Home / আর্ন্তজাতিক / কোনো ক্ষমতাসীন সরকারের পক্ষে সুষ্ঠু নির্বাচন করা সম্ভব নয় সংবিধান মেনে নিয়েছিল

কোনো ক্ষমতাসীন সরকারের পক্ষে সুষ্ঠু নির্বাচন করা সম্ভব নয় সংবিধান মেনে নিয়েছিল

প্যাট্রিসিয়া বিউটেনিস খুব অল্প সময় বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ছিলেন । এর মধ্যেই ঘটে যায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক চিত্র পাল্টে দেয়া ঘটনা ওয়ান-ইলেভেন। বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী দেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে সে সময় বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার বহু ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছেন বিউটেনিস। ২০১৪ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর তিনি নিজ কর্মজীবনে প্রত্যক্ষ করা নানা ঘটনা নিয়ে সাক্ষাৎকার দেন যুক্তরাষ্ট্রের এসোসিয়েশন ফর ডিপ্লোম্যাটিক স্টাডিজ অ্যান্ড ট্রেনিং-এর ফরেন অ্যাফেয়ার্স ওরাল হিস্টরি প্রোগ্রামকে। চার্লস স্টুয়ার্ট কেনেডিকে দেয়া ওই সাক্ষাৎকারটি সমপ্রতি প্রকাশিত হয়েছে। মানবজমিন-এর পাঠকদের জন্য দীর্ঘ ওই সাক্ষাৎকারে উঠে আসা বাংলাদেশের অংশগুলো ধারাবাহিকভাবে ছাপানো হচ্ছে। আজ থাকছে তৃতীয় কিস্তি:

তখন বিএনপি প্রধান বেগম খালেদা জিয়া ক্ষমতার শেষ বছরে। বাংলাদেশের সংবিধান মেনে নিয়েছিল যে রাজনীতিবিদরা পক্ষপাতদুষ্ট হতে পারে, তাই ক্ষমতাসীন সরকার সুষ্ঠু নির্বাচন করবে বলে আস্থা রাখা যায় না।

তাই সংবিধান নির্ধারণ করে দিয়েছিল, বিদায়ী সরকার নির্বাচনের কয়েক মাস আগে ক্ষমতা ছাড়বে এবং প্রধান উপদেষ্টার নেতৃত্বে একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করবে যার প্রধান কাজ হবে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করা। সরকারি কর্মচারীরা সরকার চালিয়ে নেবে, কেবল শীর্ষ স্তরের কর্মকর্তাদের সরানো হবে। বিএনপি সরকারের ক্ষমতার শেষ মাসগুলোতে সবকিছু উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে উঠলো। বিএনপি প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে যে ব্যক্তিকে নির্বাচিত করলো, তিনি আওয়ামী লীগের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিলেন না। দুই দলই দূতাবাসগুলোকে নিজেদের পক্ষে নেয়ার চেষ্টা করছিল; এক দল রাষ্ট্রদূতদের বিএনপি দ্বারা নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে সমর্থন করতে, অন্য দল তাতে আপত্তি জানাতে।
আমাদের পছন্দের কেউ ছিল না। তবে আমরা একটি অবাধ, সুষ্ঠু, বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের কথা বলছিলাম যাতে বিএনপি’র প্রার্থীর পক্ষে সরকার তার ক্ষমতাকে কাজে না লাগায়, একটি নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার থাকে এবং নির্বাচন কমিশন তার কঠিন দায়িত্ব সম্পাদন করতে পারে। এদিকে আওয়ামী লীগের শেখ হাসিনা নির্বাচনে অংশ নেওয়ার জন্য কিছু শর্তপূরণের দাবি জানান। তিনি জানতেন সেগুলো পূরণ করা হবে না বা আদৌ করা সম্ভব নয়। উদাহরণস্বরূপ শেখ হাসিনা ভোট জালিয়াতি রোধে ছবিসহ ভোটার তালিকার দাবি জানান। কিন্তু আমি মনে করি, সে সময় ভোটার তালিকা কম্পিউটারেই রেকর্ড ছিল না। আওয়ামী লীগের জন্য সুবিধার জায়গা ছিল- আমরা মনে করতাম তাদের নির্বাচনে অংশ নেওয়াটা বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাই আমরা সরকারকে কিছু ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য চাপ দিয়েছিলাম যাতে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে আসে। আমরা সরকারকে মানবাধিকার ইস্যু বিশেষ করে র‌্যাব-এর দ্বারা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিষয়টির দিকে নজর দিতে বলি। মনে করা হতো, র‌্যাব তাদের টার্গেটকে হামলা করে এবং তারপর দাবি করে যে অভিযুক্ত সন্ত্রাসী বা অপরাধী ক্রসফায়ারে নিহত হয়েছে।
তৃতীয় আরেকটি উদ্বেগের জায়গা ছিল- শ্রম অধিকার এবং তা নিয়ে কিছু শর্ত। জিএসপির আওতায় বাংলাদেশ আমাদের সাথে বাণিজ্যে  বাড়তি সুবিধা পেতো কিন্তু তাদের ট্রেড ইউনিয়নের শোচনীয় অবস্থার কারণে তারা এই মর্যাদা হারাতে বসছিল। তাদের তৈরি পোশাক শিল্প নিয়ে আমাদের উদ্বগের কারণ ছিল যা ছিল তাদের সবচেয়ে বড় কর্মসংস্থান এবং বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনের ক্ষেত্র। সেখানকার আশি শতাংশ শ্রমিকই ছিল নারী। সেখানে কাজের পরিবেশ ছিল ভয়াবহ এবং এখনও শ্রমিকরা কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে মারা যায় কারণ তাদেরকে আটকে রাখা হয় কিংবা তাদের মৌলিক নিরাপত্তার ব্যবস্থাও সেখানে উপেক্ষিত। ট্রেড ইউনিয়নগুলোও ছিল রাজনৈতিক লেজুরবৃত্তির শিকার এবং তারা কোন দলের হয়ে কাজ করতো।
বাংলাদেশে আমাকে নিয়ে কেন বিতর্ক তা নিয়ে আমার কথা বলা উচিত। যেমনটি বলছিলাম, আমাদের উদ্বেগ ছিল যদি প্রধান বিরোধী দল  নির্বাচনে অংশ না নেয় তাহলে আমরা নির্বাচনের ফলাফল মেনে নিতে পারি কিনা। এক পর্যায়ে আমাদের স্টেট ডিপার্টমেন্টের মুখপাত্র বলেছিলেন যে, যদি আওয়ামী লীগের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পরিবেশ না থাকে, তাহলে আন্তর্জাতিক সমপ্রদায় ফলাফল মেনে নেয়ার ক্ষেত্রে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। সুতরাং আমরা একদিকে বিএনপি সরকারকে আওয়ামী লীগের কিছু দাবি মেনে নেয়ার জন্য চাপ দিচ্ছিলাম এবং অন্যদিকে আওয়ামী লীগকে চাপ দিচ্ছিলাম তারা যেন (দাবি মানা না হলে) তাদের ধ্বংসাত্মক কর্মসূচি থেকে বিরত থাকে। আওয়ামী লীগ তাদের ‘শক ট্রুপ’কে রাস্তায় নামাবার হুমকি দিয়ে রেখেছিল। বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের উদ্দেশে আমাদের সমমনা দেশগুলোর বার্তাও সঙ্গতিপূর্ণ ছিল।
আমাদের অবস্থান নিয়ে বিতর্কিত কিছু হয়নি তবে দুর্ভাগ্যক্রমে উভয় পক্ষই নিজেদের জায়গায় অনড় এবং সমঝোতায় নারাজ ছিল। আমি এবং আমার কূটনীতিক সহকর্মীরা যখন এসব নিয়ে ভাবছি তখন সামরিক বাহিনীর কাছ থেকে গুজব শুনলাম, ‘তৃতীয় শক্তি’ আসছে। এটি এমন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয় যে, সেনাবাহিনী দায়িত্ব নেবে এবং কিছু একটা করবে। খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা এবং তাদের একে-অপরের প্রতি অন্তহীন শত্রুতা এবং তাদের দলগুলো একত্রে কাজ করতে রাজি না হওয়ায় সামরিক বাহিনীর পাশাপাশি সমাজের অন্যান্য অংশও বেশ বিরক্ত ছিল। কিছু লোক আমার প্রতিক্রিয়া কি সেটা বোঝার  জন্য আমার কাছে তৃতীয় শক্তির বিষয়টি তুলতো এবং অবশ্যই আমি সবসময় একটা কথাই বলতাম,  ‘কোনভাবেই না, রাজনীতি এবং সরকারে সামরিক বাহিনীর ভূমিকা থাকতে নেই। সংবিধান মেনে চলুন।’
আমার কূটনৈতিক সহকর্মীদের বার্তাও ছিল অভিন্ন। ওই সময়টা কাটছিল ভীষণ ব্যস্ততায়। অন্যান্য রাষ্ট্রদূত এবং রাজনীতিবিদদের সঙ্গে সন্ধ্যারাতে টেলিফোনে কথা বলা, বৈঠক করা, বিভিন্ন সম্মেলনে অংশ নিয়েই দিন কাটছিল। এমনকি আমি আমার বাসায় প্রত্যেক দলের জ্যেষ্ঠ প্রতিনিধিদের (রাজনৈতিক নেতা নন) নিয়ে একই সঙ্গে বসার ব্যবস্থা করি। একটা সমঝোতা বা অন্তত সংলাপের প্রচেষ্টায়। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি।
সে সময় জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কর্মসূচিতে বাংলাদেশের সৈন্য সংখ্যা ছিল সবচেয়ে বেশি। সেটা ছিল সামরিক বাহিনীর জন্য গর্বের বিষয়। নির্বাচনের ফলাফল আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য না হলে বাংলাদেশকে শান্তিরক্ষা মিশন থেকে বের করে দেয়া হবে এমন সম্ভাবনা নিয়েও উদ্বেগ দানা বাঁধছিল।
তখন এমন সব মুহূর্ত গেছে, যেগুলো আমি জীবনেও ভুলবো না। একদিন বিকালে আমাদের (রাষ্ট্রদূতদের নিয়ে গড়া) ছোট গ্রুপটার কানাডার হাইকমিশনারের বাসায় বিএনপি’র কয়েকজন নেতার সঙ্গে বৈঠক চলছিল। আমাদের অভিন্ন প্রশ্ন ছিল: আপনারা কেন আওয়ামী লীগের কিছু দাবি মেনে নেন না যাতে তারা নির্বাচনে অংশ নিতে পারে? একসময় আমার সেল ফোন বেজে উঠলো। আমার রাজনৈতিক পরামর্শদাতা আমাকে জানালো যে, সেনাবাহিনী সবেমাত্র জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে। এটি মোটেও ভালো খবর ছিল না এবং আমি আমার পাশে বসা যুক্তরাজ্যের সহকর্মীকে ই-মেইল করে ফিসফিস করে তা পড়তে বললাম। তখন সব কূটনীতিকই ফোনে এই খবর পাচ্ছেন এবং আমরা আমাদের সঙ্গে থাকা বিএনপি নেতাদের খবরটা জানাই। বিএনপি নেতাদের সঙ্গে আমাদের বৈঠকটি ভেঙে যায়। তবে আমি মনে করি, বিএনপি’র সঙ্গে আমাদের বৈঠক চলাকালীন সেনাবাহিনীর এই পদক্ষেপ নেয়ার কাকতালীয় ঘটনা এই বিশ্বাসের জন্ম দেয় যে, আমরা কূটনীতিকরা জরুরি অবস্থা জারির ঘটনায় প্ররোচনা দিয়েছি। অবশ্যই আমরা সামরিক বাহিনীর এ রকম পদক্ষেপে সন্তুষ্ট ছিলাম না। তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে বিশ্বব্যাংকের সাবেক এক কর্মকর্তাকে নিয়োগ দেয় যিনি খুব সম্মানিত ব্যক্তি ছিলেন। যাই হোক নির্বাচন স্থগিত হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত তারাও ব্যর্থ হয় এবং ২০০৮ সালে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে আওয়ামী লীগ তাদের জোটকে নিয়ে জয়লাভ করে।
আমাকে অবশ্যই বলতে হবে, কেবল সেনাবাহিনীই যে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অবস্থা ও সংস্কৃতি নিয়ে হতাশ ছিল, তা নয়। তবে তাদের জড়িত হওয়াটাও গণতন্ত্রকে জোরদার করতে সহায়তা করেনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

%d bloggers like this: