Home / অন্যান্য / অপরাধ / কৈশোর বিপথগামিতার ঝুঁকিতে

কৈশোর বিপথগামিতার ঝুঁকিতে

এক কিশোরীকে পাঁচ বন্ধু মিলে ধর্ষণ করে প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখান করায় গত মাসে ঢাকার কামরাঙ্গীরচরে। ১৫ থেকে ১৮ বছর বয়সী এসব কিশোরকে ধর্ষণে সহযোগিতা করে কিশোরীর এক বান্ধবী। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গ্রেপ্তার করেছে তাদের। এই একটি ঘটনাই থেমে থাকেনি ধর্ষণের মারী। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে গত রবিবার দিবাগত রাত পর্যন্ত রাজধানীতে দলবেঁধে একাধিক ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে।

আশঙ্কাজনকভাবে এসব ঘটনায় জড়িতদের বেশিরভাগই বয়সে কিশোর। এরপর রয়েছে মাদকাসক্ত। দল বেঁধে ধর্ষণের ঘটনায় উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে সব মহলে। বিচারে দীর্ঘসূত্রিতা ও ধর্ষণ পরবর্তী শাস্তির বাইরে থেকে যাওয়ার কারণে অন্যদের মধ্যেও অপরাধপ্রবণতা তৈরি হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। অন্তত কয়েকটি ধর্ষণের ঘটনায় নজির রাখার মতো শাস্তি নিশ্চিত করা না গেলে ধর্ষণের ঘটনার রাশ টেনে ধরা কঠিন হয়ে পড়বে আশঙ্কা তাদের।

অপরাধবিজ্ঞানীরা বলছেন, তরুণদের শারীরিক চর্চাসহ ক্রিয়াশীল কাজের সুযোগ কম থাকায় অনেকে বিপথগামী হচ্ছেন। আর বিচারহীনতার কারণে এই ধরনের অপরাধ করতে সাহস পাচ্ছে অপরাধীরা। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ধর্ষণের মামলার বিচার সম্পন্ন করা এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। এতে করে ধর্ষকদের মনের মধ্যে ভীতির সঞ্চার হবে।

রাজধানীর বাড্ডা ও কদমতলীতে একই দিনে দল বেঁধে দুই কিশোরীকে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। গাজীপুর, ময়মনসিংহেও বয়সে কিশোরদের হাতে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন দুই তরুণী। বাড্ডার ধর্ষণের ঘটনায় অপরাধী গ্রেপ্তার না হলেও অন্য ঘটনাগুলোয় জড়িতদের গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যানুযায়ী, ২০১৯ সালে সারাদেশে ধর্ষণ ও গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন মোট ১৪১৩ নারী। এর মধ্যে ধর্ষণ পরবর্তী হত্যার শিকার হয়েছেন ৭৬ জন এবং ধর্ষণের পর আত্মহত্যা করেছেন ১০ জন। যা আগের দুই বছরের চেয়ে দ্বিগুণ। ২০১৭ সালে দেশে ৮১৮টি ধর্ষণ ও গণধর্ষণের ঘটনা ঘটে। আর ২০১৮ সালে তা কিছুটা কমে ৭৩২ এ নেমে আসে।

কদমতলীর ধর্ষণের ঘটনার বিষয়ে জানা গেছে, গত রবিবার সকালে নোয়াখালী পট্টি এলাকায় তিন যুবক মিলে দুই কিশোরীকে ধর্ষণ করে। ওই দুই কিশোরী নিজেরাই রাতে থানায় এসে অভিযোগ করে। মামলার পরপরই সোহেল, রানা বেপারি ও আকতার আলী নামে তিনজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাদের তিন দিন করে রিমান্ডে পেয়েছে পুলিশ।

এদিকে বাড্ডায় গত রবিবার রাতে দুই কিশোরী তাদের বন্ধুর সঙ্গে দেখা করে বাড়ি ফিরছিলেন। রাস্তা ভুলে যাওয়ায় তারা এদিক-ওদিক ঘোরাফেরা করলে কয়েকজন যুবক তাদের রাস্তা দেখানোর কথা বলে ডিআইটি প্রজেক্টের ১৪ নম্বর সড়কের ১৩৯৫ নম্বর প্লটের পূর্বপাশে নিজামের গোডাউনের মধ্যে নিয়ে যায়। সেখানে দুই কিশোরীকে দল বেঁধে ধর্ষণ করে। তবে ওই ঘটনায় গত রাত পর্যন্ত কেউ আটক হয়নি।

অন্যদিকে শুক্রবার দিবাগত রাতে গাজীপুরের টঙ্গীতে দাওয়াত খেয়ে অটোরিকশা করে বাড়ি ফেরার পথে স্থানীয় হিমারদিঘিস্থ হক ফ্যাক্টরীর মোড়ে দল বেঁধে ধর্ষণের শিকার হয় এক কিশোরী। তার সঙ্গে থাকা ছোটভাইকে মারধর করে পেশায় বিউটি পার্লারের কর্মীকে ধর্ষণ করে একদল তরুণ। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে নয়ন, সাহাবুদ্দিন, তোফাজ্জল হোসেন ও বাবু মণ্ডলকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করে টঙ্গী পূর্ব থানা পুলিশ। তাদের বয়স ১৭ থেকে ২২ বছর।

এর আগে গত ৯ জানুয়ারি ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় এক মাদ্রাসাছাত্রীকে রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে রাতভর ধর্ষণ করে তিন যুবক। ওই ঘটনায় দুজনকে আটক করেছে পুলিশ। এরাও বয়সে কিশোর। বোরকা কিনে বাড়ি ফেরার জন্য সিএনজি অটোরিকশা খোঁজার সময় পূর্বপরিচিত ওবায়দুল নামের এক যুবক তাকে সিএনজিতে করে এক জায়গা নিয়ে যায়।

পরে মেয়েটি চিৎকার করলে মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে মেরে ফেলার ভয় দেখিয়ে বোরর চর ইউনিয়নের নির্জন একটি বাড়িতে নিয়ে ওবায়দুলসহ শাকিল ও নাঈম পালাক্রমে ধর্ষণ করে। পরদিন সকালে ওই তিনজন মেয়েটিকে একটি গাড়িতে তুলে বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়।

এই ঘটনার এক সপ্তাহ পর দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয় একদল ধর্ষকের কর্মকাণ্ডে। জন্মদিনের কথা বলে কৌশলে ডেকে নিয়ে গাজীপুরের শ্রীপুরে এক কিশোরীকে ধর্ষণ করে চার তরুণ। ধর্ষণের পর তারা ফেসবুক লাইভে এসে উল্লাস প্রকাশ করে। তাদের গ্রেপ্তার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

গত ১৫ জানুয়ারি বিকালে ওই চার বন্ধু জন্মদিনের কথা বলে মেয়েটিকে গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার নয়নপুর এলাকার একটি বাসায় নিয়ে যায়। কেক কাটার পর আসামিরা পূর্ব পরিকল্পিতভাবে কিশোরীকে এনার্জি ড্রিংসের সঙ্গে নেশা জাতীয় দ্রব্য মিশিয়ে পান করিয়ে অজ্ঞান করে। পরে পাশের একটি ঝোঁপের ভেতর নিয়ে কিশোরীর হাত, পা ও মুখ বেঁধে পালাক্রমে ধর্ষণ করে।

গ্রেপ্তার হওয়া সুজন তার মোবাইল ফোনে ওই ধর্ষণের ভিডিও ধারণ এবং তার ফেসবুক আইডিতে আপলোড করে। ধর্ষণের পর ৪ বন্ধু একটি সেলুনে গিয়ে উল্লাস করে এবং ‘হ্যালো ফ্রেন্ডস-জেলে থাকতে পারি’ এসব বলে আরও একটি ভিডিও করে সেটিও ফেসবুকে আপলোড করে।

এসব চাঞ্চল্যকর ধর্ষণের ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অপরাধ ও সমাজ বিশ্লেষক খন্দকার ফারজানা রহমান ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘প্রতিটা বয়সের একটি পজিটিভ এনার্জি থাকে। কিন্তু দেশে সেই এনার্জি ইতিবাচকভাবে ব্যবহারের সুযোগ কম। ফলে অনেকে বিপথে যাচ্ছে।’

‘তবে বিচারহীনতার সংস্কৃতিও একটি বড় কারণ। গত দশবছরে ফিরে দেখলে অন্তত ১০টি ধর্ষণের ঘটনারও চূড়ান্ত রায় হয়নি। তাই নীতিনির্ধারকদের কঠোর হতে হবে। যথাসময়ে বিচার শেষ করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে ধর্ষকদের মধ্যে ভীতির সৃষ্টি করতে হবে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

%d bloggers like this:
Skip to toolbar