Home / ফিচার / করোনা পরিস্থিতিতেও জনপ্রতিনিধিদের চাল চুরি ও নৈতিকতা

করোনা পরিস্থিতিতেও জনপ্রতিনিধিদের চাল চুরি ও নৈতিকতা

ঘটনা ১

‘ত্রাণের চাল চুরি : অভিযুক্ত চেয়ারম্যানের পক্ষে এমপি আহমেদ ফিরোজ। ২২৯ বস্তা সরকারি ত্রাণের চালসহ পাবনার বেড়া উপজেলার ঢালারচর ইউপি চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি কোরবান আলী সরদারকে হাতেনাতে আটক। ও পরে আমিনপুর থানায় দায়েরকৃত মামলায় গ্রেফতারের ঘটনায় অভিযুক্ত চেয়ারম্যানের পক্ষেই অবস্থান নিয়েছেন।

পাবনা ২ আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আহমেদ ফিরোজ কবীর। চাল চুরির ঘটনায় কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের নির্দেশনায় জেলা আওয়ামী লীগ কোরবান আলী সরদারকে প্রাথমিক সদস্যপদসহ দলীয় সকল সদস্যপদ থেকে বহিষ্কার করেছে।

র‍্যাব-১২ পাবনা ক্যাম্পের কমান্ডার আমিনুল কবীর তরফদার জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সোমবার র‍্যাব জানতে পারে বেড়া উপজেলার ঢালারচর ইউপি চেয়ারম্যান কোরবান আলী সরদার ভিজিডি ত্রাণের চাল কালো বাজারে বিক্রির উদ্দেশ্যে ইউনিয়ন পরিষদ ভবনে না রেখে। গভীর রাতে রূপপুর ইউনিয়নের বাঁধেরহাট বাজারে নিজ ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের গুদাম ঘরে মজুদ করছেন। সোমবার রাত ১০টার দিকে র‍্যাব হাতেনাতে এই চাল উদ্ধার করে। চেয়ারম্যানকে জিজ্ঞাসাবাদে প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ায় তাকে আটক করে। রাতে আমিনপুর থানায় মামলা দায়ের করা হয়। পরে মঙ্গলবার আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। সময় টিভি, ১২ এপ্রিল ২০২০

ঘটনা ২

জামালপুরে ট্রাক আটকিয়ে ত্রাণ লুটের ঘটনার নেপথ্যে বেড়িয়ে আসছে চাঞ্চল্যকর খবর। তথ্য অনুসন্ধানে জানা গেছে, ক্ষুধার্তরা নয়, রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় ত্রাণ লুটের ঘটনা ঘটেছে। নেপথ্যে ছিল এক জেলা আওয়ামী লীগ নেতা। তার ইন্ধনেই ত্রাণ লুটের ঘটনা ঘটেছে বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঘটনাস্থলের আশপাশের এলাকায় একাধিক ব্যক্তির সাথে কথা বলে জানা গেছে। জেলা প্রশাসকও সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে ক্ষুধার্ত নয়, রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় ত্রাণ লুটের ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করেছেন। ঢাকা টাইমস ১৪ এপ্রিল ২০২০।

ঘটনা ৩

করোনা ভাইরাস সংক্রমণের (কোভিড-১৯) ফলে সৃষ্ট সংকটের মধ্যে মানবিক আবেদনে অসহায়দের পাশে দাঁড়াচ্ছে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান। করোনায় অসহায় ও কর্মহীন ২৬ পরিবারের মধ্যে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করছিলেন চট্টগ্রামের হাটহাজারীর এক ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান।

ত্রাণ বিতরণকালে ছবি তোলার পর ২৬ পরিবারের কাছ থেকে সেই ত্রাণসামগ্রী কেড়ে নিয়েছেন বলে ওই চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনার প্রতিবাদ করতে গিয়ে চেয়ারম্যান ও তার লোকজনের হাতে মারধরের শিকার হয়েছেন অসহায় পরিবারের সদস্যরা।

মারধরের শিকার পরিবারগুলো এ ঘটনার জন্য দায়ী করেছেন স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নুরুল আবছারকে। অভিযুক্ত নুরুল আবছার হাটহাজারী উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা হিসেবে পরিচিত। তার বিরুদ্ধে প্রকল্পের টাকা আত্মসাৎ এবং নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম, ১২ এপ্রিল ২০২০।

ঘটনা ৪

বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার কাকচিড়া ইউনিয়নে জেলেদের ভিজিএফ চাল বিতরণে ব্যাপক অনিয়মের ঘটনায় চেয়ারম্যান আলাউদ্দিন পল্টুকে আটক করেছে বরগুনা ডিবি পুলিশ। এসময় নৌবাহিনীর টহল টিম উপস্থিত ছিলেন। ডিবির ওসি হারুন অর রশিদ হাওলাদার তাকে আটকের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

শুক্রবার (৩ এপ্রিল) জেলেদের ভিজিএফ চাল বিতরণে অনিয়মের ভিত্তিতে সরেজমিনে গিয়ে প্রাথমিক সত্যতা পেয়েছেন পাথরঘাটা উপজেলা চেয়ারম্যান মোস্তফা গোলাম কবির ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির।

পাথরঘাটা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মোস্তফা গোলাম কবির জানান, চেয়ারম্যান আলাউদ্দিন পল্টু চাল বিতরণ ব্যাপকভাবে অনিয়ম করেছে। তার এলাকায় বরাদ্দকৃত ৪৪ মেট্রিকটন চালের মধ্যে মাত্র সাড়ে ১৬ মেট্রিকটন চাল বিতরণের সঠিক প্রমাণ দিতে পেরেছে। বাকি সাড়ে ২৭ মেট্রিকটন চাল বিতরণের কোনো সঠিক প্রমাণ দিতে পারেননি তিনি। ভোরের কাগজ, ১২ এপ্রিল ২০২০।

উপরের ঘটনা গুলি এই সময়ে যখন পৃথিবী ব্যাপী ছড়িয়ে পড়া করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত বাংলাদেশের চিত্র। দেশ ও পৃথিবী ব্যাপী যখন মানুষের জীবন মরণ অবস্থা কোথায় আমাদের রাজনীতিবিদ ও জন প্রতিনিধি তাদের পাশে দাঁড়াবেন তা না করে হরিলুটের উৎসবে যোগ দিয়েছেন চিরাচরিত নিয়মে। আসলে তাদের কি দোষ প্রবাদে আছে ‘ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভাঙ্গে’।

১. পাবনার বেড়া উপজেলার ঢালারচর ইউপি চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি কোরবান আলী সরদারকে ২২৯ বস্তা সরকারি ত্রাণের চালসহ হাতেনাতে আটক করেছে র‍্যাব। চেয়ারম্যান কোরবান আলী সরদার ভিজিডি ত্রাণের চাল কালো বাজারে বিক্রির উদ্দেশ্যে আনে।

তিনি সেটি ইউনিয়ন পরিষদ ভবনে না রেখে গভীর রাতে রূপপুর ইউনিয়নের বাঁধেরহাট বাজারে নিজ ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের গুদাম ঘরে মজুদ করছেন। যেখানে র‍্যাব প্রমাণসহ তাকে আটক করেছে।

সেখানে এমপি সাহেব কোথায় জনগণের ও করোনা মহামারির কথা বিবেচনা করে চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিবেন। তা না করে চেয়ারম্যানকে বাঁচানোর জন্য উঠে পড়ে লেগেছেন। যে কারো মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে এমপি কি জনগণের নাকি চেয়ারম্যানের?

২. জামালপুরে ট্রাক আটকিয়ে ত্রাণ লুটের ঘটনা নিয়ে ২ ধরণের তথ্য মিডিয়া ও সোশ্যাল মিডিয়াতে ভেসে বেড়াচ্ছে :

এক. এলাকার জনগণ ত্রাণ পাচ্ছে না। এর ফলে গরিব ও অসহায় মানুষ গুলো না পেড়ে ট্রাকের সব ত্রাণ লুট করে নিয়ে গেছেন মুহুর্তে মধ্যে।

দুই. ক্ষুধার্তরা নয়, রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় ত্রাণ লুটের ঘটনা ঘটেছে। নেপথ্যে ছিল এক জেলা আওয়ামী লীগ নেতা।

দুইটি ঘটনায় জাতি হিসেবে আমাদের জন্য সুখকর নয়। কারণ প্রথম ঘটনা যদি সত্য হয়ে থাকে তাহলে আমাদের সরকার ও স্থানীয় প্রশাসন ব্যর্থ হয়েছেন। এই দু:সময়ে মানুষকে সহযোগিতা করতে। যার ফলে মানুষ বাধ্য হয়ে লুটের মত ঘটনায় অংশ নিতে বাধ্য হয়েছেন। আর অন্যটি যদি হয় রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে ঘটনাটি সাজানো হয়েছে। সেখানে আরো বড় অশনি সংকেত। কারণ দল মত নির্বিশেষে যেখানে সবাই সবার পাশে থাকা উচিত। তা না করে নিজেদের মধ্যে এরকম নোংরা রাজনীতির খেলা রাজনীতিবিদদের নীতি ও নৈতিকতা দিকে আঙ্গুল তোলার রাস্তা আরো সহজ করে দিল!

৩. করোনায় অসহায় ও কর্মহীন ২৬ পরিবারের মধ্যে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করছিলেন চট্টগ্রামের হাটহাজারীর এক ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান নুরুল আবছার। তিনি আবার হাটহাজারী উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা হিসেবে পরিচিত। ত্রাণ বিতরণকালে ছবি তোলার পর ২৬ পরিবারের কাছ থেকে সেই ত্রাণসামগ্রী কেড়ে নিয়েছেন।

চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ উঠেছে। ঘটনার প্রতিবাদ করতে গিয়ে চেয়ারম্যান ও তার লোকজনের হাতে মারধরের শিকার হয়েছেন অসহায় পরিবারের সদস্যরা। কোথায় চেয়ারম্যান ও আওয়ামীলীগ নেতা জনগণের পাশে দাঁড়াবেন। তা না করে ফটো সেশনের জন্য লোকজনকে ডেকে ত্রাণ দিয়ে ফেরত নেওয়া। এভাবে মারধর করার ঘটনা অত্যন্ত ন্যক্ষার জনক ও অমানবিক।

৪. চেয়ারম্যান আলাউদ্দিন পল্টু চাল বিতরণ ব্যাপকভাবে অনিয়ম করেছেন। তার এলাকায় জেলেদের জন্য বরাদ্দকৃত ৪৪ মেট্রিকটন চালের মধ্যে মাত্র সাড়ে ১৬ মেট্রিকটন চাল বিতরণের সঠিক প্রমাণ দিতে পেরেছে। বাকি সাড়ে ২৭ মেট্রিকটন চাল বিতরণের কোনো সঠিক প্রমাণ দিতে পারেননি তিনি।

আমরা জানি জেলে সম্প্রদায় এমনিতেই দরিদ্র সীমার নিচে বসবাস করেন। অন্য যে কোনো সম্প্রদায় থেকে তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা ও শিক্ষার হার ও নিম্নমুখী। তারা সাধারণত প্রতিবাদ কম করে থাকেন। এই বিপদের সময় এই জনগোষ্ঠীর জন্য বরাদ্দকৃত ত্রাণের চাল মেরে খাওয়া কতটুকু অমানবিক।

একটা সময় ছিল সমাজে যারা খুবই ভালো মানুষ ছিলেন তাদের কে এলাকার লোকজন অনেকটা জোড় করেই চেয়ারম্যান বানাতেন। কিন্তু বিগত ২টি নির্বাচন দলীয় প্রতীকে হওয়ার ফলে সজ্জন ব্যক্তিরা নির্বাচন করছেন না। আর যারা করছেন তারাও মার্কার সাথে পেরে উঠছেন না। হতে পারে দেশের বর্তমান হ-য-ব-র-ল এই দলীয় চেয়ারম্যানদের প্রভাবের জন্য।

উপরোক্ত চারটি ঘটনা শুধু লেখার মাধ্যমে তুলে এনেছি এরকম শত শত ঘটনা ঘটছে দেশজুড়ে। যার কিছু ঘটনা টেলিভিশন বা পত্রিকার পাতায় আসে। আর যারা খুব নিপুণভাবে চুরি করে যাচ্ছেন তাদের সেই ঘটনা প্রকাশিত হয় না। করোনার মতো মহামারিতে যেখানে পৃথিবীব্যাপী মানুষের সহযোগিতার মনোভাব বৃদ্ধি পাচ্ছে সেখানে আমাদের অনেক জনপ্রতিনিধি যেভাবে হরিলুট ও চুরির মহোৎসব করছেন তা থেকে বেড়িয়ে এসে জনগণকে সহযোগিতা করুন।

প্রত্যাশা রাখি, জনপ্রতিনিধিদের শুভবুদ্ধির উদয় হবে।

লেখক: শাহাবুদ্দিন শুভ, প্রধান সম্পাদক, সিলেট পিডিয়া

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

%d bloggers like this: