পারে বলে জানিয়েছেন গবেষকরা।
এদিকে, বৃহস্পতিবার থেকে মানব দেহে পরীক্ষা শুরু হয়েছে বৃটিশ একটি টিকারও। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির একদল বিজ্ঞানী টিকাটি তৈরি করেছেন। সিএইচএডিওএক্স১ এনসিওভি-১৯ নামের ওই টিকাটির মানব দেহে পরীক্ষা শুরু হয়েছে ইউনিভার্সিটি হসপিটাল সাউথাম্পটনে। এটাই ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা শুরু করা একমাত্র বৃটিশ টিকা।
অক্সফোর্ডের দলটি শিম্পাঞ্জির দেহ থেকে অ্যান্টিবডি নিয়ে টিকা তৈরির চেষ্টা করছে। এজন্য শিম্পাঞ্জির দেহে প্রথমে ভাইরাসটি প্রবেশ করানো হয়। ভাইরাস থেকে বাঁচতে প্রাণীটির দেহে একধরনের অ্যান্টিবডি সৃষ্টি হয়। অক্সফোর্ড ভ্যাকসিন গ্রুপ ও জেনার ইন্সটিটিউট যৌথভাবে এই টিকা তৈরির কাজ করছে। তাদের প্রত্যাশা আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যেই তারা টিকাটি মানুষের মধ্যে ব্যবহার উপযোগী করে তুলতে পারবে। তবে সেটি বাজারে আসতে দেরি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা জানান, সাধারণত কোনো ভাইরাসের টিকা বাজারে আসতে ১০ থেকে ৫ বছর লেগে যায়। কিন্তু, বর্তমানে করোনার টিকা আগামী ১ থেক ২ বছরের মধ্যে বাজারে আনার চেষ্টা করছে বিশ্বজুড়ে কয়েক ডজন প্রতিষ্ঠান। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগামী বছরের আগে কোনো টিকা বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনের সম্ভাবনা নেই।

উপরোক্ত টিকাগুলো ছাড়াও, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, বিশ্বজুড়ে প্রি-ক্লিনিক্যাল পরীক্ষায় রয়েছে অন্তত ৭৭টি টিকা। তবে কেবল টিকাই করোনা ভাইরাসের একমাত্র চিকিৎসা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে না। চীনের একদল চিকিৎসক এর আগে জানান, তারা করোনা রোগীদের উপর জাপানে ফ্লু’র চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধ ফাভিপিরাভির প্রয়োগ করে সফলতা পেয়েছেন। এতে রোগীরা দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠার প্রমাণ পাওয়া গেছে। তবে ওষুধটি নিয়ে এখনো গবেষণা চলছে।
এদিকে, বিশ্ব যখন টিকা তৈরির প্রতিযোগিতায় মত্ত তখন জনপ্রিয় একটি টিকা- রেমডেসিভির ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে অকার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। সম্প্রতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক ফাঁস হওয়া প্রতিবেদনে এ তথ্য দেখা গেছে। ফেব্রুয়ারিতে সংস্থাটির জানিয়েছিল, রেমডেসিভিরকে করোনার চিকিৎসায় একটি সম্ভাব্য ওষুধ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

%d bloggers like this: